রম্যরচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রম্যরচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৫

বার্ধক্যের থ্রুপুট

|| বার্ধক্যের থ্রুপুট ||


দ্রুতগতি বার্ধক্যের সাথে সাথে বেনু (বেণী মাধব) বাবুর গতানুগতিক সমস্যাও টপাটপ দেখা দিচ্ছে | উচ্চ রক্তচাপ, মধুমেহ, গেঁটে বাত ... কী নেই বলা মুশকিল | প্রতি ছ’মাসে রক্ত পরীক্ষা | প্রতি মাসে একবার ডাক্তারের মুখদর্শন |

এর মধ্যে ধরা পড়ল, বেনু বাবুর রক্তে প্লেটলেট কমে এক লাখের নিচে এসে দাঁড়িয়েছে | রুগীর পক্ষে যা চিন্তার বিষয়, ডাক্তারের পক্ষে তা নয় | রিপোর্ট দেখে হরি সাধন ডাক্তার ওষুধ লিখে দিলেন, ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স | কেমন ঝুরঝুরে বড়িগুলো, চট করে ভেঙ্গে যায় | বেনু বাবুর ব্যাপারটা মনঃপুত হল না | স্ত্রী কে বললেন, “নিভা, ডাক্তার মনে হচ্ছে ব্যাপারটা তেমন গা করল না | তুমি একটু নেটে দেখো তো |” নিভা (নিভাননী দেবী) কলেজে জীববিজ্ঞান পড়েছিলেন | এখনও চোখে চশমা লাগে নি | ছেলের ফেলে যাওয়া কলেজের কম্প্যুট্যরটা মাঝে মাঝে ঘেঁটে অন্তর্জাল থেকে নানান কাজের তথ্য খুঁজে পান ও বেনু বাবুর উপর তা প্রয়োগ করে তার কার্যকারিতা যাচাই করেন |

দু’দিন পরে বেনু বাবু বললেন, “নিভা, তুমি নেটে কিছু দেখেছ ? আমার কিন্তু ...” বলতে বলতে তিনি থেমে গেলেন | নিভা প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু কী ?”
- “না, মানে দু’দিন ধরে সকালে বাথরুম করে দেখছি ...”
- “কী দেখছ ?”
- “হলুদ বাথরুম হচ্ছে |”
- “বলবে তো !”

আবার ডাক্তার হরি সাধন, আবার রক্ত পরীক্ষা | রিপোর্ট দেখে ডাক্তার বললেন, “হুম, প্লেটলেট তো যা ছিল তাই আছে ... এদিকে বিলিরুবিন একের একটু উপরে দেখছি ... মনে হচ্ছে জন্ডিস হয়েছে | যাক, সবে শুরু, চিন্তার কিছু নেই | ওষুধ লিখে দিচ্ছি |”

ইতিমধ্যে নিভা নেট ঘেঁটে একটি যুতসই জিনিস পেয়েছেন | নেটে বলছে, প্লেটলেট বাড়ানোর একেবারে মোক্ষম পথ্য ! এছাড়াও তার অজস্র গুণ | প্রথমত:, তাতে কী নেই ? লোহা, তামা, দস্তা, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, সেলেনিয়াম সব আছে (যদিও শেষের দুটো ঠিক চেনা লাগল না, তবে অধিকন্তু ন দোষায়) | তারপর, পর পর – তাতে যকৃৎ উপকৃত হয় ; রক্তচাপ কমে ; মেদ কমে ; বার্ধক্যের গতি রোধ হয় ; এমন কি, কর্কট (বালাই ষাট !) রোগেরও উপশমে সাহায্য করে |

একটু মুশকিল, তার ভয়ঙ্কর রঙ নিয়ে | খাবারে রঙ নিয়ে বেনু বাবুর রাইট এন্ড রং জ্ঞান অত্যন্ত প্রখর | রান্নায় হলুদ কম খান | মিষ্টি কেনেন তো শুধু সাদা | বাজারের বোঁদে চলে না, বাড়িতে তৈরি হয় বিনে রঙ দিয়ে | কেনা ডালমুটে লাল বোঁদে, সবুজ মটর দেখলে বেছে বেছে ফেলে দেন | যেদিন থেকে শুনেছেন পটল রঙ করে বিক্রি করা হয়, পটল খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন | সবুজ সবজি, সাদা মুলো চলে, কিন্তু কুমড়ো, লাল মুলো কি গাজর না |

অনেক ভেবে নিভা একটা উপায় খুঁজে পেলেন | ওটাকে কুচিয়ে আরও অন্য কিছু মিশিয়ে কড়াইয়ে একটু নেড়ে নরম করে দু-পিস পাউরুটির মধ্যে দিয়ে স্যান্ডউইচ করে দিলে বেনু বাবু খেয়ে নেবেন | রাত্রের খাবার শুকনো হলে ভালো, সাদা পাউরুটি হলে তো কথাই নেই |

ক’দিন পরে বেনু বাবু বললেন, “নিভা, তুমি নেটে কিছু দেখেছ ? আমার তো এখন ...” বলতে বলতে তিনি থেমে গেলেন | নিভা জিজ্ঞাসা করলেন, “এখন আবার কী হল ?”
- “না, মানে আজ সকালেও টয়লেট করলাম | কেমন যেন ...”
- “কেমন ?”
- “একটু কালচে লাল মনে হল |”
- “কালচে লাল ! মানে রক্ত ?”

কিছু না বলে নিভা ডাক্তারকে ফোন করলেন | ডাক্তার শুনে একটু চুপ করে থেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ওর খাওয়া দাওয়া ঠিক আছে তো | কোন অনিয়ম ?” নিভা একটু দ্বিধায় মাথা নাড়লেন, যেটা ডাক্তার দেখতে পেলেন না | তাই জিজ্ঞাসা করলেন, “কিছু খাওয়া দাওয়ার থেকেই গণ্ডগোল হচ্ছে মনে হয় | কাল রাত্রে কী খেয়েছে ?” এবার সতর্ক হয়ে নিভা জানালেন ইদানীং সন্ধ্যায় তিনি প্লেটলেট বাড়ানোর জন্য একটা নতুন পথ্য দিচ্ছেন, অবশ্যই বেনু বাবুকে না জানিয়ে |

“কী ?” ডাক্তারের প্রশ্ন | উত্তরটা শুনে ডাক্তার না সামলাতে পেরে অট্টহাসি হেসে উঠলেন | হাসি আর থামে না | ক্রমে বেগ কমে এলেও খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতেই থাকলেন | বিব্রত হয়ে নিভা জিজ্ঞাসা করলেন, “হাসছেন যে !” ডাক্তার বললেন, “প্লেটলেট ইন – প্লেটলেট আউট |”
- “মানে ?”
- “মানে ... বিটরুট ইন – বিটরুট আউট !”


----------------------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ১৮ নভেম্বর ২০১৫

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

কাঁচা লাউয়ের সোওয়াদ



|| কাঁচা লাউয়ের সোওয়াদ ||


আমি খুব তক্কে তক্কে থাকি যে তেমন একটা ঘ্যাম স্বপ্ন দেখলে তাই নিয়ে লিখব | কিন্তু বহুদিন হল নিয়মিত স্বপ্নই দেখি না | যা ও বা দেখি, ঘুম থেকে উঠে মনেই পড়ে না | গত রাত্রে ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ল | প্রেক্ষাপটটা এই – বহুদিন বাজারে যাওয়া হয় নি | কাল সন্ধ্যেয় রিলায়েন্স ফ্রেশে গিয়েছিলাম – কিন্তু তেমন মনঃপুত তরকারী পাই নি | একমাত্র তরকারী ছিল লাউ | লাউ আমার প্রিয় – খুব বলব না, তবে অন্য কিছু না পেলে খাই | কিন্তু যে লাউগুলো ছিল একটাও পছন্দসই নয় | হয় পেট-পিঠ সাদা গদাই-লস্কর, নয় যুদ্ধং দেহি লিকলিকে |

রাত্রে ঘুমে, এক মামা (নাকি দূর সম্পর্কের দাদা – বহুদিন আত্মীয় স্বজনের সাথে দেখা সাক্ষাত নেই – যে এসে যা পরিচয় দেয় তাই মেনে নিই) দেখা দিয়ে বলল একটা ফাংশন করবে, তারই বাড়ির ছাদে | আমাকে একটু সাহায্য করতে হবে | কী ফাংশন ঠিক বুঝলাম না, তবে খাওয়া দাওয়া থাকবে জেনে খুশি হয়ে রাজি হলাম | ফাংশনটা যদি তাদেরই বাড়ির ছাদে হয় তবে আমার সাহায্য দরকার কেন ? বুঝলাম, যখন মামা বলল বাড়িটা এক তত্ত্বাবধায়ক হাতে বহুদিন ধরে দেয়া আছে | এখন তার সহযোগিতা দরকার | কী সহযোগিতা ? মামা বলল, ফাংশনটার জন্য ছাতে একটা ছাউনি করতে হবে, তার জন্য টিনের চাল দরকার, কিন্তু কয়েকটাই মামার কাছে আছে, আর খান কয়েক ওই লোকটার কাছে চাইতে হবে | মামা কেন চাইবে না ? না, লোকটার নাকি অনেক বকেয়া বাকি | অতএব, আমিই লোকটাকে, নাম বীরু, ধরলাম | সে বলল, ঠিক আছে, আমি টিনের চাল দেব, তবে কিনে নিতে হবে | দাম কত ? বীরু বলল, আগে ফাংশনটা হোক | তারপর কেমন ফাংশন, কত লোক এলো গেল এই সব দেখে দামটা ধরা হবে – অর্থাৎ, কাজ অনুযায়ী দাম |

ফাংশন অবশ্য খুবই মামুলি হল, তাতে মামা বক্তা, আমি শ্রোতা এবং বীরু পর্যবেক্ষক – স্রেফ দেখতে যে ফাংশনটা কত জমকালো হল | মেনু ভাত আর লাউয়ের একটা ঝোলঝোল তরকারী | ফাংশন শেষ হলে বীরু কোন কথা না বলে, ভাত না খেয়ে, দু’ খানা কাঁচা লাউ তুলে চলে গেল |

পিছু পিছু মামা গেল বীরুর কাছে জানতে, যে টিনের চালের দরুন কত টাকা দিতে হবে | বীরু বেশ চড়া দাম হাঁকল | মামা অবাক হল দাম শুনে | বীরু বলল কারণ, এক – এত বাজে ফাংশন হয়েছে যে তার সব টিনের চালের এক রকম অবমাননা হয়েছে ; আর দুই, বাকি বকেয়াও তো দেখতে হবে ! মামা আমায় বলল, কী উপায় বল তো, আমার কাছে তো এতগুলো টাকা নেই | আমি বললাম, দাঁড়াও দেখছি | আমি গিয়ে বীরুকে বোঝালাম, যে টিনের চালগুলো বিক্রি না করে ভাঁড়া দেয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে | বছর বছর ও ভাঁড়া দেবে, আর মামা ফাংশন করবে | শেষে দশ হাজার টাকার দাম ছেড়ে দিয়ে ভাঁড়া হিসাবে হাজার খানেক টাকায়  বীরু রাজি হল | টাকা ট্যাঁকে গুজে নিজের টিনের চাল খুলে নিয়ে বীরু চলে গেল | মামাও নিজের টিনের চাল, আর কিছু বাকি লাউ, যা ওই ফাংশনের জন্য কেনা হয়েছিল, কিন্তু কোন গতি হয় নি, তুলে নিয়ে বলল, চল, এবার আমায় একটু এগিয়ে দে |

কিছুদূর এগিয়ে গ্রাম থেকে বেরিয়েই এক ভিয়েতনামের গেরিলা যুদ্ধের দৃশ্য | জল কাদায় ভরা ধানের ক্ষেতে একটা ভাঙ্গা টিনের চালের ঘর | সেদিকে তাকিয়েই মামা বলল, এই রে সর্বনাশ ! বলেই, মামা কাঁধ থেকে টিনের চাল মাটিতে ফেলে সামনে ঢালের মত ধরে বলল, শিগগির এর পিছনে লুকো | দুজনে টিনের চালের পিছনে দাঁড়াতেই, মামা আমাকে একটা সরু লিকলিকে লাউ হাতে ধরিয়ে বলল, এইটে উঁচিয়ে ধর বন্দুকের মত | আমি বললাম, কেন ? মামা বলল, দেখছিস না, সামনে ? ঐ ঘরটায় বীরু লুকিয়ে আছে, আমাদের অপেক্ষায় | আমি বললাম, কেন, কী করবে ও আমাদের ? মামা বলল, ঠিক করে দেখ | ঠাহর করে দেখলাম | বীরু দেখা না গেলেও, দেখলাম ঐ ঘরের বন্ধ জানালা থেকে দু দিকে দুটো লাউ উঁচিয়ে ধরে আমাদের দিকে তাক করা | ব্যাপারটা স্পষ্ট হল, বীরু ব্যাটা টিনের ভাঁড়া আদায় করে এখন বাকি বকেয়া আদায় করার জন্যে ফাঁদ পেতেছে |

বেশ খানিকক্ষণ আমরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে, আর ওদিকে বীরুর দিকেও কোন হাঁই-চাঁই নেই | কেউই গুলি চালাচ্ছে না | অথচ পরিষ্কার ভাবে পরিস্থিতি সঙ্গিন | কী করব ভাবছি, হঠাত ধাঁই করে মাথায় বুদ্ধি খেলল | মামার টিনের ঢাল থেকে বেরিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে গেলাম বীরুর ঘরের দিকে | ও কিছু বোঝার আগেই ওর জানালা দিয়ে বের করা এক নলা লিকলিকে একটা লাউ আমি কপ কপ করে কামড়ে চিবিয়ে মুহূর্তের মধ্যে গিলে ফেলে, দ্বিতীয় লাউটারও একই গতি করলাম | সমস্ত ঘটনা চোখের নিমিষে ঘটে গেল | বীরুও একটু পরে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে মাথার উপর হাত তুলে ঘরটার পিছন দিক থেকে বেরিয়ে এলো |

এবার বলি, আমার মাথায় কী বুদ্ধি খেলেছিল | যখন আমি দেখলাম বীরু গুলি চালাচ্ছে না, আমি বুঝেছিলাম ওর কাছে গুলি নেই | আর, তক্ষুনি এও অনুভব করেছিলাম যে, যেহেতু আমাদের দিক থেকেও গুলি চলছে না, এই দেখে বীরুও শিগগির বুঝবে আমাদের কাছেও গুলি নেই | অতএব, ও সে’কথা বোঝার আগেই ওকে নিরস্ত্র করতে হবে | আর, নিরস্ত্র করার একমাত্র উপায় – বন্দুক লাউগুলোর সদ্গতি করা |

ঘুম থেকে উঠে খুব মনে পড়ল কেমন সুন্দর, একটু আঁকাবাঁকা, লিকলিকে সরু ছিল বীরুর লাউ দুটো | কিন্তু, কিছুতেই মনে পড়ল না ওগুলো খেতে কেমন লেগেছিল | বউকে বলতে, সে উল্টো অনুযোগ করল, কাল তুমি সিটকে দেখে লাউ নিলে না | একটা নিলে আজ চেখে দেখতে পারতে, কাঁচা লাউ কেমন লাগে খেতে |

একটা ব্যাপার বোধগম্য হয়েছে - র‍্যপিড আই মুভমেন্ট ঘুমে মুখে কোনও স্বাদ হয় না ||

------------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৫

সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০১৫

বন্ধুত্বের গো-চোনা

|| বন্ধুত্বের গো-চোনা ||
(গতকাল ২ অগাস্ট, ‘বন্ধু দিবস’ ছিল – সেই শোকে অশোক হয়ে লিখছি)

বন্ধু আমাদের ছেড়ে গেল কারো কথা নাহি শুনে
এমনই নাকি রামচন্দ্র গিয়েছিলেন একদা বনে
পাতের ভাতে রাগে করে তিনি যান নি বিলক্ষণ
সাথে তো তাঁর ছিলই ছিল, সীতা আর ধরলক্ষণ

সুহৃদ আমার চলে গেল দিয়ে বুকে একটু ব্যথা
ভাই-বন্ধু বলে নয়, এমনিই বলছি একটা কথা
আচ্ছা বিজন অরণ্যে কি লাগে না ভাই লক্ষণ
কবে, কি কেউ বলতে পারে, আসে কার কুক্ষণ

ধরো যদি আসে কোন বিপদ তার বরাতে ঘনিয়ে
আমি থাকলে সাথে, দিতে সে পারত তা গছিয়ে
যেমন হামেশা লেগে আছে এই উৎপাত কবিতার
নিজের মনে আউড়ে, কে ক্যহাঁত্যক পাবে নিস্তার

সেক্ষেত্রে ধরলক্ষণটা সাথে থাকলে আশেপাশে
কবিতা তাকে শোনান যায় গলাটা ঝেড়ে, কেশে
কিম্বা সীতা চরিত্র নিয়ে নানান, বিশদ আলোচনা
সত্যি কি সে অপরূপা, বিম্বাধরা, সুশ্রী, সুলোচনা

কেনই বা তাহার সদাই দুর্লভ সোনার হরিণ চাই
যখন আছে সর্বদা সাথে, সম্পর্কে-দেবর এক ভাই
সে তো শুধুই হাতে ধরে, মুখ দেয়না সে কিছুতেই
বন্ধু, ঘরে ফেরো, দেখ, তোমার সীতা বৌ ও নেই

এখন তুমি যতই লেখ নর-পুরীষ নিয়ে রম্য রচনা
পড়ে কি মনে হবে না ? ‘উফ! এ কী গো-চোনা !’


-----------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ০৩ অগাস্ট ২০১৫

বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০১৫

ত্রিকোণমিতি

<< চীনেবাদাম কবিতা >>

এ’রকম কি কিছু আছে, চীনেবাদাম কবিতা ?
আসলে আমি চীনেবাদাম খাওয়ার মত ছন্দময় অথচ অন্তঃসারশূন্য অনুভূতির এক বিশেষ প্রকাশের কথা ভাবছিলাম |

আপনি এক ঠোঙ্গা চীনেবাদাম কিনলেন – ছোট ঠোঙ্গা, তার সাথে এক পুরিয়া লঙ্কার গুঁড়ো মেশানো দানা-নুন | টাকাটা আগেই হাতে বের করেছেন, একদম সঠিক খুচরো – কেন না, ঠোঙ্গাটা হাতে ধরলেই প্যাভলোভিয়ান প্রতিক্রিয়ায় জিভে জল কাটবে  – ধুর মশাই, তখন কে নুলো বাড়িয়ে অপেক্ষা করবে বাদামওয়ালার কাছ থেকে খুচরো ফেরত নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখে পকেটে পুরতে !

যাক, এবার আপনি জুত করে বসলেন ঘাসে – চিন্তা নেই, পরনের প্যান্ট ঘাসের মতই পরিষ্কার বা ময়লা | সাবধানে ঠোঙ্গাটা ফাঁক করে দেখলেন – বাদাম একটু কম লাগছে, লাগুক | সন্তর্পণে, প্রথম বাদামের খোলা ভেঙ্গে দানাগুলো হাতের তালুতে রেখে দেখে নিলেন – পোকা লাগা নেই তো | তারপর মুখ খুলে বাদামগুলো ফেলেই বিদ্যুৎ বেগে নুনের পুরিয়া খুলে এক চিমটে মুখে দিলেন | ইতিমধ্যে জিভের উপরে বাদাম, আর নিচে লালার জোয়ার – সেই জোয়ারে নুন গুলো একটু গুলে উঠলেই আপনি চিবাতে শুরু করলেন | শুরু হোলো মুখে লালা, বাদাম আর ঝাল-নুনের কোলাকুলি | আহা ! আপনি চিবচ্ছেন আর একটু একটু গিলছেন – এক আশ্চর্য ‘খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না’ সম্ভোগ !

কিন্তু, পরমানন্দ কি ধরে রাখা যায় ? তবে পুনঃ পুনঃ প্রার্থনা করতে ক্ষতি নেই | অতএব, দ্বিতীয় বাদামের নগ্নীকরণ ও ঝাল-নুন সহযোগে চর্বণ | তারপর, তৃতীয় ...

ক্রমে, এক সুন্দর ছন্দের চালে চলে, বাদামের সাইজ কমে আসে, মজুদও কমে – সেই সাথে ঝাল-নুনের চাহিদা বাড়ে |
শেষে, নাহ, সব শেষ – ঠোঙ্গা ঝেড়েঝুড়ে, তার কোনা ঘুপচি হাতড়ে, শেষ বাদামটাও শেষ | এমন নিখুঁত হিসেবে খাওয়া যে ঝাল-নুনের কয়েক দানা শুধু বাকি, আর আঙ্গুলের ডগায় সব শেষে তার কিছু রেশ ...

একটা ঢেকুর তুললেন | ঠোঙ্গাটা দুমড়ে ফেলতে গিয়ে ভাঁজ করে রেখে অবশ্যম্ভাবী এই চিন্তাটাকে আর অগ্রাহ্য করতে পারলেন না -
“হঠাত করে কেমন একটা ছন্দপতন, আর গোটা ব্যাপারটা ভেবে দেখলে কত অন্তঃসারশূন্য !”

কিছু কবিতা লেখা ঠিক এই রকম চীনেবাদাম খাওয়ার মতন | হঠাত ঝোঁক ওঠে, পদে পদে ছন্দ নিয়ে শব্দ আসে, কিন্তু, লেখা শেষে সেই অন্তঃসারশূন্যতা বোধ | এই এক অদম্য ঝোঁক আমায় প্রায়ই পেয়ে বসে, আর আমি মাথার খোল থেকে শব্দের দানা আলাদা করে, ঝেড়েঝুড়ে রুচির ঝাল-নুন দিয়ে সাধি | একেই বলি চীনেবাদাম কবিতা – মাথা নেই, মুণ্ডু নেই, সার নেই, মর্ম নেই ...
– ছন্দ ? হয়ত আছে, পড়ে দেখুন ...


|| ত্রিকোণমিতি ||


অযাচিত তোমার সখ্যতা, বন্ধু, অযাচিত তোমার আবির্ভাব
এতদিন যে তুমি ছিলে না জীবনে, ছিল না কোনও অভাব
কী হোলো হঠাত তোমার খেয়াল, কী হোলো প্রয়োজন ?
হঠাত করে দিলে চিঠিতে খবর, যার ভাবে বিস্তর আসঞ্জন

আমার নাকি কিছুটা ভালো, বেশির ভাগ ঠিক নয় মোটে
দাঁড়ালে আমিও হয়ত জিতব, তবে মাত্র তোমার জোটে
কিসে দাঁড়ালে, লেখ নি সেকথা, চিরকাল আমি দাঁড়িয়ে
দেখেছি তুমি ঘোর বেপাড়ায়, শুধু যাও এ পাড়া এড়িয়ে

এখন ঘুরে ঘুরে সুকতলা ক্ষয়েছে, পায়ে ভিড় ফোস্কার
তাই বুঝি বসে, জিরিয়ে রোয়াকে, শোনালে, “নমস্কার !”
আহা, কী মধুর, যদিও লাগে বন্ধুর, চেনা এই অভিবাদন
কী যেন বললে নামটা তোমার, হনুমান না কি গন্ধমাদন ?

