কাব্যকল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কাব্যকল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২৯ মে, ২০১৬

ওথেলোর একালাপ

|| ওথেলোর একালাপ ||

সকালে ঘুম ভাঙ্গার মুখে তোর স্বপ্ন দেখে জেগে উঠলাম | স্নান সেরে শাড়ি কাপড় পরে এলো চুলে রোদে দাঁড়িয়ে চুল শুকচ্ছিস | রোদ দেখে মনে হল শীতের রোদ – যদিও ছবিটা সাদায় কালোয় | বয়েস তোর আন্দাজ আটাশ – কি তিরিশ | কোমর, কাপড়ের কুঁচি বাদ দিলেও, “ঈষৎ স্ফীত” | ছবিটা কী তোর জন্মের পর, না কী তুই জন্ম দেয়ার পর ? ভাবতে ভাবতে বুঝলাম গুলিয়ে ফেলেছি – তোর কথা ভাবছি তোকে মাতৃত্বের রূপে স্বপ্নে দেখে | তুই, তোর মা, সব আজকাল গুলিয়ে যায় |

মাঝে মাঝে তোর ছবিগুলো বার করে দেখি | কোথায় রেখেছি ছবিগুলো, কবে শেষ দেখেছি মনে নেই | তবে চোখ বুজলেই একটা বড় বাক্স হাতে পাই | তার ভিতরে থরে থরে ছবি সাজানো – তোর, আমার, আমাদের মায়েদের, আমাদের বাবাদের, আরও কত কার কার ছবি আছে | তার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে তোর ছোটবেলার ছবি – পুতুলের মত ; তোর একটু বড় হয়ে ছবি – ডাগর চোখ, ফ্রকের তলায় লম্বা পা, আর ঠোঁটে একটা – তখনই ফুটছে – সেই হৃদয়সমুদ্র মন্থন করার ঠোঁট টেপা মৃদু, মিষ্টি, আলগোছ হাসি, “দূরে থাক ! খবরদার, কাছে আসবি না |” ওই হাসিটা এখনও তেমনি আমার বুকে হাতুড়ি পেটায় – অথচ তুই জানতিস না | তুই তো পালিয়ে বেড়াতিস – “চল খেলবি”, বলে কোথায় যে উধাও হতিস, ভালো করে জেনে যে তোকে আমি খুঁজে বেড়াব | আজও খুঁজি | খুঁজতে খুঁজতে ওই বাক্সয় হাতড়াই | কখনও তোর বড় হয়ে ওঠার ছবি পাই না – সেখানে পাই তোর মায়ের ছবি – কিন্তু হাসিটা গুলিয়ে দেয়, ভুল করিয়ে দেয়, যে ওটা তুই |

কী গান্ধারী ওই চেহারা | টিকালো নাক, উঁচু গালের উপর লম্বা পলকের ছায়ার শিরোনাম, পলকের নিচে কটা কটা চোখের মণি | আর ঠোঁটের কথা নাই বললাম | তুইও হয়তো তোর ঠোঁটের কথা জানতিস না | নইলে কী আমায় এগোতে দেখলেই ঠোঁটের উপর আঙ্গুল রেখে চুপ করতে ইশারা করতে গিয়ে উল্টে আমার টানটা আরও অদম্য করতিস ?

আমি আর তুই – যেন ওথেলো আর দেসদিমোনা | আচ্ছা বলতো, একই সম্পর্কের জালে কী ভাবে দু’রঙা সুতো থাকতে পারে, কালো আর লাল | কী করে সবাই হতে পারে হয় সুন্দর, নয় কুৎসিত ? আর কেন, তুই প্রথম দলে, তো আমি দ্বিতীয় দলে ? কোথায় আমাদের ধারা আলাদা হল ? কেন হল, এমন ? কেন হল এমন যে কাকা, পিসি, মামা, মাসি আর আরও সবাই – হয় রূপের পক্ষে, নয় বিপক্ষে ?

তুই কী লক্ষ্য করেছিস এই জালে সব সহোদর এক সুতোর নয় ? কেউ কালো, অপুষ্ট, শ্রীহীন, ক্ষীনপ্রাণ তো কেউ রূপের জেল্লায় লাল, ফেটে পড়ছে |

এই কথাতে  এসে আমার ছোটবেলার একটা কথা মনে পড়ে যায় | রান্নার মাসি উনুন ধরিয়েছে পাট কাঠির মাথায় পাট জড়িয়ে কেরোসিন ঢেলে | তারপর চেলা কাঠ চাপিয়ে চলে গেছে | তোকে আর আমাকে বলে গেছে দেখতে যেন আগুনটা ধরে | আমি সামনে বসে পাটকাঠি দিয়ে ফুঁ দিচ্ছি গাল ফুলিয়ে – পরনে হাফ প্যান্ট, গা উদোম | তুই পাশে উবু হয়ে বসে দেখছিস – পরনে তোর লেস দেয়া হাতকাটা শেমিজ | কী কুক্ষণে যে তোর পায়ের দিকে আমার নজর গিয়েছিল, আর তুই লেসের হেম ধরে শেমিজ টেনে নামিয়ে হাঁটু গেড়েছিলি, পাছে আমার দৃষ্টি দুই ধারা কে কাছে টানে | তখন দেখছিলাম ওই আগুনে উজ্জ্বল হয়ে চেলা কাঠের বুক ফাটলো, তার স্ফুলিঙ্গ ছিটকে ছড়িয়ে পড়ল, আর তোর গালে তার আগুন লাগলো | গালে ফুটে উঠল অজস্র লাল বিন্দুর স্ফুলিঙ্গ | তোর চোখও যেন জ্বলে উঠল | আমায় বললি, “মুখপোড়া হনুমান !” তারপর ছুটে পালিয়ে গেলি | তখনই তুই বলে গেলি – তুই শুভ্র, আমি কৃষ্ণ – আমরা জাতে, পঙক্তিতে আলাদা | আমরা ভিন্ন পথের পথিক |

অথচ আমি জানি, একদিন দুই ভিন্ন পথের পথিক – এক রূপসী আর এক দানো – এক হয়ে রক্তের ধারা এক করতে চেয়েছিল | তবুও কালো রক্তে লাল রক্ত মিশ খায় নি | দুটো ধারা আলাদা রয়ে গেছে | তাই তাদের প্রজন্মে দুই ধারা আলাদাই রয়ে গেছে |

তবুও তো আমার রক্তে রয়ে গেছে ওই অন্য রক্তের ডাক | আমার রক্ত ডাকে, আর এক রক্তের সাথে এক হতে – যাতে ওথেলো আর দেসদিমোনা আর আলাদা না থাকে |

ওই ডাক শুনে বিছানায় যাই | ওই ডাক শুনে ঘুম আসে | ঘুমে ছবির বাক্সটার ডালা খুলে ছবি দেখি | কিন্তু ওখানে তো তোর আর কোন ছবি নেই | তাই জানি না তুই কবে মায়ের রূপ ধরলি – আর কার সাথে এক হয়ে মা হলি | স্বপ্ন দেখে জেগে উঠে আমি বুঝি – দুই রক্ত কোনদিন এক হবে না | ওথেলোরা চিরকুমার থেকে যাবে, আর দেসদিমোনারা চিরকুমারী |

তবুও বুকের চরে ভাঁটা পড়া রক্তের স্রোত বয়েই যায় – হয়ত এগোতে এগোতে তোর স্রোতের সাথে দেখা হবে, দুই স্রোত এক হবে |

যেখানেই থাক, বইতে থাক, থামিস না |


----------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ২৯ মে ২০১৬

মঙ্গলবার, ৫ নভেম্বর, ২০১৩

আলেয়া



দেয়ালি, ২০০৭
জিত,
         একটা পুরনো খাতা পেয়ে পড়ে দেখছিলাম | কবেকার খাতা ? বলছি শোনো -

         ২০০১ এর পুজোয় বাড়িতে আসতেই মামণি ধরেছিল, “এবার তোর সেকেন্ড ইয়ার হয়ে গেল | ওই সব আই আই টি তে ভর্তি হওয়ার পড়াশুনার খাতাগুলো এবার ফেলে দিলে হয় না ?”

         কালীপূজোর আগে একদিন সকালে একটু শীত শীত ভাব | খাবার টেবিলে কচি রোদ এসে পড়ছে সকাল থেকে | আমি বসলাম খাতাগুলো নিয়ে | কত পরিচিত সময় আটকে আছে ওদের পাতায়, পাতায় | কোথাও লিখে কাট-কুট করেছি কতবার, কোনও অঙ্ক মেলাতে | কোথাও অর্গানিকের জটিল সমীকরণ | কোথাও বাপি সুন্দর ছবি এঁকে অপটিক্সের কিছু বুঝিয়েছে | প্রথম, প্রথম খাতা কিনতাম | পরে যখন কুলিয়ে উঠল না, তখন বাপি অফিস থেকে ব্যবহার করা কম্প্যুটারের ফ্যানফোল্ড কাগজ নিয়ে আসত | মামণি সেগুলোর এক এক পাতা আলাদা করে এক পাশের ফুটোতে সুতো ঢুকিয়ে সেলাই করে দিত একসাথে অনেকগুলো পাতা | দিব্যি খাতা হত, পাতার মুখের দিকটা পিছনে রেখে পিঠের দিকে আমি লিখতাম | একটা খাতা দিন পনের চলত | তাও ভালো | কেনা খাতাগুলো তো চার-পাঁচ দিনেই শেষ হত |

         এইসবের মধ্যে থেকে বের হল একটা খাতা, যেটা যখন আমি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম, তুমি এসেছিলে, তখনকার | মনে পড়ল তার শেষের দিকের পাতায় সেই হাসপাতালের দিনগুলোর কথা লিখেছিলাম, যখন আমি কেবিনে একা থাকতাম | সেই খাতাটা সরিয়ে রেখে বাকিগুলো মামণিকে দিলাম, ফিরীওয়ালাকে দিয়ে দিতে |

         আজ খাতাটা আমার পুরনো জামাকাপড়ের নিচ থেকে বেরল | সেটাই পড়ে মনে হল তোমায় একটা প্রশ্ন করি | নাকি দুটো ?

         তার আগে বলি – আমি নিচে সেই ডায়েরির পাতাগুলো নকল করে দিলাম | তখন লিখেছিলাম অবশ্য ইংরেজিতে | এখন সেটাই বাংলায় লিখে পাঠাচ্ছি |

         পড়ে এই দুটো প্রশ্নর উত্তর দিও |
- একটা কথা আমি তখন লিখিনি | ভাবতে পারো সেটা কি ?
- দেয়ালির রাতে তোমার মনে কি ঘটেছিল তা হয়ত এখন তোমার মনে পড়বে না | তাও জানতে চাই, নিচের লেখা পড়ে সেই রাতের কথা কি ভাবে তোমার মনে পড়ে ?

         তাড়াতাড়ি উত্তর পাঠাবে তো ?
মাম্মা আর বাপ্পি কে আমার কি জানাবো – প্রণাম, না শ্রদ্ধা ? তুমি ঠিক করে নিয়ে জানিয়ে দিও, প্লিজ !
তোমায় কিছুই জানাচ্ছি না, তোমার উত্তরের অপেক্ষায় |

- তোমার ইতি 


-----------------------------------------------------------------------------------------------------

০৩ নভেম্বর
তিন দিন আগে বেনারসের বড় মাসির কাছ থেকে ফিরেছি জন্ডিস নিয়ে | যাওয়ার সময় খুব জ্বর ছিল | ওখানে ক’দিন ডাক্তার দেখানোর পর ইউরিনের রং দেখে ডাক্তার বলল যে জন্ডিস হতে পারে | ট্রেনে রিজার্ভেশন থাকলেও জ্বর আর গা ব্যথায় অনেক কষ্টে ফিরেছি | বাড়ি ফিরেই বাপি আমাকে হাসপাতালের এমার্জেন্সিতে দেখাল | ওরা বলল তখনই ভর্তি করতে | ঘরে গিয়ে দরকারি জিনিস নিয়ে ফিরে এসে ভর্তি হলাম | প্রথমে ওরা আমাকে ওয়ার্ডে দিল | অনেক রাত অব্দি বাপি থেকে শেষে মামণিকে রেখে গেল আমার কাছে | খুব চিন্তা হল মামণি কি করে রাত কাটাবে, বসার জন্য তো খালি একটা স্টুল | ডাক্তার দেখে গেল, বেশি ওষুধ দিল না | শুধু নার্স রক্ত নিলো পরীক্ষা করার জন্য | ডাক্তার বলল পরদিন কেবিন দেবার চেষ্টা করবে |

বাড়ি থেকে আসার সময় মামণি বাপিকে জিজ্ঞাসা করেছিল জিত কে খবরটা দেবে কিনা | বাপি বলেছিল বাড়ি ফিরে জিত কে ফোন করবে | আমি ভাবলাম, ‘জিত কি করবে ? আমার সাথে হাসপাতালে তো কথা বলতে পারবে না | শুধু রাত জেগে ছটফট করবে হয়ত |’

পরশু জানলাম আমার বিলিরুবিন ১৬’র ওপরে | খুব বেশী | কেন হল এরকম ? বাপি আবার গেল কেবিনের কথা বলতে |

