নাটকীয় গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
নাটকীয় গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১৬

দেখা

|| দেখা ||


স্টাফ-রুমে  ঢুকে বুকে চেপে ধরা বইগুলো নামিয়ে চেয়ার টেনে বসতে গিয়ে নীতা দেখল বড় টেবিলটার এক কোনে দীপা চুপ করে বসে আছে | সামনে একটা খোলা খাতা, হাতে ধরা কলম, কিন্তু শরীরের নিস্তেজ ভঙ্গি দেখে মনে হল ওর মন ওই দুটোর মধ্যে নেই | নীতা চেয়ার টানলে একটু আওয়াজ হল, কিন্তু দীপা ধ্যানস্থ হয়েই বসে রইল, নড়ল না, তাকাল না | নীতা বসে পড়ে বলল, “এই, কী হয়েছে তোর ?” একটু পরে মাথাটা খুব আস্তে ঘুরিয়ে দীপা বলল, “হরষে-বিষাদ কথাটার মানে কী জানিস ?” নীতা বলল, “হরষে-বিষাদ . . . আমি তো জানি হরিষে বিষাদ . . . যাকগে, হটাত এই কথাটার মানে কেন জিজ্ঞাসা করছিস ? কিছু হয়েছে ? তোর মেয়ে কেমন আছে ?”

উত্তর না দিয়ে দীপা মাথা নামিয়ে খোলা খাতায় একটা টিক দিল, তারপর পাতা ওলটাল | নীতা উঠে গিয়ে দীপার পাশে দাঁড়িয়ে ওর কাঁধে আলতো করে হাত রেখে বলল, “কিছু বলবি না ?” দীপা মুখটা তুলে একটু হাসল – ম্লান হাসি, যেমন মেঘলা দিনে চর জেগে ওঠা গাঙের বুকে দূরের জল চিকচিক করে ওঠে কোন অদৃশ্য সূর্যের ছটায় | তারপর পাশের চেয়ারটা টেনে বলল, “কাছে বোস, বলছি |” নীতা বসলে দীপা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল -

কাল রাত্রে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছি | দেখেছি ওর সাথে কোথাও বেড়াতে গিয়েছি | আমরা একটা হোটেলে উঠেছি | তার চারিদিকে ঢালাও খোলামেলা প্রকৃতি, হাতছানি দিচ্ছে বেড়াতে যাওয়ার জন্য | কী সুন্দর সিন্যরী ! আমরা লবিতে বসে দেখছি, আর ভাবছি কখন বেরব | আমি ওয়াশরুমে গেলাম | ওয়াশরুমেও বড় বড় জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে | তখন দেখি ওয়াশরুমের পিছন দিকে একটা দরজা | কী কৌতূহলে দরজাটা খুললাম | পিছনে চারিদিক একেবারে গাছে গাছে ঢাকা, সবুজে সবুজ, মুগ্ধ করে দেয়ার মত | আর ওই দরজা থেকে একটা পায়ে হাঁটা পথ তার মধ্যে চলে গেছে | আমি ওর কথা ভুলে গেলাম, কোথায় আমি, কী করছিলাম সব ভুলে গেলাম | সব ভুলে গিয়ে ওই পথ ধরে রওনা দিলাম, যেন আমি জানি কোথায় যেতে হবে | কী সুন্দর, কী পরিষ্কার চারিদিক, কোথাও কোন আগাছা নেই, নিচে সবুজ ঘাসে একটা ময়লা, একটা খড়-কাঠি, একটা কুটো, কি একটা শুকনো পাতা নেই, চারিদিক শুধু সবুজ পাতা ছাওয়া বড় বড় গাছ | এইভাবে বাইরেটা আমাকে সব ভুলিয়ে দিয়ে টেনে নিয়ে চলল | কিসের টানে যে আমি কোন ভয় না করে এগিয়ে গেলাম তা আমি জানি না | কতদূর চলে গিয়েছি এই ভাবে হুঁশ হারিয়ে | তারপর দেখলাম গাছগুলো একটু ফাঁকা হচ্ছে, মাঝখানে বেশ খানিকটা পরিষ্কার জায়গা, যেন কেউ ওই ভাবে জায়গাটা তৈরি করেছে | গাছগুলো যত্ন করে সাজানো, নিচে কেয়ারি-করা ফুলবাগান  আর সমান করে ছাঁটা ঘাস, তার মধ্যে একটা বসার বেঞ্চ | বুঝলাম আমি কোন পার্কে পৌঁছেছি | সেই বেঞ্চে একটা বউ বসে, আর তার থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে একজন হাবভাব ভঙ্গিতে বয়স্ক লোক, যে কোন কারণে বউটার থেকে সরে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে – যাকে সে সাথে করে নিয়ে এসেছে, কিন্তু ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারছে না, অপেক্ষা করছে কখন সে ফিরে যেতে চাইবে | লোকটার মুখটা দেখতে না পেলেও বুঝলাম লোকটা মনের দৃষ্টিতে বউটার দিকে তাকিয়ে আছে, সেই দৃষ্টিতে একসাথে বিস্ময়, কৌতূহল, অপেক্ষা, আকাঙ্ক্ষা সব মিশে আছে | দুজনেই চুপ |

আমি কাছে যেতেই বউটা আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল আর উঠে দাঁড়াল | অল্প বয়েস | লম্বা, সুঠাম, সুন্দর চেহারা | গায়ের রঙ ফর্সা নয় ময়লা, কিন্তু মুখের আদল অপূর্ব সুন্দর – যেন তার সব কটা বৈশিষ্ট্য কোন শিল্পীর খুব যত্ন করা হাতে ছেনি দিয়ে ছিলা-কাটা | মাথা ভরা কোঁকড়ানো চুল কাঁধ ছাপিয়ে উপচে পড়ছে | আর কী শান্ত চোখের দৃষ্টি, কত সৌম্য মুখের ভাব | আমি এমন সুন্দরী আর একজন দেখি নি | আমি ওকে দুচোখ ভরে দেখছি দেখে ও একটু হাসল | আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “সুখবরটা পেয়েছেন তো ?” ও মাথা নাড়ল, যেন খবরটা কেউ না বললেও
ওর জানা | আমি বললাম, “আপনি খুশি ?” ও বলল, “আমি খুউব খুশি |” আমি বললাম, “আপনার ছেলে আপনাকে মিষ্টিও পাঠাবে |” ও বলল, “পাঠাবে ? আমি মিষ্টি পাবো ?” আমি বললাম, “হ্যাঁ পাবেন, ও নিশ্চয় পাঠাবে |” ও বলল, “তবে তুমি ওকে বোলো দুটোর বেশি নয় |”

ওর কথা শুনতে শুনতে আমি চোখ ফেরাতেই পারছি না | এত সুন্দর মুখশ্রী, আর তাতে এত আনন্দ | কিন্তু এই শেষ কথাটা বলতে গিয়ে ওর মুখে একটা ছায়া পড়ল | ও আমাকে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি যাচ্ছেন তো ?” আমি বললাম, “আমি যাব, খুব শিগগিরই যাব | আপনি যাবেন না ?” ও বলল, “আমিও যাব |”

আমার হটাত মনে হল, এর টানেই কি আমি সব ভুলে ছুটে এসেছি | না হলে, আমি কেন ওর  মুখ থেকে আমার দৃষ্টি সরাতে পারছি না ? আমি কি ওকে আগে কখনও না দেখে থাকলেও সেই মুহূর্তে চিনেছিলাম ? এই সব প্রশ্নের চিন্তায় আমি একটু অন্যমনস্ক হয়েছিলাম হয়ত, হয়ত আমার দৃষ্টিটা এক মুহূর্তের জন্য আবছা হয়েছিল | আবার দৃষ্টি স্পষ্ট হলে দেখলাম দুজনে নেই | আমি তখন ওই পথেই তাড়াতাড়ি হোটেলে ফিরে এলাম |

দীপার বলা শেষ হলে নীতা জিজ্ঞাসা করল, “তুই কবে যাচ্ছিস মেয়ের কাছে ?”
দীপা, “এখনও দেরী আছে |”
নীতা, “ডেট কবে দিয়েছে ?”
দীপা, “বলছে তো এক্সপেক্টেড ডেলিভারি আশ্বিনের মাঝামাঝি, তবে এক আধ সপ্তাহ আগেও হতে পারে |”
নীতা, “তুই তোর মেয়েকে স্বপ্নটার কথা বলবি ?”
দীপা, “কী বলব ? যে ওর শাশুড়িকে স্বপ্নে দেখেছি | ওনাকে তো আমি দেখিই নি | শুনেছি, উনি আমার জামাইকে জন্ম দিয়ে মারা যান |”
নীতা, “তবে কী করে মনে করছিস যে ওটা তোর বেয়ান ছিল ?”
দীপা, “কে জানে, হয়ত ওই জামাইয়ের মত কোঁকড়া চুল, ওর হাসি, ওরই গায়ের রঙ . . . জানি না রে . . . বা, হয়ত ওর কাছে যে বয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে ছিল সে আমার বেয়াই ছিল | সেই রকমই লাগছিল তার দেহভঙ্গি দেখে |”

এই ঘটনার এক সপ্তাহ পরে নীতা আবার দীপাকে স্টাফ-রুমে একা পেয়ে বলল, “কেমন আছে তোর মেয়ে ?”
দীপা, “ভালো আছে | এই তো স্কুলে আসার আগে ফোনে কথা হল |”
নীতা, “কিছু মনে করিস না . . . জিজ্ঞাসা করছি  . . . তোর সেই স্বপ্নের কথাটা তুই মেয়েকে বলেছিস ?”
দীপা, “হ্যাঁ বলেছি | আমার বরও আমাকে চাপ দিচ্ছিল | ক’দিন আগে মেয়েকে বললাম | বললাম, জামাইকে বলিস | ও বলল, ওকে ফোনটা দিচ্ছি, তুমি নিজের মুখে বল | জামাইকে বললাম | শুনে জামাই একটু চুপ করে থেকে বলল, মা, আপনি বাবাকে একটু বলবেন এই কথা ? আমি জিজ্ঞাসা করলাম, উনি কিছু মনে করবেন না তো ? ও বলল, না | আমি বললাম, কিন্তু বলার দরকার আছে কি ? জামাই বলল, আপনি বলে দেখুন, বাবা হয়ত কিছু বলতে পারে |”
নীতা, “তুই বললি, তোর বেয়াই কে |”
দীপা বলল, “আমি বলি নি | আমার বর বলেছে | পরে বড় আমাকে বলল, স্বপ্নের কথা শুনে বেয়াই নাকি একদম চুপ করে গেলেন | তারপর ফোনটা ছেড়ে দিলেন আর কোনও কথা না বলে |”
নীতা, “আশ্চর্য তো !”
দীপা, “আশ্চর্য নয় | বা বলতেও পারিস . . . | কাল মেয়ের কাছে শুনলাম, জামাই ওকে বলেছে, প্রথম দুই মেয়ের জন্ম দেয়ার পর আমার বেয়ানের শরীর খুব খারাপ হয়ে যায়, ডায়াবেটিসে ধরে | এইটুকু আমিও জানতাম | জানতাম না যে ওনার শ্বশুর চাইছিলেন নাতি | কিন্তু বেয়ান আর সন্তান চাইছিলেন না | শ্বশুরের শখ পূর্ণ করে দিয়ে আমার বেয়ান আর বেশি দিন বাঁচেন নি |”

দুজনেই চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ | তারপর দীপা বলল, “আর জানিস, আমি ভেবেছিলাম স্বপ্নে উনি মিষ্টির কথা বলছিলেন . . . যখন বললেন, ‘তবে তুমি ওকে বোলো দুটোর বেশি নয় |’ ”


----------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ৩০ এপ্রিল ২০১৬

বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০১৬

অস্তিত্ব

|| অস্তিত্ব ||


একদিকে সাতনা, অন্যদিকে মতিসুর, মাঝখানে হীরাপুর | হাইওয়ের দুপাশে শালের জঙ্গলে ঢাকা চড়াই উতরাই | জমি পাথুরে, তার নিচে নাকি অঙ্গার আছে | তাই ছোট ছোট জনবসতি, যেখানে সবাই গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকে, আবার তাদের মাঝে এক দু মাইল শুধু শালের জঙ্গল, কোথাও ঘন, কোথাও পাতলা | কোথাও শাল নেই, শুধু এখানে ওখানে কিছু কুব্জ পলাশের গাছ |

নিঃসন্তান তারাবাবু হীরাপুরে এসেছিলেন শিক্ষকতা থেকে স্বেচ্ছা-অবসর নিয়ে স্ত্রী মায়া কে নিয়ে | হীরাপুরে কিছুই নেই | দেখে বলা মুশকিল লোকের জীবিকা কী | তবুও অনেক মধ্যবিত্তের বাস – অশিক্ষিত কি অর্ধ-শিক্ষিত স্রেফ শান্তশিষ্ট ভালোমানুষ | তাঁর দূর সম্পর্কের ভাইপো দীপক বাস ট্রাকের মেকানিকের কাজ করে | বলেছিল, “জেঠু আমার কাছে এসে থাকো | আমি তোমাদের দেখব | বদলে, দু মুঠো বাড়ির ভাত খেতে দিও |” কথাটা মন্দ বলেনি ছেলেটা | মায়া এসে সংসার গুছিয়ে নিয়েছিলেন |

দীপকের গ্যারেজ বলতে হাইওয়ে থেকে হীরাপুরে ঢোকার রাস্তার ধারে একটা ছোট ন্যাড়া মাঠের মুখে সুরকি দিয়ে গাঁথা ইটের বাড়ি | মালিক সাতনায় থাকে | বাড়িটার নিচে গোটা দুয়েক ঘর ভর্তি যত হাবিজাবি সারাইয়ের যন্ত্রপাতি আর পার্টস | আর একটা ঘরে একপাশে একটা কেরোসিনে চলা কম্প্রেসর, বাকি ঘর ভর্তি পুরানো টায়ার টিউব | হীরাপুরে কারো মোটরগাড়ি নেই | শুধু হাইওয়ে দিয়ে যে সব বাস, ট্রাক যায় তারা আসে দীপকের কাছে ভাঙ্গা গাড়ি নিয়ে | গাড়ি দাঁড় করিয়ে খাটিয়া পেতে ড্রাইভার, কন্ডাক্টর, হেল্পর শুয়ে, বসে পড়ে, গরম কালে মাঠের কোনে শিরিষ গাছের ছাওয়ায়, আর শীতকালে ঠায় রোদে | দীপক একমনে সারাই করে |

উপর তলায় টিনের চালের নিচে একটা শোয়ার ঘর, আর একটা ঘর একই সাথে রান্নাঘর আর ভাঁড়ার | বাইরে স্নানঘর, যার মাথায় চাল নেই | ওঠা নামার খোলা সিঁড়ি বাড়ির বাইরের গায়ের দেয়ালে | তারাবাবু এসে উঠলে দীপক নিচে কম্প্রেসরের ঘরে খাটিয়া পেতে নিজের শোয়ার ব্যবস্থা করে নিলো | উপরে তারাবাবু আর মায়া সংসার গুছিয়ে নিলেন | ক’মাসেই সব সেট হয়ে গেল | এমনকি চারিদিকের রুক্ষ প্রকৃতিও তারাবাবুর ভালো লেগে গেল |