হ্যাঁ, রে হতভাগা, পড়েছে মনে, বছর তিন কি চার আগে
ধার দিয়েছিলাম আমার সুপ্রীতি, যদি কোনো কাজে লাগে
সেই ভালবাসা তুমি দিয়ে দিলে আমার বান্ধবীকে উপহার
আজ আবার তুমি এসেছ কোন মুখে চাইতে পুনশ্চ ধার ?

তবে বলি শোন, কাউকে বোলো না, আমি যে দাঁড়াতেম
তোমার জন্য নয়, জানাতে আমার ওই বান্ধবীটিকে প্রেম
আমি কী জানতাম যে বেপাড়ায় ঘুরে সে করে ফষ্টিনষ্টি
আমার বদলে তোমার সাথে – হে ভগবান এ কী অনিষ্টি !

এখন এসেছ মুখটা পুড়িয়ে, বকে বান্ধবীর সাথে অনর্গল
দিয়ে মহিলাকে ফেরত, নিতে পার ধার, এক টিউব বার্নল
কেটে পড় তুমি, জুটে যাই আমি, বিনে কারোরই জোটে
তর্জনী চেপে দিই অর্গল, তার বেসামাল প্রগলভ ঠোঁটে ||
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -    (কি ? আরেক ঠোঙ্গা চলবে ?)


----------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ২৯ জুলাই ২০১৫

শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০১৫

গঙ্গাপ্রাপ্তি

|| গঙ্গাপ্রাপ্তি ||


(অভিধান অনুযায়ী, গঙ্গাপ্রাপ্তি শব্দটি সাধারণ অর্থে মৃত্যু, ও বিশেষ অর্থে গঙ্গাতীরে বা গঙ্গাজলে মৃত্যু, জ্ঞাপন করে)

বহুকাল পূর্বের কথা  | সেই কালে, বঙ্গের শহরে গ্রামে স্থানীয় নদীকে, সে যে নদীই হউক, চলিত কথায় গঙ্গা বলা হইত (যথা, “যাই গঙ্গায় নাই করে আসি”) | কিন্তু, অধিকাংশ মধ্যবিত্ত ও সচ্ছল মানুষের মনঃপুত ছিল না যে তাহার মৃত্যু হইলে, ওই স্থানীয় গঙ্গাতীরেই তাহার অন্তিম সংস্কার করা হউক | অতি দরিদ্র মানুষ ব্যতিরেকে যে কেহই কিঞ্চিত অর্থ কিম্বা প্রতিপত্তি লাভ করিত, সে কামনা করিত যে তাহার অন্তিম সংস্কার যেন প্রকৃত গঙ্গাতীরে নির্বাহ করা হয় | এই উদ্দেশ্যে প্রকৃত গঙ্গা নিকটবর্তী না হইলে, স্থান বিশেষে অদূরবর্তী হুগলী নদীকেই গঙ্গা রূপে গণ্য করা হইত | হেন কারণে, হুগলী নদীর আশেপাশের বহু শহর কি গ্রাম হইতে মৃত ব্যক্তির মরদেহ হুগলী নদীতটে আনিয়া দাহকার্য, জলে অস্থি বিসর্জন ইত্যাদি ক্রিয়া সম্পন্ন করিবার প্রথা প্রচলিত ছিল |

এইরূপে, মায়াপুর গ্রামের হরিসাধন বাবুর মৃত্যু হইলে, গ্রামের পাঁচজন মনস্থ করিল, তাঁহার গঙ্গাপ্রাপ্তি করানো হইবে | তিনি দেবতুল্য মানুষ ছিলেন | গ্রামের দুর্গা পূজা বাবদ অর্থ ব্যয়ে ও অন্যান্য দীন দুঃখী সেবায় সকলের চক্ষে সম্মান শ্রদ্ধার পাত্র হইয়াছিলেন | সুতরাং তিনি ব্যতীত আর কে হইতে পারে মরণোত্তর গঙ্গাপ্রাপ্তির যোগ্য ? মায়াপুর হইতে সর্বাপেক্ষা নিকটস্থ হুগলী নদীর তটবর্তী শহর বৈরামগঞ্জ দশ – বারো ক্রোশ দূর | একটি মাত্র মোটরবাস, এই দূরত্ব যাইতে অন্তত পাঁচ ঘণ্টা লয় – কেন না পথের বেশ কিছু অংশ পাকা নহে | উপরন্তু, গাড়িটি যাত্রী উঠাইয়া, নামাইয়া, থামিতে থামিতে যায় | কিন্তু, যথেষ্ট অর্থের প্রলোভন দেখাইয়াও ওই গাড়ির চালককে মৃতদেহ বহন করিতে সম্মত করানো গেল না | ওদিকে বর্ষা প্রায় সমাগত | আবহাওয়া মোটেই মৃতদেহ রক্ষণের উপযুক্ত নহে | তখন গ্রামের সর্বজ্ঞ পান্নালাল ঘোষ বাবু, পানু খুড়ো নামে জনপ্রিয়, প্রস্তাব করিলেন যে মরদেহ কাঁধে লইয়া বৈরামগঞ্জ যাওয়া হইবে | পানু খুড়ো আরও জ্ঞাপন করিলেন যে, যাহারা মৃতদেহ বহনে স্কন্ধ দান করিবে তাহারাও ওই পুণ্যবলে গঙ্গাপ্রাপ্তির ভাগ্য অর্জন করিবে |

গ্রামে হুড়াহুড়ি পড়িয়া গেল | কার্যত দশ জন সক্ষম তরুণ শববাহক পাওয়া গেল, যাহাদের উৎসাহের কোনও অন্ত নাই | কারণ, তাহারা ইতিপূর্বে বৈরামগঞ্জ কি, কোনও শহরই দেখে নাই | পানু খুড়ো তাহাতে বিশেষ বিস্মিত হইলেন না, কেন না তাঁহার এই প্রস্তাবের কারণ স্বয়ং তিনিও এই সুযোগে বৈরামগঞ্জ শহর দেখিয়া লইবেন | রক্ষা এই যে, এই সব পুত্রসম তরুণদের মধ্যে কেহই সেই গুপ্ত উদ্দেশ্য টের পাইবে না |

পরদিন অতি প্রত্যুষে, দলটি ‘বল হরি, হরি বোল’ রবে গ্রাম মুখরিত করিয়া বৈরামগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল | সাথে চলিল একটি গরুর গাড়ি, দাহ কার্যের জন্য কাষ্ঠ ও কিছু রন্ধনের সামগ্রী লইয়া | এই প্রান্তিক গ্রাম হইতে বহির্জগতে যাইবার একমাত্র পথটি বৈরামগঞ্জ শহরের দিকে গিয়াছে বটে | কিন্তু সেই পথে কিছু দূর যাইলেই একটি করিয়া গ্রাম আসে, ও পথটি বিভক্ত হইয়া এদিক ওদিক চলিয়া যায় – কিছু গ্রামটির ভিতর দিয়া, কিছু গ্রামটির বাহিরে বাহিরে | পাছে শববাহকরা ভুল পথে সময় ও শক্তির অপচয় করে, সর্বাগ্রে পানু খুড়ো দৃঢ় পদক্ষেপে পথ দেখাইতে দেখাইতে চলিলেন | প্রতিটি গ্রামে, মোটরবাস কোন পথে বৈরামগঞ্জ যায় এই প্রশ্ন করিয়া পাঁচ দশ গ্রামবাসীর মতামত লইয়া নিশ্চিত হইয়া শববাহকদিগকে পথ প্রদর্শন করেন | ইত্যবসরে শববাহকরা কাঁধ-বদল করিয়া, কিম্বা শব নামাইয়া রাখিয়া, যথাসম্ভব বিশ্রাম লয় | এইভাবে থামিয়া থামিয়া শবযাত্রা অগ্রসর হইল |

দ্বিপ্রহর হইলে একটি গাছের নিচে শব নামাইয়া সিদ্ধ-পক্ব ভাত রাঁধিয়া খাওয়া হইল | পানু খুড়ো সকলকে আশ্বাস দিলেন যে সন্ধ্যা নাগাদ বৈরামগঞ্জ পৌঁছানো যাইবে | কিন্তু সন্ধ্যা হইলে জানা গেল শহরে পৌঁছাইতে আরও ঘণ্টা দুই লাগিবে | সন্ধ্যা ঘোর হইয়া আসিলে দূরে শহরের আলো দেখা দিল | ক্লান্ত যুবকরা হৃত উৎসাহ ফিরিয়া পাইয়া পদচালনা দ্রুততর করিল | তথাপি, বৈরামগঞ্জ পৌঁছাইতে পৌঁছাইতে সময় নবম প্রহর পার হইল | শ্মশানের খোঁজ পাইতে বিশেষ পরিশ্রম করিতে হইল না | শহরে প্রবেশ করিয়াই গঙ্গার পার্শ্বে যে বড় রাস্তা পাওয়া গেল তাহার শুরুতেই “জাগ্রত-কালী” শ্মশান, বাম হস্তে রাস্তা ও দক্ষিণ হস্তে গঙ্গার মধ্যবর্তী | প্রচুর প্রাচীন বৃক্ষের বাগানে সংলগ্ন জাগ্রত-কালীর মন্দির, ও তাহার পার্শ্বেই নদী তীরে শবদাহ করিবার স্থান | কিন্তু কালী মন্দিরটি ততক্ষণে বন্ধ হইয়া গিয়াছে | যে একটি মাত্র ডোমের দেখা পাওয়া গেল সেও স্বগৃহে ফিরিবার প্রস্তুতি করিতেছে | সে জানাইল যে শেষকৃত্য সম্পন্ন করিবার পুরোহিত মহাশয় নিদ্রা গিয়াছেন | আগামীকাল সকালের পূর্বে কোনও দহন কার্য সম্ভব নহে | ততক্ষণ শববাহকরা মন্দির প্রাঙ্গণে রাত্রি যাপন করিতে পারে | তবে লক্ষ্য রাখিতে হইবে যে কোনও জন্তু যেন মৃতদেহ আক্রমণ না করে | এই কয়েকটি কথা বলিয়া ডোম বিদায় লইল |

ইতিমধ্যে অমাবস্যার অন্ধকারে অজান্তে মেঘের সঞ্চার হইয়া গুমোট গরম ধরিয়াছিল | সহসা সেই নিশ্ছিদ্র নিকষ কালো শামিয়ানা বিদীর্ণ করিয়া মুহুর্মুহু হুঙ্কার সহযোগে বিদ্যুৎ ঝিলিকের অসিযুদ্ধ শুরু হইল, এবং আর্দ্র শীতল বাতাসের ঝটিকা আশু ঝড়-বৃষ্টির অগ্রিম আভাস দিল | পানু খুড়ো সকলকে তাড়া দিয়া মৃতদেহটি মন্দিরের চত্বরে রাখিয়া চতুর্দিকে প্রদীপ জ্বালিয়া রাখিবার ব্যবস্থা করিলেন | লন্ঠনের আলোয় অনুসন্ধান করিয়া নিকটেই একটি তেঁতুল গাছের পাদদেশে একটি পূর্বে ব্যবহৃত উনুন পাওয়া গেল | চটপট কাষ্ঠ জ্বালাইয়া রন্ধনের ব্যবস্থা করা হইল |

চারিদিক নিস্তব্ধ | সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত শববাহক যুবক সকল কেহ কথা কহিতেছে না | কেবল উনুন হইতে প্রজ্বলিত কাঁচা কাষ্ঠ ফাটিবার ফুটফাট শব্দ শোনা যাইতেছে | এমন সময় দূর হইতে বিলম্বিত লয়ে ক্যানেস্তারা কর্তনের কর্কশ শব্দের ন্যায় একটি গোঙানির আওয়াজ বাতাসে ভাসিয়া আসিল | দূর হইতে আগত সেই নির্ঘোষ ক্ষীণ হইলেও এত সুস্পষ্ট ও জান্তব যে মনে হইল যেন কোনও জন্তু করাতের মত দাঁত দিয়া অসম্ভব কঠিন কোনও জিনিস কাটিতে চেষ্টা করিতেছে | সচকিত হইয়া সবে একে অপরের দিকে চাহিল | কিন্তু, পর মুহূর্তেই নিস্তব্ধতা বিরাজ করিলে কান পাতিয়াও কেহ বিশেষ কিছু বুঝিতে পারিল না | কেবল সমর, শববাহকদিগের একজন, প্রশ্ন করিল, “পানু খুড়ো, ওটা কিসের আওয়াজ ছিল ?” পানু খুড়ো এইরূপ শব্দ পূর্বে কখনও শুনেন নাই | কিন্তু কোনরূপ অনভিজ্ঞতা স্বীকার করা তাঁহার আত্মসম্মানে বাধে | তিনি মনে মনে কিছু উপযুক্ত উত্তরের মুসাবিদা করিতেছেন কি, সহসা অতি নিকট হইতে সেই বিকট আর্তনাদ আবার শোনা গেল – মূহুর্মূহু, একের পর এক, কতিপয় উৎস হইতে | মনে হইল যেন কেহ বা কাহারা মস্ত বড় কোদাল দিয়া বিশাল জালার বাহিরে ও ভিতরে চাঁছিয়া শব্দ করিতেছে | সমর কহিল, “এ তো মনে হয় কোনও ভয়ঙ্কর জন্তু ...” তাহার মুখের কথা কাড়িয়া সুবল কহিল, “বাঘ নয় তো ?” কিন্তু হলধর, যাহার শ্রবণশক্তি কিঞ্চিত ক্ষীণ, সে দৃঢ় বিশ্বাসে কহিল, “বাঘ নয় | মনে হয় ওগুলো ফেউ, গঙ্গার ওপারে খাওয়া-খাওয়ি করছে |” দৃঢ় পণ সমর প্রশ্ন করিল, “ওপারে ফেউ বলে কি এপারে বাঘ চরতে পারে না ?” হলধর কহিল, “না, তা সম্ভব নয় |”

এই সব গ্রামবাসী জীবনে গবাদি পশু, কুকুর কি শৃগাল ব্যতীত অন্য কোনও জন্তু দেখে নাই | হলধরের বরাভয় সমাপ্ত হইবামাত্রই শ্মশানের ঠিক বাহিরে পাকা রাস্তার উপর ঠকঠক শব্দ করিয়া যেন কোনও চতুষ্পদ জন্তু দৌড়াইয়া পলাইল | তাহার পলায়নের শব্দ দূরে মিলাইয়া যাইবার পূর্বেই রাস্তার উপর আবার ঠকঠক শব্দ করিয়া কোনও জন্তু দ্রুতপদে নিকটে আসিয়া দাঁড়াইল | অতঃপর শ্মশানের প্রবেশ দ্বারের দিক হইতে একই ভয়ঙ্কর কর্ণবিদারী নির্ঘোষ নিনাদ শোনা গেল, এবং একাধিক বার দ্রুততালে সেই নির্ঘোষের অনুক্রম ধ্বনি-প্রতিধ্বনির ন্যায় গুঞ্জিত হইতে থাকিল | ততক্ষণে সকলের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হিম ও রক্ত জল হইয়া গিয়াছে | কেহ অস্ফুট স্বরে কহিল, “খুড়ো, কী হবে এখন ? উপায় কী ?” তাহার কথা শেষ হইবার পূর্বেই পানু খুড়ো, “শিগগির ! সবাই চট করে এক একটা গাছের নিচে আগুন জ্বেলে, গাছে উঠে পড়,” এই কহিয়া তিনি স্বয়ং জ্বলন্ত উনুনের ভ্রুক্ষেপ না করিয়া এক লম্ফে তাহার ঠিক উপরে গাছের একটি ডাল ধরিয়া আশ্চর্য ক্ষিপ্রতায় তাহাতে উঠিয়া পড়িলেন | তাঁহার দেখাদেখি অন্যান্য সকলেও তৎক্ষণাৎ উনুন হইতে প্রজ্বলিত কাষ্ঠ লইয়া চতুর্দিকে দৌড়াইয়া নিকটে যে যাহা গাছ পাইল তাহার নিচে কোনও মতে এক দুইখানি কাষ্ঠে আগুন জ্বালাইয়া জোড়ায় জোড়ায় গাছে চড়িয়া যথা সম্ভব উপরে উঠিয়া বসিল | কেবল গোরুর গাড়ির চালক মহেশ গাড়ির সামগ্রী নামাইয়া রাখিয়া গোরুগুলিকে জল পান করাইতে লইয়া গিয়াছিল | সে হয়তো ফিরে নাই, বা ফিরিয়া আসিলেও সে কোনও সাড়াশব্দ করিল না |

কিছুক্ষণের মধ্যেই হাওয়ার দাপটে লন্ঠনটি নিভিয়া গেল | তুমুল বৃষ্টি নামিল | বৃষ্টির জলে সব আগুন একে একে নিভিয়া গেল | সেই বৃষ্টির জলের শব্দ এমন প্রচণ্ড যে আর কিছুই শোনা যায় না | তথাপি, পানু খুড়ো আন্দাজ করিলেন গাছের ডালে ডালে বিরাজমান যুবকরা কেহই টুঁ শব্দটিও করিতেছে না | কে জানে তাহারা জাগিয়া আছে কিনা ? যদি ওই অবস্থায় কেহ ঘুমাইয়া পড়ে (সকলেই যেরূপ ক্লান্ত) ও বৃষ্টিতে পিচ্ছল গাছের ডাল হইতে পড়িয়া যায়, তবে তাহার কী গতি হইবে ? গ্রামে ফিরিয়াই বা কী করিয়া লোকজনকে মুখ দেখাইবেন ? কী কহিবেন ? স্বচক্ষে না দেখিয়া শুধুমাত্র শ্রবণের ভিত্তিতে নরখাদক বাঘের বর্ণনা কী রূপে করিবেন ? – এই সব চিন্তায় তাঁহার ঘুম আসিল না |

ক্রমে ক্রমে বৃষ্টিপাতের বেগ হ্রাস পাইল | বৃষ্টি থামিলে, এদিক ওদিকের বৃক্ষ হইতে দু একটি চড় চাপড়ের শব্দ শুনিয়া পানু খুড়ো নিশ্চিন্ত হইলেন যে বৃক্ষারূঢ় যুবকরা মশার উপদ্রবে ঘুমায় নাই, জাগিয়া আছে | একবার তাঁহার মনে হইল এক এক করিয়া নাম ধরিয়া ডাকিয়া দেখেন কে আছে, কে নাই | ঠিক তখনই তাঁহার গাছের নিচেই পর পর ধপাস-ছপাস শব্দ করিয়া কিছু জিনিস যেন উপর হইতে নিচে বৃষ্টির জমা জলে পড়িল | সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন বৃক্ষ হইতে বিভিন্ন ভয়ার্ত স্বরে শোনা গেল, “কে ? কে পড়ল ?” ... “পানু খুড়ো কোথায় ?” ... “এই, চুপ কর ! টুঁ শব্দও করবি না  ...”

এই ক্ষণিকের আকস্মিক কোলাহল শান্ত হইলে স্পষ্ট শোনা গেল নিচে কোনও ভারী জিনিস ছেঁচড়াইয়া টানিয়া লইয়া যাইবার শব্দ | একটু পরেই কিছু চর্বণ করিয়া ভক্ষণ করিবার শব্দ শোনা গেল – নরখাদকটি কখনও কড়মড়, তো কখনও মুচমুচ শব্দে কিছু চিবায়, আবার কখনও শুধু লালা-মিশ্রিত খাদ্য ভক্ষণের সপসপ শব্দ শোনা যায় | এইরূপ নানাবিধ শব্দে অনেকক্ষণ আহার করিতে করিতে নরখাদকটি হটাত হাঁচিতে শুরু করিল | বোধহয় সে হাঁচির বেগ সামলাইতে না পারিয়া ক্ষিপ্ত হইয়া হাঁচিতে হাঁচিতে সবেগে পলায়ন করিল | পানু খুড়ো ডোমের সাবধান বাণী স্মরণ করিয়া মনে মনে প্রমাদ গণিলেন যে আর বোধহয় সকাল বেলায় মৃতদেহটি অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যাইবে না, সৎকার না করিয়াই গ্রামে ফিরিতে হইবে | ‘কিন্তু,’ তিনি মনে মনে বিস্মিত হইলেন, ‘তাহলে বাঘটার নাম কী ঢুকে যাওয়াতে বাঘটা পালাল ?’

ভগবানদের কী বিচিত্র লীলা | সব আতঙ্ক ক্রমে ক্রমে নিদ্রায় বিলীন হইল | একে একে যে যাহার বৃক্ষশাখা জড়াইয়া ধরিয়া ঘুমে অচেতন হইল |

অতি প্রত্যুষে ডোম আসিয়া এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখিতে পাইল | নিচে মন্দির চত্বরে তিন দিনের বাসি মড়া গরমে ও বৃষ্টিতে ফুলিয়া ঢোল হইয়াছে | আশেপাশে কেহ নাই | একটি তেঁতুল গাছের নিচে নির্বাপিত উনুনের উপর ভাতের হাঁড়ি বসান | পাশে একটি লন্ঠন কাত হইয়া পড়িয়া আছে | অনতিদূরে একটি বস্তা হইতে লুণ্ঠিত যাবতীয় খাদ্য সামগ্রী – চাল, ডাল, বড়ি, চালভাজা, হলুদ, লঙ্কার গুঁড়া ইত্যাদি – ছড়াইয়া ছিটাইয়া পড়িয়া, ও তাহার চারিপাশে কাদায় কোনও চতুষ্পদ জন্তুর ক্ষুরের বিক্ষিপ্ত পদচিহ্ন | ডোম দৃষ্টি এদিক ওদিক করিয়া দেখিল উপরে গাছের ডালে ডালে জনা দশ বারো মানুষ নানাবিধ ভঙ্গিতে – কেহ বানর, কেহ বাদুড়, কেহ পক্ষীর ন্যায় – নিদ্রামগ্ন | ডোম দৌড়াইয়া গিয়া মন্দিরের বন্ধ দরজার উপর করাঘাত করিয়া ডাকিতে লাগিল, “ঠাকুর মশাই ! শিগগির উঠুন | কী ভয়ঙ্কর কাণ্ড হয়েচে ... শিগগির উঠে আসুন, দেখুন | হে মা কালী ...”