আজ সকালে আমি কেবিন পেয়েছি | আমি বলায় বাপি কিছু আই আই টির বই খাতা দিয়ে গেছে | সেগুলো রেখেছি মাথার কাছে ওষুধের ছোট টেবিলটা টেনে | তবে বেশি কিছু পড়তে পারছি না | ভারী ভারী বইগুলো পড়েই থাকছে | তার উপর বাতি আসছে আর যাচ্ছে | বাপি বলছিল ঋতু বদল হলেই লোড শেডিং হয় | যেমন এখন ঠাণ্ডা পড়ছে | কিন্তু কেন ? জিত থাকলে নিশ্চয় এই নিয়ে কথা বলা যেত | আমি কিছু প্রশ্ন করলে ও খুব খুশি হয় নিজের মতামত জানানোর সুযোগ পেয়ে |

৬ই রাত্রিতে কালীপূজো | পরদিন মামণি প্রদীপ জ্বালবে | বলছিল, “তুই নেই | কি করব ভেবে পাচ্ছিনা |” আমি তো দেয়ালি দেখতে পাব না বলেই মনে হচ্ছে |

০৪ নভেম্বর
কাল জিত এসেছে | রাত সাড়ে দশটায় স্টেশনে নেমে বাপিকে ফোন করে জেনে নিয়ে আমি কোথায় আছি, প্রথমে সোজা হাসপাতালে এসেছে | রিসেপশনে ওকে আটকে রেখে খবর পাঠাল কেবিনে | মামণি গিয়ে ওকে নিয়ে এলো | কেবিনে ঢুকে আমায় দেখে ওর হাসি নিভে গেল | ও এইরকম চুপ করলেই আমি বুঝি ওর মনে কোনও আলোড়ন হচ্ছে যা মুখে প্রকাশ করতে পারছে না | মামণিকে বললাম গিয়ে নার্সদের কাছ থেকে জেনে আসতে শোয়ার আগে কোনও ওষুধ খেতে হবে কি না | মামণি চলে গেল জিজ্ঞাসা করলাম, “জিত কি হয়েছে ? তুমি এমন চুপ করে আছ কেন ? ক্লান্ত ?”
জিত আমার কাছে এসে আটকানো গলায় বলল, “খুব কষ্ট পেয়েছ, না ? ... ভাবিনি তুমি এত রোগা হয়ে গিয়ে থাকবে |”
আমি – “না, না | আসলে আমি হাসপাতালের ঢিলে গাউনে রোগা লাগছি হয়ত | আর, কতদিন পরে দেখছ | ”
জিত – “না | তোমার হাত, গলা সব কত রোগা হয়ে গেছে | শরীর দেখে মনে হচ্ছে বয়েস বার – তেরো যেন | কি খাচ্ছ ?”
আমি – “ডাক্তার ঝা, যে আমায় দেখছে, বেশ বয়স্ক, খুব হেসে কথা বলে | আমার ভারী বইগুলো দেখে বলে, এখন এগুলো তুলো না, দুর্বল শরীরে ক্লান্ত হতে নেই | আজ ও বলেছে এখন আমি বাড়ির খাবার খেতে পারি | সেই কথা শুনেই বাপি লাফিয়ে অফিস থেকে ফিরে আমার জন্য কুমড়ো, বেগুন, ঢেঁড়স দিয়ে সাম্বার আর ভাত রান্না করে এনেছিল | খুব খেয়েছি |”

মামণি নার্সদের ওখান থেকে ফিরে এলে জিত বলল, “মাসিমা, আজ রাত্রে আমি থাকি ? আপনার নিশ্চয় অনেক দিন রাত্রে বাড়িতে শোয়া হয়নি |” মামণি বলল, “না টুকু | তুমি আজ কতক্ষণ ট্রেনে কাটিয়েছ | তুমি যাও | মেসোমশাই নিশ্চয় বসে আছে খাবার নিয়ে | ওকে বলে দিও আমি খেয়ে নিয়েছি |”

জিত চলে গেল সকালে আসবে বলে |

০৫ নভেম্বর
জিত আসার পর আমি মনে মনে অনেক ভাল বোধ করছি | জ্বরটা কমেছে, তবে ডাক্তার ঝা বলছে বিলিরুবিন কমতে দেরী হবে | রোজ সকালে এসে আমায় দেখে যায় | গলায় কণ্ঠীর মালা, কপালে চন্দন আর সিঁদুরের টিপ | ইংরেজি একদম বলতে পারে না | একদিন জিত কে না দেখতে পেয়ে মন্তব্য করল, “ও যখন থাকে তখন তো তুমি খুব হাসিখুশি থাক দেখছি !”
ভেবেছিল আমি উত্তর দেব না | হেসে বললাম, “আপনাকে দেখেও তো আমি খুশি হই |” | “ভাল কথা”, বলে চলে গেল |

মুশকিল নার্সগুলো কে নিয়ে | জিতকে নিয়ে নানা পরোক্ষ প্রশ্ন | একদিন জিত আমার খাটে বসে আমার হাতে কিরুকিবু কাটছিল | এটা ওর একটা খেলা | হাতের ভিতরের দিকের চামড়া তিন আঙ্গুলের ডগা দিয়ে চিমটি কেটে কেটে আঙ্গুল তিনটে হাঁটিয়ে নিয়ে যাবে কব্জি থেকে কাঁধ অব্দি, মনে হবে যেন কোন ডেঁয়ো পিঁপড়ে কামড় দিতে দিতে হেঁটে যাচ্ছে | হালকা চিমটির সাথে অদ্ভুত একটা সুড়সুড়ি লাগে, যেটা হাতের শিরা বেয়ে বেয়ে গলা হয়ে মাথায় ওঠে | আমার তো কিছুক্ষণের মধ্যেই শরীরের টানটান ভাব ছাড়তে শুরু করে | একবার মার হাতে করাতে মা তো হাসতে হাসতে হাত ছাড়িয়ে বলল, “ও সব তুমি ঋহার হাতেই করো, বাবা |” তাই, সেদিন একটা নার্স ইনজেকশন দিতে এসে এই সব দেখে খুব গম্ভীর হয়ে জিত কে বলল খাটে না বসতে | পরে আমাকে জিজ্ঞাসা করল, “ও কি তোমার ভাই, যে খাটে বসেছিল ?”

০৬ নভেম্বর
আজ রাত্রে কালীপূজো | বাপি আজ একটা অভাবনীয় কাজ করেছে | আমার বিলিরুবিন কমছে না এই নিয়ে খুব চিন্তিত দেখে কাল, অফিসে নয় ক্লাবে, বাপিকে কেউ বলেছে, পীরডিহিতে এক মুসলমান বাবা আছে যে নাকি জন্ডিসের ওষুধ দেয় | মাকে নিয়ে গিয়েছিল | একটা সাদা কাঠের পুঁতির মালা এনে আমায় দিয়েছে | এটা পরে থাকলে ওই পুঁতিগুলো শরীর থেকে বিলিরুবিন টেনে নেবে | পুঁতিগুলো হলুদ হয়ে গিয়ে কমলা রং ধরলে বুঝতে হবে অসুখ শেষ হয়েছে | মামণি তো এত রেগে গিয়েছে | বাপিকে জানি নাস্তিক বলে | ভগবান, সাধু, সন্ত কিছুতেই বিশ্বাস নেই | কিন্তু খুব কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “ঋহা, একবার পরেই দেখ না |” শেষে মামণি ও আমাকে বলল, “বাপির যখন এতে এত আস্থা, তখন কদিন পরেই দেখ |” তাই মালাটা পরেছি, কিন্তু খুব অস্বস্তি করছে কেন না ঘাড়ে, গলায় খরখরে পুঁতিগুলো ফুটছে |
মা আজ রাত্রে কালীপূজো দেবে | জিত থাকবে আমার সাথে কেবিনে |

আমার কেবিনটা বেশ বড় | বাইরে একটা এক মুঠো চৌক ঘাসের উঠোন ঘিরে চারি পাশে করিডোর | তিন পাশের তিন করিডোরে মুখ করে কেবিন পর পর, চতুর্থ করিডোরটা হাসপাতালের যাতায়াতের মেরুদণ্ড | আমার কেবিনে ঢুকে বাঁ দিকের দেয়ালে লাগান আমার খাট | তার এই পাশে ঢোকার দরজার পর একটা বড় সোফা, যাতে শোয়াও যায় | এই দরজার মুখোমুখি উল্টো দেয়ালে আর একটা দরজা | ওটা দিয়ে বেরলে একটা ছোট ব্যালকনি | ওই দরজার পাশে একটা বড় জানলা, যেটা দিয়ে হাসপাতালের রিসেপশন দেখা যায় | দেখা যায় এদিক ওদিক কত ঢাকা করিডোর গেছে, পাশ দিয়ে দিয়ে সবুজ বেড়া আর ছায়া ছায়া গাছ | কেউ না থাকলে আমি বাইরে বসি, বা খাটে শুয়ে শুয়ে জানালা দিয়ে দেখি | জিত এলে বাইরেই বসি | অনেক সময় কোনও কথা হয়না | কি ভাবছে জিজ্ঞাসা করলে বলে, “কারো সাথে কথা বলার একটা সুযোগ পেয়েছি | মনে মনে দুটো কথা বলে নিই |” মাঝে মাঝেই আমায় হাতে কিরুকিবু করে দেয় | কে যে শিখিয়েছে ওকে | আগে একবার বলেছিল অর্জুন নাকি | অত ছোটবেলায় ?

আর, ওদের কি হল, অর্জুন আর এর্মের, কে জানে ? জিত কে জিজ্ঞাসা করলে বলে জানে না |

০৭ নভেম্বর
কাল রাত্রে জিত ছিল | অনেক রাত অব্দি গল্প করে শুয়েছি | সকালে উঠে দেখি আমায় না বলে চলে গেছে | এই খাতার একটা পাতা ছিঁড়ে লিখে রেখে গেছে -

তুমি ঘুমচ্ছিলে, ভোরের নার্স ওষুধ রাখতে এসে আমায় দেখে চমকে গেল | আসলে, আমি তোমার খাটের পাশে দাঁড়িয়ে তোমায় দেখছিলাম | ঘুমের মধ্যে তোমার বুক একটুও উঠছে পড়ছে না দেখে হটাত খুব ভয় পেলাম ! তারপর যখন তুমি নড়ে পাশ ফিরলে, তখন আশ্বস্ত হলাম | তখন দেখি তোমার গালে ঘামে আর লালায় অনেক চুল জড়িয়ে গেছে | গালটা মুছে চুলগুলো ছাড়াচ্ছিলাম, এমন সময় নার্সটা ঢুকল, আর থমকে দাঁড়াল |
আমি বাড়ি যাচ্ছি | স্নান করে জলখাবার নিয়ে আসব | তুমি ঘুমাও ততক্ষণ |

ঘুমবো কি, ফ্যান চলছে না, বাতি নেই সকাল থেকে | বাইরে শীত শীত আবহাওয়া হলেও সারা রাত বন্ধ ঘর সকালে গরম | জিত এলে ব্যালকনিতে বসে দুজনে মামণির বানিয়ে দেয়া স্যান্ডউয়িচ খেলাম চায়ের সাথে | তারপর জিত আমায় অনেক পার্ম্যুটেশনের অঙ্ক দেখিয়ে দিল | ও শুধু মুখে বলে দেয় | খাতায় কিছুতেই লিখবে না | একদিন ঠাট্টা করে বলল (সাধারণত এরকম কথা বলে না), “কে জানে একদিন যদি কেউ তোমার খাতায় আমার হাতের লেখা দেখে | কি বলবে তুমি তাকে ?”

আমার খাতায় আর কেউ লিখবে ? জিত, তুমি আমার যে খাতায় লেখ, সেটা কেউ কোনোদিন দেখবে না | আমি নিজেই দেখতে পাইনা | খালি লেখ যখন, যেমন এখন এই কথাগুলো বলে লিখলে, তখন মনের ভিতরে আঁচর টেনে কিরুকিবু করে তোমার লেখা পড়ে | কি লেখা তা বুঝি না | শুধু এটুকু বুঝি যে যা বলছ তা নয়, কি বলতে চাইছ তাই লেখা হচ্ছে | হয়ত অনেক দিন পরে একদিন আমি মনটা খুলে দেখাব তোমাকে, আর তুমি পড়ে শোনাবে কি বলতে চেয়েছিলে |

দুপুর অব্দি থেকে জিত চলে গেল | খেয়ে ঘুমিয়ে সন্ধ্যা বেলায় আসবে | ততক্ষণ মামণি থাকবে | ভাইফোঁটা পার হলে জিতের ছুটি শেষ, মায়ের স্কুল খুলবে, আমার ও | সামনে পরীক্ষা | কি লিখব ? ওদিকে আমার বিলিরুবিন কমতে লেগেছে, এখন দশের কাছাকাছি | বাপি একটু আশ্বস্ত হয়ে আমার গলার কাঠের পুঁতির মালাটা দেখল | মামণি কে বলল, “বুনু দেখ পুঁতিগুলো কেমন হলুদ হয়েছে |” মা জিতের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল | জিত বাপিকে বলল, “হ্যাঁ মেসোমশাই | আমি আগেই বলেছি ঝিলিক কে, যে এবার ও ঠিক হয়ে যাবে, আর আমি তাড়াতাড়ি বাড়ি পালাতে পারব |”

আমি এটা বুঝি না, বাপি জিত কে জিত বলে ডাকে, কিন্তু মামণি ওকে এখনো মাঝে মাঝে টুকু বলে ডাকে | আর বাপির সাথে কথা বললে জিত আমাকে ঝিলিক বলে ডাকে | মনে হয় যেন মামণি জিতকে এখনো সেই ছোট মনে করে, আর বাপি ভাবে ও বড় হয়ে গেছে | আর বাপির মনে আমি এখনো ছোট, তাই বাপির কাছে জিত আমাকে ঝিলিক বলে ডাকে | আমি বাপির ঝিলিক, না টুকুর ? জিত আমার, না বাপির ? টুকু আর ঝিলিক কি ভাই বোন ? আর, জিত আর ইতি ...