সামনের রাস্তা বেয়ে একটু এগোলেই রাস্তাটা উতরাই দিয়ে নেমে হাইওয়েতে পড়েছে যেখানে বাস দাঁড়ায় | সেখানে একটা দেয়াল খসে পড়া ছাতের ছাউনি – কোনও কালে জিলা পরিষদের দয়ায় নির্মাণ করা  – বর্ষা বাদলে লোকে দাঁড়ায়, গরিব লোকে মেঝেতে উবু হয়ে বসে | একপাশে একটা ঝুপড়িতে মধুর চায়ের দোকান | আর এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েকটা পরিত্যক্ত বাস ট্রাকের কাঠামো | দেখে বোঝার উপায় নেই কবে কে ফেলে গিয়েছিল ওগুলো | সকাল সকাল জায়গাটা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে | তারাবাবু সকাল নটা নাগাদ একবার হাঁটতে হাঁটতে আসেন | মধু একটা ছোট নড়বড়ে বেঞ্চ পাতে | মধুর মেয়ে গুঙ্গি এসে চা বিস্কুট দিয়ে যায় | চা খেতে খেতে তারাবাবু দূরে চেয়ে থাকেন | দেখেন পিছনে বাড়ির দিকের চড়াই থেকে শাল গাছের গুঁড়ির ফাঁকে ফাঁকে হাওয়া হনহন করে নেমে এসে হাইওয়ে লাফিয়ে পার হয়ে ওপারের উতরাইতে শালগাছের মাথায় কেমন ঝাঁপিয়ে পড়ছে | কখনও হয় যেন কেউ মস্ত বালতিতে হাওয়ার দলবল তুলে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে গাছগুলোর মাথায় | সেই ঝোড়ো যুদ্ধে ঋজু শাল গাছের মাথা ঈষৎ নুয়ে আবার সোজা হওয়া দেখতে দেখতে তারাবাবুর বুকটা একটা উত্তেজনায় ভরে ওঠে | মনে হয় এখনও কী একটা করা বাঁকি আছে | কী সেটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে এক অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে তিনি বাড়ি ফেরেন | ততক্ষণে কাগজ এসেছে | শোয়ার ঘরটার জানালা খুলে দিলেই ঢুকে পড়ে দামাল বাতাস | দূর থেকে ভেসে আসে আছড়ানো সমুদ্রের শব্দের মত বাস, ট্রাকের যাওয়া আসার আওয়াজের লহর – শুনতে শুনতে তারাবাবু সম্মোহিত হয়ে পড়েন | তারপর কেমন ভাবে আস্তে আস্তে বুকের ভিতরে সেই অনুভূতি নেতিয়ে পড়ে, হাতের কব্জিতে ধমনী শ্লথ হয়ে যায় | যেই দুপর গড়িয়ে বিকেল নামে, যেমন যেমন শাল গাছের গা থেকে রোদটা কেউ চেঁছে নিয়ে যায়, প্রখর গ্রীষ্মের বাতাসও নম্র শীতল হয়ে আসে – না দেখেও তিনি টের পান মধু চায়ের দোকানের ঝাঁপ ফেলে দেয় | উনুনটা পিছনে নিয়ে গিয়ে রাত্রির ভাত বসায় | বাড়ির জানালা থেকে শুধু তার ধুঁয়া দেখা যায় | গুঙ্গি বাসন কোসন নিয়ে যায়, টিপকলে ধুয়ে আনতে | তারাবাবু সে সব কিছুই দেখতে পান না | শুধু হয়ত শুনতে পান, অস্পষ্ট টিপকলের শব্দ, বাসনের ঠোকাঠুকির শব্দ | আর, দেখেন হাওয়ায় এলোমেলো হয়ে উবে যাওয়া মধুর উনুনের ধুঁয়া | তখন যেই জানালার শার্সিতে একটা ঝিলিক দিয়ে সূর্য ডুবে যায়, দপ করে তারাবাবুর বুকে কী যেন নিভে যায় | যে শক্তির উৎস সকালে জেগে উঠেছিল বুকে, তা আবার হারিয়ে যায় |

তাই তারাবাবু অসুখী | আর একটা বড় অসুবিধা, কথা বলার লোক নেই, এক পোস্টঅফিসের ফণী মাহাতো ছাড়া – সেও শুধু যেদিন তারাবাবু পোস্টঅফিসে যান মাস খরচ তুলতে | তিরিশ বছর প্রাথমিক স্কুলে মাস্টারি করে তারাবাবু জেনেছেন মাস্টার মাত্রেই একা মানুষ, তা সে যত লোক থাক না কেন আশেপাশে | তবু মাঝে মাঝে এই নব আবিষ্কৃত অস্তিত্বটা তাঁকে বিচলিত করে | কে সে ? কী চায় ? এক এক সময় মনে হয় মায়াকে বলবেন এই নতুন অস্তিত্বটার কথা | কিন্তু, বলা হয়ে ওঠে না | আর কী যে হয়েছে ... মায়াও কি কোনও জন্মে দীপকের মা ছিলেন – যে হারিয়ে পাওয়া ছেলে পেয়ে সব ভুলে গেছেন ? সারাদিন রান্না করে, বাড়ির উপর নিচ এক করে, দীপকের দেখা শোনা করে রাত্রির খাওয়া শেষ হলেই মায়া শুয়ে পড়েন | অগত্যা তারাবাবুকেও হারিকেনের আলো কমিয়ে শুয়ে পড়তে হয় | শুয়ে অনেকক্ষণ তিনি জানালা দিয়ে হাইওয়ের দিকে তাকিয়ে দেখেন | তারার, কি চাঁদের আলোয় ঢাল জমিটা হাইওয়ের সিঁথিটার দু’পাশে কালো ভেলভেটের আস্তরণের মত নিথর হয়ে পড়ে থাকে | সেই সিঁথি বেয়ে বাঁকে বাঁকে হারিয়ে যাওয়া গাড়ির হেড-ল্যাম্প জোনাকির মত জ্বলে, নেভে, যায়, আসে | হাওয়াটা আর জানালা দিয়ে ঢোকে না – দিক বদলে উল্টো বয় | তারাবাবু জেগে জেগে দেখেন মায়ার পাশ ফিরে শোয়া শরীরটা নিশ্বাসের সাথে সাথে একটু ওঠা নামা করছে | প্রাণ আছে, কিন্তু কেমন যেন অস্তিত্বহীন | জানালার বাইরে আদিম পৃথিবী তার অস্থিরতা নিয়ে তারাবাবুর অস্তিত্বকে ডাকে | সেই ডাক অগ্রাহ্য করতে করতে ক্লান্ত হয়ে তারাবাবু এক সময় ঘুমিয়ে পড়েন |

একদিন এই ভাবে শুয়ে তাঁর ঘুম আসছে না কিছুতেই | ক’দিন ধরে মায়া তাকে বলছেন, একটা কাজের মেয়ে খুব দরকার | শরীরের ধকল আর সইছে না | তারাবাবু বলেছেন, দেখছি | কিন্তু, কাছাকাছি এমন কোন জনবসতি নেই যেখানে কাজের মেয়ে পাওয়া যাবে | তার উপর মায়া বলেছেন মেয়েটাকে বিকেলের দিকে আসতে হবে | তখন মনে হয়েছে, আচ্ছা মধুকে বললে কেমন হয়, বিকেলে যখন দোকানের ঝাঁপ ফেলে তখন যদি মেয়েটাকে পাঠিয়ে দিতে পারে | শুধু নিচের টিপকল থেকে ক’ বালতি জল তুলে ঘর ঝাঁট দিয়ে মুছে দেবে | এখন মনে হল, নাহ আর দেরী নয় | দিনের বেলা কথাটা মনে থাকে না | আর গুঙ্গিটা বোবা কালা হলেও সব কথা বোঝে | মাঝে মাঝে তাঁর দিকে পূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে দেখে | মধুকে এখনই ডেকে তুলে জিজ্ঞাসা করে নিই | আজ রাত্রে রাজি না হলে আবার কাল রাত্রে চেষ্টা করে দেখা যাবে ... যতদিন না রাজি হয় চেষ্টা করতে ক্ষতি কী ? ঠিক ! এই রাত্রেই একা মধুকে বোঝানো যাবে তাঁর দরকারটা |

মনস্থির করেই তারাবাবু খাট থেকে উঠে পা টিপে টিপে বেরিয়ে পড়লেন | নিচে নেমে দেখলেন দীপকের ঘর অন্ধকার | একটু আশ্চর্য লাগল | অনেক সময় মাঝরাতেও ব্রেক ডাউনের খবর নিয়ে লোক আসে বলে ছেলেটা হারিকেন জ্বেলে শোয় | পথে বেরিয়ে পড়ে তারাবাবু দ্রুত পায়ে হাঁটা দিলেন | মধুর ঝুপড়ির কাছে এসে দেখলেন তার ঝাঁপ খোলা | খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ভাবলেন, ‘তা কী করে হয় ? তাহলে কি অন্য কেউও মধুর সাথে কথা বলতে এসেছে ? মহা মুশকিল ! এখন কী করা যায় ?’ তখনই একটা ট্রাকের হেড-ল্যাম্পের আলোয় দেখলেন ঝুপড়ির ভিতরে কেউ নেই | তাহলে ওরা গেল কোথায় ? আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হল যেন ভোরের বেশি দেরী নেই | এর পর দেরী হয়ে যাবে | বাড়ি ফিরে শুয়ে পড়তে হবে | ঘুম আসবে না | তবু শুয়ে থাকতে হবে যতক্ষণ না মায়া পুজো সেরে ডাকেন |

এমন সময় তিনি একটা গোঙানির আওয়াজ শুনলেন | কেউ আওয়াজ করল – একবার, কয়েকবার – একটু থেকে থেকে | সেই গোঙানি কি কষ্টের, নাকি তৃপ্তির ? বোঝা গেল না | মনে হল আওয়াজটা মধুর ঝুপড়ির পিছনে পড়ে থাকা বাসটার দিক থেকে আসছে | বাসটার পিছনে গিয়ে দেখলেন নিচে কেউ শুয়ে আছে | মনে হল মধু, হাতে কিছু একটা চকচক করছে | ভাঙ্গা বোতল ? নেশা করে পড়ে আছে কি ? কিন্তু এবার বাসটার ভিতর থেকে জড়ানো গলায় আওয়াজ | তারাবাবু ফিরে এসে বাসটার ভিতরে উঁকি দিলেন | প্রথমে ভিতরে জমাট অন্ধকারে কিছু দেখা গেল না | তারপর অন্ধকারটা চোখে সইলে ঠাহর করে দেখলেন দু’ সারি সিটের পাঁজরার মাঝখানে বাসের মেঝেতে কেউ চিত হয়ে পড়ে আছে | ভিতরে উঠে আবছা আলোয় চিনতে অসুবিধে হল না – গুঙ্গি ! কাছে গিয়ে ঝুঁকে বোঝার চেষ্টা করলেন কী ব্যাপার | গায়ে কেন কাপড় নেই ? আর. চোখ বন্ধ, জোর করে চিপে রাখা ঠোঁট দুটো | শুধু শিথিল মুখের ভাবে  যেন কোন পিঞ্জরমুক্ত অনুভূতির আনন্দ | মেঝেতে বসে পড়ে মেয়েটার পিঠের তলায় হাত বিছিয়ে  ওঠানোর চেষ্টা করলেন | হালকা শরীরটা পেলব লতার মত উঠে এলো | এখনও শরীরে উত্তাপ ছড়াচ্ছে | বুকেও যেন থেকে থেকে হালকা নিশ্বাসের হিল্লোল | ওর বুকের উপত্যকায় কান পাততেই গালে কোমল মেদের স্পর্শ তাঁকে আবিষ্ট করে ফেলল | এক মুহূর্তে একটা ধাক্কার মত স্পষ্ট অনুভব করলেন আবার তাঁর সেই অস্তিত্বটা জেগে উঠছে | এও বুঝলেন, এই অস্তিত্ব খুব অধীর – পলে পলে তার ধৈর্য হারাচ্ছে | তাঁর আর মনে পড়ল না, কাকে কী বলতে এসেছিলেন | শুধু মনে হল সেই কষ্ট মেশানো তৃপ্তির শব্দটা আবার শোনার, বারবার শোনার অপেক্ষায় অস্তিত্বটা অধৈর্য হচ্ছে | মেয়েটাকে আস্তে করে মেঝেতে নামিয়ে দিয়ে তার উপরে নিজের শরীরটা এলিয়ে দিলেন | হীরাপুরের জমির নিচে সত্যিই কি অঙ্গার আছে ? না হলে কিসের হলকা বাসের মেঝেয় শোয়া মানুষটার শরীর ভেদ করে উঠে আসছে ?

একটু পরে বাসটার পিছন থেকে আবার গোঙানির শব্দটা উঠে এলো - এখন কিছু নিস্তেজ, কিন্তু নিখাদ কষ্টের | তারাবাবু বুঝলেন তিনি দুটো আলাদা ধরনের শব্দ শুনছেন | দুটিই নিয়ন্ত্রণ হীন |

সকালে উঠে মায়া দেখলেন তারাবাবু নেই | কোথায় গেল মানুষটা ? মুখ ধুয়ে, স্নান করে নিচে এসে দীপককেও দেখতে পেলেন না | মায়া পুজো না করা অব্দি কথা বলেন না – তারাবাবু বা দীপক কিছু বললে ইশারায় উত্তর দেন | শেষে চিন্তিত হয়ে পুজো শেষ না করেই সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে দেখলেন দীপক ছুটে আসছে হাইওয়ের দিকে থেকে | চড়াইয়ে দৌড়ানোর পরিশ্রমে বেশি জোরে ছুটতে পারছে না | হাঁপাতে হাঁপাতে কাছে এসে বলল, “জেঠিমা ! শিগগির চলো |” মায়া শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ভ্রুকুটি করলেন, অর্থাৎ কী হয়েছে ? দীপক বলল, “একটু আগে আমার চেনা একটা বাসের খালাসী ছুটে এসে আমায় বলল, দীপক, শিগগির আয় | মনে হয় তোর জ্যাঠা পাগল হয়ে গেছে | আমি বললাম, কেন, কী হয়েছে ? ও বলল, তোর জ্যাঠা একটা বালতিতে জল আর কাপড় নিয়ে মধুর ঝুপড়ির পিছনের পুরানো বাসটা মুছছে ... মুছেই যাচ্ছে | আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, জেঠু কী হয়েছে ? ও কিছু উত্তর দিল না | আমরা কিছুতেই ওকে থামাতে পারছি না | কী শক্তি ওর গায়ে ! তুই শিগগির চল ... তো আমি লোকটার সাথে ছুটে গিয়ে দেখি ....”

দীপক একটু ইতস্তত করে বলল, “গিয়ে দেখি প্যাসেঞ্জার সব সাতনার বাস থেকে নেমে ভিড় করেছে | আরও অনেক লোক জড়ো হয়েছে | আর এক কাণ্ড ...  ঝুপড়ির পিছনে মধু পড়ে আছে | কেউ ওর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে | মনে হয় মরে গেছে |”

মায়া পাথর হয়ে যেতে যেতেও মুখ খুললেন, “আর ? আর কি দেখলি ? তোর জেঠু ... ” দীপক বলল, “না ... প্রথমে জেঠুকে দেখতে পাই নি | তো খালাসীটাই বলল জেঠু বাসটার ভিতরে আছে | ভিতরে উঁকি মেরে দেখলাম ...”
- “কী দেখলি ?”
- “দেখলাম জেঠু একটা কাপড় বালতিতে ডুবিয়ে বাসটার মেঝেটা মুছছে |”
- “কাপড় ? গায়ের কাপড় ?”
দীপক মাথা নাড়ল | মায়া বললেন, “মানে, গায়ে কাপড় নেই ? তাই দিয়েই মুছছে কি ?” দীপক আবার মাথা নাড়ল | তারপর মায়ার হাত খপ করে ধরে বলল, “জেঠিমা শিগগির চল | জেঠু তোমার কথা ঠিক শুনবে |”

মায়া দীপকের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে বললেন, “ক’দিন ধরেই মনে হচ্ছিল মানুষটার গা এত গরম কেন, চোখদুটোও সব সময় লাল ... আর রাত্রে ঘুমায় না ... বুঝেছিলাম ঠিক কিছু একটা হবে |” তারপর একটু চুপ করে থেকে বললেন, “কিন্তু, তুই ঠিক দেখেছিস তোর জেঠু পরনের কাপড় দিয়ে মুছছিল না ?”
দীপক বলল, “মোছার কাপড়টা তো দেখলাম ... লাল রঙের ... তাতে একটা ফিতে ছিল ... সায়া হবে ... গুঙ্গির |”
মায়া চমকে উঠে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী ? তুই ... তুই কী করে চিনলি ?”
দীপক মরিয়া হয়ে বলল, “না, মানে. আর কার হবে ? জেঠিমা, তুমি চলো না ... আমি সব বলব ... কথা দিচ্ছি, আমি সব বলব |”


-----------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ২৭ জানুয়ারী ২০১৬

সোমবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১৫

পাঁচ মিনিট

|| পাঁচ মিনিট ||


-    “তুই শুনবি না ?” বিরক্ত হয়ে সীমা জিজ্ঞাসা করল |
-    “হ্যাঁ, এইবার বল – শুনি তোর কথা |” খবরের কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে, চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে নামিয়ে রেখে তিন্নি বলল, “শুরু থেকে বল | কোথায় বললি তোর বর তোকে নিয়ে গেল ... আর, কেন ?”