এই চীৎকারে পানু খুড়ো জাগিয়া উঠিয়া দ্রুত বৃক্ষ হইতে নিচে অবতরণ করিলেন ও বেশি হাঁকডাক অপচয় না করিয়া, একটি গাছের ডালের খোঁচা দিয়া বাকি সকলকে জাগাইলেন | সকলে নিচে নামিয়া চক্ষু বারম্বার কচলাইয়া দেখিয়া অবাক হইল যে মৃতদেহ এখনও বর্তমান, যদিও এত ফুলিয়াছে যে চেনা মুশকিল !

সৎকার ক্রিয়া সমাপ্ত হইতে বেলা হইল | পুরোহিত মহাশয়কে কিঞ্চিত অধিক দক্ষিণা প্রদান করিয়া পানু খুড়ো ক্ষেদের সহিত কহিলেন, “চাল, ডাল, তেল, ঘি, হলুদ, নুন কিছুই দিতে পারছি না ... কাল রাত্তিরে বাঘ এসে সব নষ্ট করে গিয়েছে |” পুরোহিত মহাশয় আশ্চর্য হইয়া কহিলেন, “বাঘ ?” পানু খুড়ো কহিলেন, “হ্যাঁ, সে কী তর্জন গর্জন ! আমরা তো গাছে উঠে পড়ে প্রাণ বাঁচিয়েছি | তবে ভাগ্যিস বাঘটা মড়াটা খায়নি |” এই তথ্যের সহিত সম্মত হইয়া পুরোহিত মাথা নাড়িলেন | পানু খুড়ো শুধাইলেন, “আচ্ছা, বাঘটা মড়া না খেয়ে চাল, ডাল কেন খেল বলুন তো ? মড়াটা বাসি বলে ? নাকি, জলে ভিজে ফুলে ঢোল হয়েছিল, বলে ? কোথায় থাকে এমন বাঘ ?” পুরোহিত মহাশয় হুগলীর অপর তটের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করিয়া কহিলেন, “শুনেছি ওপারে ভৈরব মণ্ডলের জঙ্গলে নাকি এক আধটা বাঘ থাকে | বা, থাকত ... কিন্তু, বহুদিন কেউ তাদেরকে দেখে নি, তাদের ডাকও শোনে নি | আপনি ঠিক শুনেছিলেন, বাঘের ডাক ?”

ঠিক সেই মূহুর্তে শ্মশানের বাহিরের রাস্তা হইতে সেই ভয়ঙ্কর ডাক শোনা গেল | চমকিত যুবাগণ পানু খুড়োর সহিত একত্রিত হইয়া, পিঠে পিঠ লাগাইয়া ঘনিষ্ঠ হইয়া দাঁড়াইয়া আত্মরক্ষার বেষ্টনী সৃষ্টি করিল | অতঃপর সকলে ভয়ে ভয়ে রাস্তার দিকে চাহিয়া দেখিল একটি লোক একটি চতুষ্পদ জন্তু লইয়া যাইতেছে | রামছাগল অপেক্ষা সামান্য বড় জন্তুটির সহিত মানুষ দেখিয়াই সকলে কিঞ্চিত আশ্বস্ত বোধ করিল | যেন জন্তুটি চিনিতে পারিয়া সমর কহিল, “এতো দেখতে কিছুটা জগুবাবুর ইতিহাসের বইয়ের সেই চেতক ঘোড়াটার মত, তাই না ?” শশাঙ্ক, যে পড়াশোনায় অপেক্ষাকৃত কৃতী, কহিল, “ধুর, দেখছিস না এটার কানে কত চুল, চোখ দুটো ডাগর হলেও কত বোকা বোকা, আর দেখতে কত খিটখিটে ?” পৃষ্ঠে একগাদা কাপড়ের গাঁট চাপান জন্তুটির অবস্থা দেখিয়া বোঝা গেল যে বোঝার ভারে সে নড়িতে পারিতেছে না | লোকটি হাতের লাঠি দিয়া তাহার ঠ্যাঙে প্রহার করিলে সে পুনরায় ভয়ঙ্কর আর্তনাদ করিল | তাহা শুনিয়া সকলে একত্রে শিহরিয়া উঠিল | কেবল পানু খুড়ো ম্রিয়মাণ কণ্ঠে কহিলেন, “ওই তো ! ওই শুনুন, সেই ভয়ঙ্কর ডাক !”

পুরোহিত মহাশয় কাষ্ঠ হাসি হাসিয়া কহিলেন, “মনে হয়, আপনারা বৈরামগঞ্জে এই প্রথম এলেন | তাই এখানকার বিখ্যাত গাধার-ডাক আগে কখনও শোনেন নি |”

---------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ২৬ জুন ২০১৫

বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৩

লাইভ ঠাকুর

|| লাইভ ঠাকুর ||


আজ দশমী | এবার আমাদের পাড়ার পুজোর থিম ছিল লাইভ ঠাকুর | মোড়ের মিষ্টির দোকানের ময়রা হয়েছিল গণেশ, বলিউডের স্বপ্নে বিভোর ঋত্বিক - কার্তিক, পাড়ার হার্টথ্রব চিনির বোন মিনি - লক্ষ্মী, গণেশের বোন তিন্নি - সরস্বতী, আর কমিটির নন্দীবাবু - মা দুর্গা | কোন বউ রাজী হল না ষষ্টির দিন থেকে কাঁধে চার জোড়া হাত লাগিয়ে দশ-হাতা ব্লাউজ পরে এক ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকতে | কখন কোন বাচ্চা এসে চেঁচাবে, “মা ! বাবা গেঞ্জি খুঁজে পাচ্ছে না |” ভোটে নন্দীবাবু জিতলেন | তিনি সব চেয়ে বেশি চাঁদা তুলেছেন ; হাতে, পায়ে, বুকে, পেটে কোন লোম নেই ; হাঁচি, কাশি এইসব ব্যাঘাতকারী ব্যামো নেই ; আর চশমা পরেন না | সিংহ, মোষ আর অসুর হতে কেউ রাজী হল না, আর সবাইকে স্থির হয়ে দাঁড়াতে হবে এই বলতেই গণ্ডগোল | গণেশ বলল ওর পায়ে মিষ্টির রস থাকে,  পিঁপড়ে কামড়াবে | কার্তিকের বলল, ওকে রোজ কয়েক ঘণ্টা এক চোখ টেপা অভ্যাস করতে হয় | মিনির রক্ত ‘ও’ গ্রুপের, খুব মশা কামড়ায় | সরস্বতীর খালি পেটে ঢেকুর ওঠে | আর সবাই বলল রাতে ছ’ঘণ্টা ঘুম চাই | ঠাকুরমশাই সব সমস্যা সমাধান করলেন | আলিপুর থেকে সিংহ আর গোয়ালার কাছ থেকে মোষ ভাড়া করা হবে | পাড়ার একজন চাঁদা দেয়নি, তাকে জোর করে অসুর করা হল | রাত বারোটা থেকে ভোর ছ’টা পর্দা টেনে পর্দানশীনম্ সন্ধিপুজো হবে, যাতে সবাই ঘুমতে যেতে পারে | গণেশ ভোরে ফিরবে দোকান থেকে দু হাঁড়ি ছানার জল  নিয়ে | তাতেই পা ধুলে কাজ হবে, আর চরণামৃতও আলাদা করে বানাতে হবে না |  যখন কোনও ছেলে ভক্তি ভরে প্রণাম করবে তখন কার্তিক তাকে চোখ টিপবে | সে নির্ঘাত ভাববে ভুল দেখেছে | মিনির জন্য কচ্ছপ ছাপের কয়েল জ্বালিয়ে আরতির ব্যবস্থা করা হল | সরস্বতী কে বলা হল ঢেকুর চেপে রাখতে, আর যেই কেউ ফটো তুলবে তখন ‘চীয্’ বলার মতো মুখ করে ঢেকুর ছাড়তে | শেষ সমস্যা, বাথরুম যাওয়ার
কী হবে ? ইলেক্ট্রিশিয়ান রিভলভিং বেদী বানাতে রাজি হলে তারও সমাধান হল | খালি বেদীর পিছনে একটু গ্যামাক্সিন ছেটানোর ব্যবস্থা করতে হল |

একটা কথা কেউ ভাবেনি – বিসর্জন হবে কী করে | আজ দশমীর সকালে জানা গেল পাঁচ জনের কেউই সাঁতার জানে না |


--------------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ১৪ নভেম্বর ২০১৩

শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

গহ্বর চৌর্য কাণ্ড


|| গহ্বর চৌর্য কাণ্ড ||                                 


আমার শৈশব কাটে এক বর্ধিষ্ণু গ্রামে, নাম জৈত্যপুর | জৈত্যপুরের জমিদার নৃসিংহ দেব পৈত্রিক ভিটা ত্যাগ করিয়া কলিকাতা নিবাসী হইবার পূর্বে ভিটার রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধার্থে বহির্বাটীখানি পুলিশ থানার জন্য দান করেন | তাই সেই কালেই জৈত্যপুরে থানা পুলিশ ছিল – নতুবা এই কাহিনীর ঘটনাটি ঘটিত না |

আর একটি কথা – শৈশবে দেখিয়াছি পুলিশের মাথায় পাগড়ি-টুপী | বোধ হয় সেই পাগড়ি-টুপীতে মাথা গরম হয় বলিয়া বহুকাল পূর্বে তাহার সমাপ্তি হয়, ও পুলিশের আধুনিক টুপীর আবির্ভাব ঘটে | সেই পুরাতন পাগড়ি-টুপীর সহিত এই কাহিনী সংযুক্ত |

আমাদের শৈশব কালে সামাজিক জীবন খুবই সুষ্ঠু ও সামঞ্জস্য পূর্ণ ছিল | সমাজে ভেদাভেদ যে ছিল না তাহা নহে, কিন্তু উত্তম, মধ্যম ও অধম একত্রে উঠবস, খাওয়া দাওয়া করিত | ধনী গরিবকে সম্মান, গরিব ধনীকে সম্ভ্রম করিত | শিক্ষিত অশিক্ষিতকে উপেক্ষা, কিম্বা অশিক্ষিত শিক্ষিতকে অবজ্ঞা করিত না | জনতা ও পুলিশ একে অপরকে বিশ্বাস করিত | চোর ও পুলিশের মধ্যে যথেষ্ট সহযোগিতা ছিল |  নেহাত অভাবে না পড়িলে চোর চুরি করা দ্রব্য ভোগ না করিয়া,  সন্নিকটের রামপুর শহরে চোর-বাজারে কম দামে বিক্রয় করিত | সেই জন্য যাহার বাড়িতে চুরি হইত সে থানা যাইবার পরিবর্তে চোর-বাজারে যাইয়া ঢুঁ মারিত | একবার এইরূপ হইল যে বাড়িতে বাড়িতে স্নানের সাবান চুরি হয় | অনুসন্ধান করিয়া
দারোগা জানিলেন যে কোনও এক চোরের ভগিনীর বিবাহ স্থির হইতেছে, তাই সে রোজ সাবান মাখিয়া স্নান করিতে চায় – অন্তত, যতদিন না বিবাহ হয় | সুতরাং, দারোগা চোরের সহিত যোগাযোগ করিয়া এই চুক্তি করিলেন যে সে এক বাড়ি হইতে সাবান চুরি করিয়া একদিন ব্যবহারের পর তাহা পরবর্তী রাত্রে অন্য বাড়িতে রাখিয়া, সেখানকার সাবান লইয়া যাইবে আগামী দিনের জন্য | একদিন কাহারো হামাম সাবান চুরি হইলে, তাহার পরিবর্তে পরদিন সে এক লাক্স সাবান ফেরত পাইল | সাবানটি কাপড় কাচার সোডা দিয়া ফুটাইয়া, গঙ্গাজলের ছিটা দিয়া শুদ্ধ করা হইল, নতুন সাবান কিনিবার প্রয়োজন হইল না |

কখনো সেইরকম বড় কিছু চুরি হইলে পুরস্কার ঘোষণা করা দস্তুর ছিল | পুরস্কারের টাকা চোর ও পুলিশ ভাগাভাগি করিয়া চুরির মাল ফেরত দিত | এমন কথা আমরা ক্বচিৎ শুনিয়াছি যে পুলিশ চুরির অনুসন্ধান করিতেছে | চুরি হইলে পুলিশ কেবলমাত্র জেলেপাড়া, মুচিপাড়া, ঘাঁসীপাড়া যাইয়া সম্ভাব্য চোরের সহিত, পরিস্থিতি অনুযায়ী গোপনে কিম্বা প্রকাশ্যে, যোগাযোগ করিত ও পুরস্কারের রকম দরাদরি করিয়া ফিরিয়া আসিত | যাহার চুরি হইয়াছে সে ক্ষমতা সাপেক্ষ পুরস্কার দিতে রাজী হইত, এবং সেই অনুযায়ী চুরি করা জিনিস ফেরত আসিত | এই ব্যবস্থায় সকলেরই অলিখিত সম্মতি ছিল, কাহাকে কখনো কোনও আপত্তি প্রকাশ করিতে দেখি নাই |

অধুনা থানা অরাজকতার লঙ্কা, পুলিশ সেথায় সুপ্ত কুম্ভকর্ণ | কোনও অপরাধ হইলে থানা যাইতে হয় | পুলিশ অতি কষ্টে প্রাথমিক রিপোর্ট লেখে | সে’কালে পুলিশের কাজ ছিল টহল দিয়া অপরাধের খবর সংগ্রহ করা | তাহার জন্য পাড়া প্রতি বীট-কনস্টেবল ছিল | সে সিপাহী রোজ প্রাতঃকালে পাড়ায় টহল দিতে যাইত, যে যদি সময়কালে কোনও চুরির খবর মেলে, তবে চোর সংসারের নানা কার্যতে ব্যস্ত হইবার, কি বাহিরে যাইবার পূর্বে তাহাকে ধরা যায় | আমাদের পাড়ার বীট-কনস্টেবল ছিল এক শ্যামলাল যাদব | প্রত্যহ প্রত্যুষে দেখা যাইত সে নিদ্রা-ক্লিষ্ট চক্ষু কচলাইতে কচলাইতে টিপ টিপ পায়ে মাথা হেঁট করিয়া থানা হইতে আসিতেছে | তাহার টাক-মাথা প্রভাতের রৌদ্রে চক চক করিত | কিছুক্ষণ পরে সে যখন প্রত্যাবর্তন করিত তখন তাহার হাতে পাগড়ি-টুপী থাকিত | এই প্রথার কারণ, বীট-কনস্টেবলদিগের আচরণে লক্ষ্য রাখিবার জন্য থানার দারোগা পহেলবান সিং এক কৌশল করিয়াছিলেন | প্রতি রাত্রে তিনি স্বয়ং, কিম্বা বিশ্বস্ত সিপাহী দ্বারা, বিভিন্ন পাড়ার বিশেষ বিশেষ স্থানে বীট-কনস্টেবলদের টুপী লুকাইয়া রাখিতেন | সপ্তাহের সাত দিনের জন্য সাতটি গোপন স্থান ধার্য ছিল | সিপাহীদের দায়িত্ব ছিল রাত্রির টহল শেষ করিয়া সপ্তাহের দিন অনুযায়ী যথাযথ গোপন স্থান হইতে নিজ টুপী উদ্ধার করিয়া থানায় ফিরিয়া পহেলবানজীর সামনে হাজিরা দেয়া | শুনিয়াছিলাম যে দারোগা সাহেবের কুকুর শমশের সকল সিপাহীর টুপীর গন্ধের সহিত পরিচিত ছিল | তাহাকে ধোঁকা দিয়া কোনও সিপাহীর পক্ষেই অপর সিপাহীর টুপী দিয়া সংক্ষেপে কাজ সারিবার উপায় ছিল না | সিপাহীর শরীরের এবং টুপীর গন্ধের মধ্যে বিন্দুমাত্র বৈষম্য বোধ করিলেই শমশের অশান্ত হইয়া গুরুগম্ভীর হাঁকডাকে থানা মাথায় করিত |

পুলিশের সেই লাল কাপড়ের শিরস্ত্রাণ-সদৃশ টুপী ছিল সদ্য সমাপ্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিদ্যমান স্মারক | সে’কালে অপরাধ অপেক্ষাকৃত ভাবে কম ছিল – পুলিশের কাজে মস্তিষ্কের প্রয়োজন তেমন ছিল না | এই দেশের উষ্ণতা-জনিত সিপাহীদের মাথার ঘাম ব্রিটিশ আমল হইতে পায়ে না পড়িতে পাইয়া সেই সব টুপীতে পুঞ্জিত লবণে সঞ্চিত ছিল | অতএব, সিপাহী ভিন্ন অন্য কাহারো ওই পাগড়ি-টুপীর প্রতি লোভ হয় এ সম্ভাবনা ছিল না | আমরা খেলিতে খেলিতে দেখিয়াছি সে টুপী লুকানো আছে – কোনও গাছের ফোকরে, কি আটচালার খড়ের নীচে | কিন্তু তাহা পাইলেও কোনও দুষ্ট বুদ্ধির প্ররোচনা কখনও চিত্ত বিচলিত করে নাই | শ্যামলাল যাদব প্রায়শই ঘুমাইতে ঘুমাইতে প্রত্যাশিত জায়গা হইতে টুপী সংগ্রহ করিয়া টহল শেষ করিত, থানায় ফিরিয়া রিপোর্ট দিত, “সাহব, মাঠপাড়া মে সব ঠিক হ্যায় |” মাঠপাড়া  ছিল জৈত্যপুরে আমাদের পাড়া |

এক শনিবার, বিহারীদের ছট্ পর্বের দিন – প্রত্যুষে সূর্যোদয়ের পূর্ব হইতেই পথ ঘাট স্নানার্থী লোকজনে গিজগিজ করিতেছে | বেলা বাড়িলে যখন ভিড় কমিল, তখন দেখা গেল শ্যামলাল বীটে যাইতেছে | সেই দিন তাহার টুপী থাকার কথা খেলার মাঠের শেষে নদীর পাড়ে এক কাঁঠাল গাছের ফোকরে | যখন সে ফিরিল, দেখিলাম তাহার লাল টুপী হাতে না ধরিয়া মাথায় রাখিয়াছে, কারণ তাহার কোলে এক রোরুদ্যমান বালক | শিশুর ক্রন্দন শুনিয়া পাড়ার কিছু জনগণ ছুটিয়া আসিল | কিন্তু দেখা গেল সে শিশু পাড়ার নহে | সে কিছু কহে না, কেবল কাঁদে | শ্যামলালকে প্রশ্ন করিলে সে জানাইল যে সে যখন টুপী লইয়া ফিরিতেছিল তখন গাছের পশ্চাৎ হইতে এক শিশুর ক্রন্দন শুনিতে পায় | সেখানে গিয়া দেখে এই শিশুটি এক গর্তের পার্শ্বে বসিয়া আছে | তাহার দুই হাত গর্তের কিনারায় রাখিয়া সেই ভাবে সে যেন কিছু জাপটাইয়া ধরিয়া উঠাইতে চেষ্টা করিতেছে, ও বিফল হইয়া কাঁদিতেছে | ইহার বেশি বিশেষ কিছু শ্যামলাল বলিতে পারিল না | এই কথাবার্তার সময় শিশু বারম্বার খেলার মাঠের দিকে হাত দেখাইয়া শ্যামলালের কান ধরিয়া টানিতে থাকিল | তখন আমাদের প্রতিবেশী ও পাড়ার বিশিষ্ট গণ্যমান্য জন মহাদেব বাবু কহিলেন, “শ্যামলাল, এ লড়কা কো ময়দান ওয়াপস লে চলো |” কার্যত আমরা সকলেই শ্যামলাল ও শিশুর সহিত মাঠের দিকে অগ্রসর হইলাম | দূর হইতে তাহার টুপী লুকাইবার কাঁঠাল গাছ দেখাইয়া শ্যামলাল জানাইল যে তাহার পিছনে সে শিশুটিকে বসিয়া কাঁদিতে দেখিতে পায় |

আমরা সেই গাছের কাছে পৌঁছানো মাত্র সে শিশু শ্যামলালের কোল হইতে অস্থির হইয়া নামিয়া দৌড়াইয়া কাঁঠাল গাছের পিছনে গেল | সেখানে মাটিতে এক গর্ত দেখাইয়া সে কহিল, “এই তো আমার গত্ত ! একে আমার বাড়ি নিয়ে চলো |” শ্যামলাল টুপী খুলিয়া শিরে করাঘাত করিয়া কহিল, “মহাদেও বাবু, অব হম ক্যা করে বতাইয়ে |” মহাদেব বাবুও (বোধ হয় শ্যামলালের মতো শিরে করাঘাত করিতে গিয়া) অপ্রতিভ হইয়া মাথা চুলকাইলেন | বাঁকি সকলে নীরব থাকিল | কেবল আমি সন্দিগ্ধ-মনে প্রশ্ন করিলাম, “গত্ত আবার কী করে কেউ বাড়ি নিয়ে যায় ?” সে কথা শুনিয়া সে শিশু উচ্চস্বরে জেদ করিল, “আমার গত্ত, আমি নেব, তোমার তাতে কী ?“

অতঃপর মহাদেব বাবুর নেতৃত্বে জনগণ থানার দিকে রওয়ানা হইল | থানা পৌঁছাইয়া দেখা গেল ছট্ স্নান সারিয়া পহেলবানজী সুপ্রসন্ন চিত্তে আসন্ন শীতের প্রথম হাওয়ায় বাহিরে কেদারায় বসিয়া চা পান করিতেছেন | তিনি সম্ভ্রম সহকারে মহাদেব বাবুকে নমস্কার করিয়া কহিলেন, “কী বেওপার মহাদেও বাবু, এত সোকাল সোকাল ?” তারপর তিনি শ্যামলালের কোলে অস্থির শিশুটি দেখিয়া প্রশ্ন করিলেন, “আরে, এ সামলাল, এ বছুয়া ক্যহাঁ সে আইল্, সুবহ্, সুবহ্ ?” ঘটনার গুরুত্ব অনুমান করিয়া রামেশ্বর জমাদার আশ্চর্য তৎপরতার সহিত এক হাতল-ভাঙ্গা কুর্সি আনিয়াছিল | ততোধিক ক্ষিপ্রতার সহিত মহাদেব বাবু তাহা দখল করিয়া কহিলেন, “পহেলবানজী, এই বাচ্চা হারিয়ে গেছে | নদীর ধারে বসে কাঁদছিল, শ্যামলাল বীটে গিয়ে পেয়েছে | একটু খোঁজ খবর নিয়ে একে বাড়ি পাঠিয়ে দিন |”