০৮ নভেম্বর
কাল দেয়ালি ছিল | বিকেলেই পুরো পাওয়ার চলে গিয়েছিল | নেমে আসা অন্ধকারে আমি ব্যালকনিতে বসেছিলাম | সূর্য ডুবলে ওরা জেনারেটর চালিয়ে চেষ্টা করল অনেকক্ষণ ধরে | কিন্তু তাতে কখনো এখানে, কখনো ওখানে, এক দুটো বাতি শুধু জ্বলে উঠবার চেষ্টা করেই নিভে যাচ্ছিল | মনে হচ্ছিল যেন করিডোরে করিডোরে আলেয়ার আলো পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে | ভাবছিলাম করিডোরে অন্ধকার ঘনালে জিত আসবে কি করে | তখন বাইরের দরজায় দুটো টোকার শব্দ হল, শুনলাম জিত ডাকছে, “ইতি, তুমি কোথায় ?” আমি ব্যালকনির দরজা ফাঁক করে সাড়া দিলাম, “ব্যালকনিতে | চলে এস |”

দুজনে বসে থাকতে থাকতে দেখলাম, হাসপাতালের বাইরে নার্সদের হোস্টেলে বাতি এলো | ওরা অনেক ছোট চুমকি বাতি লাগিয়েছে - সাদা, হলুদ, লাল, নীল, সবুজ আর বেগুনী বিজলীর বাতি ঝালরের মত ঝুলছে চারতলা বাড়িটাতে | কি মায়াবী লাগছে বিশেষ করে ওই সবুজ, নীল আর বেগুনী আলো | তারপরে দেখলাম নার্সরা ব্যালকনির রেলিঙে প্রদীপ দিচ্ছে | জিত বলল মামণিকে প্রদীপের সলতে, তেল সব ঠিক করে দিয়ে এসেছে | মামণি বাপির অপেক্ষায় বসে আছে |

কিন্তু হাসপাতালে বাতি আর এলো না | জেনারেটর অনেক চেষ্টা করে শেষে কিছু কিছু জায়গায়, যেমন নার্সদের স্টেশনে স্টেশনে বাতি দিল | একটা নার্স এসে আমার ঘরে একটা ইমার্জেন্সি বাতি দিয়ে গেল | জিত গিয়ে সেটা নিভিয়ে এসে বলল, “চলো আজ অন্ধকারে বসি, দিনটা মনে রাখার জন্য |” দেখলাম একটু একটু করে ঠাণ্ডা নামছে | জিত আমার হাত দুটো নিয়ে নিজের হাতের তালুর মধ্যে ধরে রাখল | পরে ভিতর থেকে একটা চাদর এনে আমার হাঁটুর উপর ফেলে দিল |

একটু পরে আবার দরজায় টোকা | একটা নার্স ঢুকল, বলল রক্ত নেবে | নার্সটা নতুন মনে হল | কিছুতেই আমার নাড়ি খুঁজে পায় না আর থেকে থেকে জিতের মুখের দিকে তাকায় | জিত ওর চোখ এড়িয়ে ওকে একবার বলল অন্য নার্স ডাকতে | সে কথা না শুনে ও হটাত খুব জোরে ছুঁচ ফুটিয়ে রক্ত নিতে শুরু করল | তারপর ছুঁচটা বের করতেই ফোয়ারার মত রক্ত বেরোতে লাগল ফোটানো জায়গাটা থেকে | আমি দেখি জিত অদ্ভুত ভাবে সেদিকে তাকিয়ে, মুখে কথা নেই | আমি চিৎকার করে উঠতে নার্সটা ছুটে বেরিয়ে গিয়ে ফিরে এলো অন্য নার্স নিয়ে | জিত সেইভাবেই থ হয়ে দাঁড়িয়ে | যেন স্থাণু হয়ে গিয়েছে | কিছুক্ষণ পরে নার্সরা রক্ত বন্ধ করে চলে গেলে আমি বিছানা থেকে উঠলাম | ততক্ষণে ও সোফায় গিয়ে বসে পড়েছে | আমি ওর হাতে হাত রেখে বললাম, “জিত, কি হয়েছে ? এরকম রক্ত দেখনি কোনও দিন ?” জিত সম্বিত ফিরে পেয়ে বলল, “না, আমি তোমার রক্ত তো আগে দেখিনি | কোথায় থেকে এলো এত কালচে রক্ত ? তোমার আর আমার রক্তের রং আলাদা কেন ? “
আমি – “জিত, ইমার্জেন্সি আলোয় রক্তটা হয়ত কালচে লাগছিল | তুমি তাই দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিলে ?”
জিত = “না, আমি ঘাবড়ে যাইনি | কিন্তু কি সব এলোমেলো চিন্তার ঝোঁকে পড়ে গিয়েছিলাম, যেন ওই রক্ত আমাকে সম্মোহিত করেছিল |”

আমি জিত কে জড়িয়ে অনেকক্ষণ সোফায় ওর পাশে বসে থাকলাম | ওর পিঠে আমার বুক হেলিয়ে ওকে শোনালাম যে আমার বুকের ভিতরটা শান্ত হয়েই আছে; যাতে ও আর চিন্তা না করে | জিত কাঠের গুঁড়ির মত শক্ত হয়ে বসে থাকল |

রিসেপশনটা সন্ধ্যা থেকে অন্ধকার ছিল | অনেক দেরীতে ওখানে ওরা প্রথমে একটা ইমার্জেন্সি বাতি দিল | তারপর কেউ এসে অনেকগুলো মোমবাতি জ্বেলে দিয়ে গেলে | জানলা দিয়ে আসা সেই আলোয় জিত হুঁশ ফিরে পেয়ে বলল, “চল, ঝিলিক, ওখানে গিয়ে দেখি ওরা কি করছে |” জিত আমাকে ঝিলিক বলে ডাকার মানেই হচ্ছে একটা কিছু খেলার কথা মনে হয়েছে ওর | উঠে বললাম, “আচ্ছা তুমি বস, আমি এই গাউনের নিচে একটা আমার শেমিজ পরে নিই |” তার ওপর চাদর গায়ে জড়িয়ে আমি বেরলাম | অন্ধকার করিডোরে ইমার্জেন্সি বাতিটা ধরে আস্তে আস্তে হেঁটে রিসেপশন পৌঁছলাম | ওখানে একটা সোফায় আমায় বসিয়ে জিত গেল ক্যান্টিন থেকে চা আনতে | চা বলে দিয়ে ফিরে এলো কয়েকটা কাপ-কেক নিয়ে | একটু পরে একটা ছেলে চা দিয়ে গেল | খেতে খেতে দেখলাম কিছু স্টাফ অনেক রঙিন মশাল আর তুবড়ি নিয়ে এসে জ্বালাতে লাগলো পোর্টিকতে | তার ধুঁয়ায় ভরে গেল রিসেপশন | তখন একটা সিনিয়র ডাক্তার এসে খুব বকাবকি করল | তারপর সবাই এক এক করে চলে গেল | জায়গাটা শান্ত হয়ে গেল | শুধু মোমবাতিগুলো জ্বলল ঠাণ্ডা হওয়ায় শিখা হেলিয়ে দুলিয়ে | ওগুলো বোধ হয় সেন্ট দেয়া ছিল | পোড়া মশালের গন্ধ কাটিয়ে খুব সুন্দর হালকা একটা গন্ধ ছড়িয়ে গেল | আমি আর জিত বসেই থাকলাম | নটা বাজলে রিসেপশনিস্ট ও চলে গেল | তারপরে দেখলাম নার্স হোস্টেলে ওরা চুমকি বাতিগুলো নিভিয়ে দিল | দেখতে, দেখতে ওদের প্রদীপও প্রায় সব নিভে গেল | পটকা ফাটার শব্দ দূর হতে দূরে মিলিয়ে যেতে লাগল | বাইরের অন্ধকার নিঃশব্দে বাড়তে থাকল | এক সময় ঠাণ্ডা হাওয়াটায় গাটা শির শির করে উঠলো | তখন আমি মনের মধ্যে ভেসে আসা একটা কথা শুনে অস্পষ্ট স্বরে তার প্রতিধ্বনি করলাম, “টুকু, এবার আমায় ঘরে নিয়ে চল |”

ঘরে ফিরে এসে প্রথমে খাটে শুলাম, ক্লান্ত লাগছিল এত | তারপর উঠে বসলাম জানালার দিকে মুখ করে | জিত জানালার কাছে গিয়ে বাইরে দেখল | তারপর আমার কাছে এসে, অন্ধকারে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল | আমি বললাম, “কি দেখছ ?”
জিত – “তোমার চোখ |”
আমি – “কি আছে ওতে ?”
জিত – “ওর কালো অন্ধকার মনিতে বাইরের আলোর প্রতিফলন দেখছি | স্পষ্ট |”
আমি – “তাই ?”
জিত – “ভাবছি, যদি ওই ভাবে চোখে আলো ভরে নিতে পারতাম |”
আমি – “কেন ?”
জিত – “পথ দেখার জন্য |”
আমি – “কোন পথ ?”
জিত – “জানিনা | পথটাই তো খুঁজছি |“
আমি এই হেঁয়ালি না বুঝে চুপ করে থাকলে জিত বলল, “খিদে পায়নি ? ... রাত হয়েছে | চলো তোমাকে খেতে দিই |”
আমি – “দাঁড়াও, আগে এতগুলো জামা ছাড়ি | তুমি এখানেই থাক, শুধু ইমার্জেন্সি বাতিটা নিভিয়ে দাও |”

আমি নিচে পরা বাড়ির শেমিজটা ছাড়তে ওপরের হাসপাতালের গাউনটা খুলতে চাইলাম | মাথার উপর কাপড়ে কাপড় জড়িয়ে গেল | জানালার আবছা আলোয় দেখলাম জিত এগিয়ে এলো আমায় সাহায্য করতে | আমার কাছে এসে ইতস্তত করছে কি, বাতি জ্বলে উঠল | জিত বিব্রত মুখে, “চলো, বাতি এসে গেছে | আমি বাইরে বসছি | তুমি কাপড় বদলে নাও”, বলে দরজা খুলে ব্যালকনিতে চলে গেল |

কিছুক্ষণ পরে আবার বাতি চলে গেল | জিত অন্ধকার ঘরে ফিরে এসে ইমার্জেন্সি বাতিটা না জ্বেলেই আমার খাবারটা বের করে বেড-টেবিলে দিয়ে বলল, “ইতি, প্রায় দশটা বাজে | আমি এবার গিয়ে মাসিমা কে পাঠিয়ে দিচ্ছি | তুমি খাবার সময় বাতিটা জ্বেলে নিও |”
আমি – “মা তো এখনো এলো না | তুমি এত তাড়াতাড়ি কেন যাবে ?”
জিত – “জানিনা | দেরী হয়ে গেছে | হয়ত কোনও বাস বা অটো পাব না | হেঁটে যেতে হবে | ভয় হচ্ছে যদি অন্ধকারে আমি পথ গুলিয়ে ফেলি | তাই আর দেরী করব না |”

জিত চলে গেলে অন্ধকারে আমি এক সম্পূর্ণ শূন্যতা নিয়ে বসে থাকলাম | জিত যখনই এইরকম অদ্ভুত কথা বলে আমি বুঝি ও কোনও অন্তর্দ্বন্দ্ব জয় করার চেষ্টা করছে | কিন্তু আমায় বলতে পারছে না, কেননা সেটা খেলা, না খেলার দ্বন্দ্ব নয় | কি নিয়ে দ্বন্দ্ব তাও হয়ত ও নিজে জানে না |

বাপি মামণিকে যখন দিয়ে গেল, তখন প্রায় এগারোটা বাজে | জিত তখনও বাড়ি পৌঁছায়নি |

০৯ নভেম্বর
জিত কাল সকালে চলে গেছে | যাওয়ার আগে আমার সাথে দেখা করেনি | মামণি বলল ওকে বলেছিল ভাইফোঁটা কাটিয়ে যেতে | তাও থাকল না |

মামণি আরও বলল, “টুকু আসছে না দেখে বাপি ফেরার পর ওকে খুঁজতে গেল | কোথাও পেল না | টুকু অনেক রাতে এসে শুধু বলল ও পথ হারিয়ে গিয়েছিল | তারপর কিছু না খেয়ে শুয়ে পড়ল | বাপি বলছিল, ছেলেটা খুব ইমোশনাল | কখন কি কথা নিয়ে ভাবে, কিছু বোঝার উপায় নেই | তোর কি মনে হয় ?” আমি মাকে কাল রাত্রের নার্সের রক্ত নেয়া, ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরনোর কথা সব বললাম | বললাম, ওই রক্ত দেখে জিত কিভাবে স্থাণু হয়ে গিয়েছিল | মা বলল, “এতো আমারই ভুল | টুকু কি তাই পারে এই সব হাসপাতালের ঝক্কি সামলাতে ?”

