বুধবার, ২৭ নভেম্বর, ২০১৩

শিশিরের স্মৃতি

|| শিশিরের স্মৃতি ||


আজ এত দিন পরে ...

এভাবে কেন তুমি ক্ষণিকের তরে আমার স্মরণে এলে ?
আমার একটা মিষ্টি সকাল তুমি কী ভাবে নষ্ট করে দিলে !

কতদিন পরে মনে পড়ল আজ, না জানি
তোমায় দেখি নি, কি তোমার কণ্ঠ শুনি নি   
ঝগড়া কিম্বা রাগ করি নি, বা ভালবাসি নি
মূক উৎসুকতায়, মানসে উপোষ করে
দিব্যি পারছিলাম থাকতে তোমাকে ভুলে ...

এভাবে কেন তুমি ক্ষণিকের তরে আমার স্মরণে এলে ?
আমার একটা মিষ্টি সকাল তুমি কী ভাবে নষ্ট করে দিলে !

যখন হল সকাল, উঠল সূর্য, বইলো মুক্ত হাওয়া
মনে পড়ল একসাথে বসে এক গলায় গান গাওয়া
কিম্বা চুপ করে বসে থেকে সিক্ত সবুজ গালিচায়
রাতভোর ঝরা জোছনার কণা, ঘাসের শীর্ষে শিশির
আঙ্গুল দিয়ে ছোঁয়া ৷ শিহরিত করে পৃথিবীকে,
দিব্যি ছিলাম, স্বেদ-বিন্দু শিশির মাখিয়ে আঙ্গুলে ...

এভাবে কেন তুমি ক্ষণিকের তরে আমার স্মরণে এলে ?
আমার একটা মিষ্টি সকাল তুমি কী ভাবে নষ্ট করে দিলে !

সদ্য ঘুম ভাঙ্গা আলসেমির ছেঁড়া স্বপ্নের শত
আমেজ জড়িয়ে গায়ে, পুরনো লেপের মত
চিত হয়ে শুয়ে চোখ বুজে ভাবা যে পৃথিবীটা
এখনো আছে ঘুমিয়েই অকাতরে, অন্তরতম
নির্দোষ অবচেতনে ... তার দিগন্তের প্রান্তরে
হারাচ্ছিলাম তোমাকে, চোখের আড়ালে ...

এভাবে কেন তুমি ক্ষণিকের তরে আমার স্মরণে এলে ?
আমার একটা মিষ্টি সকাল তুমি কী ভাবে নষ্ট করে দিলে !

এখন তুমি এসেছ তো থাক আমার মনোবাসনায় প্রতি ক্ষণে
আমার নষ্ট সকাল মিষ্টি করে দিতে অতি সহজে, অবহেলনে
তোমার স্বিন্ন শরীরে ছাওয়া, শিশির মাখা মত্ত পরবশ রোঁয়া
আমার নেশাগ্রস্ত আঙ্গুল খোঁজে তাদের স্পর্শকাতর ছোঁয়া
শিশিরের স্বেদ মাখিয়ে নিতে দিও হাতের শিথিল আঙ্গুলে,
যাতে সে শুকিয়ে বিলীন হয়ে, জুটে যায় মুক্ত হাওয়ার দলে ৷৷


-----------------------------------------------------------------------------------------------
ইন্দনীর / ২৭ নভেম্বর ২০১৩

সোমবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৩

স্পর্শ



|| স্পর্শ ||


                              যখন স্তব্ধ বাতাসে শুনি,
                পড়ে যাওয়া পারার কণায়, কণায়
                 ভেঙ্গে যাওয়ার নিঃশব্দ আওয়াজ |
                       যখন নিরেট অন্ধকারে দেখি
         কেটে যাওয়া চলচ্চিত্রের খোপে খোপে
                             খাপছাড়া উধাও অদৃশ্য |
                            যখন নিথর অন্তরে শুঁকি
                  জমানো অনেক অনেক হৃদয়ের
                          অপ্রস্ফুটিত পুষ্পের অঘ্রাণ |

             তখন কেন যে মনে হয় আছে ঈশ্বর
                        না শব্দে, না দৃশ্যে, না ঘ্রাণে, 
নিথর অন্তরের নিরেট অন্ধকারে স্তব্ধ বাতাসে

                 তার জন্যে প্রার্থনার দরকার নেই
                           শুধু আছে হয়ে ইন্দ্রিয়হীন,
                     হতে ঈশ্বরের ব্যাপ্তিতে বিলীন

                               ভগবানের বাসা আছে
                  স্পর্শের কামার্ত বিস্ফারিত ওষ্ঠে 
                  যেখানে সমস্ত ইন্দ্রিয় কেন্দ্রীভূত
                  তার এক কামাতুর অনুভূতিতে
             নির্বাসনে দিয়ে সব শব্দ, দৃশ্য, ঘ্রাণ
            যোগাতে জীবন এক দেহে, নিষ্প্রাণ
                    এক অভিনব নির্নিমেষ চুম্বনে ||


-------------------------------------------------------------------------------------

ইন্দ্রনীর / ২৫ নভেম্বর ২০১৩

রবিবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১৩

সম্মোহন

দশ বছর এক সাথে বাস করে পারুলের আর আমার বিচ্ছেদ হয়ে গেল | প্রেম করার সময় ধরলে, আমাদের সম্পর্ক বাইশ বছরের | আমার যখন বারো আর পারুলের দশ, তখন ভালো লাগা থেকে শুরু হয় এই যুগ্ম জীবন | কলেজে উঠে আবিষ্কার করলাম যে দুজনে যা করতে চাই, বা বলতে গেলে, জীবন থেকে যে যা যা পেতে চাই তার জন্য একে অপরের অপরিহার্য পরিপূরক | অতএব অদম্য প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, উভয়ের যৌথ চাহিদা মেটান | এই সব করতে করতে চব্বিশে বিয়ে করলাম | প্রথম লক্ষ্য কর্মক্ষেত্রে নিজেদের স্থাপন করা, তারপর সংসার | পারুল এম এ করে কলেজে ঢুকল | আমি ম্যানেজমেন্ট পাশ করে একটা ভালো কাজ পেলাম | সাতাশে পড়ে, চাকরিতে সুস্থিত হয়ে, মন বসল সংসারের পাটে - সংসার গড়তে |

কিন্তু সংসার যে টুকু সেই টুকুই রয়ে গেল | আত্মীয় স্বজনের নানা রকমের মন্তব্য ও উপদেশ শুরু হল | ডাক্তার দেখিয়ে কিছুই ধরা পড়ল না | পারুলের কোনও দোষ নেই, আমারও স্বাস্থ্য অটুট, পারস্পরিক আকর্ষণ অক্ষুণ্ণ | অথচ কোনই ফল নেই | সেই নিয়ে শুরু দুজনেরই নানারকম অভাব বোধ এবং অভিযোগ – আর তার থেকে খিটখিট করা অশান্তি | শেষে পারুলের আত্মীয় স্বজনের আর আমার বন্ধুদের কথায় গত কার্তিকে, পুজোর পরে, আমরা আইনত বিবাহ বিচ্ছেদ নিলাম |

ছাড়াছাড়ি হলে প্রথম দিন পারুল চলে গেল দাদার কাছে, কিছুই জিনিস না নিয়ে | তারপর একদিন দাদা, বৌদিকে সাথে নিয়ে এসে তিনজনে তিন স্যুটকেস ভরে কাপড় জামা, প্রসাধন আর পড়ার বই খাতা নিয়ে গেল | বাকি জিনিস রয়ে গেল | ওরা বেরনোর সময় আমি খাবার টেবিলে বসে রইলাম | ওর দাদা কিছু বলতে এসে শুধু আমার হাত ঝাঁকিয়ে চলে গেল | একটু পরে পারুল এসে বলল, “আমার বাকি জিনিস গুলো কাউকে দিয়ে দিও বা ফেলে দিও | জমিয়ে রেখ না |” আমি উত্তর না দিলে বলল, “আর, যদি ... সত্যি কোন দরকারের কথা থাকে তো ফোন করতে পার |” ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিটা অনুভব করে একবার ইচ্ছে করল ওর মুখটা দেখি, কিন্তু এও মনে হল যে তার সময় চলে গেছে | বিদায় স্বীকার করে নিচে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বললাম, “হ্যাঁ | এবার এসো |”