পহেলবানজী – “য়েহি বাত ? এ রামেসর, ব্যবুয়া কো অন্দর লে যাও | নজর রখনা, ঠিক সে !
“মহাদেও বাবু, চিন্তা নেই | কিছু সময় লাগবে | আপনি বিকেলে একটু খবর লিয়ে যাবেন |
“বাকি আপনারা সব এখন ওয়াপস জান |
“আপনি বসুন মহাদেও বাবু, কিছু বিচার-বিমর্স করি আমরা |”

জনগণ বিদায় হইলেও আমি রহিলাম | আবহাওয়া ও রাজনীতির ক্ষেত্রে জোচ্চুরি-জনিত অনিশ্চয়তা প্রসঙ্গে বিচার বিমর্শ করিয়া পহেলবানজী মহাদেব বাবুকে বিদায় করিলেন | তিনি আমাকে লইয়া বাড়ি ফিরিয়া চাকরের হস্তে সেই শিশুর জন্য কিছু দুধ ও ফল থানায় পাঠাইলেন | চাকরের উপর ভরসা না হওয়ায় আমাকে সাথে পাঠাইলেন | মহাদেব বাবু বিপত্নীক, স্থানীয় ইস্কুলের এককালীন হেড-মাস্টার – অবসর লইয়া গ্রামেই বসবাস করিতেছিলেন আমাদের প্রতিবেশী হইয়া | তাঁহার এক মাত্র পুত্র কলিকাতায় চাকুরীরত | নিঃসঙ্গ জীবনে আমার উপর তিনি কিঞ্চিত সদয় | বস্তুত, কোনও দৈনিক কার্যতে বা পদচারণে যাইবার পূর্বে তিনি আমার খোঁজ নেন, ও পারিলে আমি তাঁহাকে সঙ্গ দিই | এই কারণে লোকে বলে আমি তাঁহার ন্যাওটা |

বৈকালে মহাদেব বাবু রওয়ানা হইলেন থানায় ‘কেসের’ অগ্রগতি জানিবার জন্য | আমিও তাঁহার ডাকে তাঁহার সহিত যাইলাম | থানায় জানা গেল ‘কেস’ বিশেষ কিছু অগ্রসর করে নাই | প্রথমত, সমস্ত বীট-কনস্টেবল ফিরিয়া আসিলে, কাহারো নিকট হইতে কোনও বিশেষ ঘটনা জানা যায় নাই | কেবল দিনকর পাঁড়ে, যে বেনেপাড়ায় গত রাত্রে প্রহরায় ছিল, ছটের ভোরবেলায় একজনকে দৌড়াইয়া পলাইতে দেখে | কিন্তু বেনেপাড়ায় কোনও চুরির ঘটনা ঘটে নাই | দ্বিতীয়ত, সেই শিশু সারা দিন কোনও প্রশ্নের উত্তর না দিয়া কেবল কাঁদিয়াছে – তাহার মুখে একই প্রশ্ন, “আমার গত্ত কই ?” শেষে সে ক্লান্ত হইয়া দুধ ও ফল খাইয়া এক বেঞ্চে ঘুমাইয়া পড়িয়াছে |

মহাদেব বাবু সযত্নে শিশুর নিদ্রাভঙ্গ করিলেন | শ্যামলাল তাহার হাত, পা, মুখ এক ভিজা গামছা দিয়া মুছিয়া দিলে, মহাদেব বাবু শিশুকে কোলে বসাইলেন | সে এদিক ওদিক চাহিল ও প্রশ্ন করিল, “আমার গত্ত কোথায় ?”

মহাদেব বাবু – “তোমার নাম কী বাবা ?”
শিশু – “না |”
মহাদেব বাবু – “তোমার নাম নেই ?”
শিশু – “না |”
মহাদেব বাবু – “ও !”
আমি – “তোমাকে বাড়িতে কী বলে ডাকে ?”
শিশু – “খোকা |”
মহাদেব বাবু – “তাই বুঝি ? তবে যে তুমি বললে তোমার নাম নেই! “
শিশু – “নেই না, আমার নাম খোকা ! আমার বাবার নাম বাবা !”
মহাদেব বাবু – “ও আচ্ছা, আচ্ছা ... হুম, বুঝেছি |”
আমি – “সবারই তো নিজের বাবাকে বাবা বলেই ডাকে |”
মহাদেব বাবু - “তা, তোমার বাবার নাম কী যেন বললে ?”
শিশু – “বাবা |”
মহাদেব বাবু – “বাবার নাম জানো না ?”
শিশু – “বললাম তো, বাবার নাম বাবা |”
মহাদেব বাবু – “ঠিক কথা | আচ্ছা, এটা বলো, তোমার বাবা কী করে ?”
শিশু – “বাবা খালি বকে | খুব বকে |”
মহাদেব বাবু – “কাকে বকে ? কেন বকে ?”
শিশু – “বাবা আমাকে বকে | আমি বাড়িতে গত্ত খুঁড়তে চাই, বাবা বাড়িতে গত্ত খুঁড়তে মানা করেছে, খুঁড়লে পরে বকে |”
মহাদেব বাবু – “তুমি কোথায় থাক ? তোমার বাবা, মা কোথায় থাকে ?”
শিশু – “আমরা সবাই বাড়িতে থাকি |”
মহাদেব বাবু – “তোমার বাড়ি কোথায় ?”
শিশু – “বললাম তো | ওই যেখানে বাবা থাকে, মা থাকে, ওটাই আমার বাড়ি |”
মহাদেব বাবু – “তা, বাবা বকে তাও তুমি গর্ত কেন খোঁড় ?”
শিশু – “তুমি এত প্রশ্ন কেন করছ ? আমার গত্ত কোথায় ?”
পহেলবানজী – “ফির ওহি জিদ ! এ তো বহুত জিদ্দি বাচ্চা আছে |”
মহাদেব বাবু – “কই তুমি তো বললে না তুমি গর্ত কেন খোঁড় |”
শিশু – “জায়গা করতে গত্ত খুঁড়ি | গত্তে জায়গা হয়, জানো না বুঝি ?”
মহাদেব বাবু – “তুমি গর্ত খোঁড় বাড়িতে জায়গা করতে ? জায়গা করে কী করবে ?”
শিশু – “আমার নতুন খেলনা এনে কোথায় রাখব ? বাবা আমায় বলেছে, বাড়িতে তো আর জায়গা নেই, তাই আরও যদি খেলনা চাস তো আগে বাড়িতে জায়গা কর |”
মহাদেব বাবু – “ওহ ! তা, তুমি মাঠে কেন গত্ত খুঁড়তে গেলে ? বাড়িতে খুঁড়লেই তো পারতে |”
শিশু – “বললাম তো যে বাবা বকে | বলে, খবরদার যদি বাড়িতে গত্ত খুঁড়েছিস ... তুমি চলো না বাপু, আমার গত্তটা বাড়ি নিয়ে যাব, ওতে অনেক জায়গা, অনেক খেলনা আঁটবে |”
পহেলবানজী – “এ খোকা | খিলোনা এখন কোথায় মিলবে ? যখন কিনবে তখন গত্ত লিয়ে লিবে |”
শিশু – “না, না | আমি কাল ছটের মেলায় খেলনা দেখেছি | চাইলাম তো বাবা বলল, বাড়িতে আগে জায়গা কর, তবে খেলনা পাবি |”
মহাদেব বাবু – “তাই তো !”
অতঃপর মহাদেব বাবু যেন উপরোক্ত সংলাপ অনুধাবন করিয়া কহিলেন, “ও ! এই ব্যাপার |”

কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা বিরাজ করিলে পহেলবানজী অনেক চিন্তার পর মহাদেব বাবুর সহিত সম্মত হইয়া একবার, “ও ! য়েহি বেওপার |”  কহিয়া অন্যমনস্কভাবে গোঁফে তা দিতে লাগিলেন | এদিকে সন্ধ্যা হয় হয়, রামেশ্বর এক হারিকেন বাতি রাখিয়া গেল | মহাদেব বাবু কিঞ্চিত ইতস্তত করিয়া পহেলবানজীকে প্রশ্ন করিলেন, “তাহলে বাচ্চাটা আজ রাত কোথায় কাটাবে ? এটা তো ভাবার বিষয় !”
পহেলবানজী – “কিছু চিন্তা নাই | আমি ওকে গোমতীকে পাস সুলিয়ে দিব | খানা-পিনা ভি ওহি করিয়ে দিবে | কোনও বেওপার নেই | আপনি এখন আসুন | কাল ফির বাত হোবে |”

গোমতী দারোগা সাহেবের স্ত্রী | নিঃসন্তান মহিলাটি মাতৃত্বের সকল স্নেহ ও কোমলতার এক প্রতিমূর্তি | কোনও শিশু পাইলে বড়ই মাতৃস্নেহে তাহার আদর যত্ন করে | হোলির দিন পাড়ার সব শিশুরা তাহার হাতের মালপুয়া ও ঘুঘনী খায় | অতএব, মহাদেব বাবু নিশ্চিন্ত হইয়া থানা হইতে বাড়ি ফিরিলেন |

পরদিন সকাল হইতেই হুলস্থূল কাণ্ড | মা আমাকে ঘুম ভাঙ্গাইল যে মহাদেব বাবু ডাকিতেছেন | ত্বরায় মুখ চোখে জল দিয়া ছুটিলাম, দেখিলাম থানা হইতে পেয়াদা হারাধন আসিয়াছে, যে মহাদেব বাবুকে পহেলবান সাহেব জোর তলব করিয়াছেন | থানায় গিয়া দেখিলাম পহেলবান
জী দ্রুত পায়ে থানার বাহিরে টহল দিতেছেন | মহাদেব বাবুকে লইয়া সোজা নিজ কক্ষে গেলেন | রামেশ্বর চা আনিতে গেল | ইত্যবসরে যাহা জানা গেল তাহা এই |

গত রাত্রে পহেলবান
জীর বাড়িতে শিশুটি খুবই দাঙ্গা করিয়াছে - রাতভোর একই কান্না, একই প্রশ্ন, “আমার গত্ত কই ?” এই গোলমালে জাগিয়া থাকিতে, থাকিতে শেষ রাত্রে দারোগার হটাত মনে পড়ে যে তিনি শ্যামলালের পাগড়ি-টুপী লুকাইয়া আসিতে ভুলিয়াছেন | তখন তিনি রামেশ্বরকে লইয়া যাইয়া খেলার মাঠের শেষে নদীর পাড়ে  কাঁঠাল গাছের ফোকরে শ্যামলালের পাগড়ি-টুপী লুকাইয়া আসেন | কিন্তু তাহাঁর খেয়াল থাকে না যে সেদিন রবিবার, মন্দিরে টুপী রাখিবার কথা | শ্যামলাল সেই রাত্রে ছটের আনন্দে গাঁজা-ভাং এর নেশা করিয়াছিল | সকালে নেশা কাটিবার পূর্বেই অভ্যাস মতো মন্দিরের আটচালা হইতে পাগড়ি-টুপী সংগ্রহ করিতে যায় | টুপী না পাইয়া সে পহেলবানজীকে আসিয়া কহে যে তাহার টুপী চুরি হইয়াছে | ঠিক সেই সময় গোমতী শিশুর আবদারে পরাক্রান্ত হইয়া তাহাকে থানায় রাখিতে আসিয়াছিল | শিশু শ্যামলালকে দেখিবামাত্র প্রশ্ন করে, “আমার গত্ত কোথায় ?” হতভাগা শ্যামলাল নেশার ঝোঁকে, নাকি প্রশ্নটি টুপী সম্বন্ধিত ভাবিয়া, উত্তর দেয়, “চোরি হয়ে গেছে |”

সর্বনাশ ! শিশু তৎক্ষণাৎ গোমতীর হাত ছাড়াইয়া, মাটিতে আছাড় খাইয়া পড়িয়া চিৎকার করিয়া কাঁদিতে লাগে | তাহার হাত পা ছোঁড়া সামলান যায় না |  কাঁদিতে কাঁদিতে তাহার মুখ চোখ লাল হয় ও চক্ষের মনি পালটাইয়া যায় | শেষে মুখে ফেনা হইয়া সে প্রায় অজ্ঞান মতো হয় | কোন মতে গোমতী তাহাকে আবার বক্ষে লইয়া, ও বারম্বার এই সান্ত্বনা দিয়া যে পহেলবানজী চোর অবশ্যই ধরিয়া তাহার নিকট হইতে গর্ত বরামত্ করিবেন, শিশুকে লইয়া ঘরে ফেরত যায় |

চায়ে চুমুক দিয়া মহাদেব বাবু কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া প্রশ্ন করিলেন, “আচ্ছা পহেলবানজী, এখনও কেউ খবর করে নি যে কোনও বাচ্চা হারিয়ে গেছে ?”
দারোগা – “ওহি তো মুস্কিল বাত আছে | সে রোকম কোনও রিপোট নাই | সব সিপাহীকে আমি পুছেছি | আপনি ভি পুছতে পারেন |”
মহাদেব বাবু – “তাহলে কি ঢাক পিটিয়ে সারা গ্রামে এই খবর প্রচার করা যায় যে একটা শিশুকে পাওয়া গেছে ? যদি কেউ কিছু বলতে এগিয়ে আসে |”

এই সব কথা বার্তা চলিতেছে এমন সময় সিপাহী দিনকর পাঁড়ে আসিয়া জোরে সেলাম ঠুকিল | তাহার উসখুস ভাব ভঙ্গি দেখিয়া পহেলবানজী তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “ক্যা বাত ?” দিনকর তখন জানাইল যে ছট্ স্নানের পূর্বের রাত্রে সে যাহাকে পলাইতে দেখিয়াছিল তাহাকে তখন চিনিতে পারে নাই, কারণ সেই দুষ্কৃতিকারী বহুকাল যাবত কোনও দুষ্কর্ম করে নাই | কিন্তু, তাহাকে পরদিন খেয়া ঘাটে ফেরী নৌকার জন্য অপেক্ষা করিতে দেখিয়া দিনকর তাহাকে চিনিতে পারে যে সে পুরাতন সিঁধকাটা চোর গণেশ | দিনকরের সন্দেহ হয় যে গণেশ সেই রাত্রে কোনও কুকর্ম করিয়া পলায়ন করিতেছে | সে গণেশকে চাপিয়া ধরিয়া তাহার জেরা করে, কিন্তু গণেশ কোনও রূপ কুকর্ম কবুল করে না | তাহার কথাবার্তা হইতে এইরূপ বোধ হয় যে গণেশ কোনও কারণে ভয়ঙ্কর ভাবে ভীত, কিন্তু সে তাহা কোনও মতেই স্বীকার করে না | এই পরিস্থিতিতে দিনকর গণেশকে ধরিয়া আনিয়েছে যে যদি পহেলবানজী তাহাকে জেরা করিতে চাহেন |

পহেলবানজী রাজী হইলে গণেশকে কক্ষের ভিতর আনা হইল | দেখা গেল সত্যিই সে অদ্ভুত ভাবে ভয়ভীত, দুই নিষ্প্রভ চোখ বসিয়া গিয়াছে, নিদ্রার অভাবে ওষ্ঠ শুষ্ক ও কালো | মনে হইল যে সে যেন দিনভোর খায় নাই | পহেলবানজীর আদেশে রামেশ্বর তাহাকে জল আনিয়া দিলে সে তাহা পান করিয়া মাটিতে উবু হইয়া বসিয়া দুই হস্তে মস্তক ধরিয়া কাঁদিতে লাগিল, “হুজুর, আমার প্রাণ বাঁচান, আমাকে গারদে রাখুন |”

তাহার অনেক কান্নাকাটি, ও পরিবর্তে দারোগা সাহেবের দাপট, অনুনয়, সান্ত্বনা ও প্রলোভন বাদে গণেশ জানাইল যে ছটের পূর্ব সন্ধ্যায় তাহার মনে হয় যে সে অনেক দিন সিঁধ কাটে নাই, এই ভাবে দিন কাটিলে ক্রমে ক্রমে সে পেশা-চ্যুত হইবে | তাহার তখন চিন্তা হয় সে বার্ধক্যে খাইবে পরিবে কী করিয়া | অনেক চিন্তা ভাবনা করিয়া সে স্থির করে যে সে রাত্রে বেনেপাড়া যাইয়া দেখিবে কেহ প্রত্যুষে ছট্ স্নানে যাইতেছে কি | এবং সেরকম মক্কেল পাইলে সে সেই সুযোগ লইয়া সিঁধ কাটিবে - শুধু মাত্র হাতযশ বজায় রাখিবার জন্য, তেমন কোনও বড় চুরি সে করিবে না | রাত্রে শুইবার পূর্বে সে বেনেপাড়া যাইয়া চারিদিক পরীক্ষা নিরীক্ষণ  করে | শিবানন্দ স্যাঁকরার বাড়ি হইতে কথাবার্তা শোনা যাইতেছিল | কান পাতিয়া তাহার ঠাহর হয় যে শিবানন্দ প্রত্যুষে রওয়ানা হইবার প্রস্তুতি করিতেছে | তখন গণেশ ঠিক করে যে সে প্রত্যুষ-পূর্বের অন্ধকারে আসিয়া সিঁধ কাটিবে | মাটি দিয়া গাঁথা ইটের দেয়াল, বিশেষ সমস্যা হইবে না | সে প্রায় চার ঘটিকায় আসিয়া দেখে বাড়ি অন্ধকার | সে অনুমান করে যে শিবানন্দ ইতিমধ্যেই ছট্ স্নানে গমন করিয়াছে | সে মন দিয়া দেয়ালের মাটি কাটিতে শুরু করে | কিন্তু, হটাত সেই শয়নকক্ষ, যাহার দেয়ালে সে সিঁধ কাটিতে শুরু করিয়াছিল তাহার ভিতর হইতে উচ্চস্বরে শোনা যায় শিবানন্দর গলায়, “এতদিন তো ব্যাটা বেশ হাত গুটিয়ে ছিল | আজ কি আমি বাড়ি থাকব না জেনে সেই সুযোগ নিয়ে মাটি কাটবে ঠাউরেছে ? ভেবেছে কী সে, হ্যাঁ ? মারের ভয় নেই বুঝি ?” ভিতর, বোধহয় রান্নাঘর, হইতে  শিবানন্দর স্ত্রীর ত্রস্ত কণ্ঠে শোনা যায়, “আস্তে বলো | শুনে ফেললে ছেলেটা চমকে উঠে ভয় পাবে |”
শিবানন্দ – “শোনে শুনুক | তোমার জ্বালায় তো এই বাড়িতে জোরে কথা বলার উপায় নেই | কী মুশকিল !”
স্ত্রী – “কথা বলা এক, আর মারধোর করা আর এক | তুমি এত বড় একটা মানুষ, ওকে পেটালে ও কি আর বাঁচবে ?”
শিবানন্দ – “তবে কি চোখ কান বুজে ভিটের মাটি কাটা সহ্য করব ?”
স্ত্রী – “মাটিই তো কাটছে, সিঁধ তো নয় |”
শিবানন্দ – “তুমি কচু জানো | মাটি কাটা থেকে সিঁধ কাটা - বেশি দূর নয় | মাটি কাটুক না, তারপর আমি ধরব আর  মেরে হাড়গোড় আর মাংস আলাদা করে দেব | আস্ত রাখবো না |”
স্ত্রী – “তোমার বাবা ঠিক বলেছিল, রাগলে তো তুমি নিজের ছেলেকেও খুন করতেও পারো |”
শিবানন্দ – “সাবধান ! বলে দিচ্ছি, আমি ভিটেয় খোঁড়াখুঁড়ি সইবো না, একটা হেস্তনেস্ত করবোই |”

এই কথাবার্তা শুনিতে শুনিতে গণেশের হাত পা অবশ হয়, সে বোঝে যে সে মারাত্মক ভুল করিতে চলিয়াছে – জাগ্রত গৃহস্থ তাহার অপচেষ্টা ধরিয়া ফেলিয়াছে | সেই সময় সে শোনে শিবানন্দ বলিতেছে, “আর দেরী করবো না | দাও দেখি আমার লাঠিটা, আর আলোটা একটু ধরো |” তৎক্ষণাৎ সে অতি মনোবলে শিথিল হস্ত-পদ সঞ্চালন করিয়া সিঁধকাঠি তুলিয়া দৌড় দেয় | যাইতে যাইতে সে দেখে দিনকর পাঁড়ে টহল দিতেছে | তখন সে সারাদিন গৃহে লুকাইয়া রহিয়া, সারাদিন চিন্তা করিয়া স্থির করে যে তাহার কুকর্ম অবশ্যই ধরা পড়িবে, সুতরাং তাহার গ্রাম হইতে পলায়ন করা উচিত |

গণেশের বৃত্তান্ত শুনিয়া পহেলবান
জী তাহাকে সোজা গারদে চালান করিলেন | গণেশ বিশেষ আপত্তি করিল না, নিশ্চয় এই ভাবিয়া যে গারদে সে শিবানন্দর প্রহার হইতে বাঁচিতে পারিবে | ওদিকে পহেলবানজী হারাধনকে পাঠাইলেন শিবানন্দকে তলব করিতে, যাহাতে তাহার বয়ান নেয়া যায় যে গণেশ কিছু চুরি করিয়াছে কি না | ইহার পর পহেলবানজী আমাদের ছুটি দিলেন |

বৈকালে থানা হইতে কোনও ডাক না আসায় অস্থির হইয়া মহাদেব বাবুর বাড়ি সম্মুখে পায়চারী করিতে লাগিলাম | আমায় দেখিয়া তিনি হাস্যমুখে কহিলেন, “কী নীরেন, তোমার তর সইছে না বুঝি | আচ্ছা দাঁড়াও, আমি চাদর আর ছড়িটা নিয়ে আসি |”