ডাক্তার ঝা বাপিকে সন্ধ্যায় দেখা করতে বলেছে | আমার বিলিরুবিন অনেক কম | মনে হয় কাল ছেড়ে দেবে | বাড়ি গিয়ে আগেই জিতকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করব, সেদিন ও কেন বাতি জ্বললে অত বিব্রত হয়েছিল, যেন কোনও অচেনা মেয়ের কাছে এসে পড়েছে | হটাত আসা আলোয় আমি কি অচেনা হয়ে গিয়েছিলাম সেই এক মুহূর্তের জন্য ?
 





দেয়ালি, ২০০৭
ইতি,
         তখনকার অনেক কিছু কথাই আমার মনে নেই, এখন তোমার ডায়েরির লেখা পড়ে তার কিছু কিছু মনে পড়ছে | তবে, জানি না কোন অলিখিত কথার তুমি উল্লেখ করেছ |

         আমার একটা কথা তুমি লিখনি, কেননা তোমার জানার কথা নয় |

         প্রথম দিন তোমার রুগ্ন চেহারা হাসপাতালে দেখে আমি ভেঙ্গে পড়েছিলাম | আমার মনে তুমি সব সময় ছোটবেলার ঝিলিক – টুকটুকে চেহারার | আর হাসপাতালের গাউনে তোমায় দেখলাম যেন একটা ডুবন্ত জাহাজের ভেঙ্গে পড়া মাস্তুলে একটা প্রাণহীন পাল ঝুলছে | কি ভাবে কাটল পরের দিনগুলো | খালি মনে হত বিধ্বস্ত তোমাকে জড়িয়ে ধরে কোথাও নিয়ে যাই, কোনও এমন জায়গায় যেখানে গেলে সব অসুখ সেরে যাবে, তোমার হাসি ফিরে আসবে, আবার আমরা ছোটবেলার খেলায় ফিরে যাব | কত অছিলা করলাম তোমাকে ধরার, কিরুকিবু করে, গাল থেকে তোমার চুল সরিয়ে, তোমার হাত আমার হাতে নিয়ে গরম করে | তোমার হাঁটুতে গরম চাদর রাখতে গিয়ে মনে হল ওটাতে তোমাকে জড়িয়ে বুকের মধ্যে টেনে নিই |

         কিন্তু কি ছিল এই ভাবে চাওয়ার মধ্যে, সাথে সাথে মনের মধ্যে একটা সন্দেহ জাগল – এভাবে তোমাকে পাওয়া কি ঠিক ? কে বলে দেবে, আমি কোন পথে চলেছি ? নাকি পথে চলতে চলতে পথ হারাচ্ছি ?

         তখন শুধু তোমার চোখ দেখে মনে হয়েছে ওই আমার কম্পাস, আমায় এই অন্তর্দ্বন্দ্ব অন্ধকারে পথ দেখাবে |

         দেয়ালির দিন সন্ধ্যায় যখন তোমার কাছে যাব বলে বেরচ্ছি, মাসিমা জানতে চাইল, “টুকু, তুমি ভাইফোঁটা অব্দি থাকবে ?” মেসোমশাই বলল, “কিন্তু, ঋহা তো হাসপাতালে, কি ভাবে ফোঁটা দেবে ?” আমি বললাম, “দেখি |”

         আমার মনে কথাটা ঘুরতে থাকল | হাসপাতালে এসে তোমাকে জিজ্ঞাসা করতে চাইলাম, কিন্তু কি ভাবে প্রশ্নটা সাজাব, কি শব্দে, কি কথায় ? একদিকে মন ছুটে যাচ্ছে তোমাকে ছুঁতে, অন্যদিকে তোমাকে হারানোর বিভ্রান্তি | রোজকার অন্ধকারে মনে হত পথ হারাচ্ছি তোমার কাছে যেতে যেতে | চাইতাম, যদি তোমার চোখের আলোয় একটু কোনও পথের ইঙ্গিত দেখতে পাই |

         আমার মনে হয় আমার সেদিনের দৃষ্টিতে কিছু ছিল যা ওই নার্সটাকে বিচলিত করেছিল | না হলে তোমার রক্ত নিতে গিয়ে ওর হাত এত কাঁপল কেন ? যখন ফিনকি দিয়ে তোমার রক্ত বেরল, আমি মরমে মরমে মরলাম | মনে হল আমার জন্য তোমার সব রক্ত কালো হয়ে গেছে | তাও তোমাকে ধরা-ছোঁয়ার ইচ্ছায় আমি লাগাম লাগাতে পারলাম না | তুমি যখন রিসেপশন থেকে কেবিনে ফিরে জামা খুলতে গিয়ে পারলে না আমি এগিয়ে গেলাম তোমাকে সেই সুযোগে ছুঁতে | তখনই বাতি এলো, আর দেখলাম তোমার শুকিয়ে যাওয়া শরীর, যার স্নেহ দরকার, স্পর্শ নয় |

         আমি হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ভাবলাম কোথায় যাব ? কাকে শোনাব আমার পাগল করা সব প্রশ্নের কলরোল ? মনে পড়ল একবার ঠাকুমা বাবাকে বলছিল, আমি শুনেছিলাম, যে পাপবোধ হল কামনাকে গ্রাহ্য করার স্পর্ধার অভাব | এই সবই ভাবতে ভাবতে অনেক, অনেক সময় ধরে অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে, আকাশের তারা দেখে পথ খুঁজে পেতে পেতে, বাড়ি ফিরলাম, তোমার মনের কাছে যাওয়ার পথ হারিয়ে |

         জানো, সেই রাত্রে আমি শপথ নিয়েছিলাম আমি আর তোমাকে ছোঁব না, আর তোমার স্পর্শও আমার অকাম্য হবে |

         এখন ভাবি কত শিশুসুলভ কথা ভেবেছিলাম তখনকার অপরিণত বুদ্ধিতে | কিন্তু, তাই পরদিন আমি সকালে উঠে রওনা দিলাম বাড়ি ফিরতে | এই ভেবে নয় যে থাকলে তুমি আমায় ফোঁটা দেবে | এই ভয়ে যে ফোঁটা দিতে গিয়ে তুমি আমায় ছোঁবে | আর আবার তোমাকে ছোঁয়ার লোভ আমাকে পেয়ে বসবে |

         এতদিন পরে তোমাকে এইসব কথা বলে জানিনা আমার মন হালকা হবে কিনা, আর তোমারই বা কি মনে হবে | কিন্তু, যত দিন গিয়েছে, জেনেছি আর বুঝেছি, সেই কদিন তোমাকে যতই ছোঁয়ার কামনা করে থাকি, কোথাও তারই মধ্যে সেই ছোটবেলার নির্দোষ খেলার সম্পর্কের একটা আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে ছিল – তোমার সংস্পর্শ পাওয়ার, তোমার শরীরটা ছোঁয়ার নয় |

         অনেক ভেবেছি, তোমাকে কি তোমার শরীর থেকে আলাদা করে চাওয়া যায় ? আর সেভাবে পেলে, কিভাবে তোমাকে ছোঁব ? আসলে আমরা ভালবাসার একটাই ভাষা জানি বোধহয়, যার সব কথা শারীরিক |

         তাও সেদিনের মনোভাব তোমাকে জানাচ্ছি এই নিচের লাইন গুলোয়, সেদিন বাড়ি ফিরে সারা রাত জেগে লেখা,


                         আদিগন্ত, অফুরন্ত এই আঁধার, কি করাল ধাঁধা
                         তৃষার্ত চাতক আমি, আলোর মরীচিকায় বাঁধা
                         হাতড়ে তোমায় খুঁজি, না পেয়ে আমার সমীপ
                         আঁধারে দৃষ্টিহীন হয়ে করি তোমার দূরত্ব জরিপ

                         জ্বালাও না কেন তুমি হাজার দীপের দিয়াড়ি ?
                         যোগাও আমায় সামর্থ্য, দিতে এই ব্যবধান পাড়ি
                         আলোর বলয়ে তোমার কালো দু’আঁখির প্রভা
                         আমার হৃদয়ে ভরাবে তার নম্র কবোষ্ণ আভা
                         চোখের তারার আলো তার কটাক্ষে, ইঙ্গিতে
                         দেখাবে পথ যা হারিয়েছে আকাশের তারাতে

                         কোথায় সেই পথ, যা খুঁজেছি আমি এতকাল ?
                         আঁধার বিছিয়ে ছিল সে তার অলীক মায়াজাল
                         উপরে মহাকাশে দেখে তা তারার নীহারিকায়
                         হয়েছি পথভ্রান্ত আমি পৃথিবীতে, অন্ধ, একাই

                         এখন জ্বললে প্রদীপে প্রদীপে আলোর আলেয়া
                         লেলিহান শিখায় লুকিয়ে শ্যামার আমরণ-মায়া
                         আসবো আমি ছুটে, তখন তুমি দেখিও আমায়
                         পথ বিছিয়ে আছ বসে, তোমার চোখের তারায়

                         এই পথ কি সেই পথ যা ফেলে এসেছি পিছে ?
                         এই পথ কেন তবে ভুলে ঘুরেছি মিছে মিছে ?
                         এখন দেখি যে দুই কালো চোখের দৃষ্টি ধরে
                         পথ চলে যেতে গেছে হারিয়ে শরীরে গভীরে
                         তার যে ধমনীতে বহে যায় শোণিতাক্ত ধারা
                         আমার পথ সেই নাড়িতে শুরু, তাতেই সারা

                         দুয়ার-কপাট অকপট চোখের মনিতে খোলা
                         আলেয়া আলোর শিখারা তাতে করে খেলা
                         আলোর চাতক আমি, নিয়ে পিপাসা শিখার
                         করি আকণ্ঠ পান সব আগুন, বুকে দীপিকার

                         আমি ভেবেছিলাম আলেয়া শিখায় নেই উত্তাপ
                         শুধু লাগে পোড়াতে প্রেমে সুপ্ত কামনার পাপ
                         তা যদি হবে তবে কি ভাবে এই আকণ্ঠ পিপাসা
                         কামনার বুকে লুকানো এক ভীরু ভাবুক আশা
                         খুঁজে পাবে পথ দেয়ালির আলোর আলেয়ায় ?
                         শরীরে না খুঁজে, আমি পাব কোথায় তোমায় ?

         আশা করি এতে তোমার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর পাবে |
         ভালো থেক |
- জিত






দেয়ালি, ২০০৭ 
জিত,
         যে কথা তোমায় লিখিনি, আমার ডায়েরিতেও লেখা নেই |

         কালীপূজোর আগের দিন শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম আমার অসুখটার একটা ভালো দিক আছে | যতদিন অসুখ থাকবে তুমি আমার কাছে থাকবে, ছুটি ফুরিয়ে গেলেও হয়ত | মামণি জিজ্ঞাসা করেছিল, “জিত কে কি ভাইফোঁটা অব্দি থাকতে বলব ? ও অবশ্য কবে বাড়ি ফিরবে তা কিছু বলছেনা | কিন্তু আমি ভাবছি আগে জানা থাকলে সময়ে ব্যবস্থা করতাম | তুই কি বলিস ?”

         আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, “মামণি, আমি জানিনা |”

         মামণি তখন একটা কথা বলেছিল, যা আমার এখন মনে পড়লে মনে হয় তখন কেন বুঝিনি | বলেছিল, “দেখ, যাত্রা যবেই কর না কেন, যাত্রার প্রস্তুতি অনেক আগেই করতে হয় | নাহলে যাত্রার সময় এসে চলে যায়, মানুষ পা ফেলে এগোতে পারে না |”

         তুমি কি যাত্রায় প্রস্তুতি সেই সময়েই করেছিলে ? তা না হলে পথ কেন খুঁজছিলে আমার মধ্যে ?