সীমা - “সকাল সকাল – একটু আগেই শৈবাল ডেকে বলেছে প্রায় সাতটা বাজে – একটা ফোন এলো | ফোনে এক দুটো কথা বলেই গম্ভীর গলায় ও বলল, ‘ওঠো | চলো, বেরোতে হবে |’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী হয়েছে ? কার ফোন ছিল ? কোথায় যেতে হবে ?’ ও বলল, ‘বড় মামার ফোন ছিল | বলল, এই মাত্র খবর পেয়েছি, তোতনদা মারা গেছে | হাসপাতাল থেকে ফোন করে খবর দিয়েছে |  আমার তো এখন লোকজন দরকার | তুই সীমা কে নিয়ে যত তাড়াতাড়ি পারিস আয় |’ ”
তিন্নি - “তোতনদা বলতে ?”
সীমা - “শৈবালের বড় মামার সৎ-কাজিন |”
তিন্নি - “ইউ মীন ... শৈবালদা’র দাদুর দু’টো বউ ছিল ?”
সীমা - “আরে না | ওর দাদু একটাই বিয়ে করেছিলেন | তাঁর যে বাবা, তেনার দুটো বউ ছিল, সেই কোন এক কালে | সেই সুবাদে তোতন ... মামাই হবে তো ... বড় মামার একরকম সৎ-কাজিন হয় | মানে – বুঝছিস তো – আমি জানি না ওনাকে এক্চ্যুয়ালি কী বলা উচিত |”
তিন্নি - “ও ... তারপর ?”
সীমা - “আমি উঠে চটপট দু’একটা কাজ সেরে শাড়িটা পাল্টে তৈরি হয়ে নিলাম |”
তিন্নি - “কী শাড়ি পরলি ? তাঁত ?”
তিন্নি - “আহ, ছাড় তো | এত সিরিয়াস কথাবার্তার মধ্যে ... ‘কী শাড়ি পরলি ?’ ... তুই ও না !”
তিন্নি - “আচ্ছা বাবা, রাগিস না, বল |”
সীমা - “শৈবাল আমাকে নিয়ে একটু পরেই বেরিয়ে পড়ল | তাড়াহুড়োয় জলখাবারটা অব্দি মুখে দিতে পারলাম না | ও বলল পৌঁছে মুখে কিছু দেবার একটা ব্যবস্থা করবে | সবাই নাকি অপেক্ষা করবে আমাদের জন্য |”
তিন্নি - “কোথায় যেতে হল ?”
সীমা - “সে অনেক দূরে | বাড়ি থেকে রিক্সা ধরে লেভেল-ক্রসিং মোড়ে গিয়ে সেখান থেকে ট্যাক্সি নিয়ে ...  তোতন মামার বাড়ি সব মিলিয়ে প্রায় চার ঘণ্টা | ওখানে, ও বলল কী নাম যেন পাড়াটার, হুগলীর মোহনার পাড়ে একটা ক্রিমেটোরিয়াম আছে – তারই সামনে একটা বাড়িতে | আমরা অনেক খুঁজে সেটা বের করলাম | দেখলাম, অনেকেই সেখানে আগে এসে অপেক্ষা করছিল |”
তিন্নি - “সেটা কি সেই ... তোতন মামার বাড়ি ?”
সীমা - “উহুঁ | ওটা কারো বাড়ি ছিল না – মানে, বাড়িটায় লোকজন বাস করে এমন কিছু দেখলাম না |”

সীমা একটু নড়েচড়ে বসে গুছিয়ে বলতে শুরু করল |

বাড়িটা একতলা, কিন্তু খুব বড় – যাকে বলে বিশাল, ছড়ানো | কিসের বাড়ি সামনে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই – ভিতরে গিয়ে বুঝলাম বাড়িটা সম্ভবত ভাড়া দেয়া হয় এই ধরনের অনুষ্ঠানের জন্য | যেমন, যারা গঙ্গাপ্রাপ্তির জন্য মড়া পোড়াতে দূর দেশ থেকে লোকজন, দলবল নিয়ে আসে তারা ওখানে ওঠে | আমরা যখন পৌঁছলাম বাড়িটা প্রায় ফাঁকা | ভিতরে ঢুকেই দেখলাম একটা বেশ বড়সড় কামরায় মেঝেতে ফরাস পেতে অনেক লোক বসে | বেশির ভাগই পুরুষ মানুষ, আর দু’এক জন মেয়ে মানুষও বসে | কাউকেই চিনলাম না | মনে হয় না শৈবালও কাউকে চিনল | কিন্তু, ওদেরই মধ্যে থেকে কেউ এগিয়ে এসে ওকে বলল, “এসো, এসো |” মেয়ে বউদের একটা দল এক পাশে বসে আমাকে দেখছিল | তাদের একজন আমাকে হাত নেড়ে ডাকল ওদের কাছে বসে পড়ার জন্য | আমি কাছে গিয়ে বসতেই সে বলল, “চুপচাপ বসো এখন | অনেক সময় লাগবে |” কিসের সময় লাগবে ভাবছি, ততক্ষণে শৈবাল আমার কাছে এসে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, “শোনো, মনে হচ্ছে দেরী হবে |” আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “কিসের দেরী ?” ও বলল, “বলছে চুল্লীর ওখানে লাইন পড়ে গেছে | আমাদের পালা আসতে দেরী হবে |” আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “বড় মামা কোথায় ? ওনাকে তো দেখছি না |” ও বলল, “আমিও দেখলাম না | কেউ বলতেও পারছে না |” আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “আর তোতন মামার বডিটা ?” শৈবাল সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “দাঁড়াও সীমা, আমি সব খবর নিয়ে এসে বলছি |” এই বলে ও চলে গেলে আমি বসে থাকলাম | অনেকক্ষণ বসে থাকলাম | ও আর ফিরেই এলো না |

বাকি সবাইও চুপ করে গ্রুপে গ্রুপে বসে | কিন্তু কেউই তেমন কথা বলছে না | বুঝতে পারছি না সবাই কি তোতন মামার সাইডের লোক, না আলাদা আলাদা ডেড বডির সাথে আসা দল | সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার - কাউকে কাঁদতে দেখলাম না | এও বুঝলাম না যে তোতন মামার পরিবার, ছেলে মেয়ে বলতে কিছু কি নেই ?

হলঘরটায় একটা ঘড়ি ছিল | তাতে যখন প্রায় দুটো বাজে, শৈবাল ফিরল | দূর থেকে আমাকে ডাকল | আমি উঠে গেলে বলল, “শোনো, মুশকিল হয়েছে | কিছু ছেলে, এখানকার মাস্তান-টাস্তান হবে, বড় মামার সাথে খুব ঝামেলা করছে |” আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “কী নিয়ে ঝামেলা ?” ও বলল, “কাল তোতন মামার মারা যাওয়ার খবর পেয়ে বড় মামা হাসপাতালে গিয়ে বডিটা মর্গে রেখে, আজ ভোর ভোর এখানে এসেছিল | একা মানুষ, কী ভাবে সামলাবে ভেবে পায় নি | চিন্তা হয়েছিল যে কাঁধ দেবার লোকজন জোগাড় করে বডি নিয়ে আসতে আসতে এখানে পোড়ানোর লম্বা লাইন পড়ে যাবে | তাই আগে এখানে এসেছিল লাইনে জায়গা ধরতে | এসে দেখল মড়া বিনে কেউ কথাই বলতে চায় না | একদল বখাটে ছেলে খবরদারি করছিল | তারা বলল, ‘আগে মড়া নিয়ে আসুন | তারপর কথা বলবেন |’ মামা ওদেরকে বলল, ‘দেখো ভাই, আমি একা মানুষ | যে মারা গেছে, তারও তিন কুলে কেউ নেই | লোকজন জোগাড় করে বডি আনতে আনতে দেরী হয়ে যাবে | তাই বলছিলাম, আমার নম্বরটা যদি লিখে রাখতে |’ একজন বলল, ‘ঠিক আছে, নাম বলুন – আপনার না – যে মারা গেছে তার নাম বলুন |’ মামা নাম বললে ওরা নাকি একটা নোটবুকে লিখে রেখে বলল, ‘যান, গিয়ে মড়া নিয়ে আসুন | আপনার নম্বর থাকলো |’ তারপরই বড় মামা আমাকে ফোন করেছিল | আমি তখন বলেছিলাম, ‘হাসপাতালে নিশ্চয়ই ডেড বডি শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার জন্য হ্যর্স (শবযান) পাওয়া যাবে  | তুমি অপেক্ষা করো, আমি আসছি |’ এখন একটু আগে মামাকে নিয়ে হাসপাতালের হ্যর্স জোগাড় করে, তোতন মামার বডি নিয়ে ফিরেছি | এখানে এসে দেখছি আমাদের লাইন নেই – ইতিমধ্যে অন্য যারা এসেছে, ওই মাস্তানগুলো তাদের আমাদের আগে নম্বর দিয়ে বসে আছে | বড় মামা যে ভোরে এসেছিল সে কথা ওরা মানছেই না | বড় মামা যখন ওদের বলল ওদের একজন নোটবুকে নাম লিখেছিল, ওরা সবাই খুব খ্যাঁক খ্যাঁক করে বিশ্রীভাবে হাসল | একজন বলল, ‘যা শ্যালা, সসান ঘাটে নোটবুক ! দাদু, এটা কি দেখে ইসকুল-টিস্কুল মনে হচ্ছে ?’ এই ধরনের কথা শুনে বড় মামার মাথা গরম হয়ে গেছে | আমি কোনমতে বড় মামাকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে ওই হাসপাতালের হ্যর্সে বসিয়ে রেখে এসেছি ... আমি এখন যাই – রগচটা মানুষ, সামলে না রাখলে আবার তেড়ে যাবে ওদের সাথে লাগতে |” আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “খাওয়ার কী হবে ? সেই সকাল থেকে যে না খেয়ে আছি |” “দেখছি কী করা যায়”, বলে শৈবাল গেল |

সীমা কথা থামাল | তিন্নি বলল, “থামিস না | বেশ ইন্টারেস্টিং !”  সীমা চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে আবার বলতে লাগল |

যখন দেয়াল ঘড়িতে প্রায় পাঁচটা বাজে, রোদ পড়ে আসছে, দেখলাম বাথরুম পেয়েছে – যদিও সকাল থেকে এক গেলাস জলও খাই নি | উঠলাম | বাড়িটার ভিতর দিকে ঘরটা থেকে বেরিয়ে একটা করিডোর – তার এক পাশে উঠোন, অন্য পাশে ঘর পর পর | কোনটার দরজা বন্ধ, কোনটার খোলা | কোথাও বাথরুম দেখতে পেলাম না | বেশ কিছু এগিয়ে গিয়ে পেলাম  এই করিডোরটার আড়াআড়ি আর একটা করিডোর | তার দু’পাশে ওইরকম খালি খালি ঘর | যতই এগোই কোনও বাথরুম দেখতে পাই না | এলোমেলো ঘুরে কখন কোন করিডোর থেকে কোন করিডোরে চলে গিয়েছি জানি না – হঠাত মনে হল আমি পথ গুলিয়ে ফেলেছি | ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরে আন্দাজে হাঁটা দিলাম | একটু পরে লোকের কথা বলার আওয়াজ শুনে ভরসা পেলাম যে যাক নিজের ঘরটার কাছাকাছি এসেছি | তখন দেখি একটা ঘরের দরজা খোলা যার উল্টোদিকের দেয়ালে একটা আধখোলা দরজা – সেদিক থেকে অপরিষ্কার বাথরুমের মত একটা গন্ধ ভেসে আসছে | ঢুকে ভিতরের দরজাটার কাছে গিয়ে দেখি তার পিছনে একটা কুঠরি | তার মেঝেয় একটা কল থেকে জল পড়ে পড়ে শ্যাওলা হয়েছে, যার গন্ধ পেয়েছিলাম | ফিরে বেরিয়ে আসতে গিয়ে দেখি বাইরের ঘরটার একদিকে দেয়ালের লাগোয়া একটা টেবিলে সাদা কাপড় পেতে তার উপরে কিছু ফুল, সাথে কাগজের প্লেটে প্লেটে থরে থরে অনেক মিষ্টি রাখা | মনে হল  শ্মশান যাত্রীদের জন্য হয়ত জলযোগের ব্যবস্থা করা আছে | পাশে গেলাসে গেলাসে জলও রাখা ছিল | খুব তেষ্টা পেয়েছিল | একটা গেলাস তুলে জলটায় মুখ দিয়েছি কি, কী ভাবে ধাক্কা লেগে একটা মিষ্টির প্লেট থেকে কিছু মিষ্টি মাটিতে পড়ে গেল | তুলে দেখি শুকনো মিষ্টি | ওগুলো হাতে নিয়ে জল খেতে খেতে ভাবছি, মিষ্টিগুলো প্লেটে রেখে দেব না ফেলে দেব – এমন সময় কেউ বলল, “এ তুমি কী করলে ?” মেয়ে মানুষের গলা শুনে তাকিয়ে দেখি দরজায় দাঁড়িয়ে একজন অল্প বয়সী বউ ভীষণভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে | আমি তাকাতেই সে বলল, “এখনও মড়ার মুখাগ্নি হল না, আর তুমি মিষ্টি খেয়ে মুখে জল দিলে ? ছি ছি ছি !” মনে করতে পারলাম না যাদের সাথে বসেছিলাম তাদের মধ্যে ওকে দেখেছি কিনা | আমি কিছু বলার আগেই সে মাথা পিছনে ঘুরিয়ে বলল, “এ কেমন  অলক্ষুণে কথা, দেখো দিদি ! কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার !” তার পিছন থেকে একজন বয়স্কা বউ উঁকি দিয়ে বলল, “কী সর্বনাশ ! চল চল, গিয়ে খবরটা ওদের বলি |” প্রথম বউটা মাথার কাপড় তুলে আঁচলের খুঁটে চোখ মুছতে মুছতে কাঁদো কাঁদো গলায়, “এর কী বিহিত হবে এখন ? হে ভগবান ! যে চলে গেল তার আত্মা এখন কী ভাবে শান্তি পাবে ?” বলে দরজা থেকে সরে গেল | আমি কী বলব, ফ্যালফ্যাল করে বোকার মতো তাকিয়ে থাকলাম | একটু সময় লাগল এই শক থেকে ধাতস্থ হতে | তারপর চট করে মিষ্টিগুলো কুঠরিতে ফেলে, ওখানে কলে হাত ধুয়ে করিডোরে বেরলাম | ওদের দু’জনকে কিন্তু কোথাও দেখতে পেলাম না |

লোকজনের গলা শুনতে শুনতে ঘরটায় পৌঁছলাম | ভিতরে ঢুকে কটা বাজে দেখার জন্য দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দেখি কোনও ঘড়ি নেই | যারা বসে আছে তারা সব নতুন মুখ | স্পষ্ট বুঝলাম আমি যে ঘরে বসেছিলাম এটা সেই ঘর নয় | তাহলে আমি কি সত্যি হারিয়ে গিয়েছি ? দ্বিধা নিয়ে বেরিয়ে আসতে যাব, অমনি বসে থাকা বউদের মধ্যে একটা গুঞ্জন উঠলো | দেখলাম সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে | একে একে সব বউরা নিচু গলায় কথা বলতে শুরু করল | সেই বয়স্কা বউটা যে আমাকে মিষ্টির ঘরে উঁকি মেরে দেখেছিল, সে মাথা নাড়ল | অল্প বয়সী বউটা হাতছানি দিয়ে আমাকে ডাকল | আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম, “কী ?” অমনি দু’তিন জন বউ সমস্বরে কথা বলতে লাগল | কেউ জিজ্ঞাসা করল, “এখনও মড়া পোড়ানো হয় নি, আর তুমি উপোষ ভাঙ্গলে ?” কেউ বলল, “এমন কাজ করলে ভাই !” আবার কেউ বলল, “আমরাও তো সবাই না খেয়ে আছি | ছি, ছি, ছি – কাজটা ভালো করলে না |” আমি ভাবলাম বলি, ‘আমি তো আপনাদের, বা যিনি মারা গেছেন তাঁর, কেউ নই | আর, আমি শুধু জল খেয়েছি, আর কিছু খাই নি |’ কিন্তু, ওদের আরও মতামত, মন্তব্য বলা শুরু হয়ে গেল – সবই আমার খেয়ে ফেলা নিয়ে কটু কথা | শুনে মনে হল না আমি ওদের অচেনা, ওদের পর | আমি ভীষণ হতাশ বোধ করলাম | একে না খেয়ে আছি সকাল থেকে, তারপর হারিয়ে গিয়েছি এই বাড়িটার গোলকধাঁধায়, আর জানি না শৈবাল কোথায়, কী করছে, আমি যে মিসিং আদৌ তা লক্ষ্য করেছে কিনা | আমি ছুটে করিডোরে বেরিয়ে এলাম |

জানি না কতক্ষণ উদ্ভ্রান্তের মত যেদিকে পেরেছি হেঁটেছি | হয়ত এ্যাবসেন্ট মাইন্ডে বাইরে বেরোনোর পথ খুঁজছিলাম | কিছুক্ষণ পরে মনে হল সূর্য অস্ত গেছে | আলোটা আবছা হয়ে আস্তে আস্তে আঁধার ঘনিয়ে আসছে | অন্ধকার করিডোরে আমি সম্পূর্ণ একা |