থানায় গিয়া দেখা গেল পহেলবানজী কক্ষে নাই | গারদের ভিতরে গণেশ ও বাহিরে শিশু, এবং শিশুর তদারকিতে নিরত রামেশ্বর | প্রথম দুই জনে খুব ভাব হইয়াছে | গারদের এপারে ওপারে বসিয়া তাহারা ঘনিষ্ঠ ভাবে গল্প করিতেছে | দারোগা সাহেবের জন্য অপেক্ষায় বসিয়া আড় পাতিয়া শুনিয়া বুঝিলাম যে আসলে গণেশ শিশুকে নানাবিধ গর্ত খোঁড়ার প্রণালী ও কী কী বিশেষ সাবধানতা অবলম্বনের দরকার তাহা বুঝাইতেছে | শিশু অতি গভীর মনোযোগ সহকারে তাহা শুনিতেছে | এঁটেল মাটি, বেলে মাটি, শক্ত মাটি, নরম মাটি, গভীর গর্ত, ফালাও গর্ত, খাল, সুরঙ্গ ইত্যাদি অনুযায়ী প্রণালী যে বিভিন্ন তাহা আমি জানিতাম না | সশব্দে ও নিঃশব্দে গর্ত কাটার মধ্যে আশ্চর্য তফাত | গর্তে মানুষ প্রবেশ করিবে কি না তাহার উপর নির্ভর করে কাটা মাটি কিভাবে রাখা বা ফেলা হইবে | গর্ত কাটিয়া যদি তাহাতে কিছু ফেলিয়া, অথবা গর্ত শূন্য রাখিয়া, তাহা আবার বুজাইতে হয় তবে কাটা মাটির কিছু পরিমাণই হাতের কাছে রাখা হইবে ও বাকি মাটি ফেলিতে হইবে | কাজ শুরু করিবার পূর্বেই সেই সব পরিমাণের হিসাব করা আবশ্যক | এই পরিমাণ মাটির প্রকৃতি ও আর্দ্রতার উপর নির্ভর করিবে | দেখিলাম শিশু মাঝে মাঝে এমন এক দুই প্রশ্ন করিতেছে যে মনে হইল সে এই বিদ্যা অধ্যয়ন করিতে সক্ষম | সব বৃত্তান্ত শুনিয়া শেষে শিশু জানাইল তাহার এক গর্ত চুরি হইয়াছে | পহেলবান
জী সেই গর্ত চোরের সন্ধানে আছেন | তাঁহার নাম শুনিয়া শমশের আসিয়া শিশুর গাল চাটিয়া লেজ নাড়িয়া ঘনিষ্ঠ হইয়া বসিল |

ঠিক এই সময় পহেলবানজী সবেগে কক্ষে প্রবেশ করিয়া মাথার টুপী দ্রুত খুলিয়া আপন কেদারায় বসিয়া শরীর এলাইয়া দিলেন | তাঁহার দৃষ্টিপাতে গণেশ উঠিয়া কয়েদ-কক্ষের গভীরে লুকাইল | শিশু তাঁহার নিকটে আসিয়া প্রশ্ন করিল, “আমার গত্ত চোর ধরেছ ?” পহেলবানজী কোনও উত্তর না দিয়া অঙ্গুলি দ্বারা রামেশ্বরকে নির্দেশ করিলেন শিশুকে গোমতীর কাছে লইয়া যাইতে |  সে শিশুকে লইয়া গেলে তিনি জানাইলেন যে শিবানন্দের সন্ধানে হারাধন তাহার বাটীতে গিয়া দেখে সে নাই | সে দুই দিনের জন্য মুঙ্গেরে গিয়াছে, কোনও গহনা ক্রয় সংক্রান্ত ব্যাপারে | তাহার যাওয়ার দিন, অর্থাৎ ছটের দিন, প্রতিবেশীরা দেখে বাড়ি বন্ধ, কেহ নাই | পরদিন দেখা যায় বাড়ি খোলা, ভিতরে তাহার স্ত্রী শান্তিবালা শয্যাগত | সে ভয়ঙ্কর অসুস্থ, ঘন ঘন মূর্ছা যাইতেছে | কখনো স্বামীর, কখনো বা পুত্রের নাম লইয়া কাঁদিতেছে | ছটের দিনের ও তত্পূর্বের রাত্রির কথা কিছুই তাহার মনে নাই |

মহাদেব বাবু প্রশ্ন করিলেন, “বাড়িতে আর কেউ নেই, ছেলে মেয়ে, আত্মীয় স্বজন ?”
পহেলবানজী – “সিবানন্দের তো এক বেটা ছিল | কেউ বলছে কী সে বাবার সঙ্গে গেছে মুঙ্গের |”
মহাদেব বাবু স্বগতোক্তি করিলেন, “আশ্চর্য, গণেশের কথায় মনে হল বউটা ছটের সকালে ঠিক ছিল | তাহলে সেদিন সে কোথায় গেল ? আর ফিরে এসে অসুস্থই বা হল কী ভাবে ? হুম্ ...
“যাক গে ! চলো নীরেন, বাড়ি যাই |”

মহাদেব বাবু উঠিয়া আমাকে লইয়া বাড়ি ফিরিলেন |  রাত্রি-ভোজ সম্পন্ন হইয়াছে কি হারাধন হারিকেন হাতে লইয়া আসিয়া ডাকিল |

থানায় আসিয়া দেখি পহেলবানজী দ্রুতগতিতে পদচারণ করিতেছেন ও গণেশ গারদের বাহিরে মাটিতে বসিয়া আছে | রামেশ্বর দরজায় প্রহরারত | আমরা প্রবেশ করিতেই বসিতে ইঙ্গিত করিয়া পহেলবানজী নিজস্ব কেদারায় স্থান গ্রহণ করিলেন, এবং তৎক্ষণাৎ গণেশ বলিতে শুরু করিল, “বাবু, ওই খোকা শিবানন্দ স্যাঁকরার ছেলে | আমি ওর সাথে কথা করে ধরতে পেরেছি | বাবা বাড়ি থেকে বেরোতেই খোকা পালিয়ে গেছিল নদীর ধারে, গত্ত খুঁড়তে | সবাই ভাবছে খোকা বাবার সাথে মুঙ্গেরে গেছে | হয়তো খোকার খোঁজ না পেয়ে ওর মা সেদিন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আশে পাশে এদিক ওদিক খুঁজেছে | খুঁজে না পেয়ে বাড়ি ফিরে কাঁদতে লেগেছে | কেউ বুঝছে না আসল কথা কী |”
পহেলবানজী – “অব ব্যতাইয়ে বেওপার ... কী রকোম এই ব্যচ্চা সবাইকে পরেশান করেছে |”
শিবানন্দ বাবু – “তাহলে তো ব্যাপার চুকে গেল | খোকাকে এখন বাড়ি পাঠিয়ে দিলেই হল, শিবানন্দ ফিরে আসার আগে |“
পহেলবানজী – “এতো সোজা না আছে বেওপারটা, মহাদেও বাবু | গণেশ, ব্যতাও ইনকো |”
গণেশ – “বাবু, খোকা আমায় বলেছে ও ওর সেই গত্ত নিয়ে তবেই বাড়ি ফিরবে | গোমতী ভাবীকেও বলছে, পহেলবানজীকে বলো চোরের কাছ থেকে আমার গত্ত এনে দিতে, তবে আমি বাড়ি যাবে | আমার ভয় হচ্ছে যে জোর করলে খোকা আবার বাড়ি থেকে পালাবে |”
পহেলবানজী – “আর আমাকে গোমতী বলছে, এ কোনসি বড়ি বাত ? এতো ছোটো ব্যচ্চা এত রোনাধোনা করছে | বুঝলেন মহাদেও বাবু, গোমতী এক রকোম ব্যচ্চাটাকে গোদ, মানে কোলে, লিয়ে লিয়েছে | আমাকে বলছে, এ আমার ইজ্জতের সওআল | আপনি বলুন কী উপায় আছে |”
মহাদেব বাবু কিঞ্চিত চিন্তা করিয়া কহিলেন, “ঠিক আছে, তাহলে আজ রাত্রে ও থাকুক গোমতীর কাছে | ভেবে দেখি, কী উপায় করা যায় |”

বাড়ি ফিরিয়া বিছানায় ছটফট করিতে করিতে শেষ রাত্রে নিদ্রা আসিল, জাগিলাম বিলম্বে | দেখিলাম বেলা হইয়াছে, বাহিরে ঝরঝরে হাওয়া ও ঝলমলে রৌদ্র, যেন আকাশে বাতাসে এক পরিমল আনন্দের আগমনী সম্বর্ধনা | সেই সময় কানে বাজিল দুর হইতে ভাসিয়া আসা, হাওয়ার সহিত ওঠাপড়া, ঢাকের আওয়াজ | সে কী ? তড়াক করিয়া উঠিলাম এবং মায়ের গলায় শুনিলাম, “উঠেছিস ? যা চট করে মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে নে | মহাদেব বাবু ভোর ভোর থানায় গেছেন, বলে গেছেন তুই উঠলে তোকে পাঠিয়ে দিতে |”

কোনমতে নাকে মুখে দুই গ্রাস মুড়ি দিয়া ছুটিয়া গেলাম | থানার কাছে যাইতে যাইতে ঢাকের শব্দ প্রবলতর হইল | কাছে গিয়ে দেখি থানার বাহিরে এক ঢাকি ঢাক বাজাইতেছে | সেই সময় থানার দরজা দিয়া হারাধন বাহির হইল, পরনে হলুদ মাখানো ধুতি, গা খালি, মাথায় এক বৃহৎ কুলো, তাহার উপর এক ধামা যাহাতে কিছু ফুল ও বেলপাতা | তাহার পিছন পিছন বাহির হইল, একাদিক্রমে, গ্রামের পুরোহিত মহাশয়, কোলে শিশু লইয়া গোমতী, পাশাপাশি পহেলবানজী ও মহাদেব বাবু এবং সর্ব-পশ্চাতে শমশেরের গলায় বাঁধা দড়ি ধরিয়া শ্যামলাল যাদব | আমি দৌড়াইয়া যাইয়া মহাদেব বাবুর হাত ধরিলাম ও প্রশ্ন করিলাম, “কী হচ্ছে ? কোথায় যাচ্ছ তোমরা ?”
মহাদেব বাবু – “চলো সাথে | এখুনি দেখতে পাবে |”

রাস্তায় যাইতে যাইতে এই মিছিলে কিছু কৌতূহলী শিশু যোগ দিল | শীঘ্রই মিছিল নদী তীরে সেই কাঁঠাল গাছের কাছে পৌঁছাইল | সেখানে দেখা গেল গণেশকে কোমরে দড়ি দিয়া বাঁধিয়া দড়ি হাতে ধরিয়া রামেশ্বর দাঁড়াইয়া আছে | সে পহেলবানজীকে সসম্ভ্রম সেলাম করিয়া কহিল, “পকড় লিয়া সাব | য়েহি চোর হ্যায় |”
তারপর গর্তটি দেখাইয়া রামেশ্বর শিশুকে কহিল, “এই দেখ, খোকা বাবু | তোমার গর্ত বরামত্ করেছি কেমন |”
শিশু অধীর উত্তেজনায় শরীর কচলাইয়া গোমতীর কোল হইতে নামিয়া দৌড়াইয়া গর্তের নিকট গেল ও মাটিতে উপুড় হইয়া শুইয়া পড়িয়া দুই হাতে গর্তটি ঘিরিয়া যেন আলিঙ্গন করিল | চক্ষু তাহার নিমীলিত, মুখে তাহার কী অকপট, নির্মল, প্রশান্ত আনন্দ, যেন বহুকালের হৃত খেলনা খুঁজিয়া পাইয়াছে | গোমতী আসিয়া তাহাকে উঠাইয়া পুনরায় কোলে লইয়া কহিল, “চলো, এবার তোমার গর্ত তোমার বাড়ি নিয়ে যাব |”

পহেলবানজী গম্ভীরভাবে মস্তক হেলাইয়া কার্য যথাযথ হইয়াছে এইরূপ এক ইঙ্গিত করিয়া রামেশ্বরকে ইশারা করিলেন সহসা অকারণে হাস্যবদন গণেশকে কাঁঠাল গাছের আড়ালে লইয়া যাইতে |

গর্তের সম্মুখে কিছু জায়গা পরিষ্কার করিয়া একটি রঙ্গিন চাটাইয়ের আসন পাতিয়া পুরোহিত মহাশয় পূজায় বসিলেন | তিনি ধামা হইতে ফুল বেলপাতা বাহির করিয়া কুলায় রাখিলেন | তাহার নির্দেশে হারাধন প্রথমে সেই গর্তের মাটি চারিপাশ হইতে একত্রিত করিয়া ধামায় ভরিল | অতঃপর পুরোহিত মহাশয় তাহার উপর ফুল ও বেলপাতা রাখিয়া কোশা-কুশি হইতে গঙ্গাজল ছিটাইয়া এই মন্ত্র পড়িলেন –

                          এতঃ পশ্য নিম্নম কাঁঠালস্য বৃক্ষ

                           এক গহ্বর ছিদ্রতি ধরিত্রী বক্ষ
                            যস্য প্রহরায় রাহু, কেতু, যক্ষ
                           তস্য পরি ক্রিয়তি চোরম্ লক্ষ্য
                          পহেলবান দারোগা পরমঃ সুদক্ষ
                        অভ্যুর্থানমকৃত ক্রিয়তি গহ্বর রক্ষ
                         অদ্র অগ্রহায়নম্ মাসে শুক্লম্ পক্ষ
                         এত গহ্বর গচ্ছতি শিবানন্দ কক্ষ
                   ওম্ নমো, সর্ব গহ্বরায়ঃ নমো, ওম্ নমো

মন্ত্রটি তিনবার পড়া হইলে পুরোহিত মহাশয় রামেশ্বরকে কহিলেন গণেশকে লইয়া আসিতে | গণেশ আসিলে পুরোহিত মহাশয় তাহার কানে কিছু কহিলেন | গণেশ আঙ্গুলে আঙ্গুলে হিসাব কষিয়া ধামার কিছু মাটি চারিদিকে ছিটাইয়া ধামার বাঁকি মাটি কুলো দিয়া ঢাকিল | তারপর সে কুলো সমেত ধামা সাবধানে উপুড় করিয়া সেই গর্তের উপর রাখিল | পুরোহিত মহাশয় বিড়বিড় করিয়া আরও কিছু মন্ত্র পড়িলেন | গণেশ বাম হস্তে ধামা ধরিয়া, দক্ষিণ হস্তে অতি সন্তর্পণে তাহার নীচ হইতে কুলোটি টানিয়া বাহির করিল | তারপর ধামাটি সযত্নে গর্তের উপর কয়বার এদিক ওদিক সঞ্চালন করিয়া তাহাকে একটু উঠাইয়া তাহার নীচে কিছু নিরীক্ষণ করিল - কী তাহা আমরা দেখিতে পাইলাম না | বেশ কয় বার এইরূপ ধামা সঞ্চালন ও তাহার নিম্নে পর্যবেক্ষণ সম্পন্ন হইলে সে সন্তুষ্টি সূচক মাথা নাড়া দিয়া পুনরায় কুলোটি ধামার নীচে ঢুকাইয়া ধামা ও কুলো যুগপৎ সোজা করিয়া গর্তের উপর হইতে সরাইল | বিস্মিত হইয়া দেখিলাম যে সে গর্ত আর নাই | শিশু তৎক্ষণাৎ উৎসুক হইয়া গোমতীর কোল হইতে নামিয়া পুরোহিতের নিকট যাইয়া অভিযোগের কণ্ঠে শুধাইল, “আমার গত্ত কোথায় গেল ?”
পুরোহিত মহাশয় – “তোমার গত্ত ধামাতে পুরে নিয়েছি | এখন ওকে তোমার বাড়ি নিয়ে যাবো |”
শিশু – “কই ? আমায় দেখাও গত্ত |”
তখন তাহাকে কুলোটি অল্প তুলিয়া দেখানো হইল ধামার ভিতর | ফাঁকা ধামা দেখিয়া শিশু কিছু ইতস্তত করিলে গোমতী তাহাকে কহিল, “দেখো গত্তের সব জায়গা এখন ধামায় ঢুকে গেছে | এসো এবার আমার কাছে, বাড়ি যেতে হবে |” শিশু তাহার কোলে উঠিয়া কহিল, “হ্যাঁ | এবার আমি ঠিক বাড়ি যাব |”

পুনরায়, দারোগা সাহেবের মস্তক হেলনের ইশারায় রামেশ্বর গণেশকে লইয়া রওয়ানা দিল | কেহ দেখিল না যে যাইবার পূর্বে গণেশ চুপচাপ পুরোহিত মহাশয়ের রঙ্গিন চাটাইয়ের আসন হস্তগত করিল |

ঢাকের আওয়াজ করিতে করিতে মিছিল চলিল বেনেপাড়া | সর্বাগ্রে হারাধন, মাথায় কুলো ঢাকা ধামা, যাহার ভিতর খোকার গর্ত | সর্ব-পশ্চাতে শ্যামলাল ও শমশের, শিশুর দোদুল্যমান হাত পা চাটিয়া | কিছু সন্দেহ প্রকাশ করিয়া শমশের কখনো হাঁচে, কখনো বা কাশে, এবং সেই সন্দেহ নির্মূল করিতে সে পুনরায় শিশুর হাত পা চাটে |

বেনেপাড়া যাইয়া মিছিল উপনীত হইল শিবানন্দের মাটির বাড়িতে | জমি হইতে মোটা দেয়াল উঠিয়াছে বুক সমান উচ্চতায়, যাহার উপরের দেয়াল কিঞ্চিত পাতলা | একটি জানালা দেখা গেল, বোধ হইল তাহা শয়নকক্ষের | খোলা জানালার দুই পাল্লার নিকট বাঁশে বাঁধা কাপড় শুকাইবার দড়িতে রামেশ্বর তাহার গরম চাদর ঝুলাইয়া দিয়াছে, ও তাহার আড়ালে গণেশকে লইয়া দাঁড়াইয়া আছে, তপ্ত রৌদ্র হইতে বাঁচিতে | পুরোহিত মহাশয় ঢাকিকে কহিলেন, “ঘরের ভিতর ঢাক বাজালে তো খুব কানে লাগবে | তুমি ওই জানালার কাছে যাও | ওখানেই দাঁড়িয়ে ঢাক বাজাবে, জানালা দিয়ে আওয়াজ ভিতরে ঢুকবে |” ঢাকি রামেশ্বরের নিকট চলিয়া গেল |

বন্ধ দরজায় করাঘাত করিতে এক দাসী আসিয়া তাহা খুলিয়া প্রশ্ন করিল, “কাকে চাই ?”
পুরোহিত মহাশয় - “শান্তিবালা আছে ?”
দাসী, কিঞ্চিত ইতস্তত করিয়া - “উনি তো অসুস্থ |”
পুরোহিত মহাশয় – “গিয়ে বলো ওর হারিয়ে যাওয়া ছেলে আমরা ফেরত এনেছি |”
দাসী  - “ও আচ্ছা ! তবে, আপনারা ভেতরে আসুন |”

আমরা সদলে অন্দরে প্রবেশ করিলাম | বাহিরে বৈঠকখানা, তাহার অপর দিকে উঠান ও তাহার চারিদিকে নানাবিধ কামরা, শয়নকক্ষটি ডান দিকে | পুরোহিত মহাশয় নিঃসংকোচে শয়নকক্ষে প্রবেশ করিলেন | দেখিলাম এক পালঙ্কে শায়িতা এক মহিলা, তাহাকে আর এক মহিলা হাতে পাখা লইয়া হাওয়া করিতেছে | শায়িতা মহিলা চক্ষু খুলিয়া লোক জন দেখিয়া ক্ষণিকের জন্য যুগপৎ বিস্মিত ও শঙ্কিত হইয়াছেন কি, শিশু “মা” বলিয়া তাহাকে সম্বোধন করিল | মহিলা মুহূর্তে উঠিয়া আসিয়া গোমতীর কোল হইতে শিশুকে ছিনাইয়া লইয়া “খোকা, খোকা” বলিয়া উদ্বেগ-সমাপ্তির অশ্রু সম্বরণ করিতে করিতে শিশুকে শত সহস্র চুম্বন করিল |  শিশু তাহার বক্ষে মুখ লুকাইল | কিছু পরে মহিলা ক্রন্দন করিতে লাগিল, “বাবা তোকে মারবে না রে খোকা | ও মুখেই শুধু বলে মারধোরের কথা | তাই শুনে তুই এমন করে পালালি | একা একা আমি তোকে কত খুঁজেছি | কোথায় কোথায় না গিয়েছি | আর ভেবেছি তোর বাবা ফিরে এলে কী জবাব দেব |”

আবেগের বন্যা প্রশমিত হইলে পুরোহিত মহাশয় কহিলেন, “হারিয়া যাওয়া ছেলে ক’দিন পরে বাড়ি ফিরেছে, একটু যে পুজো করতে হবে মা |” মহিলা ত্রস্ত পদে আসিয়া পুরোহিত মহাশয়কে প্রণাম করিয়া কহিল, “আমায় কী করতে হবে ? আমার তো কোনও যোগাড় নেই পুজোর |”
পুরোহিত মহাশয় – “সব আছে মা, সব আছে | পহেলবানজী আর মহাদেব বাবু যখন খোকাকে ফিরিয়ে এনেছেন তখন ওঁরা সব ব্যবস্থাই করে রেখেছেন | তুমি চিন্তা করো না |
“আমি এখানে এই জানালার সামনে বসে পুজো সেরে নেব | বাইরে চাদর ঝুলছে, ভালই, মুখে রোদ লাগবে না | তুমি শুধু আমায় একটা দড়ি দাও দেখি মা, এই পাঁচ কি ছ হাত লম্বা | আর একটা ধুনুচি, নারকেলের ছোবড়া আর বেশ কিছু ধুনো |”

দাসী দড়ি, ধুনুচি ইত্যাদি লইয়া আসিলে পুরোহিত দড়ির তিন ভাগের দুই ভাগ কামরার ভিতর দিকে ও বাঁকি তৃতীয় ভাগ কামরার বাহির দিকে ঝুলাইয়া জানলার শিকে বাঁধিলেন | দড়ির ভিতরের অংশ অর্ধ-বিভক্ত করিয়া এক ভাগে কুলো ও অন্য ভাগে ধামা বাঁধিয়া ঝোলানো হইল, প্রথমে কুলো – তাহার পিঠ দেয়ালের উপর, ও তাহার বুকের উপর উপুড় হইয়া পড়া ধামা, যে অবস্থায় এই দুইয়ের মধ্যে আবদ্ধ শিশুর গর্ত লইয়া আসা হইয়াছে | ধামার ঠিক নিম্নে ধুনুচি রাখিয়া ঠাকুর মহাশয় ধুনো জ্বালাইয়া দিলেন | এই অসাধারণ আয়োজন সম্পূর্ণ হইলে তিনি আমাদের জানাইলেন যে এইবার তিনি পূজা করিয়া খোকার গর্তকে ধামা হইতে শিবানন্দর ভিটায় সঞ্চারণ করিবেন |