- তোমার ইতি



                                                                                                                    দেয়ালি, ২০০৭

 
ইতি,


        হয়ত, আমি খুঁজছিলাম পথ – গন্তব্য ঠিক না করে, আর তুমি খুঁজছিলে গন্তব্য – পৌঁছানোর পথ আছে কি নেই না জেনে |        জীবনযাত্রাটা বোধহয় একটা গন্তব্য হীন, পথ হীন আলেয়া |

- জিত 





--->X<---

মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৩

চৌকাঠ


                                                                                                  লক্ষ্মী পুজো, ২০০১
জিত,
         <<
         আজ লক্ষ্মী পুজো সারা হয়ে গেলে ...
         >>

         দুপুরের নিথর শরীর থেকে আলসেমির আঁচল ফেলে
         যখন দিনটা বিকেল হয়, অভিসারের চিন্তায় নিমগ্ন
         তখন হটাত ঘূর্ণি হাওয়ার এক অবাধ্য দুরন্ত ছেলে
         চিলেকোঠায় দরজার কড়া নেড়ে করে আমায় বিপন্ন

         সিঁড়িতে উঠতে দেখি গোধূলি রোদের তির্যক রেখা
         পাশ কাটিয়ে নেমে যায় অশালীন হাওয়ার তাড়ায়
         হাওয়া তাকে ছেড়ে, পেয়ে অবিন্যস্ত আমাকে একা
         “ডাক আছে!” শুনিয়ে মনে আশঙ্কার উদ্বেগ জাগায়

         দরজা খুলে চৌকাঠে দাঁড়াই আমি অনুসন্ধিৎসু মনে
         জানতে কি বার্তা এনেছে প্রকাশ্যে দস্যু দূত বাতাস
         আমায় আবিষ্কারের অভিপ্রায় জানি ছিল সংগোপনে
         তারই চিঠি পাঠিয়েছ কি, না দিয়ে কোনও পূর্বাভাস ?

         স্মরণে এসে আছড়ায় এক বলাকার মানসে লুপ্ত ছবি
         সুদূর অতীতে, ঘূর্ণি হাওয়াতে, যে হয়েছিল আবির্ভূত
         চিত্রিত তার শ্বেতাভ নিষ্পাপ রূপ, যেন বিস্মৃত সুরভি
         ঝরা ফুলের | এক সুপ্ত বিরহিণী, কি বিষাদে অভিভূত

         চিত্রপটে এঁকেছ অন্ধকার চিলেকোঠায় দরজার পরিখা
         পরিপ্রেক্ষিতে সমুজ্জ্বল পুঞ্জিত অগুনতি যূথিকা বাদল
         সাজায় একাকিনী নিথর মেয়েলি অবয়বের সীমারেখা
         যার পলকে, কপোলে ও চিবুকে আমার মুখের আদল

         আশ্চর্য তার একাগ্র অনাবৃত শরীর বৈশিষ্ট্যহীন কায়া
         যেন অন্তঃসলিলা সে তার শৈশবের অতনু অস্তিত্বে
         শুধু তিন বিন্দুতে পড়েছে অনাগত কৌমার্যের ছায়া
         দুটি অ-প্রস্ফুটিত মৃণালে, আর একটি মৃগনাভিতে

         চমকে সঙ্কুচিত চেতনা হতে লজ্জার বসন সরিয়ে
         খতিয়ে নিই আমার শরীরের ভূগোল ও ইতিহাস
         সবই তো অনাবিষ্কৃত, দেখি | পাই হিসাব মিলিয়ে
         সঞ্চিত আছে তিন বৃন্তহীন শিউলির অনাঘ্রাত সুবাস


- ইতি 


                                                                                                  লক্ষ্মী পুজো, ২০০১
ইতি,
         আজ, লক্ষ্মী পুজোর দিন, দুপুরে একা একা এই সব পুরনো কথা মনে পড়ছিল ...

        আমি তখন ছোট, বোধ হয় ছ’ বছরের | পুজোর ছুটিতে মহালয়ার এক দিন আগে রূপাখ্যানপুরে তুনি মাসির কাছে গেছি, বাবা মায়ের সঙ্গে | ঠাকুমাও গেছে সাথে | চাকর-বাকরের হাতে তাঁকে একা রেখে যাওয়া যাবেনা, আর তিনি নাতিকে চোখের আলগা করবেন না কিছুতেই, বিশেষ করে পুজোর সময় |

        রূপাখ্যানপুরে মেসোর বড় রেলের বাংলো, বারো-তেরো খানা ঘর, বাথরুম ইত্যাদি নিয়ে | চারিদিকে ছড়িয়ে প্রশস্ত রেলের কলোনি, তার পরে খাকি চষা মাঠ | আলের ধারে অজস্র শ্যামল পলাশ গাছদের পাহারা দেয় এখানে ওখানে কিছু খয়ের রঙের নির্জীব তাল, নারকেল, খেজুরের গাছ | সব মাঠ পেরিয়ে এক দুটো ছোট গ্রাম | রেলের কলোনি এমনিতেই শান্ত, সন্ধ্যা হলে তো নিঝুম | বাগানের গাছের অন্ধকারে এমন কি পাশের বাড়ির বাতি ও দেখা যায় না | শুধু শোনা যায়, রেলের শান্টিং এর শব্দ – চলার লিং-টিং লিং-টিং, আর থামার খ্যাস-খ্যাস-খ্যাস | কখনো কোনও এংলো-ইন্ডিয়ান বাড়ি থেকে পিয়ানোর টুংটাং | মাঝে মধ্যে থ্রু ট্রেনের চাপা গর্জন ছাপিয়ে উঠেই আবার নিস্তব্ধতা | আবার কোনও কোনও দিন কানে তালা ধরানো একটানা ঝিঁঝিঁ পোকার কলরব |

        রূপাখ্যানপুরে স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটাই বড় রাস্তা রেল কলোনি দিয়ে | তার থেকে যে সব রাস্তা এপাশে ওপাশে বেরিয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বড় যেটা সেটাই বাড়ির সামনে দিয়ে গেছে | মেসো এটাকে বলে এখানকার মেজ রাস্তা | এক ধারে উঁচু পাড়ের ওপাশে বিরাট এক লেক মতন – নাম পদ্মপুকুর | তারই জল ফিল্টার হয়ে বাড়িতে বাড়িতে যায় | রাস্তার অন্য ধারে বাড়ি | গেট থেকে নুড়ি পাথরের পথ, ফুলের বাগানের সামনে দিয়ে ডানদিকে ঘুরে বাড়ির বারান্দার সামনে এসে থেমেছে | ফুল-বাগানের উল্টো দিকে বিরাট ঘন বাগান, বন বললেই হয় | তেঁতুল, শিরিষ, আম, জ্যাম, কাঁঠাল, চিকু - কি নেই ? তাতে কাঠবিড়ালির আর লাল ডেঁয়ো পিঁপড়ের রাজত্ব | বাড়ির মাঝখানে প্রধান ঘরটা বাসঘর - বসার ও খাওয়ার আসবাব রেখেও প্রচুর জায়গা | তার দু পাশে দুটো করে চারটে শোয়ার ঘর, এক একটা বাথরুম মাঝখানে | পিছনে রান্নাঘর আর জিনিস পত্র রাখার স্টোর | এছাড়া টুল-শেড্, চাকর দের থাকার ঘর ইত্যাদি | চুড়ো করা টালির ছাত বাসঘর থেকে নিচু হয়ে চারিদিকে নেমেছে | সামনে নেমে আসা টালির নীচে চওড়া বারান্দা, ঘুরে শোয়ার ঘর গুলোর সামনে দিয়ে গিয়ে শেষ হয়েছে | মেঝে লাল সিমেন্টের, এমন পালিশ করা যে তাতে রাখা বেতের চেয়ারের ছায়া পরিষ্কার দেখা যায় | বারান্দার সামনে কাঠের থামে ওপর থেকে নেমে আসা কাঠের জাফরি, তার ভিতরে গুটানো চেরা বাঁশের পর্দা, গরমকালে নামিয়ে জল ছিটিয়ে ঠাণ্ডা করার জন্য | এই সবের মধ্যে আমি একা একা ঘুরে বেড়াই, কোনও খেলার সাথী নেই | ঠাকুমা ঠায় তাকিয়ে দেখে |

        মেসো খালি পুজোর কটা দিন ছুটি নেবে, তাই অফিস যাচ্ছে | বাবাকে নিয়ে | বাবা নাকি মেসোর অফিসের লোকের সাথে গল্প করে সময় কাটাতে যায়, কিন্তু মা বলে বাবা গিয়ে প্ল্যাটফর্মে বসে ট্রেন দেখতে দেখতে কাগজ পড়ে আর চা খায় | দুজনে যখন দুপুরে ফেরে, সাইকেলের চাকায় নুড়ির পথে সরসর করে আওয়াজ হয় | অমনি ঠাকুমা বলে, “বৌমা, অরিন আর সমর ফিরেছে, খাবার বাড়তে বল | আর টুকু, তুই নাইতে যা চট করে |”

        আমার খেলার সাথী করেছি অর্জুনকে | অর্জুন সর্দার সাঁওতাল | রেলের মজুর, মেসোর বাড়িতে ম্যান-ফ্রাইডে | সব কাজের মাঝে আমাকে বাজারে নিয়ে যায়, ঢেলা চিনির লাল-হলুদ মাছ-লজেন্স কিনে দেয় | কখনো দুপুরে রেল লাইন ধরে ধরে অনেক দুরে নিয়ে যায় যেখানে নীচ দিয়ে কেয়ূর নদী বয়ে যায় | জল কম, শুধু মস্ত মস্ত পাথর বালির উপর সী-লায়নের মতো শুয়ে বসে আছে | কোথাও তাদের কোল ঘেঁষে পরিষ্কার জলের গভীর ধারায় ছোট ছোট হলুদ কিম্বা কালো মাছ | আমি মনে করিয়ে দিলে অর্জুন হরলিক্সের বোতল নিয়ে যায় | আমাকে মাছ ধরে দিয়ে আমাকে কোমরে জড়িয়ে জলের উপর ঝুঁকিয়ে ধরে | আমি বোতল উল্টো করে দিই | মাছ গুলো জলে পড়ে আবার সাঁতার খেলতে লাগে, যেন কিছুই হয়নি | অর্জুন বলে আমি না তাকালে নাকি মাছের ছটফটিয়ে নেচে নেচে আনন্দ করে | তা আমি জানি না | তবে আমার মনে হয়, হয়ত অর্জুন সব কথা জানেনা ; কিছু কিছু মন গড়িয়ে বলে, আমায় অবাক করতে | তাইতো একবার আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম বাতির সুইচ টিপলে বাতি কি করে বোঝে জ্বলতে হবে না নিভতে হবে | অর্জুন একটু ভেবে বলল, বাতিটা সুইচ টিপলে নিজের গাটা দেখে, ফর্সা না কালো | ফর্সা হলে বোঝে নিভতে হবে, আর না হলে, জ্বলতে হবে ! আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম বাতিটা কি করে জানতে পারে যে সুইচ টেপা হয়েছে | অর্জুন খানিকক্ষণ এদিক ওদিক তাকিয়ে, ভেবে, হো হো করে হেসে বলল, সেটা তো বিজলি মিস্ত্রী বাতি কে লাগাবার সময়ই বলে বুঝিয়ে দিয়ে যায় ! কিন্তু, অর্জুন গাছ-পালা, শাক-সবজি আর নিজের কাজ খুব বোঝে | পদ্মপুকুরের পাড় থেকে কলমি শাক এনে দেয় মাসি কে | শিউলি ফুল এনে দেয় ঠাকুমাকে | আর আমাকে তীর-ধনুক, গুলতি, তালপাতার বাঁশি এই সব বানিয়ে দেয়, যেদিন যেরকম পারে |

        একদিন অর্জুনের সাথে বাজার থেকে ফিরছি, হাতে সদ্য কেনা ফিরকি, মানে তালপাতার ঘূর্ণি-পাখা, একটু হাওয়া লাগলেই ঘোরে | বাড়ির কাছে এসে হটাত সেটা হাওয়ার ঝটকায় হাত থেকে উড়ে গিয়ে পালাতে লাগলো মাটিতে গড়িয়ে | আমি ছুটে ধরতে গিয়ে আছড়ে পড়লাম | একটা সাঁওতাল গুণী পথের ধারে কি সব বই, মালা, তাবিজ, টোটকাটুটকি আর একটা খাঁচায় বন্ধ টিয়া পাখি নিয়ে বসে ছিল | আমি হুমড়িয়ে পড়লাম তার জিনিসপত্রের উপর | চমকে টিয়া পাখিটা খাঁচার ভিতর ছটফট করে ব্যস্ত হয়ে কিছু বলতে লাগলো বারবার | অর্জুন দৌড়ে এসে আমায় তুলল | আমি ধুলো ঝেড়ে অর্জুন কে জিজ্ঞাসা করলাম, “টিয়াটা কি বলছে ?” অর্জুন এক চোখ ছোট করে গুণীটাকে ইশারায় প্রশ্ন করলে সে গম্ভীর হয়ে বলল, “ইয়ে ... তোতা বলছে – বউ আইলা, পালা পাগলা |” আমি ‘ধ্যাত’ বলে অর্জুনের হাত ছেড়ে দৌড়ে এক্কেবারে বাড়ি | ঠাকুমা আমার লাল মুখ চোখ দেখে ডেকে পাশে বসিয়ে মুখ মুছিয়ে অনেকক্ষণ আমাকে হাওয়া করলো হাতপাখা দিয়ে | তারপরে ওনার হাত ছাড়িয়ে আমি গেলাম বাড়ির পিছনে স্লিপারের পাঁজার উপর ওঠে করমচা গাছে করমচা খুঁজতে | ভাগ্যিস ঠাকুমা জিজ্ঞাসা করেনি ওইটুকু দৌড়ে মুখ কেন লাল হয়েছিল | গাছের শেষ করমচা গুলো খুঁজতে খুঁজতে জানার ইচ্ছা হল বউ আনতে কেন বড় হয়ে বিয়ে করতে হয় | ঠিক করলাম ঠাকুমা কে জিজ্ঞাসা করব |

        অনেকক্ষণ পরে শুনলাম ঠাকুমার গলায়, “বৌমা, ওরা ফিরেছে | দেখ তো টুকু টা কোথায় গেল |” আমি দৌড়ে নেমে রান্নাঘরে পিছন দরজা দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে শুনলাম, মেসো মাসিকে বলছে, “তুনি, একটু মুশকিল হয়েছে !”
 