আমি প্রায় কেঁদে ফেলব, হটাত কেউ পিছন থেকে এসে আলতো হাতে আমার ডান কব্জি ধরল – হাতের তালু খসখসে আর অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা – আর বলল, “এ কী ? তুমি এখানে ! সবাই তোমাকে নিয়ে চিন্তা করছে |” গলা শুনে আন্দাজ করলাম বড় মামা | আমি ওনার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করলাম | উনি বললেন, “তুমি কি ওদের কথায় রাগ করেছ ? ছেড়ে দাও মেয়েমানুষের কথা | ও সব গায়ে মাখতে নেই ... আমি এলাম তোমায় খুঁজতে, কেননা ওদিকে খুব ভয়ঙ্কর অবস্থা | শিগগির চলো | বাকি সবাই জড়ো হয়েছে, শুধু তুমি নেই |” আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল, তাই মুখ না ঘুরিয়ে, চলা না থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “কী হয়েছে ?”
-    “কতকগুলো ছেলে তোমার বড় মামার সাথে খুব মারপিট করেছে | ওকে বেদম মেরেছে |”
-    “কারা ? কেন মারল ? শৈবাল কই ? ও কেন এলো না আমাকে খুঁজতে ?”
আমি এক নিশ্বাসে প্রশ্নগুলো করে ফেলেই থমকে গেলাম | যে মানুষটা এই ভাবে বড় মামার কথা বলছে সে কী করে বড় মামা হবে ? মুখ তুলে পাশে তাকিয়ে দেখি বড় মামার মতই লম্বা চওড়া বেশ বয়স্ক একজন মানুষ | তার মুখের আদল বড় মামার মতই সৌম্য, কিন্তু চোখ দুটো কেমন অন্ধকার, নিষ্প্রভ | আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “কারা মেরেছে বড় মামাকে ? উনি এখন কোথায় ... আর, আপনি কে ?” লোকটা বলল, “তুমি আমাকে চিনবে না ... তোমার বড় মামা গিয়েছিল ওদের সাথে কথা বলতে, ওরা কেন আমাদের আগে অন্যদের চুল্লীর লাইনে ঢুকিয়েছে | সেই নিয়ে ... ওই দেখো, শৈবাল আসছে ! ওর কাছে শোনো কী হয়েছে ঘটনাটা |” লোকটা আমার হাত ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল |

করিডোরের শেষে একটু আলোয় দেখলাম শৈবাল হন্ত দন্ত হয়ে আসছে | আমি ছুটে ওর কাছে যেতেই ও দাঁড়িয়ে পড়ে আমার হাত ধরল | তারপর আমায় টেনে ফিরে যেতে যেতে বলল, “কোথায় ছিলে তুমি ? আমি কত খুঁজছি | শিগগির চলো ... বড় মামাকে ছেলেগুলো খুব মারধোর করেছে | বড় মামা কথা বলতে গিয়েছিল, ছেলেগুলো কেন আমাদের লাইন কেটে অন্যদের ঢুকিয়েছে | এই নিয়ে তর্কাতর্কি থেকে মারামারি |” আমি ওর সাথে সমান বেগে হাঁটার চেষ্টা করতে করতে বললাম, “এখন বড় মামা কোথায় ?” শৈবাল বলল, “ওখানেই |” “ওখানেই মানে ?” আমার প্রশ্ন শুনে শৈবাল আমার দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত করে বলল, “সীমা, ওরা বড় মামাকে এমন মেরেছে যে বড় মামা চুল্লীগুলোর দরজার সামনে নেতিয়ে পড়ে আছে, উঠতে পারছে না | ছেলেগুলোর দলের সর্দারটা সবাইকে বলছে  ‘এখন লাইনে ইনি নেক্সট | জায়গা চাইছিলেন – জায়গা করে দিয়েছি |’ বড় মামাকে ওই অবস্থায় ফেলে তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি | বাকি সবাই ওখানে |” আমি আঁতকে উঠে বললাম, “তার মানে ? কী হয়েছে খুলে বলছ না কেন ?’ শৈবাল বলল, “আমি হ্যর্সে তোতন মামার বডি নিয়ে বড় মামার সাথে বসে ছিলাম | কখন একটু চোখ বুজে এসেছিল | হঠাত শুনি খুব চেঁচামেচির আওয়াজ | চমকে উঠে চোখ খুলে দেখি বড় মামা নেই | চুল্লীগুলোর দিকে থেকে একটা হট্টগোলের শব্দ আসছিল | একজন ছুটে এসে আমাকে বলল, ‘শিগগির যান, ওনাকে বাঁচান |’ দৌড়ে গিয়ে দেখি ততক্ষণে ওরা বড় মামাকে মেরে প্রায় শেষ করে দিয়েছে | রক্তমাখা জখম দেহটা একটা চুল্লীর সামনে মাটিতে শুইয়ে রেখেছে | আমি গিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করতেই ওখানকার জটলা করে দাঁড়ানো একদল ছেলের মধ্যে একজন আমাকে বলল, ‘আর দেরী হবে না | লাইনে এখন ইনিই নেক্সট |’”

আমরা ততক্ষণে বাড়িটার সামনে বেরিয়ে এসেছি | আমি বললাম, “সে কী ? তোমরা কেউ কিছু প্রতিবাদ করলে না ? তোমরা এতগুলো মানুষ আর ওই কটা ছেলে ... ওরা ক’জন ? হাসপাতালে, পুলিশে কোথাও খবর দেবে না ?” শৈবাল বলল, “দেব, দেব | তক্ষুনি আমার প্রথম চিন্তা হল তোমাকে নিয়ে | তাই আমি আগে ছুটলাম তোমাকে খুঁজতে | এতগুলো ঘর, কোনটায় যে তুমি বসেছিল কিছুতেই চিনতে পারলাম না | তোমার সাথে ওই ঘরটায় যারা ছিল তাদেরকেও দেখতে পেলাম না ... এখন দেখি কী করতে পারি ... তুমি একটা কাজ করবে ?” আমি বললাম, “কী ?” শৈবাল বলল, “তুমি ওই হ্যর্সটার ভিতরে বসো | আমি যাই, অন্যদের ধরে বড় মামাকে তুলে নিয়ে আসি |” আমি আঁতকে উঠে বললাম, “না, না, ওতে ডেড বডি আছে ... আমি পারব না |” তাও শৈবাল প্রায় জোর করে আমাকে হ্যর্সটার কাছে দাঁড় করিয়ে সাইডের একটা দরজা একটু খুলে বলল, “ওঠো !” সারাদিনের ক্লান্তিতে তখন আমার চোখ জড়িয়ে ঘুম নামছে | বসতে পেলে শুয়ে পড়ি | জিজ্ঞাসা করলাম, “এত অন্ধকার যে, কটা বাজে এখন ?” “প্রায় সাতটা ... নাও, উঠে বসো” বলে শৈবাল আমার কাঁধে একটু চাপ দিয়ে চলে গেল | কিছুক্ষণ পরেই একজন দৌড়ে এসে হ্যর্সটার পিছনের দরজা দুটো সপাট খুলে দিল | দেখলাম শৈবাল আর কিছু লোক ধরাধরি করে নিয়ে আসছে বড় মামার বিরাট শরীর |

সীমার কথা থেমে গেল | তিন্নি বলল, “উফ ! কী বীভৎস ব্যাপার ! তুই ...”  সীমা উত্তর দিল না, কেননা মনে পড়ল ...

ওর দৃষ্টি কী ভাবে যে হ্যর্সটার ভিতরে চলে গিয়েছিল, হয়ত দেখতে যে বড় মামার দেহটা কোথায় রাখবে | তখনই চোখ পড়েছিল ভিতরে শোয়ানো তোতন মামার দেহটার দিকে | মুখের কাপড় সরানো | পিছনের খোলা দরজা দিয়ে আসা রাস্তার আবছা আলোয় বোজা চোখ দুটোর অন্ধকার গর্ত ঠিক দেখা না গেলেও, মুখটার আদল অবিকল বড় মামার মত – সৌম্য, বেশ অভিজাত – যেমন কিছু আগে ও দেখেছে করিডোরে | সীমার ডান হাতের কব্জি থেকে একটা ঠাণ্ডা অনুভূতি শিরশির করে উঠে সারা শরীরে ছড়িয়ে গিয়েছিল | সীমা অবশ হয়ে পড়ে যেতে যেতে শুনেছিল, ক্ষীণ গলা থেকে ক্রমশ জোরালো হয়ে আসা শৈবালের ডাক, “সীমা ... সাতটা বাজছে ... আর না ... ওঠো এবার !”


----------------------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ২৩ নভেম্বর ২০১৫

বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০১৫

আর এক ম্যডিউসা

|| আর এক ম্যডিউসা ||

হাসি মাসি আমার চেয়ে বয়েসে খুব একটা বড় ছিল না | আমার মনে পড়ে না কবে প্রথম হাসি মাসিকে দেখি | তবে যবে থেকেই হোক, হাসি মাসিকে একই রকম দেখেছি | আবছা স্মৃতি আমার স্কুলের প্রথম গরমের ছুটির – হাসি মাসি তখন আমার থেকে এক মাথা লম্বা | তখন প্রতি বছর গরমকালে ছুটিতে দাদুর বাড়ি যাই, আর খালি গায়ে হাফ প্যান্ট পরে খেলে বেড়াই | শেষ দেখা স্মৃতি আমার কলেজে প্রথম বর্ষের পুজোর ছুটির – ততদিনে আমি হাসি মাসির থেকে এক মাথা লম্বা | এই দশ বছরে হাসি মাসির কিছুই বদলায়নি  – সেই প্রায় মায়ের মত উচ্চতা, সেই হালকা শরীর, ঠোঁট চাপা মুখে সেই স্মিত হাসি | এর পর চাকরিতে ঢুকেই একবার দাদুর বাড়ি গিয়েছি, তার কিছু আগেই হাসি মাসির বিয়ে হয়ে গেছে, দেখা পাই নি |

আমার দিদিমা নিজে একমাত্র কন্যা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ছয় ছেলে ও ছয় মেয়ে হয় | আমি  অবশ্য জ্ঞান হয়ে থেকে তিন মামা, আর তিন মাসিদের দেখেছি; বাকিরা শুনেছি আঁতুড়ঘরে, কি একটু বড় হয়ে, মারা যায় | কাজেই দিদিমার আর সন্তান-সন্ততির দরকার ছিল না | তবুও, গ্রামের এক দুঃস্থ মেয়েকে কোন সময় দাদু আশ্রয় দেন, সেই বড় হয়ে হয় হাসি মাসি | আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর দাদু হাসি মাসিকে রেখেছিলেন দিদিমাকে সংসার সামলাতে সাহায্য করার জন্য | কিন্তু, আমরা কোনদিন হাসি মাসিকে তেমন কাজ করতে দেখি নি | তার জন্য অবশ্য অতি চঞ্চলমতি করিতকর্মা দিদিমাই বেশি দায়ী ছিলেন | হাসি মাসি কিছু করতে চাইলেই ব্যস্ত হয়ে বলতেন, “না, না, থাক | তুই যা, অন্য কিছু কর |” এই কারণে, আমি দেখেছি হাসি মাসি মুখে একটু বিব্রত হাসি মাখিয়ে কিছু করার জন্য উদগ্রীব হয়ে দিদিমার আসে পাশে উপস্থিত থাকত | মেয়ে-জামাইরা গরমকালে দাদুর বাড়ি গেলে, যে নাতি নাতনির দৌরাত্ম্যে তাঁর সংসার নরক গুলজার হত, সেই নাতি নাতনিদের কেউ দেখার ছিল না | তাই, দিদিমা হাসি মাসিকে আমাদের চোখে রাখার সম্পূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছিলেন | আমরা হাসি মাসিকে গ্রাহ্যও করতাম না | তাই, আমরা বেশি উৎপাত না করলে, হাসি মাসি আমাদের ধারে কাছে থাকত না, কোন জোর খাটাত না |

হাসি মাসি ছিল, যেমন বলেছি, উচ্চতায় মাঝারি, কি একটু কম | গায়ের রং ময়লা | মিষ্টি মুখখানা ছিল গড়নে ছোট | আর, দাদুর ভাষায় বাউসমুখী, ছোট্ট দুই ঠোঁটে সবসময়ে একটা হাসি ফুটে থাকত, কিছুটা আমুদে, কিছুটা অপ্রতিভ | হাসি মাসি কিন্তু আসল হাসি হাসত চোখে, ‘চক্ষু মুদে’ | যখন হাসত ওর ভুরু কুঁচকিয়ে জোড়া হয়ে চোখ দুটো বুজে আসত, মাথা পিছনদিকে কাত হত | বেশি হাসির বেগ এলে সামলাতে না পেরে, হাসি মাসি মাথা এদিক ওদিক হেলিয়ে কাত হয়ে পড়ত, তবু মুখ খুলে হাসত না | হাসি মাসির না রোগা, না মোটা দোহারা শরীরটায় জড়ানো থাকত তাঁতের শাড়ি | হাসি মাসি কুঁচি না দিয়ে শাড়ি পরত | অন্য মাসিদের সাথে হাসি মাসির এই একটাই প্রকট তফাত ছিল | হাসি মাসির মাথায় অসম্ভব পরিমাণে কোঁকড়ানো চুল ছিল যা ওকে কোনদিন বাঁধতে দেখিনি | ওই অঢেল সর্পিল, পাকানো শণের নুড়ি, ঝুরি ঝুরি চুল পিঠ ছাপিয়ে কোমর অব্দি নামত | মা, মাসীরা মাঝে মাঝে ডাকত, “হাসি, আয়, তোর চুল বেঁধে দিই |” হাসি মাসি এড়িয়ে যেত | সেই চুলের বর্ণালীতে দিনের আলোয় অনেক সোনালী ডোরা দেখা যেত | হাসি মাসির রগে, গালে, আর হাতে ওই রকমেরই সোনালী লোমের প্রাদুর্ভাব ছিল | বোধহয়, হাতের লোম নিয়ে হাসি মাসি বিব্রত থাকত, কেন না দেখতাম হাতের উপর চোখ ফেললেই হাসি মাসি শাড়ির আঁচলে হাত লুকত | আমার চোখে ওই সোনালী লোমই কিন্তু মনে হত হাসি মাসির হাতের ছিলা কাটা সোনার চুড়ি থেকে ছিটিয়ে পড়া সোনার সূক্ষ্ম আঁশ |

আমরা হাসি মাসিকে গুরুজনের চোখেই দেখতাম | একমাত্র আমার বেয়াড়া মাসতুত ভাই দিনেশ ছড়া কেটে গাইত:
“হাসি মাসি, মাসি নয়, আসলেতে দাসী সে / রূপ তার উপচায় নিম তেল মালিশে” | 

তার কারণ, শুনেছিলাম, হাসি মাসি নাকি মেজ মাসি, দিনেশের মা, কে বলে শিরিনী থেকে নিম তেল আনাতো, গায়ে মাখার জন্য | দিনেশ বলত শিরিনীর বাজারে নিম তেল পাওয়া যায় | সেই তেল মেখে সাঁওতাল মেয়েরা চেহারা ঘষামাজা, আর হাত পা নির্লোম রাখে | দিনেশ কী করে এতসব জানতো আমার জানা নেই |

মামাদের মধ্যে হাসি মাসিকে যদিও অন্য কারো সাথে তেমন কথা বলতে দেখিনি, তপু মামা হাসি মাসির সাথে কথা বলত, ঠাট্টা করত, আর পিছনে লাগত, বিশেষ করে ওর সরল ব্যবহার নিয়ে | হাসি মাসি রাগ করত না, শুধু কপট চোখ রাঙিয়ে বলত, “তপুদা, দাঁড়াও মাকে বলছি | বলি, সেদিন কী করেছিলে ?” তখন দেখতাম তপু মামাও কপট কাকুতি মিনতি করে বলত, “হাসি, প্লিজ, মাকে কিছু বলিস না | তোর কী চাই বল, আমি এনে দেব |” হাসি মাসি বলত, “তুমি তো জানোই আমি কী চাই |” তপু মামা বলত, “আচ্ছা, আমি বলব নীল কে |” জানি না, কী সেই প্রতিশ্রুতি ছিল, তবে হাসি মাসি তপু মামার নানান ফাই ফরমাইশ খুব খাটত |

যখন আমি হাই স্কুলে উঠেছি, গোঁফ গজাব গজাব করছে, তখন অনাত্মীয়া তো বটেই, দূর সম্পর্কেরও মেয়েদের নিয়ে খুব কৌতূহল | সেই কৌতূহল কিছুটা কাটত তপু মামার সাহচর্যে | তপু মামা কলেজ থেকে ফিরে চা খেয়ে বলত, “চল, ঘুরে আসি |” ঘুরে আসা বলতে, এক চক্কর দিয়ে তপু মামা যেখানে যে বন্ধু পেত ধরে জেল-ময়দানে গিয়ে রুমাল পেতে বসে আড্ডা দিত | চীনেবাদাম খাওয়া, কদাচিৎ কখনও ভাঁড়ে চা | বেশির ভাগ গল্পই ছিল এ পাড়া, ও পাড়ার গল্প, সেই সাথে কিছু কলেজের গল্প, বই, সিনেমার গল্প, আর মাঝে মাঝে এর ওর পাড়াতুতো বান্ধবীর গল্প | গল্প বলছি, কেন না সেই সময় আমার চেয়ে বয়স্কদের অপেক্ষাকৃত পরিণত ভাষার সব চর্চাই আমার গল্পের মত মনে হত |