কিছুদিন পারুলের ছেড়ে যাওয়া জিনিস গুলো রেখে দিলাম, যাতে ঘরটা একেবারে ফাঁকা না হয়ে যায় | মনে হতে থাকল যে ওদের মধ্যে লুকানো যে পিছুটানের চুম্বক আছে সেটা হয়ত চলে যাওয়া সময়টাকে আবার গুটিয়ে ফিরিয়ে আনতে পারবে | কিন্তু দিনকে দিন বেওয়ারিশ জিনিসগুলো নিঃস্বতর হতে থাকল | একদিন দেখলাম পারুলের পুরনো সেতার, যেটা বিয়ের পর কোনোদিন বাজিয়েছে বলে মনে করতে পারলাম না, ধুলোয় ভরে গেছে, কয়েকটা তার ছিঁড়ে গেছে | সেদিন ওটাকে একটা বাজনার দোকানে দিয়ে আসলাম | ভাবলাম এই ভাবে একে একে পারুলের সব জিনিস বিদায় করে দিলে বাড়িটা খালি হয়ে অতীতের খোলস খসিয়ে একটা নতুন অস্তিত্ব পাবে | আমি আবার পথে বেরিয়ে মাথা উঁচু করে চলার শক্তি পাব | কিন্তু জানি না কী দুর্বলতায়, না অন্য কোন কারণে, আর কিছুই জিনিস ফেলা হল না | ধুলোর কী এক দুর্বোধ্য আকর্ষণ বাড়িটাকে একটা চলে যাওয়া সময়ের মোচড়ে আটকে একটু একটু করে আমাকে সম্মোহিত করতে লাগল |

অফিসের কাজ একাকীত্ব থেকে কিছুটা রেহাই দিলেও, স্টেশন আর বাড়ির মধ্যে হেঁটে যাওয়া আসার নিঃসঙ্গতাটা কিন্তু কিছুতেই কাটল না | জীবনের অনেক অতিরিক্ত সময় ছাঁটলাম অফিস যাওয়ার সময় বা অফিস থেকে ফিরে স্টেশনে নেমে প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে নির্লিপ্ত হয়ে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোকজন আর লোকালের ব্যস্ততা দেখে | একদিন একজন ঝাড়ুদার অনেকক্ষণ আমার বসার জায়গাটা বাদ দিয়ে ঝাঁট দিতে দিতে আমায় শেষে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি কি কারো জন্য অপেক্ষা করছেন ?” আমি বাধ্য হলাম উঠে পড়ে বলতে, “করছিলাম ... তবে মনে হচ্ছে সে আর আসবে না |”

সকালের হাওয়ায় ঠাণ্ডা ভাব শুরু হলে আমাকে একটা বেঞ্চ খুঁজতে হল যাতে ওই সময় রোদ পড়ে | আমার প্ল্যাটফর্মের এক প্রান্তে সেরকম একটা বেঞ্চ পেলাম, সব কিছু থেকে এত দুরে যে সকাল আটটা, সাড়ে আটটা অব্দি ওটা ফাঁকা পড়ে থাকে | রোজ বাড়ি থেকে আটটার আগেই বেরিয়ে গিয়ে ওটা দখল করতে শুরু করলাম | তারপর অন্তত ন’টা – সাড়ে ন’টা অব্দি বসে দেখা কী ভাবে আস্তে, আস্তে প্ল্যাটফর্ম ভরছে | শেষে খুব ভিড় হয়ে গেলে, আর অফিসে দেরী হওয়ার অস্বস্তিটা শুরু হলে উঠে আমার লোকাল ধরা | ঠিক যে ভাবে আগে পারুল আর আমি রোজ আটটার আগে স্টেশন গিয়েছি – ও সোয়া আটটায় লোকাল ধরেছে, আর আমি বসে বসে কাগজ পড়ে ন’টায় | পার্থক্য বলতে এই যে এখন প্রায়ই ন’টার লোকালটা ছেড়ে দিই, ভিড়ের ঘনিষ্ঠতা অসহ্য লাগে বলে | কাগজ আর পড়তে পারি না | শুধু বসে বসে ভাবি, কখনো কি কোনও ভাবে পারুলের সাথে দেখা হতে পারে ? তাই হলে ... ? আর, মাঝে মাঝে এই প্রশ্নটা আমাকে জ্বালায় – একদিকে সংসারের মোহ আর অন্য দিকে বাইশ বছরের অভ্যাস – কোনদিকের ভারটা বেশি ?

এই ভাবে না শান্ত, না অশান্ত এক মাস কেটে গেল | নভেম্বরের মাঝামাঝি – শীত মোটামুটি নেমেছে – একদিন আমার বেঞ্চের কাছে গিয়ে দেখি তাতে একজন মহিলা বসে আছে | পাশে বসা উচিত হবে কিনা ভাবছি, মহিলা উঠে দাঁড়াল | গায়ে মোটা গরম চাদর, যেটা মাথার পিছনে ঘোমটার মত করে একটু তোলা | তার নিচে মাথার চুল একেবারে অবিন্যস্ত, আর শাড়িটা সর্বাঙ্গে কুঁচকে আছে | আমার উপস্থিতি বোধ করে আমার দিকে একবার তাকিয়ে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিলো | সেই এক দৃষ্টিতে মুখটা দেখে মনে হল বয়েস পঁচিশ থেকে তিরিশের মধ্যে হবে | রোগা শরীরটা মাঝখানে একটু ভারী | মহিলা উঠে দাঁড়িয়ে নিজের স্যুটকেসটা তুলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়েই ওটা নামিয়ে আবার আমার দিকে তাকাল | তারপর আমার দিকে একটু এগিয়ে এসে বলল, “আপনার ট্রেন কি এখনই ?”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, “না, দেরী আছে |”
মহিলা – “তাহলে আপনি আমার স্যুটকেসটা একটু দেখবেন ? আমি যাব আর আসব |”
আমি – “আপনি কতদূর যাবেন ? দেরী হবে ?”
মহিলা – “বেশি দেরী হবে না, বড় জোর মিনিট দশেক |”
আমি – “ঠিক আছে, যান |”

মহিলা স্যুটকেসটা বেঞ্চের উপর তুলে রেখে চলে গেল | আমি দেখলাম স্যুটকেসটায় তালা নেই | দুটো গা-তালার একটা ঠিক করে বন্ধ অব্দি করা নয় | আউটারে দাঁড়ান একটা লোকাল হর্ন  দিয়ে নড়ল ঢোকার জন্য | আমার প্ল্যাটফর্মে ওটার জন্য অপেক্ষারত যাত্রীরা চঞ্চল হল | আমি বেঞ্চে বসে পড়ে হাত বাড়িয়ে স্যুটকেসটা নিজের যথাসম্ভব কাছে টেনে এনে রাখলাম |  চোখে পড়ল হ্যান্ডলের নিচে লেখা নাম ঠিকানা, ‘শেফালী দত্ত, ২০/এ পাওয়ার সাপ্লাই লাইন, আরামবাটী - ৭’ | দৃষ্টি সরিয়ে অলস চোখে যাত্রীদের মধ্যে শুরু হওয়া ব্যস্ততা দেখতে মন দিলাম | লোকালটা এসে সামনে দাঁড়িয়ে একদল যাত্রী উগরে আর এক দল যাত্রী শুষে উল্টো মুখে রওনা হল | গাড়িটা, আর নেমে যাওয়া প্যাসেঞ্জারদের ভিড় সরে গেলে দপ করে একটা ঠাণ্ডা হাওয়ার দমকা ধাক্কা লাগল | বুকের উপর হাত গুটাতে গিয়ে ঘড়িতে সময় দেখে মনে হল মহিলা যাওয়ার পর প্রায় পনের মিনিট কেটে গেছে | এমন সময় দেখলাম মহিলা আসছে মন্থর গতিতে, হাতে কাগজ, কলম | কেন জানি না তার চলার ভঙ্গি আর হাবভাব দেখে মনে হল সে অনেকদিন ঘুমায় নি আর নিজের কোনরকম যত্ন নেয়নি |

মহিলা এসে স্যুটকেসের ওপাশে বসে, কাগজটা হাঁটুর উপর রাখল | খানিকক্ষণ তার উপর কলমটা ধরে থেকে জিজ্ঞাসা করল, “আপনার কাছে পেন আছে ? আমার পেনের রিফিলটা মনে হচ্ছে শেষ হয়ে গেছে |”
আমি কিছু না বলে আমার কলমটা বের করে এগিয়ে দিলাম | দিতে গিয়ে চোখ চলে গেল মহিলার পায়ের দিকে | দেখলাম পায়ের ফ্যাকাসে, শুকনো দুটো পাতা | আবার মনে হল মহিলা অনেক দিন নিজের কোনরকম যত্ন করেনি | নিজেই নিজের এই অনুসন্ধিৎসায় বিরক্ত হয়ে মহিলার দিক থেকে দৃষ্টি সরাতে গিয়ে দেখলাম সে কাগজটার উপর লিখছে | একটু পরে কলমটা ফেরত দিয়ে বলল, “ধন্যবাদ |” আমি কলমটা নিয়ে পকেটে রাখলাম | ততক্ষণে উল্টোদিকের প্ল্যাটফর্মে একটা লোকাল এসেছে, ওদিকে ব্যস্ততা শুরু হয়েছে | আমি পারুলকে আবিষ্কার করার আশায় মন দিলাম |