পুরোহিত মহাশয় ঘণ্টি বাজাইলেন ও সেই সাথে জানালার বাহিরে ঢাক বাজিতে লাগিল | বাহিরে ঢাক ও ভিতরে পুরোহিত মহাশয়ের ঘণ্টি এবং মন্ত্রোচ্চারণ – মন্ত্র একই, যাহা পূর্বে উল্লেখ করিয়াছি – এই সমবেত শব্দের কোলাহলে বধির হইবার অবস্থা | তদুপরি পুরোহিত মহাশয় ঘন ঘন ধুনো ছিটাইলে কক্ষ ধূম্রাচ্ছন্ন হইয়া প্রায় অন্ধকার হইল | দর্শন ও শ্রবণ শক্তি ক্ষীণ হইতে ক্ষীণতর হইয়া লোপ পাইল | কিছুক্ষণ পরে কী ভাবে বোধ করিলাম যে  কেহ বা কিছু যেন কুলোর পিছনে এক মৃদু ধাক্কা দিল | বুকে ধামা লইয়া কুলো দেয়াল হইতে অল্প দুলিয়া উঠিয়া আবার যথাস্থানে ফিরিয়া গেল | পুনরায় সেই ধাক্কা, কিঞ্চিত জোরে | ক্রমে ক্রমে ধাক্কার জোর ও ধামার আন্দোলনের বেগ বাড়িলে, আমি ভয় পাইয়া মহাদেব বাবুর হাত ধরিয়া প্রশ্ন করিলাম, “কী হচ্ছে ওখানে ?”
মহাদেব বাবু – “ওই দেয়াল আর গর্তের মাঝে লড়াই লেগেছে | গর্ত ধামা থেকে বেরিয়ে দেয়ালে ঢুকতে চায়, কিন্তু দেয়াল তাতে বাধা দিচ্ছে |”
আমি – “তাহলে কী হবে ?”
মহাদেব বাবু – “আরে, এই মাটির দেয়াল ওই মেঠো গর্তের সাথে তাই এঁটে উঠতে পারে নাকি | একটু ধৈর্য ধরে দেখো, এত পুজো কী বৃথা যাবে ?
“আরে এই শ্যামলাল, এই হারাধন, এখানে এসে ধামা আর কুলো দেয়ালের ওপর চেপে ধরো তো বাছাধনেরা |”

দুজনে আসিয়া ধামা ও কুলো দেয়ালে চাপিয়া ধরিল | শমশের সুযোগ পাইয়া চুপচাপ বাহিরে পরিদর্শন করিতে প্রস্থান করিল | কিছুক্ষণ আরও দেয়াল ও গর্তের সংগ্রাম চলিবার পর কুলোর পিছন হইতে কিছু সংকীর্ণ কাদাজলের রেখা বাহির হইয়া দেয়াল বাহিয়া মাটিতে নামিল | মহাদেব বাবু আমাকে কহিলেন, “ওই দেখো নীরেন, দেয়াল এবার ঘেমে নেয়ে অস্থির, ওর জারিজুরি আর খাটল না | গর্ত জিতে গেছে মনে হচ্ছে |”

তথাপি, যতক্ষণ ঢাক বাজিতে থাকিল পুরোহিতে মহাশয় মন্ত্রোচ্চারণ জারি রাখিলেন | প্রায় এক কি দেড় প্রহর পার হইলে পূজা সম্পন্ন হইল | পুরোহিতে মহাশয় মুখ তুলিয়া জানালার দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া পূজা সমাপ্ত হইয়াছে এইরূপ ইঙ্গিত করিতে তিন বার টিং টিং করিয়া ঘণ্টি বাজাইলেন | ঢাক থামিল | কেহ বাহির হইতে জানালার নিকট টাঙ্গানো চাদর সরাইয়া দিল | উজ্জ্বল রৌদ্রের আলোয় চোখ ধাঁধাইয়া গেল সকলের | সেই উজ্জ্বলতা চক্ষে সহ্য হইলে দেখিলাম রৌদ্রালোকে উদ্ভাসিত ধূম্রময় কামরার মেঝেতে কুলো ও ধামা গড়াগড়ি যাইতেছে | যেখানে তাহারা দেয়ালের উপর নিলম্বিত ছিল সেখানে এক অতি সুন্দর কুলুঙ্গির আবির্ভাব হইয়াছে, যেন তাজা কাদামাটি দিয়া তাহা কেহ নিপুণ হস্তে সদ্য গঠন করিয়েছে |  শুধু তাহাই নহে, সেই কুলুঙ্গির পিছনের দেয়াল একটি অতি সুন্দর আলতা ও হলুদ দিয়া রং করা চাটাই, যাহার নক্সা ঠিক গণেশ কর্তৃক অপহৃত পুরোহিত মহাশয়ের আসনের মত | সেই কুলুঙ্গি দেখিয়া এমন বোধ হইল যে যেন বিশ্বকর্মা দেব স্বয়ং কক্ষের ভিতরে আসিয়া কাজ সমাপ্ত করিয়াছেন |

মহাদেব বাবু নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিয়া কহিলেন, “খোকা দেখো তো ওই দেয়ালে তোমার গর্তে নতুন খেলনা রাখার জায়গা হবে কিনা |”
শিশু মাতৃক্রোড়ের মায়া ছাড়িয়া আসিয়া বিস্মিত বিস্ফারিত চক্ষে কুলুঙ্গি দেখিতে লাগিল | একবার সে মাকে দেখে, আবার পুরোহিত মহাশয়কে, আবার কখনো সেই ধামা ও কুলো |

এমন সময় দরজায় করাঘাত শোনা গেলে দাসী দেখিতে গিয়া ছুটিয়া আসিয়া কহিল, “মা, বাবু ফিরে এয়েছেন |”

“শান্তি, ও শান্তি | আরে ব্যাপারটা কী ? বাইরে এত লোকজন, ঢাক, বাদ্যি – কী হচ্ছে টা কী ?” এই সব প্রশ্ন করিতে করিতে একজন হড়বড় করিয়া কামরায় প্রবেশ করিয়া এত লোক দেখিয়া থতমত খাইয়া বাক্যহারা হইল | তাহার চেহারা ভ্রমণ ক্লিষ্ট, কয়দিন ক্ষৌরকর্ম হয় নাই, মাথার চুল অবিন্যস্ত |  তাহার এক হাত হইতে একটি বাক্স ও অন্য হাত হইতে একটি থলি ও লাঠি ধপাধপ করিয়া একে একে মাটিতে পড়িল | থলির ভিতর হইতে কিছু খেলনা বাহির হইল | একটি চাকা লাগানো কাঠের ঘোড়া গড়াইতে গড়াইতে কুলুঙ্গির সামনে গিয়া দেয়ালে ধাক্কা পাইলে তাহার গতিরোধ হইল | শিশু দৌড়াইয়া গিয়া ঘোড়াটি তুলিয়া কুলুঙ্গিতে রাখিয়া অত্যধিক উত্তেজিত ভাবে তাহার পিতাকে কহিল, “বাবা দেখো, দেখো, আমি কেমন আমার খেলনা রাখার জায়গা করেছি | ওই গত্ত বাড়িতে খুঁড়ি নি কিন্তু ! নদীর ধারে গত্ত করে বাড়ি নিয়ে এসেছি |” এই কহিয়া সে বাবার নিকট গিয়া তাহার দুই জানু জড়াইয়া ধরিল | তাহার পিতা চুপ থাকিলে সে পুনরায় কহিল, “তুমি আর বকবে না তো ?” শিবানন্দ তাহাকে অন্যমনস্ক ভাবে কোলে তুলিয়া কহিল, “ঠিক আছে, ঠিক আছে | আমি তো কিছুই বুঝছি না |  এই কুলুঙ্গি এলো কোথা থেকে ?”

ইহার পরের ঘটনা বিশেষ উত্তেজনাময় নহে | পহেলবানজী শিবানন্দকে বাহিরে লইয়া যাইয়া বুঝাইলেন যে সে মুঙ্গেরে রওয়ানা হইবার কিঞ্চিত পরেই খোকা বাড়ি হইতে বাহির হয় বাবার পিছু পিছু  | সিঁধকাটা গণেশ শিবানন্দের বাটীতে সিঁধ কাটিতে আসিয়াছিল, কিন্তু সে শিশুকে ভোর রাত্রে বাটির বাহিরে যাইতে দেখিয়া কার্য শেষ না করিয়া শিশুর অনুসরণ করে | নদীর নিকট বীট-কনস্টেবল তাহাদেরকে ধরে | দুই দিন জেরা করার পর সমস্ত ব্যাপার পরিষ্কার হয় | এক্ষণে গণেশ দেয়ালে সিঁধ কাটার ছিদ্র বন্ধ করিতে সেখানে সেই কুলুঙ্গিটি বানাইয়া দিয়াছে, পরে যাহা বন্ধ করিলে করা যাইতে পারে |

সর্বশেষে মহাদেব বাবু শিবানন্দকে অনুরোধ করেন যে সে যেন গণেশকে কিছু পারিতোষিক দান করে, শিশুকে উদ্ধার করার জন্য | শিবানন্দ সে অনুরোধ উদারচিত্তে পূরণ করিয়া ছিল | আর, মহাদেব বাবু শিবানন্দকে উপদেশ দেন, এই কহিয়া, “শিবানন্দ, পুত্র-ধন এন্জয় করো, মারধোর করলে হিতে বিপরীত হবে |”

সেই পুত্র, পূর্বে খোকা, ও পরবর্তী কালে ধনঞ্জয়, বড় হইলে মহাদেব বাবুর ন্যাওটা হইয়া আমার স্থান দখল করে |

এবং যতদূর জানি, এই ঘটনার পর গণেশ সিঁধ কাটা পরিত্যাগ করিয়া রাজমিস্ত্রির কার্যে সাফল্য অর্জন করে | জৈত্যপুর গ্রামে পূর্ব-নির্মিত দেয়াল কাটিয়া তাহাতে দরজা, জানালা, কুলুঙ্গি, তাক, খোবর ইত্যাদি বানাইতে তাহার মতো পটু আর কেহ ছিল না সেই কালে |

-----------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৩

বৃহস্পতিবার, ২৯ আগস্ট, ২০১৩

এলেশ্বরী কান্ড

|| এলেশ্বরী কান্ড ||


সেই কালের কথা যখন যোগানন্দ বাবুর বয়স পঞ্চাশ | অকাল-বার্ধক্যের ফলে বাহিরে ক্বচিৎ পদার্পণ করেন | চলাফেরা করেন সাবধানে |  হটাত এক শনিবার জরুরী তলব আসিল তাঁহাকে বাঁশবেড়ে যাইতে হইবে | বাঁশবেড়ে তাঁহার শ্বশুর বাড়ি | শ্বশুর মহাশয়, ত্রিলোক চৌধুরী, কিছু দিন পূর্বে পঁচাত্তর বৎসরে পদার্পণ করিয়াছেন | তলবের কারণ তিনি তাঁহার উইল প্রস্তুত করিয়াছেন, যাহা তিনি সর্বসমক্ষে পড়িয়া সবাই কে অবগত করাইবেন |

বাঁশবেড়ে কলিকাতা হইতে এগারো কিমি | যখন যোগানন্দর সহিত ত্রিলোক বাবুর কন্যা যোগমায়ার বিবাহ স্থির হইল তখন গুরুজনেরা কহিলেন, “একেই বলে যোগা-যোগ |” কিন্তু যোগানন্দর বন্ধুরা মস্করা করিল, “জেনে শুনে বাঁশ নিতে কেন গেলে ভাই, তাও বেঁড়ে ?” বিবাহের দিন যোগানন্দ দেখিলেন জায়গাটি গ্রাম্য - আশেপাশে ধানক্ষেত; বাঁশ কোথাও দেখা গেল না | যোগানন্দ যখন আশ্বস্ত বোধ করিতেছেন, তখন প্রবাল, তাঁহার শ্যালক, কলেজ হইতে আসিয়া প্রণাম করিল | প্রবালের চেহারা খর্ব এবং সর্ব শরীর গাঁটে ভরা, কণ্ঠনালী হইতে গোড়ালি অবধি | যোগানন্দর সন্দেহ হইল এই গ্রামে সেই একমাত্র বেঁড়ে বাঁশ কি ?

বিবাহের পর যোগানন্দ দেখিলেন যোগমায়া অভিমানিনী হইলেও ত্রিলোক বাবুর ন্যায় বিচক্ষণ, কিন্তু প্রবাল তাঁহার মতো ধুরন্ধর | উপরন্তু সে নির্লজ্জ ও মহা কঞ্জুস | এই দ্বিতীয় কারণে সে এমন কি যোগানন্দকে জামাইবাবুর বদলে সংক্ষেপে দাদা বলিয়া ডাকে |

বাঁশবেড়ে যাইতে শিয়ালদহ হইতে লোকাল আছে, আর আছে বাস | উভয়েই যোগানন্দর আপত্তি, একেতে বড় ভিড়, অন্যেতে বড় ঝাঁকুনি | নিরুপায় হইয়া তিনি শ্যালকের শরণাপন্ন হইলেন | তাহার একটি মোটর গাড়ি আছে, কখনো কখনো কলিকাতা আসে কাজে | যোগানন্দ তাহাকে ফোন করিয়া সমস্যা জানাইলে সে কহিল, “কিছু চিন্তা নেই, দাদা | যায় যায় অবস্থা, এটুকু তো করতেই হবে |“ কী যায় যায় তাহা জানিবার পূর্বে লাইন কাটিয়া গেল | সন্দেহ হইল শ্বশুর মহাশয় কি যায় যায় | কিন্তু যোগমায়া সে কথা আমল দিলেন না | তাঁহার তাম্বূল পূর্ণ মুখ হইতে শোনা গেল, “ম্ এত ম্ চট করে ম্বাবা যাচ্ছে ম্না |” এই বলিয়া তিনি ফেলিলেন ‘সজোরে তাম্বূলের পিক, দিতে শত্রুর মুখে ধিক |’

প্রবাল আসিল মধ্যাহ্ন ভোজের সময়, এবং যোগানন্দর ভাত সে প্রায় সমস্তই গ্রাস করিয়া দিদির সহিত গল্প করিবার ছলে খাটে যোগানন্দের স্থানে দিব্যি দিবানিদ্রা করিল | বেলা তিনটার সময় প্রবাল যোগানন্দ কে লইয়া বাঁশবেড়ের জন্য রওয়ানা হইল | যোগমায়া সঙ্গ দিতে রাজী হইলেন না, কারণ তাঁহার উপবাস (পান / চা ইত্যাদি খাওয়া বাদে), কাজেই যাত্রার ধকল সহিবে না |

মোটর গাড়িতে প্রায় দু ঘণ্টা লাগিল, ঝাঁকুনি বিশেষ বোধ হইল না, কেননা প্রতি সিকি কি আধ কিমি অন্তর গাড়ি থামে, তাহাকে মুখে জল, বনেট খুলিয়া বুকে হাওয়া ও পশ্চাতে ধাক্কা প্রদান করিলে তবে সে আবার নড়ে | এই লম্বা অবসরে প্রবালের সহিত কথোপকথনে যোগানন্দ দুইটি ব্যাপার সম্বন্ধে জানিতে পারিলেন | এক – যায় যায় অবস্থা শ্বশুরের নহে, সম্পত্তির | দুই - তাঁহার নিজের হয়ত যায় যায় অবস্থা হইতে চলিয়াছে | কারণ, প্রবাল জানাইল যে রাত্রে গাড়িতে তাঁহাকে লইয়া কলিকাতা ফেরা অসম্ভব | এবং, যোগমায়াকে ছাড়িয়া শ্বশুরালয়ে রাত্রি বাস করা যোগানন্দর অনুচিত হইবে | অতএব, প্রবাল প্রস্তাব করিল যে রাত্রে সে তাঁহাকে লোকালে চড়াইয়া দিবে |

এই অবসরে যোগানন্দর জ্ঞান আরও বাড়িল যে বাংলার চাষার সাধারণ-বুদ্ধি অসাধারণ | পাকা-পথে মোটর গাড়ি দাঁড়াইতে দেখিলে সে কাছে আসে কৌতূহল চরিতার্থ করিতে | কিন্তু কাঁচা-পথে দাঁড়ান মোটর গাড়ি দেখিলেই সে পলায়ন করে | সে জানে যে এমন গাড়ি ঠেলিতে হইবে, এবং মালিক পয়সা দিবার আশা দিয়া, পরে গাড়ি চলিতে লাগিলে আর প্রতিশ্রুতি রক্ষণের জন্য গাড়ি থামাইবে না, পাছে থামিলে গাড়ি আবার বন্ধ হয় | অতএব, একাধিক জায়গায় তিনি গাড়ির পিছনে থাকিয়া চাষা বন্ধুদের পয়সা চুকাইয়া ধুলা খাইতে খাইতে দৌড়াইয়া গাড়ি ধরিলেন - যদিও, প্রবালের চলতি গাড়ি হাঁটিয়াই ধরা যায় |

পাঁচটা নাগাদ দুই জনে ত্রিলোকালয়ে উপনীত হইল | চা ও চাল-ভাজা খাইতে, খাওয়াইতে শ্বশুর মহাশয় খবরাখবর লইলেন | তাহার পর পুরোহিত মহাশয় ভগবানের উইল, ও অতঃপর শ্বশুর মহাশয় নিজস্ব উইল পাঠ করিলেন | প্রকারান্তরে যোগানন্দ বুঝিলেন যে, যে বিছা-হার ও সর্প-মুখী কঙ্কণ লইয়া যোগমায়া তাঁহার সংসারে প্রবেশ করিয়াছিলেন, তাহার পর আর বিশেষ কিছুর ব্যবস্থা শ্বশুর মহাশয় বিবেচনা করেন নাই | তাঁহার চিন্তা হইল ফিরিবার ভাঁড়া অন্তত পাওয়া যাইবে কিনা | পরে দেখিলেন সে গুড়ে বালি |

রাত্রের ভোজন অল্পেই সমাপন হইল – ভাত, ডাল, বড়ি ভাজা ও পুঁটি মাছ দিয়া লাউ-ডাঁটার চচ্চড়ি | এত ঝাল যে অল্পেই পেট ভরিল, অন্তত যোগানন্দর পেট বারম্বার ঢেকুর-ধ্বনির ধিক্কারে সেইরূপ ঘোষণা করিল | 

ভোজন শেষ হইল কি প্রবাল কহিল, “এবার চট করে চলো দাদা | তোমাকে নটা এগারোর এলেশ্বরী ফাস্ট লোকাল ধরিয়ে দেব |”
যোগানন্দ – “এলেশ্বরী ? নতুন গাড়ি বুঝি ?”
প্রবাল – “চলো, দেখতেই পাবে |”

স্টেশনে আসিয়া প্রবাল তাঁহাকে সোজা ওভারব্রিজের উপর দিয়া দুই নম্বরে লইয়া গেল | “টিকিট টা আগে নিয়ে নিলে ভালো হত না ?” যোগানন্দর এ প্রশ্নের উত্তরে প্রবাল কহিল, “চিন্তা নেই, এ গাড়িতে চেকিং হয়না | মনে করে শিয়ালদহের আগে আউটার সিগন্যালে নেমে পোড়ো, দেখবে ওখানেই সবাই নামবে | আর, বাথরুম পেলে ভেবো না | টয়লেট আছে | এই গাড়ির এটাই এক সুবিধা |”

ব্রিজ হইতে নামিয়া যোগানন্দ দেখিলেন সম্মুখেই এক জীর্ণ দীর্ণ নাইনটীন-অস্টিনের পুরাতন কামরা | তাহার পিছনে পার্সেল ভ্যান, তারপর কেবল খোলা মালের ওয়াগন, তাহাতে বোঝাই শত সহস্র বাঁশ | তবে কামরার অগ্রে লাগা বিদ্যুৎ চালিত আধুনিক ইঞ্জিন | ইহা দেখিয়া তাঁহার কিঞ্চিত ভরসা হইল | কামরার নিকটবর্তী দরজার দিকে অগ্রসর হইয়া তিনি দেখিলেন তাহার উপর ফিকা পড়া এক মহিলার চিত্র ও তাহার নীচে ইংরেজির দুই অক্ষর - এল. এস. | ভিতরে টিম টিম বাতিতে কতিপয় মহিলা দেখিতে পাইলেন, কোনও পুরুষ দেখা গেল না | তাঁহার দ্বিধা হইল এই প্রমীলাকুলে তিনি কি কোনও মুশকিলে পড়িতে চলিয়াছেন | কিন্তু সেই মুহূর্তে গার্ডের বাঁশি ও ইঞ্জিনের হর্ন বাজিল, একাদিক্রমে | প্রবাল যোগানন্দর ধুতির কোঁচা তাঁহার হাত হইতে ছাড়াইয়া তাহা দিয়া তাঁহার মাথা ঢাকিল ও পৃষ্ঠে  ধাক্কা দিয়া কহিল, “মাথায় কাপড়টা ধরে তাড়াতাড়ি  ওঠো, গাড়ি ছাড়ছে |”

এইরূপে ঘোমটাবৃত অবস্থায় যোগানন্দ আর কোনোদিক দৃকপাত না করিয়া গাড়িতে উঠিলেন, গাড়ি ছাড়িয়া দিল |

ধাতস্থ হইয়া যোগানন্দ প্রথমে একবার চারিদিকে দৃষ্টিপাত করিলেন পরিস্থিতি যাচাই করিতে | দেখিলেন দরজার বাম পার্শে কামরায় দৈর্ঘ্য বরাবর বেঞ্চ, দুইটি জানালার ধারে ধারে ও দুইটি পিঠো-পিঠি কামরার কেন্দ্ররেখার দুই পার্শে | বেঞ্চ গুলি বেশ চওড়া, কিন্তু হেলান দিবার ব্যবস্থা নাই | কিছু মহিলা জানালার দিকে বসিয়া আছে | কিন্তু বেশির ভাগ মহিলাই মধ্যবর্তী বেঞ্চের এপাশে কি ওপাশে বসিয়া | জিনিষ পত্র কাহারো তেমন নাই | কেহ কেহ একটি চামড়া কি রেক্সিনের ব্যাগ হাতে রাখিয়াছে |  দরজার দক্ষিণ পার্শে আসা যাওয়ার রাস্তা ছাড়িয়া মুখোমুখি দুইটি টয়লেট | একটির বাহিরের দেয়ালে একটি আয়না ও তাহার নীচে বেসিন | অপর টয়লেটের দেয়ালে হেলান দিয়া এক মেয়েছেলে উবু হইয়া  বসিয়া আছে, পরিধানে খাটো শাড়ি, পাশে এক প্যাঁটরা | তাহার হাবভাব হইতে বোধ হইল যে সে মেথরানী | এতটা নিরীক্ষণ করিতে করিতে যোগানন্দ দেখিলেন গাড়ির গতিবেগ বাড়িয়াছে ও জীর্ণ কামরা ভয়ঙ্কর ঠোকাঠুকির শব্দ করিয়া ভাল রকম দুলিতেছে | সুতরাং তিনি দরজা হইতে অগ্রসর হইয়া নিকটের মধ্যবর্তী বেঞ্চে সীট গ্রহণ করিলেন | বসিবামাত্র মেথরানী তাঁহাকে প্রশ্ন করিল, “বাবু, বাথরুম না যইবো কি ?”