আবার এক এক দিন এমনও হত, তপু মামা শুধু এক বন্ধুর সাথে ঘুরতো | তার নাম ছিল ইন্দ্রনীল না কি, ডাক নাম নীল | তপু মামার সাথে আড্ডা দিতে নীল মামা সাইকেল নিয়ে আসত | আমি সামনে রডে বসতাম, কখনও নীল মামা, কখনও তপু মামা চালাত, অন্য জন পাশে পাশে হাঁটত | কোনদিন গঙ্গার পাড়ের বাঁধে সাইকেল চলিয়ে আমরা শ্মশান ঘাট পার হয়ে যেতাম | কোনদিন খেয়া ঘাটে গিয়ে, নৌকায় করে আমারা ওপারে চলে যেতাম | সেখানে ছিল সব একের পর এক আমের বাগান, আল দিয়ে আলাদা করা | ওই আল পথে সাইকেল চালিয়ে আমরা চলে যেতাম দাদুর বাগানে | সে বাগান এত বড় ছিল যে আমি তার অন্য প্রান্ত দেখি নি কোন দিন | ওই বাগানে ঘুরে ঘুরে তপু মামা দেখত কোন গাছে কেমন ফল ধরেছে – আম, জ্যাম, লিচু, সফেদা | নীল মামা একাগ্র হয়ে মাটিতে চোখ রেখে পা টিপে টিপে হাঁটত | মাঝে মাঝে নিচে মাটিতে পড়ে থাকা শুকনো পাতায় সিরসির করে কিছু নড়ে উঠত | নীল মামা সতর্ক হয়ে, ঠোঁটে আঙ্গুল রেখে আমাদের সাবধান করে দিয়ে, পা টিপে টিপে গিয়ে হটাত মাটিতে ঝুঁকে খপ করে ধরত – সাপ | নীল মামার সাপ ধরার শখ ছিল | সাপ সম্বন্ধে জ্ঞানও ছিল বিস্তর – কোন সাপের নাম কী, দেখতে কেমন, কার বিষ নেই, কার আছে জানতো – আমার অন্তত তাই মনে হত | অনেক বার দেখেছি সাপ ধরে আবার ছেড়ে দিতে | এক দুবার দেখেছি, বড় লম্বা সাপ হলে, তার লেজ ধরে মাথার উপর বনবন করে ঘুরিয়ে ছুঁড়ে ফেলতে | আবার কখনও সাপ ধরে আছড়ে পিটিয়ে মেরে, শুকনো পাতা, কাঠ কুটো জড়ো করে তপু মামার দেশলাই নিয়ে আগুন জ্বালিয়ে, পুড়িয়ে দিত | তার শেষ দৃশ্যটা দেখে আমার খুব ভয় করত – পুড়ে যেতে যেতে আগুনের তাতে মুখটা খুলে ফাঁক হয়ে যাওয়া সাপের বিকট মুখব্যাদান | নীল মামা বলত, ওই সময় নাকি সাপ চোখ খুলে শেষ বারের মত দেখে নেয় তার ঘাতককে, পরের জন্মে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য | তাই ওই সময় সাপের চোখের দিকে তাকাতে নেই | আমি দূরে দাঁড়িয়ে আড়চোখে এই সব কাণ্ড কারখানা দেখতাম, আর ভাবতাম নীল মামার কী সাহস |

কোন কোন দিন নীল মামা একটা বাজার করার ব্যাগ হাতে নিয়ে দাদুর বাড়ি এসে তপু মামাকে নিয়ে ছাতে চলে যেত | দেখতাম থেকে থেকে হাসি মাসিকে ডেকে এটা সেটা ফরমাইশ করা হচ্ছে – দাদুর নস্যির কৌটো লুকিয়ে নিয়ে আসতে, একটু চা করে আনতে | কখনও হাসি মাসি টুক করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে নিচের ফেরিওয়ালার কাছ থেকে ডালমুট কি বাদামভাজা কিনে আঁচলে মুড়িয়ে এনে দিত | নীল মামার সাথে তপু মামার খাপ খেত যত অব্যক্তিক ব্যাপার – গঙ্গার জলে সাঁতার, বালির চরে দৌড়, ওপারের ক্ষেত বাগান, জন্তু জানোয়ার, পশু পাখী, সাপ খোপ দেখা | আমি সাথে থাকলে হাঁ করে শুনতাম |

নীলু মামা হাসি মাসিকে আড়ালে নাগকেশী বলে ডাকত | আমি কারণ বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “ওই নাম কেন ? নাগকেশ ফুল হয় জানি, কিন্তু নাগকেশী মানে কী ?” নীলু মামা বলেছিল, “ব্যাটা, তোর বুদ্ধি এক্কেবারে গুবলেট | দেখেছিস না, ওর মাথায় কত সাপের মত চুল ! তাই ... বুঝেছিস এবার ?” আমি মাথা নেড়েও সম্মত হই নি | একদিন আমি শুনে ফেললাম তপু মামা নীল মামাকে বলছে, “তুই সব সময় হাসিকে ও’ভাবে ডাকিস কেন ?” নীলু মামা বলল, “হাসিও তো আমাকে গুণীন বলে | তপু মামা বলল, “সে কী ?” নীল মামা বলল, “হ্যাঁ, আমায় বলে, সাপ বশ করো, মানুষও কী বশ করতে পা
রো ?” তপু মামা বলল, “তাই বলে তুই ... দেখ, ও আমাদের এক পদের মেয়ে নয় | কী থেকে কী বুঝে বসবে | আমার মনে হয় না তুই এটা ঠিক করছিস |” নীলু মামা জিজ্ঞাসা করল , “কেন, কী অন্যায় করছি বল ?” তপু মামা কিছু উত্তর দিতে গিয়ে হটাত আমায় দেখে হেসে বলল, “এই, বড়দের কথা তুই এত কী গিলছিস ? যা, পালা এখান থেকে |”

এই আশ্চর্য শৈশব একদিন কেটে গেল | বীররামপুর স্মৃতির আয়নায় পিছনে ফেলে এগিয়ে গেলাম স্কুল থেকে কলেজ হয়ে চাকরী জীবনে, সেও দূর দেশে | এত পরিচিত জগতটা কুঁকড়ে ছোট হয়ে দুরে সরে গেল | হারিয়ে গেল দাদু, দিদিমা, মাসি, মামারা | যতদিনে চাকরী জীবন শেষ হল মাতুলকুলের শেষ প্রদীপ সবার ছোট দীপু মামা শুধু বেঁচে | একদিন হটাত বোধ করলাম বড় হতে হতে অজান্তে বুড়ো হয়ে গেছি |

চাকরি থেকে অবসর পেলে, দীপু মামার টানাটানিতে ছোট ছেলে খোকনের বিয়েতে মামাবাড়ি গেলাম, শেষ গিয়েছি তার  সাঁইত্রিশ বছর আগে | এক এক করে পুরানো কথার খেই ধরলেও, হাসি মাসির কথা ভুলেই গিয়েছিলাম | একদিন মামিমার কাজের মেয়েটা না আসায় মনে পড়ল | দীপু মামাকে জিজ্ঞাসা করলাম হাসি মাসির কথা | দীপু মামা অবাক হয়ে বলল, “হাসির কথা তোর মনে আছে ?”
আমি –“মনে আছে ? এখনও চোখ বন্ধ করলে হাসি মাসির চেহারাটা দেখতে পাই | কোথায় আছে ? কেমন আছে ?”
মামা – “ভালই আছে | দেখলে তুই চিনতে পারবি না | সেই হালকা পলকা হাসি আর নেই, সে এখন বেশ ভারিক্কি গিন্নি হয়ে গেছে | বরটার মেলাই পয়সা | আজিমপুরে বাড়ি | গাড়ি, লরি, ট্রাক, বাস নিয়ে এলাহি কারবার | লোকজন নিয়ে মস্ত সংসার |”
আমি –“একটু একটু করে বলো সব কথা | আমি এসব কিছুই জানি না ... হাসি মাসি আর আসে না এ বাড়িতে ?”
মামা – “হ্যাঁ, বাবা মা বেঁচে থাকতে তো প্রায় পূর্ণিমা, অমাবস্যায় আসত | সেটা কমে কমে, কিছুদিন আগেও প্রত্যেক বছর পুজোয় এসে তোর মামিমার সাথে গিয়ে অষ্টমীর পুজো দিয়েছে | আবার দশমীর পর হাবুল, মানে ওর বরকে নিয়ে এসে প্রণাম করে মিষ্টি দিয়ে গেছে | খোকনের বিয়েতেই আসতে পারল না | আগেই বলেছিল হাবুলের এক ভাইঝির বিয়ে আছে একই দিনে |”
আমি – “বর, মানে মেসো কী করে ?”
মামা – “কী না করে বলা সোজা | আগে জিজ্ঞাসা কর, ওই ছেলেকে আমরা পেলাম কী করে |”
আমি –“বলো শুনি |”
মামা –“বাবা একবার সক্কাল বেলা গঙ্গা স্নান করে ফিরছে | হাবুল দুধের ক্যান সাইকেলে নিয়ে যেতে যেতে বাড়ির ঠিক সামনে বাবাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয় | বাবার খুব বেশি ছোট লাগে নি | তাও হাবুল সাইকেল দাঁড় করিয়ে বাবাকে উঠিয়ে বাড়ি দিয়ে গেল, অনেক আফসোস করে ক্ষমা চেয়ে নিলো | তারপর দু’চার দিন বাদে বাদে এসে খবর নিয়ে যেত | বাবার ছেলেটাকে খুব ভালো লেগে যায় | স্বাস্থ্য ভালো ছিল | দশ ক্লাস অব্দি পড়েছিল, কিন্তু ম্যাট্রিক দিয়ে উঠতে পারে নি | সকাল সকাল উঠে আজিমপুর থেকে খান চারেক মস্ত দুধের ক্যান নিয়ে এখানে এসে সাপ্লাই দিয়ে যেত | ভাব তুই, প্রায় দু মণ মত দুধ ছেলেটা, কি শীত কি গ্রীষ্ম কি বর্ষা, প্রায় সাত আট কোষ পথ সেই আজিমপুর থেকে সাইকেলে করে বয়ে নিয়ে আসত | এ ছাড়া আজিমপুরে কিছু চাষের জমিও ছিল |”
আমি –“তার মানে হাসি মাসি ছেলে ভালই পেয়েছিলে | আমি ভাবতাম ... হাসি মাসি তো পড়াশুনা করে নি ...”
মামা – “হ্যাঁ, প্রথম প্রথম হাসির একটু ওজর আপত্তি ছিল | কিন্তু বয়েস হয়ে যাচ্ছিল | বাবা একবার খুব রাগ করল ... কিন্তু বিয়ের পর হাসি খুব সুখী হয়েছে | হাসিই তো বিয়ের পর হাবুল কে দিয়ে একটা পুরানো লরি কেনালো | কেউ আজিমপুরে কাঠের ব্যবসা করত | গাছ কাটা নিয়ে ফরেস্ট অফিসের কড়াকড়ি শুরু হওয়ার পর সেই ব্যবসা লাটে উঠলো | তার লরিটা জলের দরে বিক্রি হচ্ছে শুনে হাসি হাবুলকে বলল, লরিটা কিনে নাও | হাবুল বলল, লরি দিয়ে কী করব | হাসি বলল, লরি করে দুধ বিলি করবে | হাবুল বলল, খালি লরি নিয়ে ফিরতে হবে, তার তেল লাগবে না ? হাসি বলল, না ফেরার পথে গঙ্গার বালি, আর ক্যান ভরে গঙ্গা জল নিয়ে আসবে, বেলগঞ্জে আড়তে সাপ্লাই দেবে | তখন হাবুল বৌয়ের কথা রেখে, বাবার সাথে পরামর্শ করে,  বাবার কাছ থেকে কিছু ধার নিয়ে, আর জমি বিক্রি করে সেই লরি কিনল | ব্যাস, তারপর লক্ষ্মী দেবী এমন প্রসন্ন হল যে দেখতে দেখতে তিন চার বছরে ও আরও দু’খানা পুরানো লরি কিনে ফেলল | এর পর জমি, বড় রাস্তায় বাড়ি, ট্রাক-বাসের ব্যবসা – ও কী করে না আমায় জিজ্ঞাসা করিস না, আমি বলতে পারব না | হাসি মেয়েটা যেমন পয়মন্ত ছিল, তেমনই দু’জনে সুখী হয়েছে |”
আমি – “তুমি বলছিলে, প্রথম প্রথম একটু হাসি মাসির আপত্তি ছিল | তারপর দাদু রাগ করল | তোমরা কি জোর করে বিয়ে দিয়েছিলে ?”
মামা – “না তা ঠিক নয় ... যাক গে, সে সব পুরানো কথা | তুই যাবি তো যা, খোকন কে নিয়ে কাল পরশু আজিমপুর থেকে ঘুরে আয় | বাসে সব মিলিয়ে এক এক দিকে ঘণ্টা খানেক লাগবে | জল খাবার খেয়ে বেরিয়ে ভাত খাওয়ার আগে ফিরে আসতে পারবি | হাসি খুব খুশি হবে |”
আমি – “হাসি মাসির ছেলে মেয়ে ?”
মামা – “একই ছেলে, ডাক্তার | ওই আজিমপুরেরই হেলথ সেন্টারে ছিল বেশ কয়েক বছর ধরে | এখন জানি না আর আছে কিনা | একটা ব্যাপারে ছেলেটার খুব হাত যশ, জানিস তো | সাপের কামড়ের একেবারে ধন্বন্তরি ডাক্তার !”
আমি – “ও ... মামা, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব ? কিছু মনে করবে না তো ?”
মামা – “বল |”
আমি – “ওই যে তপু মামার বন্ধু ছিল নীল মামা ... নীল মামা কি বেঁচে আছে ? ওর সাথে কি হাসি মাসির কিছু ছিল ?”
মামা –“কে নীলাঞ্জনদা’ ?”
আমি – “ইন্দ্রনীল না ? তপু মামার খাস বন্ধু, যে সাইকেল চেপে ঘুরে বেড়াত, আর খুব সাপ ধরত |”
মামা –“বুঝেছি | ওর নাম ছিল নীলাঞ্জন | না, ওর সাথে হাসির কিছু ছিল না | অন্তত আমাদের কখনও মনে হয় নি | ওই হাসির বিয়ের ঠিক পরেই একজনের সাপের কামড় খাওয়া বিষ মুখ দিয়ে শুষে বের করতে গিয়ে নীলাঞ্জনদা’ মারা যায় | একেবারে অকস্মাৎ মৃত্যু | বলতে পারিস, হাসির ছেলের সাপের কামড়ের চিকিৎসা শেখার পিছনে এক রকম কারণ ওই নীলাঞ্জনদা'র মৃত্যু | সে আর এক কাহিনী |”
আমি –“তাই বুঝি ? কী হয়েছিল, বলো না |”
মামা – “এখন থাক, অনেক রাত হয়েছে | আজ শুতে যা | কাল আবার গল্প হবে | আমারও তো দেখতে দেখতে আটাত্তর হল | আর বেশি রাত জাগতে পারি না | যা, আজিমপুর থেকে ঘুরে আয় | তারপর না হয় শুনবি |”

দু’দিন পরে খোকন কে নিয়ে আজিমপুর ঘুরে এলাম | একজন সৌম্য মাঝবয়েসী দরজা খুলে বলল, “আরে, খোকন ! আর ইনি ?” খোকন পরিচয় দিলে, ভিতরে নিয়ে গিয়ে বলল, “দেখ কে এসেছে, চিনতে পারো কিনা |” হাসি মাসির বেশ কষ্ট হল আমাকে চিনতে | বলল, “ওহ, সে তোরা কতজন মিলে সব আসতিস, তিন দিদির কুল মিলিয়ে তেরো না চোদ্দ জন বোনপো, বোনঝি | তাছাড়া নীরু, তোর চেহারাও তো বদলে গেছে রে অনেক | মুখ ফুলেছে, চুলও সব পেকে গেছে |”
হাসি মাসির দেখলাম চেহারা ভারী হলেও চুলে পাক ধরে নি | সেই রকম মাথা ভরা চুল | হাসির ভঙ্গিও একই রকম | হাবুল মেসো শুনলাম বাড়িতে নেই | হাসি মাসি বলল, “ইস, তুই আসবি জানলে ওকে বলতাম থাকতে |”
আমি –“তোমার ছেলে নাকি এখানেই হেলথ সেন্টারে আছে, মামা বলছিল ?”
মাসি –“কে ? সদা ? ওই তো তোদের দরজা খুলে দিল | বছর দুয়েক হোলো সদরে বদলি হয়ে গেছে | তবে গ্রামে গঞ্জে তো ডাক্তারের অভাব | কখনও রুগীর এমন জরুরী অবস্থা থাকে ডাকলে আসতেই হয় | এই যেমন এখন এসেছে |”
আমি –“শুনলাম, তোমার ছেলে সাপের কামড়ের একেবারে ধন্বন্তরি |”
মাসি হটাত চোখ ছোট করে বলল, “এই কথা কে বলল তোকে ?”
আমি –“দীপু মামা বলছিল |”
মাসি –“আর কী বলেছে দীপুদা’ ?”
আমি – “না, এমনি নীল মামার কথা হচ্ছিল | বলল, নীল মামা সাপে কাটা কারো বিষ চুষে বের করতে গিয়ে মারা যায় | সেই জন্যই কি ...”
মাসি –“সেই জন্য কী ?”
আমি –“না, আমি ভাবলাম ... নীল মামার কথা মনে করে তুমি হয়ত ছেলেকে সাপের কামড়ের ডাক্তার করেছ |”
মাসি একটু মুখটা নামিয়ে চুপ করে থেকে বলল, “কে জানে কী ভাবে সদাটা নীলদা’র ধাত পেয়েছে | ছোট থেকেই যত সাপুড়ে আর সাধু ফকিরের সাথে ঘুরত ... টোটক, তাবিজ, মাদুলি এই সব ঘাঁটত ... ও, শোন, তুই থাকবি তো ? ভাত খেয়ে ওর সাথে আলাপ করে বিকেলে ফিরবি না হয় |”
খোকন ব্যস্ত হয়ে বলল, “না পিসি, বাড়ি ফিরতে হবে | অনেক কাজ | আমি চলে যাওয়ার আগে বিয়ের খরচের সব হিসাব পত্র চুকিয়ে দিয়ে যেতে হবে |”
মাসি –“তুই আর তোর কাজ | তোর বিয়েতে যেতে পারলাম না, তাই বুঝি বউকে নিয়ে এলি না ? একটু মুখ দেখতাম অন্তত |”
খোকন বলল, “তুমি এস না একদিন | আমরা এখন আছি আরও ছ’-সাত দিন |”
বিদায় নিয়ে উঠলাম যখন, হাসি মাসি, “খোকন, দাঁড়া একটু” বলে একটা পাট করা নতুন সিল্কের শাড়ি এনে দিয়ে বলল, “যেদিন যাব, সেদিন যাব | আজ তুই এটা নিয়ে যা |”