খানিকক্ষণ পরে মনে হতে লাগলো এভাবে এই মহিলার সাথে কতক্ষণ বসা যায় | আমি উঠে চলে যাব ভাবছি কি ও বলল, “আপনি আর একবার স্যুটকেসটা রাখবেন, যদি আপনার তাড়া না থাকে ?” আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, “না, তেমন কোনও তাড়া নেই | আমি একজনের জন্য অপেক্ষা করছি | আপনি যান |” মহিলা উঠে এগোল | কুড়ি মিনিট মত পরে ফিরে এলো সেই একই ভাবে | বসে পড়ে আবার হাতের কাগজটা হাঁটুর উপর মেলে রাখল | কৌতূহল চাপতে না পেরে আড়চোখে দেখলাম সেটা একটা হাতে ভরা টেলিগ্রামের ফর্ম | মনে হল ওটাই পাঠানোর জন্য গিয়েছিল |

একটু পরে মহিলা আমাকে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা বলতে পারেন, এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের টেলিগ্রাম অফিসটায় কি সব সময় লোক থাকে না ?”
আমি – “তা তো জানি না |”
মহিলা – “এই নিয়ে দু’বার গেলাম | প্রথম বার টেলিগ্রাম ফর্মটা ভরতে গিয়ে পেনের কালি শেষ হয়ে গেল | তাই দেখে সেই যে লোকটা ‘আসছি’ বলে কোথায় চলে গেল, আর পাত্তা নেই | বুঝতে পারছি না আমার ট্রেন আসার আগে এটা পাঠাতে পারব কি না |”
আমি – “আপনার ট্রেন কটায় ?”
মহিলা – “আগে বলেছিল এক ঘণ্টা লেট আছে | কিন্তু এই বলল মৌরিপাড়া ছেড়েছে | তাহলে আর পনের মিনিটে এসে পড়বে | একবার ট্রেনে উঠলে তো আর না নামা অব্দি টেলিগ্রামটা পাঠাতে পারব না | তাহলে আজ আর হবে না | অথচ, আজই একটা খবর না পেলে বাড়ির লোক চিন্তা করবে | কী যে করি ?”

আমি চুপ করে থাকলাম | একটু পরে মহিলা বলল, “আপনি তো কারোর জন্য অপেক্ষা করছেন, তাই না ?”
আমি – “এক রকম তাই | কেন বলুন তো |”
মহিলা – “তার কত দেরী আছে ?”
আমি – “ঠিক জানিনা, গাড়ি তো বলছে লেট ...”
মহিলা – “যদি কিছু মনে না করেন, আপনি কি স্টেশন থেকে বেরোবার সময় টেলিগ্রামটা করে দিতে পারবেন, আমি যদি আপনাকে ফর্মটা আর টাকা দিয়ে দিই ?”
আমি – “কিন্তু আপনি তো বললেন এখন কাউন্টারে লোক নেই |”
মহিলা – “যদি দেখেন তখন লোক আছে, তাহলে ?”
আমি – “আপনি যাকে টেলিগ্রাম পাঠাচ্ছেন, তাকে ফোন করা যায় না ?”
মহিলা – “সেখানেই মুশকিল | বাড়ির ফোন কতো দিন হল ডেড হয়ে আছে |”
আমি – “বাড়িতে কারো মোবাইল নেই ?”
মহিলা – “বাবার আছে, কিন্তু বয়েস হয়েছে | অজানা নম্বর দেখলে তোলে না |”
আমি – “ওহ ! আপনার মোবাইল ... ”
মহিলা ম্লান হেসে বলল, “দুর্ভাগ্য কি একা আসে ? আমার মোবাইলের চার্জার খুঁজে পাচ্ছি না |”
আমি – “আমার মোবাইলটা দেব ?”
মহিলা – “বললাম তো, বাবা মোবাইলে নামের বদলে নম্বর দেখলে তুলবে না | ... ভোর থেকে আমি এই নিয়ে চেষ্টা ... ”
আমি – “ওহো | ... তাহলে তো টেলিগ্রাম ছাড়া উপায় নেই | কিন্তু, কত লাগবে কে জানে ?”
মহিলা – “আমি তো একবার টেলিগ্রামটা দেখিয়েছি | দেখে কত টাকা লাগবে হিসেব করে কাউন্টারের লোকটা কাটাকুটি বাদ দিয়ে পরিষ্কার করে লিখতে বলে সরে গেল | ... আমি না হয় আপনাকে টাকা দশেক বেশি দিয়ে দেব |”
আমি – “না তার দরকার হবে না | হলে এক দু’ টাকা এদিক ওদিক হবে | সে আমি দেখে নেব | কিন্তু, আমি ...”

কথা শেষ হবার আগেই দেখলাম মহিলার মুখে হতাশার ছায়া পড়ল | ঘনিয়ে আসা কোনও অজ্ঞাত বিপাকে জড়িয়ে পড়ার আশংকাটা দূরে সরিয়ে বললাম, “আচ্ছা, দিন টেলিগ্রামটা |”

মহিলা আমাকে কাগজটা ভাঁজ করে দিল, আর কিছু টাকা দিল | তারপর মিনিট দশেক পরে একটা ঘোষণা শুনে উঠে  দাঁড়িয়ে বলল, “আমি এবার এগোই | আপনাকে অনেক ধন্যবাদ |”

তাকিয়ে দেখলাম মহিলার ক্লান্ত চেহারায় কালি পড়া দুটো কালো চোখ গভীর কৃতজ্ঞতায় ভরে গেছে, আর ঠোঁটে একটা বিব্রত হাসি | মহিলা চাদরটা খুলে ঠিক করে জড়াতে গেলে দেখে সন্দেহ হল ও কি অন্তঃসত্ত্বা ? তারপর মহিলা স্যুটকেসটা তুলে নিয়ে এগোতে লাগলো | আমার কী মনে হল, আমি উঠে দাঁড়িয়ে ওকে নমস্কার করে, আবার বসে পড়ে, ভাবলাম আমার লোকালটা ধরে অফিসে পৌঁছে লোক পাঠিয়ে টেলিগ্রামটা করে দিলেই তো হয় |

ন’টা চল্লিশে ঘোষণা করল আমার সাড়ে নটার লোকালটা বাতিল হয়ে গেছে | জমে আসা ভিড় দেখে আমার আর ইচ্ছা করল না বসে থাকতে | বরঞ্চ টেলিগ্রামটা পাঠিয়ে দেয়ার একটা তাগাদা অনুভব করলাম | উঠে গিয়ে দেখি টেলিগ্রাম কাউন্টারে একটা বুড়ো লোক বসে আছে | জানালা দিয়ে ফর্মটা দিলাম | লোকটা এক নজর দেখে নিয়ে ফর্মটা ফেরত দিয়ে বলল, “আরে মশাই, বাক্যগুলোর মাঝখানে দাঁড়ির বদলে স্টপ লিখতে হয় |”
আমি – “যে ভাবে লেখা আছে সে ভাবেই পাঠানো যায় না ?”
লোকটা – “যাবে না কেন ? কিন্তু বাবা, স্টপগুলোর জন্য তো আর পয়সা লাগে না | বরঞ্চ লিখলে, যে টেলিগ্রাম পাচ্ছে তার পড়তে সুবিধা হয় | লিখবেন তো লিখুন, না হলে দিন, আমি এমনি পাঠিয়ে দিচ্ছি |”
আমি – “না, না | আমি ঠিক করে লিখে দিচ্ছি |”

একটু আশ্চর্য লাগলো যে মহিলা বলেছিল এই ফর্মটা একবার দেখানোর পরে আবার করে ভরা | ও কি সত্যি টেলিগ্রামটা দেখিয়েছিল ?