        কোনও মুশকিল – একটু হোক কি বেশ - আমার মনে ভীষণ কৌতূহল জাগায় | তাই আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম কথা শুনতে |
মাসি –“কি মুশকিল ?”
মেসো – “নীরেন দিল্লি থেকে চিঠি দিয়েছে | পুজোয় কলকাতা আসছে | পথে আসানসোলে নেমে ব্রেক-জার্নি করবে আমার কাছে আসার জন্য | ক’দিন কাটিয়ে যাবে | সেই বিয়ের পর কত বছর দেখা সাক্ষাত নেই | তাই এই সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত হবে না লিখেছে | এখন কি করি ?”
মাসি – “একা আসছে নিশ্চয় | তাতে কি মুশকিল ?”
মেসো – “আরে না না | সাথে ফ্যামিলি |”
মাসি – “ও ! ... আমি কি ওর বৌকে দেখেছি ?”
মেসো – “না | ওর বিয়েতে আমি একা গিয়েছিলাম |”
মাসি – “হুম ! ... তা, আসানসোল থেকে ওরা আসবে কি করে ?”
মেসো – “দেখো, আমাকে তো আসানসোল যেতেই হবে ওদের সাথে দেখা করার জন্য | ভাবছি অফিসের জিপ টা নিয়ে যাব, আর যদি ও নেমেই পড়ে, তাহলে তাতেই ...”
মাসি তখনি আমাকে লক্ষ্য করে বলল, “এই টুকু, যা, স্নান করে নে | খেয়ে ঘুমিয়ে নিবি, বিকেলে বাড়িতে নতুন লোক আসবে |”

        বুঝলাম বাড়িতে আরও লোকের ব্যাপারটা মাসি মেনে নিয়েছে | যদিও জানা হল না আমার সাথে খেলার মত কেউ আসছে কি না |

        এদিকে অফিসের কি কাজ এসে পড়াতে মেসোর আসানসোল যাওয়া হোল না | অর্জুনকে জিপে পাঠিয়ে দিয়ে মেসো আসানসোলের স্টেশনমাস্টার কে রেলের ফোনে বলে দিল স্বয়ং ওদের গাড়ি থেকে নামিয়ে জিপে তুলে দিতে |

        সন্ধ্যা বেলায় আমি আর ঠাকুমা বারান্দার সিঁড়ির ধাপে বসে | বাইরে রাস্তায় জিপ এসে থামল, কেননা ভিতরের পথে জিপের চাকা খুব নুড়ি ছিটায় | একটু পরে দেখলাম এক ভদ্রলোক আসছে, সাথে হাত ধরে একটা মেয়ে – আমার থেকে আরও ছোট, তার পিছনে এক ভদ্রমহিলা, সব শেষে অর্জুন জিনিষপত্র নিয়ে | মেয়েটার পরনে একটা চুমকি বসানো ফ্রক | সোনালী আলোতে খুব ঝিলিক দিচ্ছে |

        ভদ্রলোকে এসে ঠাকুমাকে প্রণাম করে বললেন, “সমরদা’র মা না ? অরিন কোথায় ?”
ঠাকুমা – “থাক থাক | এসো, ভিতরে চলো | অরিন এখুনি অফিস থেকে এলো বলে |”

        ঠাকুমা ওদের নিয়ে ভিতরে চলে গেলে আমি উঠে বারান্দার বাতির সুইচ টিপলাম | বাতিটা, নিজের গাটা ফর্সা না কালো বুঝতে পেরে কি না পেরে জানিনা, জ্বলল না | আমি ঘনান অন্ধকারে একটা চেয়ারে বসে কি করব না করব, কোন ঘরে যাওয়া যায়, এই সব ভাবছি, তখন সেই ভদ্রমহিলা মেয়েটার হাত ধরে বেরল, এখন তার গায়ে একটা খাটো সেমিজ | আমার কাছে এসে বলল, “এই নাও, তোমার নতুন খেলার সাথী, ভাব কর |” আর, মেয়েটাকে বলল, “তুমি ওর সাথে থাক | একটু পরে তোমার মুখ ধুয়ে চুল বেঁধে দেব, কেমন ?”

        মেয়েটার হাতে দেখলাম একটা লম্বা সরু কোনও খেলনা, মনে হল রাবারের কুমির | ও আমার চোখের দৃষ্টি লক্ষ্য করে আস্তে আস্তে ওটা আমার চোখের কাছে ধরল, দেখি ওটা একটা বহুরূপী | ও বলল, “দেখি তো তুমি একে ভয় পাও কিনা |” বলেই, ও চোখ বুঁজে আমার মুখে নাকে খেলনাটা চেপে ধরল | বহুরূপীটা অদ্ভুত নরম আর ঠাণ্ডা, আর তাতে আপেল না চন্দন না লেবু পাতা না এলাচ - নাকি সব মেশানো - অদ্ভুত একটা গন্ধ | আমি কিছু বলার আগেই ও ভয়ঙ্কর ভাবে মুখ ভেংচে হেঁসে কুটিকুটি হয়ে দৌড়ে পালাল | আমি দেখলাম ওর মাথার উপর ঝাঁকড়া কুঁকড়ানো চুলের ঝোপ দৌড়ের তালে তালে ঝাঁপাচ্ছে | তখনি সিদ্ধান্ত নিলাম ওকে আমার খেলার সাথী করার প্রশ্ন ওঠে না |

        পরে জেনেছিলাম এই নতুন মাসির খুব টিকটিকির ভয় | সেই ভয় যাতে মেয়ের মনে না জন্মায় তার জন্য নতুন মেসো ওকে বহুরূপীটা দিয়েছিল খেলতে |

        রাত্রে খেতে বসে শুনলাম আর ওর বাড়ির নাম ঋহা | নতুন মাসী বলল, ও সবাইকে নিজের পছন্দ মত নাম দিয়ে ডাকে | ইতিমধ্যেই তনি মাসি হয়ে গেছে বুম্মা, মেসো বুব্বাই, মা হয়েছে মাম্মা আর বাবা বাপ্পি | তাই আমরাও ওকে যে যার পছন্দ মত নামে ডাকতে পারি | আর, নতুন মাসি আমাকে শেখাল ওনাদের মাসিমা, মেসো মশাই বলে ডাকতে | আজও তাই ডাকি, যদিও নতুন মাসির কথা ভাবলেই মনে পড়ে ওনার প্রথম কথা, “এই নাও, তোমার নতুন খেলার সাথী, ভাব কর |“

        সেদিন রাতের খাওয়া দাওয়া করে বাকি সবাই শুতে গেলে বাবা বলল, “চলো, আজ আমরা ডায়েরি লিখি, অনেক ঘটনা বাদ যাচ্ছে |”

        জন্মে থেকে দেখেছি, আমাদের বাড়িতে সবাই মিলে ডায়েরি লেখে, কোনও বিশেষ সময় বা ঘটনার পর | যেমন পুজো শেষ হলে, বা বাড়িতে কেউ এসে বেড়িয়ে গেলে | প্রথা অনুযায়ী একই ডায়েরি তে এক এক করে সবাই যার যা ইচ্ছে লেখে | তারপরে বাবা সেটা পড়ে আর মা শোনে | আবার কখনো মায়ের কিছু পুরনো কথা মনে পড়লে বাবা সে বছরের ডায়েরি বের করে এনে সেই পুরনো দিনের লেখা পড়ে শোনায় |

        সেদিন প্রথমে আমি লিখলাম | আমাকে সবসময় প্রথমে লিখতে হয় যাতে না দেখতে পাই কে কি লিখেছে | শেষে লেখে ঠাকুমা, তবে কখনো সখনো | সবার লেখা হলে বাবা পড়ে শোনালো,
“টুকু লিখেছে – ঋহাকে আমি ঝিলিক বলে ডাকব |
“তুমি লিখেছ – আমি ঋহার নাম রেখেছি চুমকি, ওর চুমকির জামা দেখে |
“আমি লিখেছি – ভাবছি, ঋহার নাম কি সিকুইন রাখা যায় ?
“আর মা লিখেছে – ঋহা আমার চিন্তার ইতি |
“ইতি ? ... কেন, মা ?”
ঠাকুমা – “কেননা এবার আমার এক চিন্তার ইতি হল |”
মা – “আর আপনার কি নিয়ে চিন্তা, মা ?”
ঠাকুমা – “টুকু কে নিয়ে |”
বাবা – “কেন, টুকু কি করল আবার ?”
ঠাকুমা – “না টুকু কিছু করেনি | কিন্তু ওর মনটা এত চঞ্চল | সব সময় খেলার সাথী খোঁজে | সেই নিয়ে যে চিন্তা ছিল এখন সেটা শেষ হয়েছে |”
বাবা – “ও ... কিন্তু সে তো এই ক’দিনের ব্যাপার মা |”
ঠাকুমা – “দ্যাখ | কতদিনের ...”
বাবা – “মা! এই যুগে তুমি ... আচ্ছা, আচ্ছা ! এবার তুমি চল শুয়ে পড়বে |”

        নতুন মেসো মাসি কলকাতা গেল লক্ষ্মী পুজো পার করে | কেননা কলকাতায় কাজ ছিল শুধু ফেলে রাখা বাড়িটা পরিষ্কার করা | আর এখানে কত আনন্দ, কত হৈচৈ | আর ঝিলিক আর আমার ‘পিঠোপিঠি’ স্নান ?

        ঝিলিকের স্নানের দুটো ব্যাপার – এক ও কিছুতেই পিঠে তেল মাখবে না | আর দুই, কল খুললে ও আর বন্ধ করবে না | ঠাকুমা ওকে প্রথম দিন পিঠে তেল মাখাতে গেলে ও হেঁসে কচলে বলল, “ঠাম্পা (ঠাকুমা) আমার কাতুকুতু লাগে |” তখন ঠাকুমা আমার পিঠে বেশি করে তেল মাখিয়ে বলল, “টুকু, যা ইতির পিঠে পিঠ লাগিয়ে দে দেখি |” সেই ভাবে শুরু পিঠে পিঠ লাগিয়ে একসাথে স্নান | অর্জুন কুয়ো থেকে বালতিতে জল তুলে আমাদের মাথায় ঢালে, আমরা পিঠে পিঠ ঘসে হুটোপুটি করি | এই ছিল ‘পিঠোপিঠি’ স্নান | আর, কুয়োর ঠাণ্ডা জলে ঝিলিকের শিউরে উঠে চেঁচান যা শুনে মাসীমা প্রায়ই দৌড়ে আসত ব্যাপার টা কি দেখতে |

        ওরা কলকাতা থেকে দিল্লি ফেরার পথে আমরা সবাই আসানসোলে গিয়ে ওনাদের সাথে দেখা করলাম | ট্রেন থেকে নেমে মাসীমা আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, “টুকু তুমি ঋহার বহুরূপীটা দেখেছ ?” বলল কলকাতা পৌঁছে ধরা পড়েছিল যে ওটা নেই | আমি মাথা নাড়লাম | ঝিলিক কোনও কথা বলছেনা দেখে পা ছটফট করলো পালিয়ে যাওয়ার জন্য | শেষে মাসীমা আমাকে জড়িয়ে অনেক চুমু খেয়ে বলল, “টুকু, এবার আমরা এদিকে চলে আসব | দিল্লিতে ঋহার একটুও ভালো লাগেনা, আমারও না |” মেসো মশাই হেঁসে বলল, “জিত, তাহলে তো আর কখনো আলাদা হওয়া যাবেনা !”

        আলাদা ?