বাসে ফিরতে ফিরতে খোকন বলল, “নীরুদা’ তুমি জানো সদানন্দদা’ কেন সাপের কামড়ের ডাক্তার ? বাবা অবশ্য তোমাকে বলবে না |”
আমি –“তুই জানিস ?”
খোকন –“কিছু কিছু মায়ের কাছে যা শুনেছি তাই | তবে তুমি বাবাকে বোল না যে আমি বলেছি |”

খোকনের কথা শুনতে শুনতে মানসচক্ষে স্পষ্ট যেন সব দেখতে পেলাম |

নীল মামার সাপ ধরা নিয়ে হাসি মাসির খুব কৌতূহল হত | বলত, “গুণীনদা’, তুমি সাপ কী করে বশ করো আমাকে শিখিয়ে দেবে ?” নীল মামা বলত, “তুই মেয়েছেলে, সাপ ধরা শিখে কী করবি ?” কিন্তু, হাসি মাসির আবদারের চাপে নীল মামা মাঝে মাঝে নির্বিষ সাপ গামছায় মুড়িয়ে একটা ব্যাগে করে নিয়ে আসত | তপু মামার সাথে ছাতে গিয়ে, হাসি মাসিকে ডেকে দেখাত কী করে সাপ ধরে | ব্যাগ থেকে সাপটা বের করে ছেড়ে দিয়ে আবার ধরত | হাসি মাসি হুঁশ হারিয়ে তন্ময় হয়ে তাই দেখত | তারপর, নীল মামা ওকে শেখায় কী করে ধরতে হয় | হাসি মাসি ঠিক পারত না | সাপ ধরেই তার ঠাণ্ডা গায়ের ছোঁয়ায় চমকে শিউরে উঠে ছেড়ে দিত | তাই দেখে নীল মামা হাসাহাসি করত, বলত, “তোর দ্বারা হবে না রে |” কী ভাবে এই সব থেকে হাসি মাসির একটা অনাসক্তি হল নির্বিষ সাপের প্রতি | নীল মামাকে বলত, “না, এই ঢোঁড়াসাপ,  মেটেসাপ, গেছোসাপ সব কেমন ঠাণ্ডা | আমাকে এবার বিষাক্ত সাপ এনে ধরে দেখাও |”

দাদু, দিদিমার ভয়ে নীল মামা সাহস পেতো না | কিন্তু হাসি মাসির ক্রমাগত আবদারে একদিন একটা কেউটে ধরে তার বিষ বের করে ফেলে দিয়ে, নিয়ে এলো | এসে দেখে তপু মামা নেই, দিদিমা বলল হাসি মাসি গঙ্গায় স্নান করতে গিয়েছে | তখন নীল মামা দিদিমাকে, “হাসি আসলে বোলো আমি ছাতে আছি” বলে চিলেকোঠার ঘরে ব্যাগটা রেখে, তার পিছন দিকে ছাতের রেলিঙে ভর দিয়ে দাঁড়াল, নিচে তাকিয়ে, যে হাসি মাসি গঙ্গা থেকে ফিরলে ডাকবে | হাসি মাসি কখন স্নান করে এসে ভিজে কাপড় বদলে শুকোতে দেবে বলে চিলেকোঠার ঘরে ঢুকে খিল দিয়েছে নীল মামা টের পায়নি | ইতিমধ্যে, সাপটা কী করে ব্যাগ থেকে বেরিয়ে পড়েছিল | নীল মামা  হঠাত শুনলো হাসি মাসির চিৎকার, “ওরে বাবারে, চিলেকোঠায় সাপ ঢুকেছে | কে আছ, এসো শিগগির |” ওদিকে দরজা ভিতর থেকে খিল দেয়া | নীল মামা যতই বলে, “সাপটার বিষ নেই, হাসি, দরজা খুলে দে”, হাসি মাসি ততই ভিতর থেকে চেঁচায়, “সাপটা দরজার কাছে আছে, কী করে দরজা খুলব ?” নীল মামার চেঁচামেচি শুনে দাদু, দিদিমা নিচ থেকে ছুটে এলো | শেষে চাড় দিয়ে দরজা ভাঙ্গা হল | কিন্তু সাপটার দেখা পাওয়া গেল না | ঘরটায় দু চারটে ভাঙ্গা আসবাব ছাড়া কিছু ছিল না | দাদু, নীল মামা চারিদিক তন্ন তন্ন করে খুঁজে না পেয়ে আন্দাজ করল, সাপটা ওই ঘর থেকে জল বেরোনোর মুরিতে ঢুকে পড়েছে | মুরিতে জল ঢেলে দেখা গেল জল বাইরে পড়ছে না | মানে, ভিতরে ময়লা আটকে আছে, সাপটা পালাতে না পারলে আবার ঘরের ভিতরে ফিরে আসবে | তখন নীল মামা কাগজ, পাটকাঠি আর কেরোসিন এনে ওই মুরির মুখে ঢুকিয়ে আগুন ধরিয়ে দিল | সবাইকে বলল ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে | কিন্তু কেউ গেল না | হাসি মাসিও নীল মামার কথা শুনল না | আগুন যখন ভালো করে জ্বলে উঠেছে, গরমে সাপটা বেরিয়ে আসার চেষ্টা করল | না পেরে, মুরির মুখে ফণাটা বের করে ভয়ঙ্কর ভাবে ভাবে মুখটা হাঁ করে আছড়াতে লাগল | নীল মামা চেঁচিয়ে সাবধান করল, “খবরদার ! কেউ সাপটার চোখের দিকে তাকিও না | ও চিনে নেবে, শত্রু হয়ে যাবে |” হাসি মাসি, “কই দেখি তো” বলে সাপটার দিকে এগিয়ে সেই বিকট চোয়াল ফাঁক করা সর্বগ্রাসী মুখের দিকে তাকালো | নীল মামা তাই দেখে “হাসি, কী করছিস ? তাকাস না, তাকাস না” বলে আটকাতে গেল | হাসি মাসি ততক্ষণে সম্মোহিতের মত স্থির হয়ে গেছে | তাই দেখে দিদিমা মাসির কাঁধ ধরে টান দিতেই হাসি মাসি চোখ বুজে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল |

খোকন কথা থামালে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “তারপর কী হল ?” খোকন বলল, “শুনেছি,জ্ঞান ফেরার পর হাসি মাসি ক’দিন কথা বলে নি | নীল মামা তারপর আর বাড়িতে আসে নি | এই ঘটনাটা থেকে হাসি মাসির মনে সাপ নিয়ে একটা ভয় ধরে যায় | বিয়ের কথা উঠলে আপত্তি করত যে অজ পাড়া গাঁয়ে বিয়ে দিলে সাপের কামড়ে মরবে | কেউ ব্যাপারটা তেমন গুরুত্ব দেয় নি | কিন্তু, যখন বিয়ের কিছুদিন পরেই নীল মামা সাপের বিষে মারা গেল, পিসির সেই ভয়টা বদ্ধ ধারণা হয়ে দাঁড়াল, যে পিসিকেও সাপটা মারা যাওয়ার আগে দেখে রেখেছিল, একদিন ফিরে আসবে প্রতিশোধ নিতে |”

একটু থেমে, খোকন বলল, “খুব ছোট থেকেই পিসির কাছে এই কথা শুনে শুনে সদানন্দদা’ বোধ হয় প্রভাবিত হয়েছিল, তা না হলে  ...”
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “তা না হলে কী?”
খোকন – “দেখো, আমি মনে করি না আর কোনও কারণ আছে সদানন্দদার সাপ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার |”
আমি – “ঘাঁটাঘাঁটি মানে ? মামা যে বলল ও সাপের কামড়ের ধন্বন্তরি ! তা নয় ?”
খোকন –“আমি ঠিক মানি না | আমার মনে হয় ও শুধু পিসিকে আশ্বস্ত করার জন্য এই সব কথা বলে | ও তো এমনিতেও পুরো ডাক্তার ঠিক নয় – এলো এম পি | সাপের কামড়ের চিকিৎসা ও কোথা থেকে শিখবে |”

আমার মনে পড়ল নীল মামার দেয়া হাসি মাসির নামটা, নাগকেশী  – ম্যডিউসা ? আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে খোকন বলল, “কী ভাবছ এত ?”
আমি –“ভাবছি ... হাসি মাসি যদি ম্যডিউসা হত !”
খোকন –“ম্যডিউসা ? মানে ?”
আমি –“মানে ... পড়িস নি, গ্রীক পুরাণের ম্যডিউসার কথা ? মাথা ভর্তি ঢেউ খেলানো সোনালী চুল, যা আসলে চুল নয়, সাপ | সেই নাগকেশীর দিকে যেই তাকায়, অন্ধ হয়ে যায়, পাথর হয়ে যায় | হাসি মাসি ম্যডিউসা হলে তার দিকে তাকিয়ে সেই চিলেকোঠার সাপ পাথর হয়ে যেত | কে জানে নীল মামাও হয়ত মরতো না ...”
খোকন –“তুমি কী তবে ভাবছো তপু জ্যাঠার বন্ধুর মৃত্যুটা লোকে যা জানে তা নয় ?”
আমি –“কে জানে ?”


------------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ০৫ অগাস্ট ২০১৫



মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০১৫

লবঙ্গলতিকা

|| লবঙ্গলতিকা ||

বিভাস একুশ বৎসর বয়সে উপার্জনে রত হইয়া জীবনের অন্যান্য দিকে তেমন দৃকপাত করিতে পারে নাই | বহু বৎসরের অবহেলায় তাহার একদা উজ্জ্বল গাত্রবর্ণ তাম্রাভ, তাহার কোটরাগত পিঙ্গল চক্ষুদ্বয় কিঞ্চিত বিবর্ণ | তথাপি, তাহার এখনও কৃষ্ণ কুঞ্চিত কেশদাম, প্রশস্ত ললাট ও ক্ষুরধার নাসিকা দেখিয়া তাহাকে প্রাচীন কালের কোন সুপুরুষ প্রৌঢ় যুবরাজ হেন বোধ হয় |

বয়স পঞ্চাশ পার হইলে ব্যবসায় সূত্রে একবার তাহাকে বর্দ্ধমান যাইতে হইল | দিনের কর্ম সম্পন্ন করিয়া বৈকালে তাহার স্মরণে আসিল কলেজ জীবনের অস্বীকৃত অভিভাবক কাশীদা’র কথা |

স্থানীয় কলেজে পাঠকালীন সে গ্রাম সুবাদের এক পরিবারে যাতায়াত করিত | কলেজে তাহাকে ভর্তি করিয়া তাহার পিতা তাহাকে লইয়া ওই পরিবারের সহিত আলাপ করাইয়া দিয়াছিলেন | পরিবারের কর্তা নীলোৎপল রায় পিতার পিসির অমুক ননদের অমুক জা’এর পুত্র ছিলেন | অতঃপর বিভাস মাঝে মধ্যে নীলু জ্যাঠার সহিত সাক্ষাত করিতে যাইত | সময় অনুকূল হইলে ও বরাত ভালো থাকিলে বেলা অনুযায়ী মধ্যাহ্নভোজন কিম্বা নৈশভোজ, নিদেন পক্ষে চা জলপান, অবশ্যই জুটিত | নীলোৎপল বাবুর কাপড়ের ব্যবসায় ছিল | তাঁহার দুই পুত্র ছিল – কাশীনাথ ও শশীনাথ | ব্যবসায় হইতে আমদানি নেহাত মন্দ না হওয়ায় পরিবারে কাহারও পড়াশুনার প্রতি কোনও আকর্ষণ কিম্বা দুর্বলতা ছিল না | ম্যাট্রিক পাশ কাশীনাথ রেলে মাল বাবু পদে কাজ করিত | শশীনাথ, যে বিভাস অপেক্ষা স্বল্প বড় ছিল, পিতার ব্যবসায়ে সাহায্য করিত | তাহার বিভাসের প্রতি সৌহার্দ্যের অভাব পূরণ করিতেই, বোধ হয়, কাশীনাথ বিভাসের প্রতি বড়ই স্নেহশীল হইল | প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে সে বিভাসকে সাহায্য করিতে উদ্যত হইত, যাহা বিভাসের পক্ষে এক বিড়ম্বনার কারণ হইল | কাশীনাথের বিবাহ হইলে বিভাস কিঞ্চিত নিস্তার পাইবার আশা করিয়াছিল | কিন্তু নববিবাহিতা বৌদিও বিভাসের প্রীতিকর সর্বগুণে আকৃষ্ট হইল | কয়দিনের আলাপেই সে বিভাসের সহিত ঠাট্টার সম্পর্ক গড়িল | শুধাইল, “কি ছোট্ ঠাকুরপো, তোমার জন্য রাজকন্যা খুঁজি ?” এই প্রলোভনের বশবর্তী হইয়া বিভাস বৌদির কত বশীভূত হইয়াছিল তাহা জানা নাই | কিন্তু নবদম্পতির সংসারে তাহার মধ্যাহ্নভোজন ও নৈশভোজ এর ব্যবস্থা স্থানান্তরিত হইল |

কলেজের পাঠ সমাপ্ত হইয়া বর্দ্ধমান ছাড়িলে, বিভাস আর বর্দ্ধমানে পদার্পণ করে নাই | কী ভাবে ত্রিশটি বৎসর কাটিয়া গেল, তাহা সে লক্ষ্য করে নাই | এই স্থিতিকালে দাদা বৌদি যে ক্ষয়িষ্ণু পত্রালাপের মাধ্যমে বিস্মরণের অন্তরালে গেল, তাহাও সে যেন নিরুপায় হইয়া অগ্রাহ্য করিল |

প্রত্যাবর্তনের প্রথম দিনের সন্ধ্যায় কাশী দাদার কথা সহসা তাহার প্রায়ান্ধকার স্মরণে আসিয়া তাহাকে বড়ই উতলা করিল | কিন্তু তাহার মনে এক সংশয় দেখা দিল | নীলু জ্যাঠা তাঁহার বাড়ির দোতলা কাশীনাথের বিবাহের পূর্বে নির্মাণ করিয়াছিলেন যে সে বিবাহের পর দোতলায় আলাদা বাস করিবে | পরবর্তী কালে বিভাস পিতার নিকট হইতে জানিয়াছিল যে শশীনাথের বিবাহের পর কাশীনাথ পৈত্রিক ভিটা ছাড়িয়া রেলের আবাসে চলিয়া যায় | জ্যাঠা ও জেঠিমা পরলোক গমন করিয়াছে |  সুতরাং, কাশীনাথের ঠিকানা একমাত্র শশীনাথই জানিতে পারে | অতএব, সে দ্বিধা ত্যাগ করিয়া একটি রিক্সা ডাকিয়া কহিল, “আমাকে কালীবাজার নিয়ে চলো |” রিক্সা চলিতে শুরু করিলে সে দেখিল গত ত্রিশ বৎসরে এত পরিবর্তন হইয়াছে যে পূর্বের পথ চেনা মুশকিল | অগত্যা, পথ দেখা ও চেনা বাদ দিয়া সে ভাবিতে লাগিল জ্যাঠার বাড়িতে গিয়া কাহার সাক্ষাত পাইবে, নিজের সংবাদ কী জানাইবে ও কী অজুহাতে কাশীনাথের ঠিকানা চাহিবে | সে চাহিল না যে যাহার সহিত তাহার কোনদিন তেমন সম্পর্ক ছিল না, সেই শশীনাথ মনে করে যে সে কেবল কাশীনাথের ঠিকানা সংগ্রহ করিতে আসিয়াছে |