টেলিগ্রামটা পড়ে দেখি ইংরেজি হরফে বাংলা শব্দে লেখা “আমার জন্য চিন্তা করবে না | আমি কোথাও পৌঁছেই যাব | যার জন্য আর যার সাথে বেরিয়েছি সেই জন আমার ভরসা | তোমরা ভাল থেক |” কথাগুলো এত ঘন করে লেখা যে ওর মাঝে স্টপ লেখা সম্ভব নয় | আমি একটা নতুন ফর্ম নিয়ে নকল করে দাঁড়িগুলোর বদলে স্টপ যোগ করে ফর্মটা দিলাম টাকার সাথে | অভ্যাস মতো রসিদটা নিয়ে পার্সে রেখে দিলাম, পুরনো ফর্মটা না ফেলে দিয়ে |

এর পর ঘটনাটা ভুলেই গেলাম প্রায় | মনে করার মত তো কিছু ছিল না | খালি কখনও, এক আধ বার, কোথাও ওইরকম কোন ক্লান্ত, অবিন্যস্ত মহিলা দেখলে ঘটনাটা মনে পড়েছে |

শীত শেষ হয়ে এলো | মাঘের শেষে কদিন খুব বৃষ্টি হল | হিমালয়ে আবার বরফ পড়ে তার শৈত্যপ্রবাহ উত্তর ভারত থেকে এসে শীতকালের মেয়াদ বাড়িয়ে দিল | ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি বহরমপুর যেতে হল কাজে | সারাদিন কাজ করে বিকেলে হোটেলে ফিরে চা আনিয়ে বেয়ারাটাকে বখশিশ দিতে গিয়ে দেখলাম সব পাঁচশ টাকার নোট | একটা বের করলাম ওকে দেব খুচরো আনতে | তখন নজরে পড়ল নোট গুলোর পিছনে টেলিগ্রামের ফর্ম আর রসিদটা | বের করে ঠিকানাটা দেখে বেয়ারাটাকে জিজ্ঞাসা করতে বলল পাড়াটা কাছেই | রিক্সা নিলে দশ-বার মিনিটে পৌঁছে যাব | চা খেয়ে জামাটা বদলে বেরিয়ে পড়লাম |

বাড়িটা খুঁজে পেতে কোনও অসুবিধা হল না, রাস্তা আর বাড়ির নম্বর চট করে মিলে গেল | রিকশাওয়ালাকে দাঁড়াতে বলে, বাড়ির ঘণ্টার বোতাম টিপলাম | একজন বয়স্ক চাকর দরজা খুলল | আমি বললাম, “হারাধন বাবু আছেন ? একটু ডেকে দেবে ওনাকে ?” বোধহয় আমার আওয়াজ শুনে ভেতর থেকে কেউ জিজ্ঞাসা করল, “কে ?” তারপর ভিতর থেকে এক বয়স্ক ভদ্রলোক বেরিয়ে এলো, চোখে খুব মোটা চশমা | আমাকে সন্দিগ্ধ ভাবে জিজ্ঞাসা করল, “কে আপনি ? কী চাই ?”
আমি – “আমার নাম প্রবাল রায় | আমি বর্দ্ধমান থেকে আসছি | আপনি কি হারাধন বাবু ?”
উনি – “বর্দ্ধমান থেকে ? কেন ? আমাদের তো বর্দ্ধমানে কেউ নেই |”
আমি – “না, না | আসলে কিছুদিন আগে আপনার মেয়ের একটা টেলিগ্রাম আমি পাঠিয়েছিলাম |”
উনি – “আমার মেয়ের টেলিগ্রাম ... আপনি পাঠিয়েছিলেন ?”
আমি – “হ্যাঁ | মানে একজন মহিলা বর্দ্ধমান স্টেশনে আমাকে একটা টেলিগ্রামটা দিয়ে বলেছিল আপনার ঠিকানায় পাঠিয়ে দিতে | আমার মনে হয়েছিল যে সে আপনার মেয়ে |”
উনি – “আমি তো কিছুই বুঝছি না | ... সরমা, একটু এস তো |”
একজন মহিলা বেরলে তার চেহারা দেখে আমার আর সন্দেহ থাকল না যে আমার অনুমান সঠিক | বয়েসের তফাত বাদ দিলে দুজনের চেহারা প্রায় এক রকমের |

আমার অসংযত স্মৃতিতে ভেসে উঠলো সহস্র প্রহর সময়ের দূরত্বে বর্জিত এক বিষাদ প্রতিমা | তার মুখময় ছিল শুধু দুটো বিষণ্ণ চোখ, যার পিছনে সে নিজের অপরিসীম রূপ লুকিয়ে বেদনার্ত মনের বাইরের রঙ্গভূমিতে নিজেকে হারাতে পারে |

সম্বিত ফিরে পেয়ে আমি বললাম, “আপনারা নভেম্বরের মাঝামাঝি শেফালী, মানে আপনাদের মেয়ের কাছ থেকে কোনও টেলিগ্রাম পাননি ?”
মহিলা – “শেফালী ? আমাদের মেয়ের নাম তো শেফালী নয় |”
আমি – “কিন্তু আমি তো তারই একটা টেলিগ্রাম এই ঠিকানায় পাঠিয়েছি | দেখুন তো এই কাগজটা |”
আমি পকেট থেকে টেলিগ্রামের ফর্মটা বের করে দিলাম |
মহিলা কাগজটা না নিয়ে বলল, “বাবা, তুমি বস তো | বসে বল কী হয়েছিল |”
আমি বসে সব ঘটনা বললাম | দুজনে চুপ করে সব কথা শুনল | তারপর মহিলা বলল, “তুমি বলছ বর্দ্ধমান থেকে তুমি এই ঠিকানায় টেলিগ্রাম করেছিলে | তাই না ? কিন্তু, সেরকম কিছু তো আমরা পাইনি | না, না, আমাদের কাছে ওরকম কোনও টেলিগ্রাম আসেনি |”
আমি – “কিছু মনে করবেন না | আপনাদের কথা শুনে মনে হল আপনাদের মেয়ে আছে |”
মহিলা – “ছিল | কিন্তু তার নাম শেফালী নয় | তুমি কোথাও কিছু ভুল করেছ | যাকগে, সে সব কথা | ... তুমি এখন এস |”
আমি বলতে চাইলাম, “আমি ভুল করিনি | যে আমাকে টেলিগ্রাম করতে দিয়েছিল তার আর আপনার চেহারা এক রকম |” কিন্তু আর কথা না বাড়িয়ে উঠে নমস্কার করে বেরিয়ে এলাম |

বাড়ি ফিরে ক’দিন এই হেঁয়ালি খুব মনের মধ্যে তোলপাড় করল | এক রাত্রে কেন ঘুম আসছে না কিছুতেই | হটাত চমকে উঠলাম যে যদি এই ভাবে স্যুটকেসে লেখা নাম আর ঠিকানাও সেই মহিলার না হয় ? তাহলে তো আমার কাছে তার আর কোনও সূত্রই থাকল না | পরদিন অফিসে চা খেতে খেতে অজিতকে সব খুলে বললাম | সব শুনে অজিত একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, “তুই তো এত সব ঘটনার কথা আগে কোনোদিন বলিসনি |”
আমি – “না, তা বলিনি |”
অজিত – “তুই কি ভেবে চিন্তে কথাগুলো চেপে গিয়েছিলি ?”
আমি – “জানি না |”
অজিত – “জানিস না মানে ?”
আমি – “মানে ... পারুল চলে যাওয়ার পর আমার এই প্রথম কোনও অচেনা মহিলার সাথে সংযোগ | সেই জন্যে হয়ত অজান্তে ব্যাপারটা চেপে গিয়েছিলাম |”
অজিত – “ও !”
আমি – “শুধু একটা ‘ও’ ! আর কিছু বলবি না ?”
অজিত – “তুই কী শুনতে চাস ?
আমি – “আমি কেন কিছু চাইব ?”
অজিত – “আচ্ছা ? ভেবে দেখ তো, কেন তুই আমার কাছে কথা তুললি | হয় তুই অজান্তে কিছু চাইছিস, আর অবচেতনে ভাবছিস কাউকে কথাগুলো বলতে গেলে সেটা কী, তা পরিষ্কার হবে | নয় তো, তুই ভাবছিস তোর কথা শুনে যদি কেউ কিছু প্রস্তাব করে | ... কোনটা ঠিক ?”

আমি চুপ করে থাকলে অজিত বলল, “তোর মাথায় কিছু একটা কথা ঘুরছে | কী সেটা ?”
আমি – “তোকে বললাম না মহিলা অন্তঃসত্ত্বা ছিল | কে জানে, যেখানে যাচ্ছিল সেখানে কী অবস্থায় পৌঁছল | কেন জানি না, ওর ক্লান্ত চেহারাটা মনের মধ্যে কোথাও আটকে আছে, গলায় কাঁটার মত |”
অজিত – “দেখতে কেমন ?”
আমি – “অজিত ! শুধু মহিলাটার চোখ দুটো মনে আছে, ভীষণ স্যাড্ | ওই দেখে আর কিছুই লক্ষ্য করিনি, বিশ্বাস কর |”
অজিত – “ও, করুণা-দৃষ্টি ! বুঝেছি |”
আমি – “হয়ত তাই ... হয়ত তাই |”
অজিত – “হুম ....
বিনিদ্র রজনীর মসী-লাঞ্ছিত আঁখি, তমাল সারি বেষ্টিত জোড়া পুষ্করিণী,
প্লাবিত | হেন অশ্রুতে ভাসে কৃষ্ণ অক্ষিতারকা, ব্যগ্র আবেদনের তরণী,
ত্রাসিত | ...”