        যাকগে ! যে এক দুটো কথা তোমাকে মনে করানোর জন্য এত ভূমিকা, সেই কথাই তো রয়ে গেল |

        আসার পরের দিনই ঝিলিক সকালে উঠে বায়না করল আঙ্গুর খাবে | অর্জুন বাজার থেকে ফিরল – কোথাও আঙ্গুর নেই | কি হবে ? মা, তনি মাসি সবাই ব্যস্ত, যেন নিজের মেয়ে | তখন আমি ঠাকুমার কানে কানে বললাম, “ঠাকুমা দেখ | ঝিলিকের পায়ের আঙ্গুল গুলোই তো আঙ্গুর, না ?” ঠাকুমা আমাকে ঠেলে সরিয়ে ঝিলিক কে বলল, “ইতি, আঙ্গুর তো নেই, আঙ্গুরের আচার খাবি ?” সবাই অবাক | ঠাকুমা এসেই গাছের শেষ পাকা করমচার মিষ্টি আচার করেছিল | ঝিলিক সেটা একটু খেয়ে ঠোঁট চেটে বলল, “খুব নামনাম !” মাসীমা বলল, “তার মানে ঋহার ওটা ভালো লেগেছে |” ঠাকুমা বলল, “তাহলে আচারটা আমি রেখে দেব | তুমি দিল্লি নিয়ে যেও ওর জন্য |”

        লক্ষ্মী পুজোর দিন পুজো হয়ে গেলে আমি স্লিপারের পাঁজার উপর উঠে দেখি অনেক কাঠবিড়ালি একটা গাছের ফোকরে কিছু নিয়ে গিয়ে রেখে আসছে | ঝিলিক কে দেখাতে দৌড়ে গেলাম ডাকতে | দেখি ঠাকুর ঘরে, যেটা আসলে একটা শোয়ার ঘর, ও রয়েছে ঠাকুমার সাথে | ঠাকুমা পা ছড়িয়ে হয়ে বসে, তার কোলে মাথা রেখে ঝিলিক আদুড় গায়ে মাটিতে শুয়ে | পুজোর বেঁচে যাওয়া ঘসা চন্দনে লবঙ্গ ডুবিয়ে তার ছাপ দিয়ে ঠাকুমা ওকে সাজাচ্ছে | মুখ সাজান হয়ে গেছে, এখন গায়ে মালা আঁকা হচ্ছে | আমি বললাম, “ঝিলিক, এস, কাঠবিড়ালিরা সব কি কাণ্ড করছে দেখবে | ঝিলিক বলল, “আগে আমি সেজে নিই |” ঠাকুমা বলল, “তুই যা, আমি ওকে পাঠাচ্ছি একটু পরে |”

        সাজা সারা হলে ঝিলিক এলো, এক হাতে একটা মাদুর আর অন্য হাতে বহুরূপীটা | ঠোঁটের কোনে খানিকটা করমচার আচার লেগে | হাত ধরে ওকে স্লিপারের পাঁজায় তুলে মাদুর পেতে দুজনে বসলাম | কাঠবিড়ালিদের কাণ্ড দেখতে দেখতে একটু পরে ঝিলিক অকাতরে ঘুমিয়ে পড়ল | আমি ওর পাশে কাত হয়ে শুয়ে হাতে মাথা রেখে দেখলাম বহুরূপীটা দুটো স্লিপারের ফাঁকে ঢুকে গেছে | ওর মাথার পাশে আধখোলা মুঠোয় বহুরূপীটার গন্ধ | আশে পাশে শিউলি গাছ থেকে ঝরে পড়া কিছু ফুল | খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে আমি কটা শিউলি নিয়ে তাদের বোঁটা ছিঁড়লাম | দুটো দিয়ে ঝিলিকের বুকের গোলাপি বুটি দুটো আর একটা দিয়ে ওর নাভি ঢেকে দেখলাম কেমন লাগছে | ওর ঠোঁটের কোনে লাগা আচারটায় জিভ লাগিয়ে দেখলাম ঝিলিক কোনও সাড়া দিল না | কি নরম নোনতা ঘুম | আর কি করি ? চিত হয়ে শুয়ে পড়লাম পাশে, ভাবতে ভাবতে যে আজকের ঝিলিক কাল চলে যাবে | আকাশে অনেক অনেক উঁচুতে হালকা সাদা মেঘের পাঁজা তুলো যেন যূঁই ফুলের জাল বিছান | ডান হাত কপালের উপর চিত করে আর বাঁ হাত মুখের উপর উপুড় করে ধরলাম | এইভাবে এ হাতের বুড়ো আঙ্গুলের সাথে ও হাতের তর্জনী জুড়ে একটা চৌকাঠ হয় যেমনটা অর্জুন আমাকে শিখিয়েছিল | এর মধ্যে দিয়ে মেঘ দেখতে দেখতে মনে হয় মেঘেরা দাঁড়িয়ে আর আমি ভেসে যাচ্ছি | আমার ভেসে যাওয়া ভাবটা শুরু হতেই কি মনে হল, পাশ ফিরে চৌকাঠের মাঝে ঝিলিক কে একবার দেখে নিলাম | ও আমার নৌকায় শুয়ে আছে দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে মেঘ দেখতে দেখতে আমিও ঘুমিয়ে পড়লাম | কত দুরে চলে গিয়ে পায়ে একটা হালকা ঝাপটা লাগল | দেখলাম দুপুরের গরম হাওয়া উঠে এসেছে, আর তার ধাক্কায় উড়ে মাদুরের শেষটা আমার পায়ে আছাড় খাচ্ছে | একটা বক কোথা থেকে এসে ঝিলিকের মাথার দিকে স্লিপারের পাঁজার এক কোনে নেমে হাওয়ার বিরুদ্ধে ডানা মেলে নিজেকে সামলাচ্ছে | ওদিকের ফুলবাগানের বুক থেকে ঘাস-পাতা উড়িয়ে একটা ছোট দমকা ঘূর্ণি উঠে এলো | এক মুহূর্তে সেই ঘূর্ণির ঝাপটা এসে শিউলির পাপড়িগুলো ঝিলিকের গা থেকে উড়িয়ে নিয়ে গেল | শিউরে উঠে ঝিলিক চোখ খুলে তাকিয়ে প্রথমে বকটাকে দেখল, তারপর অবাক মুখ ঘুরিয়ে আমায় দেখল |

        চোখের উপর হাত রেখে রোদ আড়াল করে ঝিলিক বলল, “টুকু, এবার আমায় ঘরে নিয়ে চল |”

        ইতি, তোমার মনে পড়ে কি ওই সব কথা ? বিশেষ করে ঝিলিকের শেষ কথাটা ?

- জিত


                                                                                                  ২০ অক্টোবর, ২০০১
জিত,
         এক দুটো কথা তুমি লিখনি | যেমন,

         তুমি দেখনি যে আমার বহুরূপীটার পেট চেরা ছিল, কলম রাখার জন্য | আমি নতুন ধূপ কাঠির বাক্স এলে তার থেকে একটা কাঠি ভেঙ্গে এক টুকরো ওর পেটে রাখতাম | এই করে ওর পেট ভরে গেলে আর রাখতে পারা যেত না | তারপর মায়ের সেন্টের নতুন বোতল এলে আমি এক দু ফোঁটা ওর পেট খুলে ঢেলেও দিয়েছি | তুমি আমার হাতে যে গন্ধ পেয়েছিলে তাতে সেই সব গন্ধ ছিল |

         শেষমেশ আমার সুগন্ধি বহুরূপীর কোথায় গেল ?

         একদিন দুপুরের খাওয়ার পর মেয়েরা সবাই বসে গল্প করছি, হটাত রান্না ঘরে শুনলাম কোনও বউ অর্জুনকে খুব মিনতি করে ওদের সাঁওতাল ভাষায় কিছু বলছে | বুম্মা মা কে বলল ওটা অর্জুনের বউ | আরও অনেক কথা শুনলাম যা তখন বুঝিনি | পরে মাকে জিজ্ঞাসা করে জেনেছি অর্জুনের বউ এর্মে খুব শান্ত আর মিষ্টি ছিল | কিন্তু বাচ্চা হয়নি বলে অর্জুন ওর থেকে পালিয়ে বেড়াত | একটা সাঁওতাল গুণী এর্মের কাছে আসত, যাকে বুব্বাই একদিন দেখে ফেলে | বকাবকির পর লোকটা বলল ও এর্মের বাবা | লুকিয়ে আসে যাতে অর্জুন না জানতে পায় | ও অর্জুনকে খাওয়ানর টোটকাটুটকি এর্মেকে দিতে আসতো | সেই ওষুধ খাওয়াতে এর্মে আসত রান্নাঘরে, সবার খাওয়া হলে |

         শেষমেশ ওরা কোথায় গেল ?

         আর, জান আসার দিন কি কাণ্ড ? সবাই রেডি বেরোবে বলে, জীপ এসে গেছে | মা বলল, “যা, ঠাম্পাকে প্রণাম করে আয় |” ঠাম্পা না ঠাকুর ঘরে পা ছড়িয়ে বসে ছিল, ঠিক যেমন আগের দিন আমাকে সাজানোর সময় | আমি গিয়ে প্রণাম করব কি উনি আমায় কোলে বসিয়ে বুকে চেপে ধরে একেবারে স্থির হয়ে গেলেন | পরে দেখি উনি কাঁদছেন | কোনও শব্দ নেই, চোখে জল নেই, শুধু ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে আরে মাঝে মাঝে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন | অনেকক্ষণ পরে মা আমাকে খুঁজতে এলে ঠাম্পা মাকে জিজ্ঞাসা করল, “একে নিয়ে যাচ্ছ ?“

         দিল্লি এসে মা বলল, “ঈশ ! তোর ঠাম্পার কান্না দেখে আঙ্গুরের আচার আর চাওয়া হল না |” শেষমেশ ওই আচারের কি হল ?


         তুমি লিখেছ, ঝিলিক যে টুকুকে বলেছিল, “এবার আমায় ঘরে নিয়ে চল |“
         কোন ঘরে ? ঠাকুর ঘরে ?
         কোথায় গেল ঠাম্পা ?
         কোথায় গেল তাঁর নামনাম আঙ্গুরের আচার ?
         কোথায় গেল সেই সুগন্ধি বহুরূপী ?

         থেকে থেকে মনে হয় সেই যে ঝিলিক দিল্লি রওনা দিল নিশ্চুপ হয়ে, তারপর থেকে একের পর এক স্টেশন এসেছে, গেছে | প্রত্যেকটা আগেরটা থেকে বেশি বড়, বেশি ব্যস্ত, বেশি ঘিঞ্জি |

         কোথায় থেকে গেল টুকু আর ঝিলিক ? কি হল রূপাখ্যানপুরের অর্জুন আর এর্মের ? কেয়ূর নদীর মাছ গুলোর ?

         তুমি নিয়ে যেতে পার না আমায়, দেখাতে রূপাখ্যানপুরের ওই বাড়ির ঠাকুর ঘর, স্লিপারের পাঁজা, করমচা আর শিউলির গাছ ?

- ইতি

বৃহস্পতিবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৩

উনিশের রজনীগন্ধা





অষ্টমী / দুপুর ১:০০

জিত,



ছড়া করে লিখছি | তুমি রাগ করবে না, আমায় রাগাবেও না, লক্ষ্মীটি !


---

জানো কি , আজ আমি ভোগ খেতে যাইনি ?
বাড়ির সবাই গেছে, আমি বুকে সাহস পাইনি
কেন যে লাগে একা, ভিড় যখন খুব প্যান্ডেলে
অঞ্জলি দিয়ে ফিরেছি তাই কোন সাত সকালে
এসে থেকে আমি শোওয়ার ঘরে জানলা ধরে
জাবর কেটেছি গত পুজোর অষ্টমী মনে করে
ভেবেছি এই, যে, কী ভাবে কাটল একটা বছর
নতুন কী ঘটেছে, কী আছে লেখার মত খবর
তাই বুঝি চিঠি লিখি না তোমাকে সচরাচর
---


তুমি কি ভোগ খেতে গিয়েছিলে? মা আর বাবা দুজনেই খুব জোর করলো, “সে কী, অষ্টমীর দিন তুই ভোগ খেতে যাবি না?” বললাম, “আমার উপোষ করে গা গোলাচ্ছে, দুপুরে কিচ্ছু খাবো না |” মা বলেছিল থেকে যাবে, আমি জোর করে পাঠিয়েছি, নিরিবিলিতে তোমায় লিখতে, যে কথা মুখোমুখি বলতে পারি না |

---
সত্যি বলছি ! জানি তুমি বিশ্বাস করবে না এটা
যে, তোমার দেয়া সেদিনের সাদা বড় চকলেটটা
যেটা বটুয়ায় তুলে রেখেছিলাম, পরে খাবো বলে
ভুলেও ভেবো না করছি এই উপোষ ওই সম্বলে
ওটা বের করে ক’দিন ধরে দেখেছি, হয়েছে লোভ
করেছে প্রতারণা আমার নতুন ডায়েটিং এর ক্ষোভ
তাও, এক সাথে খাব বলে তুলে রেখেছি ধৈর্য ধরে
লালপেড়ে তাঁতে, তোমার প্রিয় বাদামী লিপস্টিক পরে
আলতো দাঁতে ধরব যখন চকলেটের ছোটো টুকরো
কটা ছবি তুলো ; একটা আমার মুখের ক্লোসআপেরও 


মা’রা সবাই খেতে চলে গেলে, আমি শুলাম বিছানায়
কী লিখব, কী লিখব না, এই নিয়ে বিভ্রান্ত ভাবনায়
কিছু পরে উঠে গত অষ্টমীর তাঁতের সাদা শাড়িটা
বের করে দেখি শূন্য লাগছে তার খোলের বাড়িটা
নিচের লাল পাড়ের কাছে একটু জেদি এঁটেল মাটি
করেছে নষ্ট নিষ্কলঙ্ক শাড়ীর সাদা জমির পরিপাটি
তবুও কেন টান বোধ করলাম বুকের দু’ কোরকে
সযত্নে খুঁটে রাখলাম ওটা নীল কাগজের মোড়কে
মায়ের পুজোয় শুনেছি লাগে নানা দুয়ারের মৃত্তিকা
কোন দ্বারে পেয়েছি এ মাটি আমি, শিঞ্জিনী-বালিকা
---


শাড়িটা দেখতে দেখতে কতক্ষণ জানি না তন্ময় হয়ে ছিলাম  ...