কালীবাজারে আন্দাজে এক জায়গায় নামিয়া রিক্সার ভাড়া চুকাইয়া দিয়া সে ঠাহর করিয়া কিছুই চিনিতে পারিল না | যে কালে সে যাতায়াত করিত, মোটামুটি এই স্থানে একটি কাঠের আড়ত ছিল | তাহার পূর্বের কোন এক গলি দিয়া যাইলে কয়েকটি মোড়ের পর জ্যাঠার বাড়ি ছিল, যাহার নাম আর এখন তাহার মনে নাই | আর, আড়তটির ঠিক পরের গলিতে সকল কাপড়ের দোকান ছিল | কিছু জিজ্ঞাসাবাদের পর সে সেই গলি খুঁজিয়া পাইল | কিন্তু, সেই গলিতে এখন কাপড়ের দোকান বিশেষ নাই | অবশেষে একটি সেকেলে মুদি দোকান দেখিয়া সে জিজ্ঞাসা করিল আশেপাশে কোনও রায় মহাশয়ের কাপড়ের দোকান আছে, কিম্বা পূর্বে ছিল, কিনা | সেই দোকানের মালিক তাহাকে বলিল, “সে তো অনেক বছর আগে বড় রাস্তায় উঠে গিয়েছিল | তবে আর নেই | তার জায়গায় একটা সোনার দোকান হয়েছে | বড় রাস্তায় গিয়ে ডানদিকে ঘুরে, কয়েকটা দোকান ছেড়ে | ওখানে কেউ জানতে পারে |”  সেই সোনার দোকানদার জানাইল যে প্রায় পাঁচ বৎসর পূর্বে কাপড়ের দোকানটি সে ক্রয় করিয়া লয় | কাপড়ের দোকানের মালিক মারা গিয়াছে | তবে তাহার পুরানো বাড়ি নিকটেই – পার্শ্বের গলি দিয়া যাইয়া নীলাম্বর বস্ত্রালয়ের নাম লইয়া জিজ্ঞাসা করিলেই পাওয়া যাইবে | সে মোটামুটি পথ বলিয়া দিল |

বিভাস গলিতে ঢুকিয়া স্বর্ণকারের বিবরণ অনুযায়ী কয়েকটি মোড় ঘুরিয়া একটি জনমনুষ্যহীন রাস্তা পাইল | কিমকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া সে ভাবিতেছে কী করিবে, এমন সময় এক বাড়ির ফটক হইতে এক বৃদ্ধা শুধাইল, “কাকে খুঁজছেন ?” বিভাস কহিল, “আজ্ঞে, শশীনাথ রায় ... যার ‘নীলাম্বর বস্ত্রালয়’ কাপড়ের দোকান |” বৃদ্ধা তাহার দিকে অবাক দৃষ্টিতে চাহিয়া কহিল, “ও মা, সে তো মাস ছয়েক হল মারা গিয়েছে | আপনি ... আচ্ছা, আসুন |” বৃদ্ধা সম্মুখের এক অন্ধকার বাড়ির ফটক খুলিয়া উঠান পার করিয়া দ্বারে কড়া নাড়িয়া কহিল, “মনসা, দেখ কে এসেছে |” কিছুক্ষণ পরে ভিতরে বাতি জ্বলিল | একটি প্রৌঢ়া দ্বারটি খুলিয়া কহিল, “ও দিদি, তুমি |” অতঃপর সে বিভাসকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কাকে চাই ?” বিভাস কহিল, “শশীনাথ রায়ের সাথে দেখা করতে এসেছিলাম |” প্রৌঢ়া কহিল, “ও ! ... ভিতরে আসুন |” সে প্রবেশ করিলে বৃদ্ধা চলিয়া গেল | প্রৌঢ়া তাহাকে প্রশ্ন করিল, “কী পরিচয় বলব ?” বিভাস কহিল, “বলুন আমি বিভাস, ঘনশ্যাম দত্তর ছেলে |”  প্রৌঢ়া অন্দরমহলের দরজার পর্দা সরাইয়া ভিতরে গিয়া নিম্ন স্বরে কিছু কহিল | কিছু প্রশ্নোত্তর বাদে, কেহ যেন পর্দা একটু ফাঁক করিয়া বিভাসকে নিরীক্ষণ করিল | অতঃপর সেই প্রৌঢ়া আসিয়া বিভাসকে অপেক্ষা করিতে ইশারা করিয়া মেঝেতে বসিয়া একটি স্থূল পুস্তক – রামায়ণ কিম্বা মহাভারত – বিড়বিড় করিয়া পড়িতে লাগিল |

বিভাসের হিসাবে অনন্ত সময় কাটিলে, পর্দা সরাইয়া এক মহিলা দেখা দিল | সৌম্য মুখশ্রী, মধ্যম উচ্চতা, কিঞ্চিত মেদ সম্ভারে সম্ভ্রান্ত মহিলাটি বিভাসের বোধ হইল প্রায় সমবয়সী | সে দরজা হইতে কহিল, “আপনাকে তো চিনলাম না |”
বিভাস আবার কহিল, “আমি বিভাস, পদ্মপুকুরের ঘনশ্যাম দত্ত মহাশয়ের ছেলে |”
মহিলা – “ঘনশ্যাম মানে ... মধ্যপাড়ার শ্যাম কাকার ছেলে ?” বিভাস আশ্বস্ত হইয়া মাথা হেলাইলে, মহিলা তাহার নিকট আসিল | কহিল, “ওর কাছে আপনার নাম তো শুনেছিলাম  ... তা, এইভাবে, কোনও খবর না দিয়ে, হটাত করে কোথা থেকে আসছেন ? কোথায় উঠেছেন ?” সে নিজে একটি কেদারায় বসিয়া কহিল, “দাঁড়িয়ে কেন ? বসুন !”
বিভাস বসিলে মহিলা কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাহাকে নিরীক্ষণ করিয়া কহিল, “বিয়ের পরে ওকে কতবার বলেছিলাম পদ্মপুকুরে নিয়ে যেতে | আমাদের বিয়ের সময় শ্যাম কাকা, কাকিমা অনেক করে বলে গিয়েছিল একবার যেতে |” কিঞ্চিত বিরতি দিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া সে কহিল, “পঁচিশ বছরে তা আর হল না ... তারপর, সে তো হটাত করে একা কোথায় চলে গেল |”
বিভাস – “আমি জানতাম না ... কী হয়েছিল ?”
মহিলা – “একদিন বুকে একটু ব্যথা উঠেছিল | তার আগে কয়েক মাস ধরে বলছিল বুকে এক রকম অস্বস্তি হয় ... সেদিন কাজ থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে ভাত খেল না | একটু মিষ্টি মুখে দিয়ে বলল, ‘আমায় একটা রিক্সা ডেকে দাও, যাই একটু ডাক্তার দেখিয়ে আসি |’ আমার আবার সেদিন নারায়ণ পুজো ছিল | তাই মনসাকে বললাম রিক্সা ডেকে দিতে |”

নাম শুনিয়া মেঝেতে উপবিষ্ট প্রৌঢ়াটি একবার মুখ তুলিয়া চাহিয়া প্রশ্ন করিল, “প্রতিমা, চা করি ?”  প্রতিমার মুখে “এখন থাক, একটু পরে আমি দেখব”, শুনিয়া সে পুনরায় পড়ায় মন দিল | বিভাস কহিল, “তারপর ...”

তাহার বলিবার প্রয়োজন ছিল না | প্রতিমা ধীর লয়ে শশীনাথের মৃত্যুর ঘটনার বর্ণনা শুরু করিল | সে চিরকাল অটুট স্বাস্থ্যের মানুষ ছিল | কবে তাহার রক্তচাপের সমস্যা হইয়াছিল কাহারও জানা ছিল না | সেইদিন তাহার হৃদরোগের প্রথম আক্রমণ হয় | চেম্বারে ডাক্তার তাহাকে দেখিয়া সাথে সাথে এ্যাম্বুলেন্স ডাকিয়া তাহাকে হাসপাতালে পাঠাইয়া দেয়, ও প্রতিমাকে খবর দেয় | প্রতিমা কলিকাতায় কন্যা কমলাকে তার করে | কমলা জামাতা সমেত রাত্রির ট্রেনে ছুটিয়া আসে | শশীনাথ পরদিন কিঞ্চিত সুস্থ বোধ করিয়া বাড়িতে ফিরিতে চাহে, কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাহাকে কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষার নামে ধরিয়া রাখে | শশীনাথ অনুনয় করে যে কেহ যেন প্রতিমাকে জানিতে না দেয় যে তাহার হৃদরোগ হইয়াছে | শশীনাথের শীঘ্র প্রত্যাবর্তনের আশায় প্রতিমা বাড়িতে পুজো অর্চনায় ব্যস্ত থাকে | তৃতীয়দিন পুনর্বার আক্রমণ হইলে শশীনাথের মৃত্যু হয় |

দীর্ঘ সময় লইয়া, লয় দ্রুততর করিয়া, প্রতিমা পুঙ্খানুপুঙ্খ বৃত্তান্তের সহিত এই বিবরণ শেষ করিল | তাহার অনর্গল প্রগলভ বাক্যস্রোত হইতে বোধ হইল না যে ইহা বিভাসের সহিত তাহার প্রথম আলাপ | উপসংহারে সে কহিল, “যে মানুষটা কোনদিন অসুস্থ হয় নি, সে হটাত অসুস্থ হয়ে এমন তাড়াহুড়ো করে চলে গেল, যে আমি একবার শেষ কথা বলার  সুযোগটুকু পেলাম না |”

বিভাস প্রতিমার মুখপানে চাহিয়া তাহার এই দ্বিধা রহিত, বিন্দুমাত্র বিলাপের আভাস হীন বক্তব্যের কলস্রোত একাগ্রচিত্ত হইয়া শুনিতেছিল | তাহার উচ্ছ্বাস ক্ষান্ত হইলে বিভাসের লক্ষ্যে পড়িল তাহার পরিধানের সদ্য পাট ভাঙ্গা তাঁতের ফিনফিনে শাড়ি | জরদ রঙের নক্সা-পাড় হালকা চম্পক বর্ণের শাড়িটি তাহার গাত্রবর্ণের সহিত সম্পূর্ণ মানানসই | তাহার মোম মণিবন্ধে শাঁখা, নোয়া, পলা না থাকিলেও কয়েক গোছা সোনার চুড়ি, বালা ও কঙ্কণ ; নাকফুলে এক বিন্দু রক্তিম স্ফুলিঙ্গ ; প্রায় স্বচ্ছ মলমল সম শাড়িটির ভিতর দিয়া তাহার মর্মরে খোদিত গ্রীবায় একটি হারের দ্যুতি দেখা যাইতেছে | হারটি দেখিতে দেখিতে বিভাসের দৃষ্টি প্রতিমার স্মিত শ্বাস-প্রশ্বাসে আন্দোলিত পূর্ণ বক্ষের দিকে সরিল | যেন বিবেকের চপেটাঘাত খাইয়া সেই দৃষ্টি অধোগামী হইল, কিন্তু নিষ্কৃতি পাইল না | সে দেখিল প্রতিমার মাজা হইতে শাড়ি সরিয়া এক ফালি কোমর দেখা যাইতেছে – সেখানে মধ্যবয়সে সঞ্চিত স্নেহের স্বর্ণাভ পরিপূর্ণতা একটি চওড়া বিছার বেড়ে নিষ্পিষ্ট | এই রূপ অবলোকনের প্রলোভন হইতে মুক্তি পাইতে বিভাস চক্ষু মুদিল |

কিছু পরে প্রতিমার অবরুদ্ধ ব্যথা অনুমান করিয়া মথিত কণ্ঠে বিভাস কহিল, “আমি এতো কথা কিছুই জানতাম না, বৌদি |” প্রতিমা আঁচলে কপালের স্বেদ মুছিয়া হাসিয়া কহিল, “আমাকে আর বৌদি বলবেন না | আমি আপনার থেকে ছোটই হব |” “কোন হিসাবে ?” এই প্রশ্ন বিভাসের মনে জাগিলেও সে চুপ করিয়া রহিল | প্রতিমা কহিল, “যাক, এই হল আমার কথা | এবার আপনার কথা বলুন – বাড়িতে কে কে আছে ? কেন এসেছিলেন বর্দ্ধমানে ? একা কেন এলেন ? ... ইস, কতবার যে চেয়েছি কাকাবাবুর বাড়ি যেতে | কিন্তু আমার কাজ পাগল বরের তো কাজের বাইরে আর কিছুতেই টান ছিল না |”
বিভাস – “স্বপক্ষে তেমন কিছুই বলার নেই | এখানে কাজের সূত্রে এসেছিলাম | বাবা, মা বহুকাল আগে গত হয়েছে | বাড়িতে ‘আর কেউ’ বলতে কেউ নেই |”
প্রতিমা – “বৌদি ?”
বিভাস মাথা নাড়িল | কহিল, “সে ভাগ্য হয় নি |”

প্রতিমা চকিত হইল | শিথিল ভঙ্গির খোলস ত্যাগ করিয়া উঠিয়া কহিল, “যাই, একটু চা করে নিয়ে আসি |”
বিভাস ত্রস্ত হওয়া কহিল, “না থাক | এবার আমি উঠবো | নইলে ফিরতে রাত হয়ে যাবে |”
প্রতিমা – “না, না | একটু বসুন | চা না হয় থাক | একটু মুখমিষ্টি করে যান ... বর্দ্ধমানে ক’দিন আছেন ?”
বিভাস – “একটু কাজ বাকি আছে | ভাবছি কাল সেটা শেষ করে কাশীদা’র সাথে দেখা করে পরশু ফিরব | কিন্তু কী করে ... কাশীদা’র ঠিকানাটাই জানা নেই |”

প্রতিমা ভিতরে যাইবার দরজার দিকে অগ্রসর হইলে, বিভাসের চক্ষু তাহার অনুসরণ করিল | মেঝেতে উপবিষ্ট প্রৌঢ়া যেন বিভাসের নজর লক্ষ্য করিয়া তাহার দিকে চাহিয়া দেখিয়া মৃদু হাসিয়া কহিল, “প্রতিমাকে এই প্রথম দেখলে বুঝি ?” বিভাস মাথা হেলাইলে সে আবার কহিল, “তাই ? ... শশীর বিয়েতেও আস নি ?” বিভাস প্রসঙ্গ এড়াইবার ইঙ্গিত করিতে কহিল, “আপনাকে তো চিনলাম না |” প্রৌঢ়া কহিল, “আমি এদের গ্রাম সম্পর্কের মাসি | প্রতিমা একা থাকে তো ... কতো রকম মানুষ যায় আসে, কার কি নজর ... তাই সাথে থাকি, চোখ রাখি |”

প্রতিমা একটি রেকাব হাতে লইয়া আসিল | বিভাস দেখিল রেকাব ভর্তি মিষ্টান্ন | তাহার যথেষ্ট ক্ষুধার উদ্রেক হইয়াছিল | তথাপি সে ক্ষীণ আপত্তি করিয়া খান দুই লবঙ্গলতিকা ও এক বাটি পায়েস  গলধঃকরণ করিল | শেষে জল পান করিয়া কহিল, “এবার তো উঠতে হয় |”
প্রতিমা কহিল, “হ্যাঁ, আর দেরী করবেন না  ... এই নিন, বড়দা’র ঠিকানা |” সে একটি কাগজে ঠিকানাটি লিখিয়া আনিয়াছিল | দ্বার খুলিয়া প্রাঙ্গণ পার করিয়া ফটকের নিকট আসিয়া প্রতিমা কহিল, “আবার বর্দ্ধমানে এলে অবশ্যই আসবেন |”

প্রথম মোড়ের নিকট পৌঁছাইয়া বিভাস পিছনে ফিরিয়া দেখিল, তখনও ফটকের নিকট প্রতিমা দাঁড়াইয়া আছে | দূর হইতে বুঝিবার উপায় নাই যে ঐ স্থাণু মূর্তি সদ্য-বিধবার পরিধানে সৌখিন শাড়ি ও গহনা |

সেই রাত্রি বিভাসের ভালো ঘুম হইল না | প্রভাতের পূর্বে সে এই স্বপ্ন দেখিয়া জাগিল | যে, সে এক বিবাহে উপহার দিতে একটি চম্পক বর্ণের শাড়ি লইয়া গিয়াছে | নব বধূ উপহারের মোড়ক উন্মোচন করিলে তাহা হইতে শাড়িটি খসিয়া মাটিতে পড়িল – বিভাস শাড়িটি তুলিতে গিয়া দেখিল তাহা আর শাড়ি নহে, একটি সম্পূর্ণ সাদা থান |

পরদিন সকালে বাকি কাজ সম্পন্ন করিয়া দ্বিপ্রহরের কিছু পূর্বে সে কাশীনাথের বাড়ি পৌঁছাইল | তাহাকে চিনিয়া কাশীনাথ উৎফুল্ল হইয়া তুমুল চেঁচামেচি করিয়া উঠিল, “লতিকা ! দেখ দেখ, কে এসেছে |” “কে ?” ভিতর হইতে প্রশ্ন করিয়া তাহার বৌদি বাহিরঘরে আসিয়া স্তম্ভিত হইয়া কহিল, “ছোট্ ঠাকুরপো, তুমি ?”  অতঃপর বিভাসের খাতিরের তোড়জোড় শুরু হইয়া গেল | কাশীনাথ পুত্র সোমনাথ কে মিষ্টান্ন আনিতে পাঠাইল | লতিকা ব্যস্ত হইয়া কহিল, “ছোট্ ঠাকুরপো, বসো |  চট করে পুজোটা সেরে নিই – বাব্বা এতদিন পরে, কী সৌভাগ্যে এলে বলো তো |” তারপর সে পুত্রবধূ কে কিছু রন্ধনের নির্দেশ দিয়া পূজা করিতে প্রস্থান করিল |