আমি – “খুব হয়েছে | চল, এবার ওঠা যাক ...”

অজিত কয়েকটা জোর টান দিয়ে সিগারেটটা শেষ করল | তারপর বেয়ারাকে ডেকে বলল আরও দু’কাপ চা দিতে | চা এলে অজিত বলল, “তুই বলছিলি না ওর স্যুটকেসে নাম ঠিকানা লেখা ছিল ?”
আমি – “হ্যাঁ | শেফালী দত্ত, ২০/এ পাওয়ার সাপ্লাই লাইন, আরামবাটী – ৭ |”
দেখলাম অজিত হটাত একটা মুচকি হাসি হাসল | তারপর বলল, “অদ্ভুত তো !”
আমি – “কী ?”
অজিত – “ঠিকানাটা ! ওই যে বললি, ‘কুড়িয়ে পাওয়ার’ কী সব, কী সব |”
আমি – “ও, তা তো আমি লক্ষ্য করিনি | ... যাকগে, তুই ঠিকানাটা জানতে চাইলি কেন ?”
অজিত – “বন্ধু হে ! তুমি যদি বহরমপুর যাইতে পারিলে তো একবার আরামবাটী কেন যাইতেছ না ?”
আমি – “এ কী বলছিস তুই ?”
অজিত – “আমি নহি, বন্ধু, তুমি ! মুখে না প্রকাশ করিয়া মনে মনে যাহা চাহিতেছ, আমি তাহাই কহিয়াছি, মাত্র |”
তারপর চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে আবার একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, “শোন ! এই শনি, রবিবার যা, অ্যাডভেঞ্চার করে আয় | আরামবাটী ঘুরে আয় |”

বাড়ি ফিরে দেখলাম অজিতের প্রস্তাবটা তখনো মনের মধ্যে ঘুরে ঘুরে আমাকে ক্রমাগত জাগরূক করার চেষ্টা করছে | ঘুম আসার আগে মনে পড়ল অজিতই আমার এক মাত্র বন্ধু যে পারুলের সাথে বিচ্ছেদ হওয়াটা সমর্থন করেনি | হয়ত ওরই কথা আমার শোনা উচিত ছিল | এখন কি ওর কথা আমার শোনা উচিত নয়, অন্তত এই একবার ?

পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গেল, এলার্ম বাজার আগেই | উঠে দাঁত মেজে যান্ত্রিক ভাবে ব্যাগে টুথব্রাশ, পেস্ট, চিরুনি, পায়জামা এইরকম সব একদিনের জিনিস ভরে নিয়ে ছুটে গিয়ে ছ’টার আরামবাটী এক্সপ্রেস ধরলাম | আরামবাটীর এক সহযাত্রীকে জিজ্ঞাসা করায় বলল ঠিকানাটার রাস্তার নাম ‘লাইন’ নয় ‘লেন’ হবে, অর্থাৎ ‘পাওয়ার সাপ্লাই লেন’ | ওই রাস্তায় পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ পর্ষদের একটা খুব বড় সাব-স্টেশন আর তার অফিস আছে | স্টেশন থেকে অটো নিলে কুড়ি মিনিট লাগবে | অটোকে বলতে হবে মৌলিপাড়া যেতে | ওখান থেকে হাইওয়ে দিয়ে মিনিট পাঁচেক | এও জানলাম, তার কাছে, যে আরামবাটীতে স্টেশনের কাছে মোটামুটি কাজ চলার মত হোটেল বলতে ‘দীনবন্ধু লজ’ |

লজে কামরা নিয়ে দেখলাম গরম জলের ব্যবস্থা নেই | ম্যানেজার রান্নাঘর থেকে গরম জল পাঠিয়ে দিলে স্নান করে, এক কাপ চা খেয়ে একটা অটো ধরলাম | ড্রাইভার বলল ফেরার অটো পাওয়া যাবে কিনা বলতে পারবে না, কেননা জায়গাটা শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে | ও বলল ও অপেক্ষা করতে পারে | তবে দুপুরের খাওয়ার সময়, বড় জোড় দু’টো অব্দি | যাওয়া আর ফেরার ভাড়ার উপর আরও পঞ্চাশ টাকা লাগবে | তাতেই রাজী হলাম | ঘড়িতে দেখলাম প্রায় দুপুর বারোটা |

যেতে যেতে একটু একটু করে বাড়ি ঘর কমে এসে মৌলিপাড়ার পর সবুজের দেখা দিল | তারপর ধানের ক্ষেতের মধ্যে হাইওয়ে দিয়ে কিছু দূর গিয়ে অটোটা ডান দিকে একটা বিরাট ঝিলের পাশ দিয়ে একটা সরু পথ ধরল | দেখলাম কিছু দূর গিয়ে প্রথমেই একটা সাব-স্টেশন আর তার লাগোয়া অফিস যার উপর লেখা ‘পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ পর্ষদ’ | তারপর ঝিল শেষ হলে দু’দিকে কিছু বাড়ি আর বাগান | একটা মাধবীলতায় ঢাকা গেটে ২০/এ নম্বর লেখা দেখে অটোটাকে বললাম থামতে | আমায় নামিয়ে ড্রাইভার বলল ও মোড়টায় ফিরে হাইওয়েতে একটা চায়ের দোকানে অপেক্ষা করবে |

গেটটা খুলতে গিয়ে দেখলাম হাতের তালু ঘেমে আছে | মনের ভিতরটা একদম ফাঁকা, যেমনটা হয় খুব বড় পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতির শেষে |

ঘণ্টার বোতাম টিপে কোনও আওয়াজ শুনতে পেলাম না | বিদ্যুৎ নেই নাকি ? কড়া নাড়তেই একজন মহিলা দরজা খুলল | সেই মহিলা, সদ্য স্নান করে তোয়ালেতে চুল জড়িয়ে তার প্রান্ত দুহাতে নিংড়াতে, নিংড়াতে | শরীর যেন আরও রোগা হয়ে গেছে | আমাকে দেখে তার কালো গভীর চোখ এক মুহূর্তেই বিস্ময়ে ভরে উঠলো | তারপর, সেই প্রায় ভুলে যাওয়া স্মিত বিব্রত হাসি হেসে বলল, “আপনি !”
আমি বললাম, “যাক, চিনতে পেরেছেন |”

পিছনে বাড়ির ভিতর থেকে একজন মহিলা ডেকে বলল, “শিউলি, দেখ তো কে এসেছে ?”
ওর নিরুত্তর দ্বিধা দেখে আমি আস্তে করে বললাম, “ভিতরে আসতে বলবেন না ?”
পিছনের দরজার পর্দা সরিয়ে এক মহিলা ভিতর থেকে সামনের ঘরে বেরিয়ে এলো | আমাকে দেখে বলল, “ইনি কে, শিউলি ?”
শিউলি ঠোঁটে আঙ্গুল রেখে আমায় চুপ থাকতে ইশারা করে ঘুরে বলল, “দিদি, ইনি সেই ভদ্রলোক |”
দিদি – “সেই বলতে ?”
শিউলি – “আরে, সেই টেলিগ্রামের |”
দিদি – “ওহো ... কী নাম যেন ?”
শিউলি – “প্রবাল |”
দিদি – “হ্যাঁ, হ্যাঁ | প্রবাল |” তারপর আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “তাই তো ?”
শিউলি ততক্ষণে এক পাশে সরে দাঁড়িয়ে আমাকে ঘরে ঢুকতে ইশারা করছে | আমি ঢুকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আমার নাম আপনারা জানলেন কী করে ?”
দিদি – “বলছি | আগে বসুন | ... আপনি যে টেলিগ্রামটা পাঠিয়েছিলেন তার তলে লেখা ছিল ‘ফ্রম’ প্রবাল |”
সাথে সাথে আমার সেই টেলিগ্রামটা আবার লেখার কথা মনে পড়ে গেল | তাহলে কি অন্যমনস্কতায় ‘ফ্রম’ এর জায়গায়  নিজের নাম লিখেছিলাম ? আমি জোড় হাত করে বললাম, “হ্যাঁ, আমার নাম প্রবাল রায় |”
তারপর শিউলির দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললাম, “আপনার নাম শিউলি ? কিন্তু, আপনার স্যুটকেসে তো লেখা ছিল শেফালী |”
দিদি হেসে বলল, “ও, সেই দেখে আপনি আমাদের ঠিকানা পেয়েছেন বুঝি ? ওটা আসলে আমার স্যুটকেস | শিউলির কাছে পড়ে ছিল |”
আমি – “কিন্তু ... ”
শিউলি – “কিন্তু কী ?”
আমি – “না, মানে, কিছু মনে করবেন না | আমি আপনার বাড়িতে গিয়েছিলাম | বহরমপুরে একটা কাজ ছিল | হটাত কী খেয়াল হল, টেলিগ্রামের ঠিকানাটা স্বচক্ষে দেখতে গেলাম | কিন্তু আপনার বাবা, মা সম্পূর্ণ অস্বীকার করলেন যে কোনও টেলিগ্রাম পেয়েছিলেন | আমি তো একদম ...  তারপর ওনারা বললেন ... ”
শিউলি – “কী ?”
আমি – “যাক | ওই সব কথা থাক !”
দিদি – “ঠিক ! শিউলি, ওদের কথা ছাড় |”
শিউলি – “বেশ ! তাহলে, আপনার নিজের কথা বলুন | হটাত এ ভাবে ... আরামবাটীতে কোনও কাজে এসেছিলেন বুঝি |”
আমি – “বলতে পারেন | তো, মনে হল দেখে যাই |”
দিদি – “কী ? কাকে ? শিউলিকে ?”
আমি সঠিক উত্তরের অভাবে চুপ করে থাকলাম |