এইরূপ অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে যোগানন্দর সন্দেহ হইল সে প্রশ্নটি অন্য কাহাকে তো করে নাই | কিন্তু ততক্ষণ যাবত তাঁহার সমীক্ষা অনুযায়ী কামরায় তিনিই একমাত্র ‘বাবু’ | অতএব না শোনার ভান করিয়া তিনি কামরা নিরীক্ষণে গম্ভীর মনোযোগ দিলেন | দেখিলেন, যে দরজা দিয়া তিনি প্রবেশ করিয়াছিলেন তাহার উপর লেখা “মহিলা কামরা | কেবল মহিলা ও অশীতিপর পুরুষ মাত্রর জন্য | পুরুষ যাত্রীর জন্ম-তিথি প্রমাণ-পত্র লাগিবে | অন্যথায় সাজা - দুই বৎসর (মহিলা) / যাবজ্জীবন (পুরুষ) কারাদণ্ড ও ২.৫০ টাকা জরিমানা |”

তাহার নীচে আরও কিছু লেখা, কিন্তু কেহ তাহার উপর বিজ্ঞাপন সাঁটিয়া ছিল | পরে তাহা ছেঁড়া হইলেও কিছু অক্ষর দেখা যাইতেছে না | তিনি কাছে গিয়া অধ্যয়ন করিবেন ভাবিয়া উঠিয়াছেন কি, সে মেথরানী উঠিয়া আসিল | তাঁহার কানে নিম্নস্বরে কহিল, “বাবু, এলোশাড়ি লগবো না ? দিখাবো কি একটা ?”

যোগানন্দ স্তম্ভিত হইয়া নির্বাক রহিলেন | মেথরানী ছাড়িবার পাত্রী নহে | কহিল, “বাবু, কী বোলছো ? চিরা-সায়া, বাটম্ সিটেম্ | একদম বড়িয়া জীনীস্ আছে আমার কাছে |”

যোগানন্দ ক্রুদ্ধদৃষ্টিতে তাহার দিকে তাকাইতে, তাঁহার মুখ দেখিয়া মেথরানী পিছু হটিল | তিক্ত স্বরে কহিল, “আরে ! ই তো ঘাটের মরা আছে | জয় সিয়ারাম |” তারপরে নিজ স্থানে ফিরিয়া উচ্চৈঃস্বরে স্বগতোক্তি করিল, “চেকিং আসলে ঠেলা বুঝবে আপ্নে আপ্ |”

যোগানন্দর মনে মনে প্রবালের উপর খুব রাগ হইল | একে বিনা টিকিটে মহিলা-কামরায় যাত্রা, তায় বিক্ষুব্ধ এক বদ-মতলবি মেথরানীর ঘন ঘন দুর্বোধ্য প্রশ্ন, প্রস্তাব, কিম্বা মন্তব্য | বিপদ গুনিলেন যে সমস্ত রাস্তা কাটিবে কী করিয়া | কিন্তু এও বুঝিলেন যে অবস্থা নিরুপায় - মাঝপথে আর কোথা যাইবেন |

কিছুক্ষণে গাড়ির গতি কমিল | বাঘরিয়া স্টেশন আসিল | এক প্রৌঢ়া উঠিলেন | গাড়ি ছাড়িতেই দৌড়াইয়া এক যুবক প্রবেশ করিল | উঠিয়াই (বোধহয় লক্ষ্য করিয়া যে কামরা ভর্তি মহিলা) সে ফিরিয়া নামিতে উদ্যত হইল | মেথরানী তৎক্ষণাৎ তাহাকে চক্ষের এক ইঙ্গিতে টয়লেটের দিকে কী ইশারা করিল | সে নামিতে গিয়াও নামিল না |  এদিকে প্রৌঢ়া যোগানন্দর কাছে আসিয়া তাঁহার দিকে চাহিলেন | তারপর পার্শে আসন গ্রহণ করিয়া ব্যাগ হইতে চশমা বাহির করিয়া চোখে লাগাইলেন | যোগানন্দকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিয়া প্রৌঢ়া এক গাল হাসিয়া কহিলেন, “নূতন বুঝি, দাদা ?” যোগানন্দ নিরুত্তর থাকিলেও তিনি বার্তালাপ বজায় রাখিলেন, “এলোশাড়ি নেই যে ?” যোগানন্দর নীরব মাথা নাড়া দেখিয়া মন্তব্য করিলেন, “তা যা গরম | সবাই একদম পসীনা পসীনা হচ্ছে |”

যোগানন্দ সম্মতির হাসি হাসিয়া, ও মাথা নাড়িয়া, মুখ ঘুরাইলেন | দেখিলেন টয়লেট হইতে এক তন্বী যুবতী বাহির হইল | শাড়ির কোঁচা ঝাড়িতে ঝাড়িতে সে আসিয়া প্রৌঢ়ার পাশে বসিল | প্রৌঢ়ার ধ্যান যুবতী আকর্ষণ করিলে যোগানন্দ মুক্তির আনন্দ অনুভব করিলেন |

এই শুভ মুহূর্তে যোগানন্দর স্মরণে আসিল তাঁহার ডাক্তারের এক বক্তব্য – ‘চিন্তা-বিশ্লেষণ ও মানসিক অনুশীলন দ্বারা মস্তিষ্কে জরার অগ্রগতি রোধ করা যায় |’ বাড়িতে যাহার বিশেষ সুযোগ মেলেনা, তাহারই পরিমিত অবসর ও অপরিমিত সুযোগ তিনি তাঁহার বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখিতে পাইলেন | যদিও কামরায় দেখিবার বিশেষ কিছু নাই, তবু অনুজ্জ্বল আলোতে যাহা দেখা গেল তিনি তাহারই বিশ্লেষণ করিতে মনোযোগ দিলেন |

যোগানন্দ লক্ষ্য করিলেন যে কামরায় দুই প্রকারের মহিলা যাত্রী আছে | যাহারা জানালার ধারে বেঞ্চে বসিয়া, তাহারা কিঞ্চিত বেপরোয়া ও চটুল | মাথায় ঘোমটা নাই, হওয়ায় চুল উড়িতেছে, শরীরের বস্ত্র শিথিল ও এলোমেলো | একে অপরের সহিত হালকা গল্প গুজব ও হাসি মস্করা করিতেছে | কিন্তু যে মহিলারা কামরার মধ্যবর্তী বেঞ্চে বসিয়া, তাহারা অপেক্ষাকৃত গম্ভীর ও পর্দানশীন | পরনে ফুল-হাত ব্লাউজ | সকলেরই মাথায় ঘোমটা | ঘোমটা কাহারো আলগা আবার কাহারো তাহার ভিতর মুখ প্রায় সম্পূর্ণ ঢাকা, খালি নাক দেখা যাইতেছে | যাহাদের ঘোমটা আলগা তাহারা অবিবাহিতা | অন্যদের কখনো ঘাম মুছিতে ঘোমটা সরাইলে দেখা যাইতেছে সিঁথি বিহীন কেশ সজ্জা | জানালা দিয়া পবন-দেব হানা দিলেও জুনের সেই গরম হাওয়ায় প্রচুর পরিমাণে তাঁহার ঘামের আর্দ্রতা | তাহার প্রভাবে প্রায় সকলেরই নাকের উপর বিন্দু বিন্দু জল টসটস করিতেছে | তবু শান্ত অবিচলিত ভাবে সকলেই কোলের উপর হাত জোড়া করিয়া যেন ধ্যান করিতেছে | কাহারো কথা বলিবার প্রবৃত্তি দেখিলেন না | আর লক্ষণীয় যে সকলেরই পা পাদুকা-হীন | চিনিতে মুস্কিল হয়না সে এই সব কুমারীরা এলেশ্বরী-ভক্ত, দিনভর পূজা দিয়া ফিরিতেছে | যোগানন্দ স্থির করিলেন পুনরায় বাঁশবেড়ে আসিলে তিনি যোগমায়াকে সাথে লইয়া এলেশ্বরী দর্শনে যাইবেন (যদি এ যাত্রা বাকী পথ নির্বিঘ্নে কাটে) |

পরের স্টেশন জামবাটি আসিলে এক পসারিণী উঠিল | তাহার চক্ষে কালো চশমা | গলায় ঝুলানো ঝুড়ি, তাহার উপর এক নামের ফলক, যাহাতে লেখা “শশী খান” | সে উঠিয়া বার বার উচ্চস্বরে নিজের নাম ঘোষণা করিতে লাগিল | এক দুজন করিয়া মহিলারা, ও যোগানন্দর প্রতিবেশী প্রৌঢ়া তাহার কাছ হইতে শসার মতো দেখিতে এক ফল কিনিয়া খোসা সমেত খাইতে লাগিলেন | কেন যেন অদ্ভুত এক প্রশ্ন যোগানন্দর মনে আসিল, ‘শশী কি শসার স্ত্রীলিঙ্গ ? বাড়িতে গিয়ে অভিধান দেখতে হবে |’ সে প্রৌঢ়া যেন তাঁহার মনের কথা বুঝিয়া তাঁহাকে কহিলেন, “দাদা খাবেন না শশী ? খান | একদম কচি আছে | এ শুধু এলেশ্বরী তে পাবেন |”

দেনাবাটি আসিলে শশী খান নামিয়া গেল | কোনও যাত্রীর আগমন কি নির্গমন হইল না | উঠিল এক ঝাল-মুড়ি ওয়ালী | সে উঠিয়াই ঝাল-মুড়ির কৌটা ঘাঁটিতে লাগিলে তাহা হইতে এক ভয়ঙ্কর খর-খর শব্দ শোনা গেল | মুড়ি তাজা ভাবিয়া উৎসুক হইয়া যোগানন্দ তাহাকে ডাকিয়া ঝাল-মুড়ি লইলেন | কিন্তু তাহা মুখে দিতেই ফেলিবার উপক্রম হইল | একে ভীষণ ঝাল – সে ঠিক আছে | কিন্তু মুড়ি তো নয় যেন কঙ্কর | তিনি থু থু করিয়া ফেলিয়া মুড়ি ওয়ালীকে প্রশ্ন করিলেন, “এ কী ?”
মুড়ি-ওয়ালী – “কেন, ঝাল চাল-ভাজা |”
যোগানন্দ – “মুড়ির বদলে চাল-ভাজা ?”
মুড়ি-ওয়ালী – “হ্যাঁ গো | এ মেয়ে-গাড়িতে তো তাই চলে | একটু আঁচার দেবো ?”
যোগানন্দর কাছে একটি সিকি ছিল | তাহা গেল |

ততক্ষণে যোগানন্দর বাথরুম পাইয়াছে | তিনি উঠিতেই মেথরানী নড়িয়া বসিল, যেন তাঁহার টয়লেট যাত্রার প্রতীক্ষায় ছিল | যোগানন্দর এমন মনে হইল যেন সে পা বিছাইল, তাঁহার পথ আটকাইতে | তাহার পাশ কাটাইয়া যাইতে যাইতে যোগানন্দ দেখিলেন মেথরানীর প্রসারিত পা খুবই লোমশ ও শক্তপোক্ত পুরুষ মানুষের মতো |  সে নিম্নস্বরে কহিল, “বাবু আমিও আসি ? ধরে পরিয়ে দিব |” তিনি এ অসভ্য প্রস্তাব শুনিতে না পাওয়ার ভান করিয়া ত্রস্ত গতিতে টয়লেটে ঢুকিয়া ছিটকিনি লাগাইলেন |

কিন্তু বাথরুম করা মাথায় উঠিল | ভিতরের দৃশ্যে তিনি হতভম্ব | বন্ধ দরজার উপর দড়ি দিয়া ঝোলান ক্ষতবিক্ষত এক আপাদমস্তক দেখিবার আয়না | তাহার দুই পার্শে দুই প্লাস্টিকের থলি ঝুলানো | একটিতে বেশ কিছু নানান সাইজের নারিকেলের মালা | অন্যটিতে কিছু জীর্ণ বিবর্ণ স্ত্রীলোকের অন্তর্বাস - নানান রঙের | সাবান রাখার তাকের উপর এক নিষ্প্রভ লাল লিপস্টিক | ছিপি খোলা এক ‘অগুরু’ সেন্টের শিশি গন্ধ ছড়াইতেছে, যাহার সহিত আর এক তীব্র গন্ধ মিশিয়া নরকের কুণ্ডের পরিবেশ সৃষ্টি করিয়াছে | গভীর এক ঘ্রাণ লইয়াই যোগানন্দ চিনিতে পারিলেন যে তাহা কারণের গন্ধ | মনে পড়িল মেথরানী যখন তাঁহার কানে কানে কথা বলিয়াছিল সেই একই গন্ধ পাইয়াছিলেন |  কোনোমতে কাজ সারিয়া ধুতির কোঁচায় ঘোমটা দিয়া তিনি বাহির হইলেন, ও মেথরানী আক্রমণ করিবার পূর্বে দ্রুত গতিতে নিজের আসনে ফিরিলেন | শঙ্কা হইল তাঁহার লাল কর্ণমূল দেখিয়া যদি কেহ ভাবে যে তিনি কানে  লিপস্টিক লাগাইয়াছেন |

খাড়াজুরি আসিলে এক পসারিণী উঠিয়া তাহার পসরা সাজাইয়া বসিল | হরেক রকমের পুতুল, ছোট ছোট হাঁড়ি, কড়াই, ঘটি, বাটি ও অন্যান্য মেয়েলি খেলনা | খেলনায় যোগানন্দর বিশেষ কৌতূহল | তিনি পসরা দেখিতেছেন কি পসারিণী এক বার্বি ডল দেখাইয়া তাঁহার দৃষ্টি আকর্ষণ করিল | কহিল, “দিদি, নেবে নাকি ? হাওড়ায় তৈরি | দাম মাত্র সাত টাকা | এত সস্তা এই এলেশ্বরীতেই পাবে | সাথে একে জোড়া ম্যাচিং এলোশাড়ি আছে |” পাশের প্রৌঢ়া কহিলেন, “ছ’টাকায় দেবে ?” শেষে অনেক দরাদরির পর সাড়ে ছ’টাকায় কথা পাকা হইল | ততক্ষণে যোগানন্দ বুঝিয়াছেন যে পসারিণী ট্যারা | পুতুল বেচা কেনার লজ্জা ও দরদাম হইতে তিনি নিস্তার পাইলেন | পুত্রের জন্য তাহার মামার মোটর গাড়ির মতো খেলনা পাইবার ইচ্ছা দমন করিতে হইল |

খাড়াজুরির পর আসিল মেদপুর |  সেখানে উঠিল আর এক পসারিণী, সাথে বিস্তর পুস্তক | এক মহিলা তাহাকে শুধাইল, “আমার বউয়ের জন্য সেলাই এর বই চাই | সেরকম কিছু আছে ?” বিক্রেতা মাথা হেলাইয়া বেঞ্চের উপর বইয়ের বোঝা নামাইল |

“আমার বউ” শুনিয়া যোগানন্দ আশ্চর্য হইয়াছেন কি মহিলা তাঁহার সন্দেহ অনুমান করিয়া মূক দর্শক প্রতিবেশীদের ব্যাখ্যা দিল, “মানে আমার ছেলের বউ, বাড়ির সব সেলাই ওই করে |” তাহাকে বিক্রেতা ‘পারিবারিক সেলাই-ফোঁড়াই’ নামক এক বই দিল | যোগানন্দ তাহাকে ডাকিয়া বই দেখাইতে কহিলেন | সে দেখাইল ‘আমের আচার-বিচার’, ‘স্ত্রী-ভাগ্য কী দুর্ভাগ্য’, ‘প্রেম-রাগ বনাম গলায় দড়ি’, ‘ধাত্রী বিদ্যায় হাতে-খড়ি’, ‘উল বোনার বর্ণ পরিচয়’, ‘সংসার রণ - টুকিটাকি নিয়ে ঠোকাঠুকি’, ইত্যাদি | যোগানন্দ তাহাকে প্রশ্ন করিলেন কোনও ম্যাগাজিন আছে কিনা | সে দেখাইল ‘মিস ইন্ডিয়া’, ‘নারীর প্রসাধন’, ‘মেয়েদের আসর’, ‘প্রেম-শৃঙ্গার’ ইত্যাদি | যোগানন্দর নিরাশ চেহারা দেখিয়া সে বিব্রত হইয়া কহিল, “বাবু, এলেশ্বরীতে এই সবই চলে, তাই আর কিছু রাখি না |”

মেদপুর ছাড়িয়া গাড়ি একটু গতি লইয়াছে কি হটাত কামরার বাতি নিভিয়া গেল | আতঙ্কিত হইয়া যোগানন্দর মুখ হইতে শব্দ বাহির হইল, “সর্বনাশ |” পার্শ্ববর্তী প্রৌঢ়া কহিলেন, “চিন্তা নেই, চেঞ্জ-ওভার হচ্ছে | এখুনি বাতি এসে যাবে |” সত্যই তাহার কথা শেষ হইতে না হইতে কামরার বাতি জ্বলিল | অনিচ্ছাসত্ত্বেও অজ্ঞতা দূর করিতে যোগানন্দ জানিতে চাহিলেন ঘটনা টা কী | প্রৌঢ়া ব্যাখ্যা দিলেন যে সেখানে ডিভিসি’র বিদ্যুৎ সরবরাহ শেষ হইল ও সিএসসি’র শুরু | যেখানেই বিদ্যুৎ সরবরাহ ঐরূপ এক হইতে অপরে পরিবর্তিত হয়, মাঝখানে কিছু দূর ওভারহেডে বিদ্যুৎ থাকে না | ইঞ্জিন বিদ্যুৎ না পাওয়ায় কামরার বাতি যায়, কেননা কামরার ব্যাটারি মরিয়া গিয়াছে | যোগানন্দ মনে মনে প্রমাদ গুনিলেন যে সেই সময় যদি মেথরানী অন্তরঙ্গ হইবার প্রয়াসে আক্রমণ করে তো ... প্রৌঢ়ার ভরসায় শক্ত হস্তে সে চিন্তা দূর করিলেন | তাঁহার মনে প্রৌঢ়ার অসীম জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা হইল | অদম্য করমর্দনের ইচ্ছায় তিনি প্রৌঢ়ার হাতের দিকে হাত বাড়াইলেন | নজরে পড়িল প্রৌঢ়ার কোলে রাখা হাতের নীচে এক ব্যাগ, যাহাতে লেখা ‘শঙ্কর কে প্রসাদ’ | প্রৌঢ়া যোগানন্দর দৃষ্টি অনুসরণ করিয়া ব্যাগ উঠাইয়া মাথায় ঠেকাইলেন ও কহিলেন, “শঙ্কর জী আমার ইষ্ট দেওতা আছেন, ব্যাগে তাহার প্রসাদ আছে |”

তখনি যোগানন্দ লক্ষ্য করিলেন প্রৌঢ়ার পার্শ্ববর্তী যুবতী নাই | সে তো এইমাত্র ছিল | গেল সে কোথায় - অন্ধকারের অন্তরালে অদৃশ্য হইল কি ?  আচমকা লজ্জা অনুভব করিয়া – তন্বী যুবতীর আকর্ষণ ... যোগমায়া জানিলে কী ভাবিবে – তিনি এই চিন্তাধারায় লাগাম লাগাইলেন |

মাঠপাড়া আসিল, শিয়ালদহের পূর্বে শেষ স্টেশন | ট্রেন থামিলে বাঘরিয়ার সেই দ্বিধাগ্রস্ত যুবক রুমালে রক্তাভ লাল ঠোঁট মুছিতে মুছিতে টয়লেটে হইতে সট করিয়া বাহির হইল | বিদ্যুৎ বেগে প্ল্যাটফর্মের বিপরীত দিকের দরজা দিয়া ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ করিয়া অন্ধকারে নামিয়া অদৃশ্য হইল | তখন যোগানন্দ লক্ষ্য করিলেন যে সে দরজার পাল্লা নাই | দরজার ফোকরের উপরে কাঁচা হাতে কেহ লিখিয়াছে:- “সংকট-কালীন দ্বার | ঝাঁপানর পূর্বে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি করুন |”

ইতিমধ্যে প্ল্যাটফর্ম হইতে এক অতি খর্বকায় নাদুস-নুদুস কালো কোট পরিহিতা মহিলা প্রবেশ করিল | তাহার মাথায় বব-কাট চুল, সিঁথি সিন্দুরবিহীন | সে টিকিট চেকিং করিতে লাগিলে যোগানন্দ যথাসম্ভব নিম্ন কণ্ঠে প্রৌঢ়াকে কহিলাম, “আমার যে টিকিট নেই, কী করি ?”
প্রৌঢ়া – “এজ-প্রুফ ?”
যোগানন্দ – “না তাও নেই |”
প্রৌঢ়া - “ইমার্জেন্সি নোট আছে ? বের করিয়ে রাখুন দু-পাঁচ টাকা |”
যোগানন্দ – “ইমার্জেন্সি নোট আবার কী ? আমার কাছে দুটো দশ টাকার নোট আছে মাত্র |”
প্রৌঢ়া – “দিন দেখি সেগুলো আমাকে |”
যোগানন্দ তাহাকে নোট দুইটি দিলে তিনি তাহার পরিবর্তে প্রসাদের ব্যাগ হইতে কড়কড়ে দশটি লাল দুই টাকার নোট বাহির করিলেন | বাতির দিকে একটি ধরিয়া যোগানন্দ কে দেখাইলেন যে তাহার জলছাপে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর ছবি | কহিলেন, “ইমার্জেন্সিতে এলেশ্বরীতে এটাই চলে – টিটি থেকে হকার সবাই নেয় | রেখে দিন, কাজে আসবে |”