ওদিকে, কাশীনাথ এই আবেগে গদগদ হয়, তো সেই অবিশ্বাসে চক্ষু রগড়ায়, নচেৎ আনন্দে হাত কচলায় | কখনও সে বিভাসের পার্শ্বে বসে, তো কখনো উঠিয়া পায়চারী করে | কখনও বা সে জানালার নিকট যাইয়া দুশ্চিন্তা প্রকাশ করে যে সোমনাথ হয়তো মিষ্টান্নের দোকান বন্ধ দেখিয়া খালি হাতে ফিরিয়া আসিবে |

চা, মিষ্টান্ন খাইয়া সোমনাথের ধুতি লইয়া বিভাস স্নান সারিল | ভুরি ভোজনের সহিত গত পঁচিশ
তিরিশ বৎসরের সকল বার্তার আদান প্রদান সমাধা হইলে কাশীনাথ চটপট তাহার বিশ্রামের ব্যবস্থা করিল | বোঝা গেল যে কাশীনাথের দিবানিদ্রার প্রয়োজন অপেক্ষাকৃত বেশি | সে দ্রুত চড়-চাপড়ে বিভাসের বালিশ চাদর পরিপাটি করিয়া কহিল, “একটু চোখ বুজে নে | বিকেলে চা খেয়ে তবে যাবি, যদিও রাতে থেকে গেলে ভালো হয় |”

পরিষ্কার ঝরঝরে বিছানায় শুইয়া বিভাসের ঘুম আসিল না | এই প্রথম চিন্তা করিবার অবসর পাইয়া তাহার উৎসুক মন গত দিনের ঘটনাসমগ্র মন্থন করিতে লাগিল | যেন বহু প্রশ্নের মীমাংসা দরকার | শশীনাথের স্ত্রী কেন বাহিরে আসিতে এত দেরী করিল ? কেন সে থান পরে নাই ? প্রতিমা কি আদৌ থান পরে না ? কেন তাহার কণ্ঠে সদ্য স্বামী বিয়োগের কোনও বিষাদ ছিল না ? কী করিয়া প্রথম আলাপেই সে অতি পরিচিতের মত অনর্গল এত কথা কহিল ? অথচ, কেনই বা সে সংসারের অন্য কথা, কন্যা-জামাতার কথা, কিছুই কহিল না ? কী এই মহিলার সত্য পরিচয় – শশীনাথের স্ত্রী, নাকি প্রতিমা ?

বহুদিন হইল বিভাস স্ত্রীজাতির প্রতি কৌতূহল বোধ করে নাই | সে সারাদিন ব্যবসায়ের কাজে লিপ্ত থাকে | সন্ধ্যা হইলে পাড়ার রাদু বাবুর মিষ্টান্ন দোকানে চা লইয়া বন্ধু-বান্ধবের সহিত বসুমতী কাগজ পড়ে ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা করে | একদা যৌবনে হয়ত তাহার মনে প্রণয়-ভাবনা উদয় হইয়াছিল | তাহা কবেই অস্ত গিয়াছে | আজ তবে কেন এইসবের ব্যতিক্রম হইল, সে প্রশ্ন কি অবান্তর ?

লতিকা দরজা হইতে কহিল, “ছোট্ ঠাকুরপো, ঘুমিয়ে পড়েছ নাকি ?” বিভাস উঠিয়া বসিল, “না বৌদি, ঘুম আসছে না | এসো না, গল্প করবে তো | কাশীদা’ কি ঘুমিয়ে পড়েছে ?”
লতিকা বিছানায় বসিয়া তাহার হাত ধরিয়া কহিল, “আগে বলো, এতদিনে কী করে মনে পড়ল ? একবারও মনে হয়নি যাই দাদা বৌদিকে দেখে আসি ?”
বিভাস বুকের মধ্যে সব আলোড়ন দমন করিয়া হাসিয়া কহিল, “সময় হল কই ? কাজে কম্মেই সারা জীবনটা কেটে গেল |”
লতিকা – “তোমার দাদাও কাজ থেকে অবসর নিয়ে কাজের জন্য ছটফট করে ... যাকগে | এটা বলো, আমাদের ঠিকানা কোথায় পেলে |”
বিভাস গত দিনের কথা সমস্ত সংক্ষেপে কহিল | সে প্রতিমার সাজ সজ্জার কথা অবশ্যই এড়াইয়া গেল | সব শুনিয়া লতিকা কহিল, “যাক, এই সুযোগে প্রতিমার সাথে তোমার আলাপ হয়ে গেল |”
কিছু অনানুসাঙ্গিক কথার পর বিভাস কহিল, “বৌদি, আমি একটা কথা বুঝলাম না, শশীদা’র বউ একা থাকে কেন | মেয়ের কাছে থাকতে পারে না কি ?”
লতিকা – “কে, প্রতিমা ? ও তো চিরকালই একা ... আর, কমলা তো ওর মেয়ে নয় |”
বিভাস – “তার মানে ?”
লতিকা – “মানে, কমলা ওর নিজের পেটের মেয়ে নয় |”
বিভাস – “তবে ?”
লতিকা – “প্রতিমার কোনও ছেলেপুলে না হওয়ায় ঠাকুরপো কমলা কে দত্তক নিয়েছিল |”
বিভাস – “ও ! ... কেন বললে শশীদা’র বউ চিরকালই একা ?”
লতিকা – “এমনিই ... কী করবে ওসব কথা শুনে |”
বিভাস – “কিছু না | তবে কৌতূহল জাগিয়েছ যখন, তখন বলেই ফেল |”
লতিকা – “বিয়ে তো করলে না ... মেয়েদের কথা বুঝবে কি ? ... আচ্ছা শোনো |
“ঠাকুরপো আর প্রতিমার বিয়ে হটাত করে ঠিক হয় | বিয়েতে প্রতিমার মত ছিল না | বিয়ের পর দুজনের সম্পর্কটা ঠিক গড়ে ওঠেনি | দু’বছর কেটে গেলে যখন ছেলেপুলে হল না তখন মায়ের, মানে আমার শাশুড়ির, চাপে পড়ে ঠাকুরপো কমলাকে দত্তক নেয় | কমলার বয়স তখন বছর আট-ন’ বছর | যখন কমলার বিয়ের কথা শুরু হল, কী হল জানি না, প্রতিমার মধ্যে একটা সাজগোজের ঝোঁক দেখা দিল | মাঝে মধ্যেই অকারণে সেজে গুজে বসে থাকত | সংসার যায় যাক, ওই সাজগোজের ঝোঁক উঠলে ওকে কেউ আয়নার সামনে থেকে সরাতে পারত না | এই নিয়ে ঠাকুরপোর  সাথে ওর মনোমালিন্য বাড়তে লাগল, আর ওর সাজগোজের ঝোঁকটা বেয়াড়া হয়ে দাঁড়াল |”
গত সন্ধ্যার ভাবিয়া বিভাসের কৌতুক করিল, “কার জন্য সাজত, তুমি জানো ?”
লতিকা – “কারও জন্য নয় ... কিম্বা, কে জানে | ব্যাপারটা শুরু হয় যখন কমলাকে দেখতে পাত্রপক্ষ আসত | প্রতিমা গাদা গাদা মিষ্টি বানাত | সেগুলো থালায় সাজিয়ে, নিজে সেজে-গুজে বসে থাকত | কমলার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরেও ওইরকম করত | দৈবাৎ বাড়িতে কেউ এলে লোক বুঝে মিষ্টিগুলো দিয়ে সৎকার করত | নইলে, বাসি হয়ে নষ্ট হলে মিষ্টিগুলো ফেলে দিত | শুনেছি, মিষ্টি ফেলা গেলে তাই নিয়ে কান্নাকাটি করত |”
গত সন্ধ্যার রেকাবের কথা মনে করিয়া বিভাস বিছানায় হেলিয়া আঁখি বন্ধ করিল | সেই ভঙ্গিতেই প্রশ্ন করিল, “তুমি নিজে দেখেছ ?”
লতিকা উঠিয়া কহিল, “না, কমলার মুখে শুনেছি ... আরও কত কী ... থাক সে সব কথা | নাও, তোমার চোখ বুজে এসেছে | তুমি একটু গড়িয়ে নাও | রাত কাটিয়ে কাল ভোরে যেও | তোমার দাদাও তাই চায় |”

বৈকালে সোমনাথ বিভাসকে লইয়া লজে যাইয়া তাহার স্যুটকেস সমেত ফিরিল | সেই রাত্রে সকলে শয়ন করিতে গেলে কাশীনাথ গল্প করিতে আসিল | গত ত্রিশ বৎসরের কথা অল্পে সম্পন্ন হইবার নয় | কাশীনাথ খুঁটিয়া খুঁটিয়া  বিভাসের খুঁটিনাটি কথা জানিতে চাহিল | বারম্বার আফসোস ব্যক্ত করিতে থাকিল, “এ হে ! তুই বিয়েই করলি না ?” কিম্বা, “সারা জীবন তুই একাই কাটিয়ে দিলি ?” শেষে কহিল, “আমাদেরই দোষ | আমরা ... ”
তাহার কথা থামাইয়া বিভাস কহিল, “আমি নিজের পরিস্থিতির দোষে বিয়ে করি নি | তোমাদের দোষ ? কী দোষ ?”
কাশীনাথ – “মানে আমার, আর লতিকার | তোর কি মনে পড়ে – লতিকা বলত তোর জন্য এক রাজকুমারী ধরে আনবে ?”
বিভাস – “হ্যাঁ, মনে আছে বই কী ?”
কাশীনাথ – “এনেও ছিল ... আমাদেরই গ্রামের মেয়ে, লতিকার কেমন লতায় পাতায় বোন হয় | তাদের বাড়ির সবারই প্রস্তাবটা খুব পছন্দ হয়েছিল | তোকে আর কাকাকে জানানোর আগেই, কী করে ভাই সেই কথা জানতে পেরে বাবাকে বলল ওই মেয়েকেই বিয়ে করবে | তুই তো জানিস, ওর কীরকম তোর সাথে রেষারেষি ছিল | ও নানান ভয় দেখাল | বাবা তখন দোকানের ভার সম্পূর্ণ ওর হাতে ছেড়ে দিয়েছে | মেয়ে দেখতে যাওয়ার ধার্য দিন আমরা তোর জায়গায় ভাই কে নিয়ে গেলাম | মেয়েটা প্রথমে বুঝতে পারে নি | দিব্যি সেজে গুজে এলো | ভাইয়ের হাতে যখন মিষ্টির থালা তুলে দিচ্ছে, বাবা পরিচয় দিল, “এই পাত্র, আমার ছোট ছেলে শশী |” মেয়েটা চমকে উঠল, আর ছুটে বাড়ির ভিতরে চলে গেল |”

কাশীনাথ দীর্ঘ শ্বাস ছাড়িল, “আমি আর লতিকা আশা করেছিলাম মেয়েপক্ষ এই বিয়েতে আপত্তি করবে | কিন্তু তা হল না | মেয়ের বাবা দেখল তোর তখনও তেমন উপার্জন নেই, আর ভাইয়ের কাপড়ের ব্যবসা রমরমা | এর সাথে বিয়েতেই ওরা রাজি হল | আমরা তোকে এই সব কথা বলি নি | আমরা আর তোর জন্য আর মেয়েও দেখি নি ... তখন কি জানতাম যে তুই বিয়েই করবি না ?”
বিভাস – “এই নিয়েই কি মনোমালিন্যের করে তুমি বাড়ি ছেড়ে রেলের কোয়ার্টার নিলে ?”
কাশীনাথ – “ঠিক মনোমালিন্য নয় ... তবে লতিকা বলল ‘এর পর আমি কি করে রোজ প্রতিমাকে আমার মুখ দেখাব ?’ কথাটা সত্যি – লতিকা প্রতিমার কাছে তোর কথা এত বলেছিল যে ও একরকম ধরেই নিয়েছিল ...”
বিভাস – “কী ধরে নিয়েছিল ?”
কাশীনাথ – “এই যে তুই ওকে দেখতে যাবি, পছন্দ করবি | ওই বয়েসে মেয়েরা যা নিয়ে জল্পনা কল্পনা করে, আর কী | কিন্তু, তা হল কই ?”

বিভাস প্রসঙ্গ পরিবর্তন করিতে কহিল, “যাক গে | জানো কাশীদা’, কাল শশীদা’র বউ ঢের মিষ্টি খেতে দিয়েছিল |”
কাশীনাথ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে শুধাইল, “তুই খাস নি তো ?”
বিভাস – “সব খাইনি ... শুধু গোটা দুয়েক লবঙ্গলতিকা আর একটু পায়েস | কেন ?”
কাশীনাথ – “বলছি ... আগে বল, প্রতিমা একা ছিল ?”
বিভাস – “না, বাড়িতে একটা বয়স্কা মেয়েছেলে ছিল – মনসা নাম বোধ হয় |”
কাশীনাথ কিঞ্চিত আশ্বস্ত হইয়া কহিল, “ওহ ! ... হ্যাঁ, প্রতিমার হাতে লবঙ্গলতিকা ভালই হয় | প্রথম খাই, ওকে দেখতে গিয়ে | তারপর আর ওর হাতের লবঙ্গলতিকা খাওয়া হয় নি |”
বিভাস – “মিষ্টির কথায় তুমি অমন আঁতকে উঠলে কেন ?”
কাশীনাথ – “না, মানে আমাদের এই বয়েসে এত মিষ্টি খাওয়া তো ভালো নয় ...”
বিভাস কিঞ্চিত বিরক্ত হইয়া কহিল, “কাশীদা’, আমার মনে হচ্ছে শশীদা’র বউ এর কিছু কথা তোমরা যেন এড়িয়ে যাচ্ছ | তখন দুপুরে বৌদি ঠিক এই ভাবে ওর কথা বলতে বলতে চেপে গেল | এখন তুমি | কী এমন কথা যা আমাকে বলা যাবে না ?”
কাশীনাথ – “শুনবি ? ... জানি না কতদূর সত্যি | একবার ওর লবঙ্গলতিকা খেয়ে ওদের পাড়ার বেশ কয়েকটা কুকুর বেড়াল মারা যায় | পাড়ায় এই নিয়ে কথা উঠলে প্রতিমা অস্বীকার করে যে ওগুলোতে কোন দোষ ছিল, কিন্তু পরে কমলার জেরায় ওর কাছে স্বীকার করে যে ইঁদুর মারতে ও এক দু’টো নষ্ট হয়ে যাওয়া লবঙ্গলতিকায় সামান্য ইঁদুর মারার বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল |”
বিভাস – “সে হতেই পারে | তাই কী ?”
কাশীনাথ - “এই যে, এর পর কমলা আমাদের সাবধান করে দেয় যে, ভুলেও প্রতিমার হাতের লবঙ্গলতিকা না খেতে |”
বিভাস – “আরে ! সে কেমন কথা ?”
কাশীনাথ – “হ্যাঁ ... ঐ যে মনসাকে দেখলি, ওকেও কমলাই রেখেছে, প্রতিমার উপর নজর রাখতে | কতো রকম মানুষ যায় আসে, কাকে প্রতিমা কী নজরে দেখে ... মনসা সাথে থেকে প্রতিমাকে চোখে চোখে রাখে, যাতে ঐরকম অঘটন আর না ঘটে |”
বিভাস – “ওহ, কাশীদা’ ! কেন, কমলার কি সন্দেহ বাতিক আছে নাকি ?”
কাশীনাথ – “তুই কি এটাকে সন্দেহ বাতিক বলবি ? আরও শোন | ভাই মারা গেলে কমলা পাড়ার ডাক্তারের সাথে কথা বলতে যায় – কী হয়েছিল, কেন হয়েছিল | ডাক্তার ওকে জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমারা কি বাড়িতে ইঁদারার জল খাও ?’ কেন না ডাক্তার সন্দেহ করেছিল হয়ত ইঁদারার জলের আর্সেনিক থেকে ভাইয়ের অসুখটা হয় | কিন্তু বাড়িতে তো বহুকাল আগে জলের লাইন বসার পর ইঁদারার জল শুধু কাচা-কুচি, ধোয়া-ধুয়ি, কি গাছে জল দেয়ার জন্য ব্যবহার হয় | তাও, কমলা ইঁদারার জলের স্যাম্পল নিয়ে কোলকাতায় পরীক্ষা করায় |”
বিভাস অধীর আগ্রহে শুধাইল,  “আর্সেনিক পাওয়া যায় ?”

কাশীনাথ উত্তর দিল না, কেবল মাথা নাড়িল |


--------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ০১ মার্চ ২০১৫