শিউলি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “দিদি, তুই কথা বল | আমি চা করে নিয়ে আসি | ... খাবেন তো ?”
দিদি – “না, না | তোরা কথা বল | আমি চা নিয়ে আসছি | ... আর আপনি কিন্তু খেয়ে যাবেন | ওর জামাইবাবু এই পাশেই বিদ্যুৎ পর্ষদের অফিসে কাজ করে | একটু পরেই এসে পড়বে দুপুরের খাবার খেতে | ওর সাথে দেখা করে, খেয়ে তবে আপনি যাবেন |”

দিদি চলে গেলে শিউলি বিস্মিত চোখে তাকিয়ে বলল, “কই বললেন না তো কী দেখতে এসেছেন |”
আমি – “না, মানে ... এমনি কী মনে হল | ... আপনি কিন্তু সেই বারের তুলনায় আরও রোগা লাগছেন |”
শিউলি – “ও, বুঝেছি | চলুন, উঠুন |”
আমি – “কোথায় ?”
শিউলি – “চলুন না | তবে, আগে সাবান দিয়ে হাত মুখ ধুয়ে নিতে হবে |”
আমি – “হাত মুখ ধোব কেন ? এই তো স্নান করে এলাম |”
শিউলি – “আসুন তো | এত প্রশ্ন করলে হয় ?”

অগত্যা উঠে শিউলির পিছন পিছন গেলাম | ভিতরের ঘর পার হয়ে একটা বারান্দা, তারপর একটা উঠোন রোদে ভরে পড়ে আছে | বারান্দায় একটা বেসিন দেখিয়ে দিল শিউলি | আমি হাত মুখ ধুতে ধুতে ও একটা বেতের চেয়ার এনে উঠোনে রেখে বলল, “এখানে আরাম করে রোদে বসুন | আমি আসছি |”

আমি বসলাম | উঠোনের একটা নিম গাছ থেকে থেকে হাওয়ায় শিরশির করে উঠে অনেক শুকনো পাতা ঝরাচ্ছে | তারা বাতাসে উড়তে, উড়তে হেলতে, দুলতে মাটিতে নেমে আসছে, যেন মাধ্যাকর্ষণ থেকে মুক্তি পেয়েও মাটির, ধুলোর মায়া কাটাতে পারছে না | ঢিলে ঢালা রোদ আর ঠাণ্ডা হাওয়ার ছোঁয়া-ছুঁয়ি মনটাকে আবছা আমেজে ভরে দিল | আর, একটা বড় পরীক্ষা শেষ হওয়ার আলসে ক্লান্তিতে চোখ বুজে এলে যেন আমি ও মাধ্যাকর্ষণ থেকে ক্ষণিকের জন্য মুক্তি পেলাম |

একটু পরে কেউ পাশে দাঁড়িয়ে ছায়া ফেলে বলল, “এবার চোখ খুলুন |” তাকিয়ে দেখি শিউলি দাঁড়িয়ে আছে | চুল খোলা, তোয়ালেটা নেই | দু’হাতে ধরা ফল রাখার মত কিন্তু বড় একটা বেতের টুকরিতে উজ্জ্বল লাল গরম চাদরের একটা বান্ডিল | তাতে ঠিকরানো রোদের আভায় কি না জানিনা ওর মুখে একটা অদ্ভুত লাবণ্যময় উত্তাপ | গভীর চোখ ছাপিয়ে এক অর্থপূর্ণ কৌতুকের হাসি | টুকরিটা আমার কোলে নামিয়ে দিয়ে বলল, “এই নিন, দেখুন | আমার ছেলে !”

দেখলাম গরম চাদরটায় চোখ বুজে ঘুমে অচেতন একটা কয়েক দিনের শিশু | মাথা ভরা চুল, আর দুটো ফোলা গালের মাঝে টুসটুসে ঠোঁট | আমি ভয়ে ভয়ে আস্তে করে সাবান দিয়ে ধোয়া ডান হাতের তর্জনী দিয়ে একটা গাল ছুঁলাম, যেন দেখতে যে ওটা সত্যি একটা শিশু নাকি একটা ফুটফুটে পুতুল | ও একটু নড়ে ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক করল | তারপর চোখ খুলে, রোদের ছটা দেখে না কি কে জানে, চোখ কুঁচকে, খোলা মুখটা একটু ভেংচিয়ে একটা নিশ্বাস নিয়ে আবার ঘুমে তলিয়ে গেল |

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “ওর নাম কী রেখেছেন ?”
শিউলি – “এখনো ঠিক করিনি |”
আমি – “তাহলে, যিশু ?”

তখনি শেফালী শিউলিকে ডেকে বলল চা নিয়ে যেতে | আমার কোলে বাচ্চাটাকে রেখে শিউলি চলে গেল | একটু পরে চা নিয়ে এসে আমায় দিয়ে বলল, “আপনি কী যেন বললেন ? দিদির ডাক শুনতে গিয়ে শুনতে পেলাম না |”
আমি – “না, তেমন কিছু নয় |”

শিউলি আমার কাছ থেকে বাচ্চাটাকে নিয়ে নিলে আমি  চাটা খেলাম | শিউলি সেই কৌতুক ভরা চোখে আমাকে দেখতে, দেখতে আমার চা খাওয়া হলে আমার কোলে বাচ্চাটাকে আবার রেখে কাপ ডিশ নিয়ে ভিতরে চলে গেল | একটু পরে এসে বাচ্চাটাকে তুলে আমাকে উঠোনে ছেড়ে ভিতরে চলে গেল | আমি চোখ বুজে পড়ে রইলাম একই ভাবে, কোলে বাচ্চাটার টুকরির ভার আর উত্তাপের রেশ উপভোগ করতে করতে |

শিউলি আর না এলেও আমি বুঝলাম ও বাড়িতেই রয়েছে কোথাও, হয় তো দিদির সাথে, আমার সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হয়ে |

শিউলির জামাইবাবু এলে শিউলি আমাকে ডেকে খাবার ঘরে নিয়ে যেতে যেতে বলল, “আপনার অটো ড্রাইভার এসেছিল বলতে যে ও খেয়ে নিয়েছে | ও রয়েছে আপনার জন্য | খেয়ে উঠেই যেন বেরিয়ে পড়েন | ... আর একটা কথা | দিদি, জামাইবাবু কিছু বললে কিছু মনে করবেন না তো ?” আমি ওর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, কিন্তু ও চোখ ঘুরিয়ে নিলো | আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “উনি কি আপনার নিজের দিদি ?” শিউলি মাথা নাড়িয়ে বলল, “না | কলেজে দু’ বছরের সিনিয়র ছিল | কিন্তু একদম নিজের দিদির মতো | ... চলুন, খেয়ে নেবেন |”

আমি আর শিউলির জামাইবাবু, অরুণ, শুধু খেতে বসলাম | শেফালী পরিবেশন করল | শিউলি বাচ্চাটাকে নিয়ে সোফায় পা তুলে বসে থাকল | খেতে খেতে অসংলগ্ন কিছু কথা হল | কে কী করে, কার দেশ বাড়ি কোথায় এই সব | সেই টেলিগ্রামের কথা কিছু না উঠলেও আমার মনে হল আমার পরিচয় ওতেই সীমিত | তার বেশি কারো কিছু কৌতূহলও নেই  দেখলাম | আমিও শিউলির সম্বন্ধে কৌতূহল সম্বরণ করলাম | ও এক দু’বার বাচ্চাটার দিক থেকে মুখ তুলে তাকালে চোখাচোখি হল | একবার আমি কিছু বলতে গেলে ঠোঁটে আঙ্গুল রেখে সেই রকম হাসি হাসি চোখে ও আমাকে কিছু ইঙ্গিত করল, বোধহয় বোঝাতে যে বাচ্চাটাকে ঘুম পাড়াচ্ছে |