টিটিই আসিলে যোগানন্দ চুপচাপ দুইটি ইমার্জেন্সি নোট দিলেন – বিনা-টিকিট ও বিনা এজ-প্রুফ  যাত্রার ডবল ইমার্জেন্সির জন্য | টিটিই তাহা হাতে লইয়া ভাঁজ করিয়াছে কি, এক কৌতূহলী ঝিঁঝিঁ পোকা সবার অলক্ষ্যে আসিয়া টাকার উপর বসিল | টাকা সমেত সে ব্লাউজের ভিতর পাচার হইতেই  “এই মরেছে | পোকা ঢুকেছে রে” বলিয়া টিটিই চিৎকার করিয়া আঁচল ফেলিয়া পটাপট ব্লাউজের বোতাম খুলিয়া ফেলিল | সংকোচিত যোগানন্দ মুখ ঘুরাইলেও, তাঁহার নিঃসংকোচ চোখ (তাঁহার অজ্ঞাতে) আড়চোখে কী পোকা তাহা দেখিতে চাহিল | এক মুহূর্তের জন্য তিনি দেখিতে পাইলেন যে টিটিই’র ভিতরের পরিধান এক অতি ম্লান গেঞ্জি | তাহার উপর ডাক্তারের স্থেথস্কোপের মতো আলগা ভাবে ঝুলিতেছে এক কাল অন্তর্বাস | কাঁধে পৈতা দেখা যাইতেছে | আর গেঞ্জির উপর দিয়া উঁকি মারিতেছে বুকের পাক ধরা চুল | সেই চুলে আটকা পড়িয়াছে অনভিজ্ঞ এক ঝিঁঝিঁ পোকা | অকস্মাৎ আবিষ্কৃত এই পোকাটি অপ্রত্যাশিত ভাবে পলায়ন-পথ খোলা পাইয়া ফরা‍‌ৎ করিয়া লম্ফ দিল | টিটিই বুক আঁচলে ঢাকিয়া তীর বেগে টয়লেটের দিকে অগ্রসর হইলে মেথরানী তটস্থ হইয়া দাঁড়াইয়া তাহাকে স্যালুট করিয়া টয়লেটের দরজা খুলিয়া দিল | যোগানন্দ যুগপৎ এতগুলি ইমার্জেন্সি কখনো দেখেন নাই |

কিছুক্ষণ পরে গাড়ির গতি কমিতে লাগিল | মেথরানী  উঠিল, ও মধ্যবর্তী বেঞ্চগুলিতে বসা সব মহিলাদের সামনে হাত পাতিল | দেখা গেল কেহ তাহাতে এক সিকি রাখিল, কেহ বা আট আনা কি টাকা রাখিয়া কিছু সিকি উঠাইয়া লইল | মেথরানী সিক্কা-চয়ন শেষ করিয়া নিজের জায়গায় ফিরিয়া পয়সা গুনিল | গোনা শেষ হইলে সে শাড়ি উঠাইয়া ভিতরে এক ডোরাকাটা খাটো পাজামার পকেটে পয়সা রাখিয়া বসিয়া পড়িল | তারপর হাতে খৈনি লইয়া মর্দন করিতে লাগিল |

আবার হটাত গাড়ির বাতি চলিয়া গেল ও ঘ্যাঁচ করিয়া গাড়ি দাঁড়াইল | সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার কামরায় কোলাহল শুরু হইল | যোগানন্দ অন্ধকারে তীব্রতর শ্রবণশক্তির বলে শুনিলেন  অদ্ভুত সব কথা বার্তা |
-    “ধুত্তোর জুতো জোড়া গেল কোথায় ?”
-    “আরে সায়ার দড়িতে যে গিঁট লেগে গেছে | ডালিম একটু টর্চের বাতিটা ধর না |”
-    “কী করে ধরব ? টর্চের তো ব্যাটারি শেষ হয়ে গেছে |”
-    “আ মোলো | এ কী, ব্লাউজের বোতাম কোথায় আঁটকে ? একটু দেখ না বুলু |”
-    “দাঁড়া দাঁড়া | আমার জামার বোতাম এলোশাড়ির ঘাটে আঁটকে গেছে মনে হচ্ছে |”
-    “আরে আরে | আমার হাতায় কে হাত ঢোকাচ্ছে ?”
-    “ও হো | শাড়ির উপর কে দাঁড়ালো রে বাবা ?”

কিন্তু ক্রমে ক্রমে কোলাহল শান্ত হইল | কিছু ঘুঙুরের আলগা ঝংকার শোনা গেল | কিছু জিনিস প্রচুর সংখ্যায় খট খট শব্দে মাটিতে পড়িয়া গড়াইতে গড়াইতে থামিল | শেষে ধুপধাপ শব্দ করিয়া বেশ কিছু যাত্রী অন্ধকারে নামিয়া গেল | প্রৌঢ়া যোগানন্দর হাতে হাত রাখিয়া কহিলেন, “দাদা, আপনি নামবেন না ?” বেশ কর্কশ সে হাতের স্পর্শে তাঁহার এক শিহরণ হইল; সন্দেহ হইল, এ কি স্ত্রীলোকের হাত ?

বাহির হইতে এক আরপিএফ জওয়ান গাড়ির ভিতর টর্চের আলো ফেলিয়া কহিল, “এ বুধবারী , আজ শিয়ালদা মে চেকিং ভইল |”
মেথরানী কহিল, “ক্যা করি | এক বাবু হ্যাঁয় | কছু বাত সুনত্ নহি |”

তারপর বাহিরে এক বাঁশি বাজিল ও গাড়ি ছড়িয়া দিল | বাতিও জ্বলিল | যোগানন্দ দেখিলেন মাঝের বেঞ্চি দুইটি খালি | যেখানে যেখানে যাত্রী বসিয়া ছিল সেখানে সেখানে অবিন্যস্ত এক এক শাড়ি আলগোছে রাখা | কাহারো নীচ হইতে অন্তর্বাস উঁকি মারিতেছে | আর মেঝেতে প্রচুর নারিকেলের মালা গড়াগড়ি দিতেছে | মেথরানী ঘুরিয়া ঘুরিয়া সব সংগ্রহ করিয়া শাড়ি গুলি তাহার প্যাঁটরা খুলিয়া সযত্নে ভাঁজ করিয়া রাখিল | বাকী জিনিস সে টয়লেটে লইয়া গেল |

তারপর মেথরানী যোগানন্দর সামনে আসিয়া অতি নম্র ভাবে কহিল, “বাবু ইমার্জেন্সি আছে, সো এলোশাড়ি একটা লিয়ে লাও | সির্ফ ছ রূপিয়া |  দেখো এ দিদিও তো পিনিয়েছেন | খরাব আছে কি ?“

অগত্যা যোগানন্দ মেথরানীকে তিনটি ইমার্জেন্সি নোট দিলেন | প্রৌঢ়া তাহাকে কহিলেন, “বুধবারী, নারিয়াল, বডিস্ বগৈরা ন ডালো | বাবু বুড়া ছে | উপর সে মাস্ নইখে |”

বুধবারী এলোশাড়ি লইয়া আসিলে যোগানন্দ দেখিলেন তাহা এক মুখ-খোলা লুঙ্গির মতো | প্রথম প্রান্তে বোতাম লাগানো ও দ্বিতীয় প্রান্তে বোতাম-ঘাট | সেই বোতাম-ঘাট ঢাকিয়া শাড়ির কুঁচি | আর পিছন হইতে আলাদা সেলাই করা আঁচল উঠিয়া আসিয়াছে | আঁচলের মাঝে এক ব্লাউজ লাগানো আছে, যাহার পিঠে বোতামের ব্যবস্থা |  এই অদ্ভুত পরিধানের ভিতর আলাদা কাপড়ের আস্তর, যাহা সায়ার কাজ করিবে | কোমরের ভিতর বাঁধার জন্য দড়ি আছে ও তাহার দুই প্রান্তে দুই ঘুঙুর | যোগানন্দ বুঝিতে পারিলেন “চিরা-সায়া, বাটম্ সিটেম্ ” ইত্যাদি ব্যবস্থার যথার্থতা | ইহাও আন্দাজ করিলেন যে ঘুঙুর দ্বারা অন্ধকারে দড়ির প্রান্ত খুঁজিতে সুবিধা হইবে |

বুধবারী বড়ই যত্নে তাঁহাকে এলোশাড়ি পরাইয়া দিল | প্রথমে ব্লাউজের হাতা গলাইয়া পিঠের বোতাম লাগাইল | তারপরে কোমরের দড়ি দিয়া এলোশাড়ি বাঁধিয়া আঁচল সামলাইয়া দিল | শেষে যোগানন্দকে সিটে বসাইয়া তাঁহার মাথায় ঘোমটা দিয়া দিল | প্রৌঢ়া হাসিয়া কহিলেন, “দেখ্ বুধবারী, নজর না লগ্ যায় |”

নজর লাগিল শিয়ালদহে পৌঁছাইয়া | গাড়ি থামিলেই প্ল্যাটফর্মে মাতামাতি | কামরার সম্মুখ ঘিরিয়া খাকি-বাহন | তাহাদের সর্দার দুই সেনা লইয়া কামরায় প্রবেশ করিল | এক সেনা প্ল্যাটফর্মের দিকের দরজা আগলাইয়া দাঁড়াইল | অন্যটি  সংকট-কালীন দ্বার আটকাইবার পূর্বেই বুধবারী বগলে আয়না, এক হাতে প্যাঁটরা ও অন্য হাতে দুই প্লাস্টিকের ঝোলা লইয়া সেই দরজা দিয়া ‘জয় বাংলা’ কহিয়া ঝাঁপ দিল | সর্দার মাঝের বেঞ্চের দুই যাত্রীর সামনে আসিয়া বেটন দিয়া এক এক করিয়া অবগুণ্ঠন উঠাইয়া মুখ দেখিল | প্রৌঢ়া “আমার মাসিক আছে” কহিয়া এক কাগজ দেখাইলেন | তাহাকে ছাড়িয়া সর্দার যোগানন্দর সামনে নিঃশব্দে হাত পাতিল | প্রৌঢ়ার ইশারায় যোগানন্দ তাহার হস্তে দুইটি ইমার্জেন্সি নোট দিলেন | ‘বাকী থাকল তিনটে’, যোগানন্দ মনে মনে হিসাব করিলেন |

সর্দার সেনা লইয়া প্রস্থান করিলে সব যাত্রী গাড়ি হইতে নামিল | প্রৌঢ়া তাঁহাকে লইয়া ওয়েটিং রুমে গেলেন | সেখানে এক ইমার্জেন্সি নোট গেল বাথরুম ব্যবহার করিয়া এলোশাড়ি ছাড়িতে | তারপর আলাপ পরিচয় সম্পন্ন করিয়া শঙ্কর কুমার প্রসাদ বিদায় লইলেন - তিনি যাইবেন রেলের বিদ্যুৎ বিভাগে কিছু কাজের বিল দিতে | যোগানন্দ বাবু স্ট্যান্ড হইতে ট্যাক্সি লইয়া বাড়ি গেলেন | শেষ দুইটি ইমার্জেন্সি নোট গেল ট্যাক্সি-ভাড়ায় |

যোগমায়া এলোশাড়ি পাইয়া যারপরনাই খুশি হইলেন | তাহা বুকের সহিত সংলগ্ন করিয়া গদগদ কণ্ঠে কিছু বলিবেন কি হটাত তাঁহার মুখ কালো হইয়া গেল | শাড়ি মাটিতে ফেলিয়া দাপটের সহিত কামরা হইতে প্রস্থান করিলেন | যোগানন্দ ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়া শাড়িটি উঠাইয়া যত্নের সহিত আলমারিতে রাখিয়া দিলেন ভবিষ্যতের জন্য |


উপসংহার

মাস কয় পর ত্রিলোক বাবু আসিলেন জামাতা দর্শনে, গোপনে এক বগলা-মুখী বশীকরণ কবচ সাথে লইয়া | যোগমায়া তাঁহাকে গুপ্ত চিঠি মারফৎ জানাইয়াছিলেন যে তাঁহার জামাতা বোধহয় অন্য স্ত্রীতে আসক্ত হইয়াছেন | কারণ তিনি বাঁশবেড়ে ফেরত এক ব্যবহৃত শাড়ি যোগমায়াকে আনিয়া দিয়াছেন, যাহাতে অগুরু সেন্টের গন্ধ ছিল |

ত্রিলোক বাবু আসিলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সন্ধি হইল, ও এক দুই দিন ভালই কাটিল | তাঁহার ফিরিবার দিন, সকাল বেলায় শ্বশুর ও জামাতা দোতলার বারান্দায় চা পান করিতেছে | শরতের বাতাসে আসন্ন পূজার আভাস, ও নীচে হইতে আসা মাছ ভাজার গন্ধ |  কিঞ্চিত উসখুস করিয়া যোগানন্দ নিজেকে শ্বশুরালয়ে নিমন্ত্রণ করিলেন, “বাবা অনেক দিনে থেকে ভাবছি যোগমায়াকে নিয়ে আপনার ওখানে আসবো, একটু এলেশ্বরীর মন্দিরে যাব |
ত্রিলোক – “এলেশ্বরী মন্দির ? সে আবার কোথায় ?”
যোগানন্দ - “ওই যে, যেখান থেকে এলেশ্বরী ফাস্ট লোকাল ছাড়ে |”

ত্রিলোক বাবু হটাত হোহো করিয়া এমন হাসিলেন যে তাহার বিস্কুট চায়ে পড়িয়া গেল | হাসি থামিলে কহিলেন, “ও তুমি এলেশ্বরীর ব্যাপারটা জানো না বুঝি |”

মনোযোগ সহকারে ত্রিলোক বাবু একটি বিড়ি জ্বালাইয়া খান দুই গভীর টান দিলেন | তারপর এই বৃত্তান্ত শুনাইলেন:

“তাহলে শোনো |”
“এলেশ্বরী কোনও দেব-দেবী নয় |
“বাঁশবেড়ে থেকে শিয়ালদা’র উল্টো দিকে গেলে এক কিমি মতো দূরে এক রেলওয়ে হল্ট আছে, যেখান থেকে এলেশ্বরী ফাস্ট লোকালটা ছাড়ে | এক কালে হল্টটার নাম ছিল বাঁশতোলা হল্ট | একটা সাইডিং ছিল বাঁশ লোড্ করার জন্য |
“সেখানে যে মেয়ে লোডাররা কাজ করতো তাদের লেখাপড়া শেখাতে এক পাদ্রি আসতেন কিছু নান্ নিয়ে | নানেদের সুবিধার জন্য লেডিজ স্পেশাল গাড়ি চেয়ে তিনি রেলে কর্তৃপক্ষকে এক আবেদন-পত্র দিলেন | তা, ওই কটা নানের জন্য লেডিজ স্পেশাল হবে কোথা থেকে ? খুঁজেপেতে পাদ্রি আমাদের বাঁশবেড়ের তখনকার স্টেশন-মাস্টার টমাস সাহেব কে ধরলেন | বাঁশতোলার সাইডিঙে একটা পুরানো মেডিকেল ভ্যান পড়ে ছিল | টমাস সাহেব ওটাকে ঝাড়ামোছা করে জুড়ে দিলে এক মাল গাড়িতে | সকালে শিয়ালদহ থেকে আসত, আর বিকেলে ফিরে যেত | একটাই স্টপ ছিল, আমাদের বাঁশবেড়েতে |
“কিন্তু  কিছু অবাধ্য পুরুষ মানুষ উঠতে লাগলে সেই কামরায় | টমাস সাহেবের এক কাজ হয়ে দাঁড়ালো গাড়ি থেকে লোক খেদানো | পুরুষ যাত্রী দেখলেই তাকে আটকাতে টমাস সাহেব হাতজোড় করে বলত, “লেডিজ স্পেশাল, সরি |” সে কামরার দরজার উপর ইংরেজিতে লেখাল এল. এস.  ...  মানে লেডিজ স্পেশাল আর কি | পরে টমাস সাহেব রিটায়ার করলে সমস্যা আবার যে কে সেই | তখন সমাধান করতে এলো এক এংলো টিটিই | ডেসমন্ড নাম তার, বদমেজাজি, কম কথার মানুষ |  সে শিয়ালদা’র আগে আউটারে গাড়ি দাঁড় করিয়ে পুরুষ যাত্রীদের ধরে ধরে ফাইন করতে লাগল | কেউ কিছু আপত্তি করলে শুধু বলত, “এল এস | সরি !” সুতরাং আউটারে গাড়ি দাঁড়ালে লোকে নেমে পড়ে পালাত | সেই থেকে লোকমুখে সেটা হয়ে দাঁড়ালো এলেশ্বরী স্টপ | গাড়ির ডাকনাম হল এলেশ্বরী ফাস্ট লোকাল | তখন একটাই স্টপ ছিল বাঁশবেড়েতে | এখন তো গাড়িটা সব স্টেশনই ধরে | পরে ওই ঘনি খান চৌধুরী ব্যাটা এসে বাঁশতোলার নাম বদলে করলো এলেশ্বরী |”
“এবার বুঝেছ. এলেশ্বরীর মর্ম ?”

গল্প শেষ করিয়া ত্রিলোক বাবু সন্তর্পণে কাপ হইতে বিগলিত বিস্কুটটি জিভ দিয়া টানিয়া সেবন করিলেন | চায়ে চুমুক দিয়া তৃপ্তিসূচক শব্দ করিয়া প্রশ্ন করিলেন, “তোমাকে বুঝি গাড়িতে এলোশাড়ি কিনতে হয়েছিল ?”
যোগানন্দ – “হ্যাঁ বাবা |”

কিছুক্ষণ চুপ থাকিয়া যোগানন্দ পাল্টা শুধাইলেন, “বাবা, এলোশাড়ি নামটার ব্যুৎপত্তি কী ?”
ত্রিলোক বাবু মাথা নাড়িয়া কহিলেন, “ঠিক জানিনা | তবে শুনেছি, বাঁশবেড়ে স্টেশনে এক মেথর ছিল বুধুয়া নামে | সে ছাপরা গেলে কোনও মন্দির থেকে দানে দেয়া বিহারিদের পুজোর হলুদ শাড়ি সস্তায় কিনে এনে স্টেশনে বেচত | ইমার্জেন্সি তে কাউকে এলেশ্বরী ধরতে হলে সে সেই শাড়ি পড়ে এলেশ্বরীতে উঠে ঘোমটা দিয়ে বসে থাকত | ধর্মের ব্যাপার বলে কথা | কিন্তু ডেসমন্ড সেটা ধরে ফেললে একদিন | তারপর হলুদ শাড়ি দেখলেই চ্যাঁচাত “ইয়েলো শাড়ি !” সেই থেকে বোধ হয় এলোশাড়ি কথাটা এসেছে | শুনেছি এলোশাড়ি পরা যাত্রীরা গাড়ির মাঝের বেঞ্চে বসতো যাতে জানালা দিয়ে ডেসমন্ড আসছে দেখে সময়ে পালাতে পারে |”
যোগানন্দ – “বাবা, বুধুয়া কি এখনো আছে ?”
ত্রিলোক বাবু – “শুনেছি ডেসমন্ড এর দাপটে তার শাড়ির ব্যবসা চুলোয় উঠলে সে বাঁশবেড়ে স্টেশনের কাজ ছেড়ে দিয়েছিল  | তারপর তো এক মেথরানী এলেশ্বরী তে শাড়ি ভাড়া খাটাতে লাগলো | বুধুয়া কোথায় গেল  কে জানে |”

দ্বিপ্রহরের ভোজনের সময় যোগমায়া নিজেই পরিবেশন করিলেন | তাহার চিত্ত বড়ই প্রফুল্ল | ত্রিলোক বাবু তাহাকে কহিলেন, “তোর ধনে-পাতা দিয়ে মাছের ঝোলটা খুব ভালো হয়েছে |”
যোগমায়া – “বাপরে, সে কী কাণ্ড | ঝোল বসিয়ে দেখি ধনে-পাতা নেই | অমনি গাউন খুলে চট করে তোমার আনা এলোশাড়িটা জড়িয়ে ছুটলাম | ধনে-পাতা কিনে শাড়ি ছেড়ে গাউন পরে রান্নাঘরে গিয়ে মাছে দিয়ে নামালাম – কত সময় লাগল জানো ?”
ত্রিলোক বাবু – “কতক্ষণ ?”
যোগমায়া – “স্রেফ পাঁচ মিনিট | বাবা, তোমার আনা এলোশাড়িটা খুব ভালো | খুব কাজের হয়েছে |”
ত্রিলোক – “বেশ বেশ | তোর ভালো লাগলেই ভালো |
“তা, তোকে বলিনি, আসলে আমার উইলে তো লিখি নি, তাই কথাটা গোপন রেখেছিলাম | যোগানন্দ যে এলোশাড়িটা তোকে এনে দিয়েছিল, সেটা তোর মায়ের জন্য কিনেছিলাম রে | ফুল-হাতায় গরম লাগত বলে সে কোনোদিন শাড়িটা পরলও না | তারপর তো সে চলেই গেল সব ছেড়ে |”

ত্রিলোক বাবু কপটশ্রু মোচন করিলেন | যোগমায়া তাঁহার কাঁধে হাত দিয়া কহিলেন, “বাবা কেঁদো না |”
ত্রিলোক বাবু - “প্রবাল জেদ ধরে ছিল ওই শাড়ি ও নেবে ওর বউ এর জন্য | আমি তাই চুপি চুপি যোগানন্দর হাতে পাঠিয়ে দিলেম | তোরঙ্গে রেখে কেমন ছাতা-পড়া গন্ধ হয়েছিল তাই একটু অগুরু সেন্ট লাগিয়ে দিয়েছিলাম, নইলে তোর আবার হাঁচি হবে বলে |”

যোগানন্দ চমকাইয়া বিষম খাইলেন | তাঁহার বিষমের ধাক্কায় টেবিলের থালা, বাটি, গেলাস নড়িয়া গেল | ত্রিলোক বাবু সেসব অগ্রাহ্য করিয়া, ও অশ্রু সম্বরণ করিয়া চার আঙ্গুলে চাটনি চুষিতে লাগিলেন |

পূর্বেই বলিয়াছি, ত্রিলোক বাবু বিচক্ষণ ও ধুরন্ধর - উভয়ই |


---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ২৯ অগাস্ট ২০১৩