---
শিরশির করে উঠতে অনাবৃত নগণ্য আমার শরীরটা
অন্তর্বাস বাদ দিয়ে পরলাম ব্লাউজ, জড়ালাম শাড়িটা
অবশেষে লিখছি চিঠি খালি গায়ে জড়িয়ে তাঁতের খোল
লিখতে সে কথা যা লজ্জায় করছে কোলাহল উতরোল


উপুড় শুয়ে দেরাজের আয়নায় করে নিজেকে নিরীক্ষণ
দেখলাম অন্তর্বাসটা, কতদিনের সেই ছোট্ট এক আবরণ
মা কে এ’ কথা জানাতে, বলল, “দাঁড়া, একদিন মা হবি”
কিন্তু কিছুতেই মনে ফোটে না সে অনাগত যৌবনের ছবি


কোন মা ? আমার ? না, যাকে অঞ্জলি দিয়েছি সকালে ?
প্রথম মা রোজ বুড়ি হচ্ছে, দ্বিতীয় স্থায়ী চিরযৌবন কালে
হতে চাই সেই মায়ের প্রতিমা, নিষ্কাম শিশুর কৌতূহলে
কাঁচা বয়েসে তুমি যাকে মৃন্ময়ী রূপে পূর্ণযৌবনা দেখেছিলে


এই সব ভাবতে ভাবতে ধীরে ধীরে নিঃশব্দ হালকা পায়ে
তোমাকে চিঠি লেখার ঘোর এলো ঘিরে সমস্ত স্বত্বা ছেয়ে


প্রথম থেকেই যখনই তোমাকে চিঠি লিখতে আমি বসি
দেখি কেন যেন অনেকক্ষণ মন মানে না বশের রশি
তারপরে একটু একটু করে এই দুর্বার জোয়ার আসে
খরস্রোতায় ভেসে যাই আমি ; একা নই, তুমি পাশে
আমি লিখি, আর তুমি বসে বসে দেখো আমার লেখা
আমার মাথার পিছন থেকে, যত দুর্বোধ্য মসী-রেখা
মাঝে মাঝে আমার ঢলে পড়া খোলা চুলের অসভ্যতা
সামলাতে তুমি মাথায় রাখ ঈষদুষ্ণ আলতো পাতা
দাও ঠেলে উড়ো চুল গুলো কানের পিছনে বনবাসে
লাজুক লতি হয় স্পর্শে কাতর, আঁখি ঢলে আলস্যে


ঘোরটা তখন যদি আমাকে আরও অবশ করে তোলে
যদি খুব লাগে বিভ্রান্ত, যদি লিখনের বৃত্তান্ত যাই ভুলে
চিত হয়ে শুয়ে তোমার মুখের দিকে থাকি ঠায় তাকিয়ে
মনে হয় তুমি হয়ত বলবে আমায় বড় বড় আঁখি দেখিয়ে
“পড়ছিলাম তুমি কী লিখছ | আগে  চিঠিটা শেষ করো !”
বলতে পারি কি, “তুমি আগে আমায় একটু চেপে ধরো” ?
---



আমি আয়নায় দেখছি - উপুড় হয়ে শুয়ে দু’ পা তুলে, গোড়ালি জোড়া করে, পা দোলাচ্ছি, পায়ের নূপুর গুলো উঠছে পড়ছে | আয়নার ছায়ায় তোমার পিছনে এই সব ঘটছে | তুমি আমার  পাশে বসে চিঠি দেখতে এতো ব্যস্ত যে দেখছও না, আমার পায়ের গোছ, আমার নূপুর পরা গোড়ালি, আর আলতা মাখা পায়ের তলা | আজ আমি আলতা পরেছি, ভারী মিষ্টি লাগছে | আলতা পরে শাড়ি তুলে পা শুকাতে শুকাতে মনে পড়ল -


---

এইতো সেদিন, তবু মনে হয় যেন কতো যুগ আগে
বৃষ্টি পড়ছে, তুমি আমার অপেক্ষায় গুলমোহর বাগে
মিনিবাস থেকে নামলাম কাদায়, শাড়িটা একটু তুলে
দৌড়ে এসে তুমি আমার সে হাতই ধরলে প্রচ্ছন্ন ছলে
ফুটপাথে উঠে বললে, “শাড়িটা এখনই নামিও না”
চমকে তোমার চোখে দেখলাম নির্দোষ মিনতির বন্যা
থতমত খেয়ে বললে তুমি, “চারিদিক জলে জলাকার”
বুকে উঠলো বেজে প্রতিধ্বনি আকাশেতে মেঘ ডাকার
---


আমি যেতে যেতে, থেকে থেকে, জানতে চাইলাম কেন | তুমি চুপ করে থেকে বললে ...  অনেকক্ষণ পরে ...

---
“রজনীগন্ধার গোছা দেখেছি আজ, জলে ভেজা বিপন্ন”
বললাম অবাক হয়ে, “কেন তবে কেন নি আমার জন্য ?”
রহস্যময় হাসি মেখে তুমি বললে, “না, আজ ছেড়ে দাও
সে যে বাঁধা রুপোর নিগড়ে | চলো, শাড়ি ঠিক করে নাও”
তারপরে কী হল যে জানিনা, তুমি হটাত চুপ করে গেলে
আর কোনও কথা বল নি, যত কথাই সাজিয়েছি ঢেলে
তুমি শুধু এক দু’টো হুঁ-হাঁ করেছ, বল নিকো আর কথা
শেষে বাসে ওঠানোর সময় ভাঙ্গলে সেই পাথরের নীরবতা
বললে, “আবার যেদিন বৃষ্টিতে তুমি নামবে মিনিবাস থেকে
চোখে ভরে নেব তোমায়, এক জোড়া রজনীগন্ধার স্তবকে”
ঠিক তখনি মিনিবাস এলো, উঠলাম নিয়ে তোমার হেঁয়ালি
চটি খুলে পা তুলে বসলাম ছড়িয়ে, পেয়ে সীটটা পুরো খালি
ভাবলাম তোমার অসংলগ্ন কথা, ছাড়াতে নূপুরের কাদামাটি
তুমি কি জানতে পেরেছিলে আমার মনের অলঙ্ঘনীয় ‘না’ টি ?
---

তুমি আমার পায়ের গোছের কথা বলেছিলে, না ? ছি ! বেশ হয়েছে, এখন তুমি তা দেখতে পাচ্ছ না, আমি নিশ্চিন্তে পা দুলিয়ে চিঠি লিখছি | 

(... চকলেটটা খাই কি ? ... না, থাক ওটা !)

এখন রাখি, একটু চোখ বুজি | ঘুম তো আসবে না, কিন্তু এই ঘোরেই শুয়ে থাকব মা’রা বাড়ি ফেরা অব্দি | এই ঘোরটাই করেছে মুশকিল | এটা লুকাতেই তো মা, বাবার থেকে দূরে দূরে থাকছি সেই সকাল থেকে | মা এখন আমার মুখ দেখলেই বলবে, “কী হয়েছে তোর ? জিত ফোন করেছিল ?”

তুমি প্যান্ডেলে গিয়েছিলে ? বিশেষ কিছু তেমন দেখলে?
আচ্ছা, মনে আছে তো এই আমার আজকের বিশেষ শেষ দিনটা ?

তোমার ইতি

***

নবমী / ভোর ১:৩০

ইতি,
আজ সারাদিন ঘুরে একটু আগে ফিরেছি | ভেবেছিলাম শুয়ে পড়ব, এত ঘুম পেয়েছিল | তখন মনে পড়ল, ভেবেছিলাম বাড়ি ফিরে দেখব মেইল আছে কিনা | আর দেখলাম তোমার মেইল | একবার মেইলটা পড়ে, জামা কাপড় ছেড়ে আবার পড়লাম |

ক্লান্তির আবেশে তোমার অতল মনে ডুবে যেতে যেতে স্বপ্নের মতো মনে হল যেন আমরা প্যান্ডেলে গিয়েছি | তুমি বললে, “একটু আসছি, মাকে প্রণাম করে |” তারপর কোথায় চলে গেলে, আমি কতক্ষণ অপেক্ষায় রইলাম | একবার প্রতিমার সামনে গিয়ে মেয়েদের ভিড়ে তোমাকে খুঁজলাম | কোথাও তুমি নেই | কী করি ভাবছি, তখন তোমার মেসেজ পেলাম, তুমি বাড়ি ফিরেছ আমায় বসে চিঠি লিখতে | কী বলার ছিল ? চিঠিতে তো লেখ নি |

আচ্ছা, তুমি কি রাগ করবে, যদি বলি তুমি চলে যাওয়ার পর আমি উদ্ভ্রান্ত হয়ে মেয়েদের মুখে, প্রতিমার শরীরে তোমাকে খুঁজেছি ? এখন খুঁজছি তোমার চিঠিটার দিকে তাকিয়ে |

কেন খুঁজছি ? ... তুমি ‘আসছি’ বলে চলে যেতে একটা নিচু করে বাঁধা বাঁশের বেড়ার উপর শাড়ি আলগোছে তুলে পার হলে যখন, আমার তখন মনে পড়ে গেল ঠিক করেছিলাম তোমায় দেখাব, দেখানো হয় নি, মায়ের সাজে রজনীগন্ধার স্টিক, ঠিক বর্ষার জলে ভেজা তোমার পায়ের গোছ দেখেছিলাম যে রকম | এখন সেই কথা মনে পড়ছে, আর ভাবছি,

---
যখন তোমার ঘোর আসে, সাজের আয়নায়, আমার পাশে
উপচিয়ে কোরকের কাঁচুলি, বিলাও তুমি আতর আহেলি
উপুড় হয়ে দুলিয়ে নূপুর, লেখ যত আবোলতাবোল মধুর
হারিয়ে আমি সকল পুঁজি, উদ্ভ্রান্ত হয়ে তোমায় খুঁজি
মায়ের তিন তারায় দেখি, নেই তুমি, সব লাগে মেকী
কোথায় গুলমোহর বাগ, কোথায় সে মেঘমেদুর সন্ধ্যা ?
কোথায় তুমি আড়াল করেছ আমার সে দুই রজনীগন্ধা ?
---

যাচ্ছি এখন, লুকিয়ে যেতে ঘুমের কোলে |
তুমি কি বাদামী লিপস্টিকটা পরেছিলে আজ ?
ঘুম থেকে উঠে দেখো, তোমার বালিশের পাশে পাবে একটা সাদা চকলেট,  আর ফুলদানিতে রজনীগন্ধা, আগত কৌমার্যের সংবর্ধনায় |
প্রমিস!
(প্লিজ একটু বেলা অব্দি শুয়ে থেক ! ফোন করে ভোরে উঠিয়ে আমায় ছুটিয়ো না !)

জিত

***

নবমী / সকাল ১০:৩০

জিত,
কী অপ্রস্তুত ই তুমি করলে আমায়, সকাল সকাল !

একটু আগে মা ঘুম থেকে তুলে বলল, “ওঠ এবার, তোর না আজ জন্মদিন ! জিত এসেছিল | তোর জন্য রজনীগন্ধা আর চকলেট নিয়ে | তুই ঘুমচ্ছিস দেখে রেখে গেছে |”
আমি বললাম, “কিছু বলল ?”
মা বলল, “ছেলেটা একটু অদ্ভুত | আমায় কাছে সুতো চাইল | দিলাম | নিয়ে রজনীগন্ধার গোছাটা খুলে দুটো আলাদা গোছা করলো, ফুলদানিতে রাখল | আমি কেন জানতে চাইলে বলল, ইতি কে জিজ্ঞাসা করবেন | হ্যাঁ রে, ফুলদানি তো একটা, দুটো গোছা করে রাখার কী দরকার ?”

শোনো ! তুমি আর আমায় এই পুজোয় পাচ্ছ না | চকলেট দুটো আমি বন্ধুদের সাথে ভাগ করে খাব | তুমি দূরে থেকো | এটা তোমাকে সংযত করার জন্য, বুঝেছ ?

(মা বলছিল, “অষ্টমীর শাড়িটা পরে একদিন ও বেরলি না |” তুমি কি দশমীর দিন আসবে বিকেলে ? দুজনে গুলমোহর বাগে গিয়ে লেকের জলে বিসর্জন দেব ওই কাদামাটির নীল মোড়কটা | আর জলে পা নামিয়ে ডোবাবো রজনীগন্ধা জোড়া | জিজ্ঞাসা কর না কোনটা, প্লীজ !)

(আর তোমার নই)
ইতি




-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ষষ্ঠী- ১০ অক্টোবর ২০১৩