খাওয়া শেষ হলে বিদায় নিয়ে আমি অরুণের সাথে বেরলাম | ওর অফিসের সামনে এসে নমস্কার করলাম | তারপর জিজ্ঞাসা করলাম, “কিছু মনে করবেন না | আমি কি আবার আসতে পারি ?”
অরুণ বিস্মিত চোখে তাকালে আমি বললাম, “যিশু কে দেখতে ?”
অরুণ ইতস্তত করে বলল, “যিশু ? ... ও ! হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ... মানে, যদি শিউলির কোনও আপত্তি না থাকে |”
আমি বললাম, “আসি তাহলে |”
 
----------------------------------------------------------------------------------

© ইন্দ্রনীর / ২৪ নভেম্বর ২০১৩

সোমবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৩

নিরুত্তর

|| নিরুত্তর ||


এই মন কোথায় শুরু, কোথায় যে শেষ কে জানে
কোথায় বা খুঁজে পাব, যে জানে সব প্রশ্নের মানে
মন কে যতই বাঁধি জড়িয়ে জীবনের ছন্দে, গানে
খেয়ালী মন ছুটে কেন যায় হেঁয়ালি ধাঁধার টানে

জীবনের এই টানা পোড়েনের দ্বন্দ্বে হল না জানা
কী প্রশ্ন জিগাতে হয় যা জিগাতে নেইকো মানা
পেয়েছি না জানি কত জ্ঞানের উৎসারিত উত্তর
শুধু যাকে প্রশ্ন করি সে হেসে রয় মূক, নিরুত্তর


----------------------------------------------------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ১৮ নভেম্বর ২০১৩

রবিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৩

বিগতযৌবনা


|| বিগতযৌবনা ||


তার রূপের অয়ন হতে হয়েছে ঋতুর উত্তরায়ণ,
লাবণ্যে পড়েছে ভাঁটা, জমেছে ক্ষীণ জরার পলি
আমার মনে যে সৌন্দর্য এনেছিল প্রেমের প্লাবন
শরীরের কারাগারে সে আজ মলিন ঘ্রাণ হীন কলি

প্রকৃত রূপের প্রকৃতি কি কেবলই সুসময়ের দাস
ঋতুর সাথে যার উদয় যায় অস্ত, অমোঘ নিয়মে
সিঞ্চন করেছিল যারে আর্তবের নিষিক্ত বাতাস
সজ্জিত হয়েছিল যে স্বর্ণাভ লাবণ্য রসের হেমে

অতিক্রান্ত শীত পারে কেন আসে রজঃ ক্ষয়ী বসন্ত
কেন ঋতু করে ত্যাগ তার অস্তিত্বের রূপসী কায়া
যে আকাঙ্ক্ষিত, সে কেন চায় এত নির্বাসন একান্ত
নিয়ে তার নিষ্ফলা, শূন্য জঠরে লুপ্ত যৌবনের মায়া

কায়া আছে, কাম নেই, তবুও স্মৃতিতে তুমি বন্দিনী
চিরযৌবনা শুধু এই এক স্তাবকের দৃষ্টির অনুমোদনে
নির্বাসনে যেতে কেন তুমি ফিরে ফিরে চাও, বিরহিণী
রেখে আমায় অশেষ অপেক্ষায়, অতীতের বিহনে    ||


---------------------------------------------------------------------------------------------
ইন্দ্রনীর / ১৭ নভেম্বর ২০১৩

বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৩

লাইভ ঠাকুর

|| লাইভ ঠাকুর ||


আজ দশমী | এবার আমাদের পাড়ার পুজোর থিম ছিল লাইভ ঠাকুর | মোড়ের মিষ্টির দোকানের ময়রা হয়েছিল গণেশ, বলিউডের স্বপ্নে বিভোর ঋত্বিক - কার্তিক, পাড়ার হার্টথ্রব চিনির বোন মিনি - লক্ষ্মী, গণেশের বোন তিন্নি - সরস্বতী, আর কমিটির নন্দীবাবু - মা দুর্গা | কোন বউ রাজী হল না ষষ্টির দিন থেকে কাঁধে চার জোড়া হাত লাগিয়ে দশ-হাতা ব্লাউজ পরে এক ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকতে | কখন কোন বাচ্চা এসে চেঁচাবে, “মা ! বাবা গেঞ্জি খুঁজে পাচ্ছে না |” ভোটে নন্দীবাবু জিতলেন | তিনি সব চেয়ে বেশি চাঁদা তুলেছেন ; হাতে, পায়ে, বুকে, পেটে কোন লোম নেই ; হাঁচি, কাশি এইসব ব্যাঘাতকারী ব্যামো নেই ; আর চশমা পরেন না | সিংহ, মোষ আর অসুর হতে কেউ রাজী হল না, আর সবাইকে স্থির হয়ে দাঁড়াতে হবে এই বলতেই গণ্ডগোল | গণেশ বলল ওর পায়ে মিষ্টির রস থাকে,  পিঁপড়ে কামড়াবে | কার্তিকের বলল, ওকে রোজ কয়েক ঘণ্টা এক চোখ টেপা অভ্যাস করতে হয় | মিনির রক্ত ‘ও’ গ্রুপের, খুব মশা কামড়ায় | সরস্বতীর খালি পেটে ঢেকুর ওঠে | আর সবাই বলল রাতে ছ’ঘণ্টা ঘুম চাই | ঠাকুরমশাই সব সমস্যা সমাধান করলেন | আলিপুর থেকে সিংহ আর গোয়ালার কাছ থেকে মোষ ভাড়া করা হবে | পাড়ার একজন চাঁদা দেয়নি, তাকে জোর করে অসুর করা হল | রাত বারোটা থেকে ভোর ছ’টা পর্দা টেনে পর্দানশীনম্ সন্ধিপুজো হবে, যাতে সবাই ঘুমতে যেতে পারে | গণেশ ভোরে ফিরবে দোকান থেকে দু হাঁড়ি ছানার জল  নিয়ে | তাতেই পা ধুলে কাজ হবে, আর চরণামৃতও আলাদা করে বানাতে হবে না |  যখন কোনও ছেলে ভক্তি ভরে প্রণাম করবে তখন কার্তিক তাকে চোখ টিপবে | সে নির্ঘাত ভাববে ভুল দেখেছে | মিনির জন্য কচ্ছপ ছাপের কয়েল জ্বালিয়ে আরতির ব্যবস্থা করা হল | সরস্বতী কে বলা হল ঢেকুর চেপে রাখতে, আর যেই কেউ ফটো তুলবে তখন ‘চীয্’ বলার মতো মুখ করে ঢেকুর ছাড়তে | শেষ সমস্যা, বাথরুম যাওয়ার
কী হবে ? ইলেক্ট্রিশিয়ান রিভলভিং বেদী বানাতে রাজি হলে তারও সমাধান হল | খালি বেদীর পিছনে একটু গ্যামাক্সিন ছেটানোর ব্যবস্থা করতে হল |

একটা কথা কেউ ভাবেনি – বিসর্জন হবে কী করে | আজ দশমীর সকালে জানা গেল পাঁচ জনের কেউই সাঁতার জানে না |


--------------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ১৪ নভেম্বর ২০১৩

অপেক্ষা

|| অপেক্ষা ||


ট্যাক্সি ধরলাম অফিসের সামনে থেকে | ক্লান্ত, তাই উঠেই সিটে শরীরটা এলিয়ে দিলাম | অনেক রাত হয়ে গেল আজ | হটাত ড্রাইভারের সিটের পিছনে লেখা ট্যাক্সির নম্বরটা চোখে পড়তেই চমকে উঠলাম | এই নম্বরটাই কি  ট্যাক্সির পিছনে লেখা ? ড্রাইভারটা নিশ্চয় আমার প্রতিক্রিয়াটা দেখেছিল আয়নায় ; বলল, “চিন্তা করবেন না |”
আমি – “চিন্তা ? আপনি কী করে বুঝলেন আমি চিন্তা করছি ?”
ড্রাইভার – “বলুন তো, গাড়ির নম্বরটা আজ কেন লক্ষ্য করলেন ? কিছু মনে পড়েছে কি ?”
আমি – “কেন কিছু মনে পড়বে ?”
– “৭৯১৩ – সাতই সেপ্টেম্বর দু হাজার তের ? এটা আপনার বিবাহ বার্ষিকীর দিন না ?”
– “আপনি কী করে জানলেন ?”
– “আজকের তারিখ ! আজ আপনি এত দেরী অব্দি অফিস করলেন কেন ?”
– “শুনুন, আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে আপনি নাক গলাচ্ছেন ! দরকার নেই ... আপনি ট্যাক্সি থামান !”
– “এত দেরীতে কোনও ট্যাক্সি পাবেন না | বললাম যে, চিন্তা করবেন না ... জানেন, কতবার আপনি এই ট্যাক্সি ধরেছেন ?”
– “এই ট্যাক্সি ?”
– “হ্যাঁ | প্রথম, যেদিন আপনি ম্যারেজ রেজিস্ট্রি অফিসে যাওয়ার জন্য দাঁড়িয়েছিলেন ; যেদিন প্রথম অফিসে যোগ দিলেন ; যেদিন বসের গাড়ি থেকে হটাত মাঝ পথে ছিটকে নেমে পড়ে আপনার স্বামী কে মোবাইলে ডাকলেন, ট্যাক্সি পাচ্ছেন না বলে ; যেদিন তিন বছরের ছেলের হাত ধরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেন | মনে আছে সেই সব দিন আপনি কোন ট্যাক্সিতে উঠেছিলেন ... ভেবে দেখুন তো |”
– “আপনি কি আমাকে ফলো করেন নাকি ?”
– “বলতে পারেন | আমাকে দেখতে হয় যাতে আপনি নিরাপদে যাওয়া আসা করেন | বিশেষ করে যেদিন থেকে আপনি বসের গাড়িতে বাড়ি ফেরা বন্ধ করলেন |”
– “এরকম ভয়ঙ্কর কাজ করেন আপনি ? একজন ভদ্রমহিলাকে ফলো করা, দিনের পর দিন | কেন ?
– “এই আশায় যে একদিন গাড়িতে উঠে বলবেন, আপনাকে আগের ঠিকানায় নিয়ে যেতে |”
– “আগের ঠিকানায় ?”
– “আপনার স্বামীর, যাকে আপনি ছেড়ে দিয়েছেন, যে ভদ্রলোকের ট্যাক্সির ব্যবসা করা থেকে বেকার হওয়া ভালো |”
– “আপনি কে ? আপনি তাকে চিনলেন কেমন করে ?”
– “আমি ... আমি তারই গাড়ি চালাই | তিনি আমাকে রোজ পাঠান, আপনার নিরাপত্তা দেখতে ... আর অপেক্ষা করেন ... আজও !”
– “তুমি !”

------------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ১৪ নভেম্বর ২০১৩

মঙ্গলবার, ৫ নভেম্বর, ২০১৩

অনাবাদী

|| অনাবাদী ||




ধরণী
এখন চিত, শুয়ে পড়ে আছে লাটে, মরা
চোখ দুটো বাসি মাছের চাউনিতে স্থির
তার কোলে নিভে আসা কাজলের ছাই
নাকের ফুটোয় গড়াচ্ছে জল, দু’ ফোঁটা
কানের লতি ফ্যাকাসে,  টিকটিকির পেট
ঠোঁট ফাটা ৷ নারকোলের ভাঙ্গা খোলার   
মত মুখের ফাটলের শুকনো হাহাকারে
মেকী পলেস্তারা চটা চটা উঠে আসছে

কাল,
রাতের আঁধারে ধোঁয়াটে পিদিমের আলোয়
এর মোহে অন্ধ হয়েছিল সে নেশার চোখে,
ডেকেছিল এর মীনাক্ষী চোখের ভীরু পলক
তেল কাজলের লক্ষ্মণ রেখার ভিতর থেকে,
নাসিকা রন্ধ্রে শুনেছিল সলিলের কলধ্বনি
কানের গোলাপি পাতায়, উত্তপ্ত শিহরণ
ঠোঁট দুটো ছিল রাঙা, মসৃণ, আপত্তিহীন
সারা শরীর যেন উর্বর গাঙ্গেয় উপত্যকার
পলি, মেদের স্তরে অঙ্কুরিত স্নেহের বীজ

ডাক শুনে, দেখে, আছে জমি, জল, বীজ
খুঁজল সে নিজের মধ্যে এক উৎসাহী চাষা
কিন্তু সে ধরণী হল দ্বিধার লাঙ্গলে দ্বিবিভক্ত
কর্ষণে শেষ হয়ে গেল  সব ফলনের আশা

তাই এর গলা টিপে করেছে তাকে অনাবাদী
দুঃখ, না করে নিজের সর্বনাশের সব আয়েস
সে এখন এই লাশের সাথে আজীবন মেয়াদী
এক দুর্ভাগা চাষা ৷

-----------------------------------------------------
ইন্দ্রনীর / ০৫ নভেম্বর ২০১৩

আলেয়া



দেয়ালি, ২০০৭
জিত,
         একটা পুরনো খাতা পেয়ে পড়ে দেখছিলাম | কবেকার খাতা ? বলছি শোনো -

         ২০০১ এর পুজোয় বাড়িতে আসতেই মামণি ধরেছিল, “এবার তোর সেকেন্ড ইয়ার হয়ে গেল | ওই সব আই আই টি তে ভর্তি হওয়ার পড়াশুনার খাতাগুলো এবার ফেলে দিলে হয় না ?”

         কালীপূজোর আগে একদিন সকালে একটু শীত শীত ভাব | খাবার টেবিলে কচি রোদ এসে পড়ছে সকাল থেকে | আমি বসলাম খাতাগুলো নিয়ে | কত পরিচিত সময় আটকে আছে ওদের পাতায়, পাতায় | কোথাও লিখে কাট-কুট করেছি কতবার, কোনও অঙ্ক মেলাতে | কোথাও অর্গানিকের জটিল সমীকরণ | কোথাও বাপি সুন্দর ছবি এঁকে অপটিক্সের কিছু বুঝিয়েছে | প্রথম, প্রথম খাতা কিনতাম | পরে যখন কুলিয়ে উঠল না, তখন বাপি অফিস থেকে ব্যবহার করা কম্প্যুটারের ফ্যানফোল্ড কাগজ নিয়ে আসত | মামণি সেগুলোর এক এক পাতা আলাদা করে এক পাশের ফুটোতে সুতো ঢুকিয়ে সেলাই করে দিত একসাথে অনেকগুলো পাতা | দিব্যি খাতা হত, পাতার মুখের দিকটা পিছনে রেখে পিঠের দিকে আমি লিখতাম | একটা খাতা দিন পনের চলত | তাও ভালো | কেনা খাতাগুলো তো চার-পাঁচ দিনেই শেষ হত |

         এইসবের মধ্যে থেকে বের হল একটা খাতা, যেটা যখন আমি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম, তুমি এসেছিলে, তখনকার | মনে পড়ল তার শেষের দিকের পাতায় সেই হাসপাতালের দিনগুলোর কথা লিখেছিলাম, যখন আমি কেবিনে একা থাকতাম | সেই খাতাটা সরিয়ে রেখে বাকিগুলো মামণিকে দিলাম, ফিরীওয়ালাকে দিয়ে দিতে |

         আজ খাতাটা আমার পুরনো জামাকাপড়ের নিচ থেকে বেরল | সেটাই পড়ে মনে হল তোমায় একটা প্রশ্ন করি | নাকি দুটো ?

         তার আগে বলি – আমি নিচে সেই ডায়েরির পাতাগুলো নকল করে দিলাম | তখন লিখেছিলাম অবশ্য ইংরেজিতে | এখন সেটাই বাংলায় লিখে পাঠাচ্ছি |

         পড়ে এই দুটো প্রশ্নর উত্তর দিও |
- একটা কথা আমি তখন লিখিনি | ভাবতে পারো সেটা কি ?
- দেয়ালির রাতে তোমার মনে কি ঘটেছিল তা হয়ত এখন তোমার মনে পড়বে না | তাও জানতে চাই, নিচের লেখা পড়ে সেই রাতের কথা কি ভাবে তোমার মনে পড়ে ?

         তাড়াতাড়ি উত্তর পাঠাবে তো ?
মাম্মা আর বাপ্পি কে আমার কি জানাবো – প্রণাম, না শ্রদ্ধা ? তুমি ঠিক করে নিয়ে জানিয়ে দিও, প্লিজ !
তোমায় কিছুই জানাচ্ছি না, তোমার উত্তরের অপেক্ষায় |

- তোমার ইতি 


-----------------------------------------------------------------------------------------------------

০৩ নভেম্বর
তিন দিন আগে বেনারসের বড় মাসির কাছ থেকে ফিরেছি জন্ডিস নিয়ে | যাওয়ার সময় খুব জ্বর ছিল | ওখানে ক’দিন ডাক্তার দেখানোর পর ইউরিনের রং দেখে ডাক্তার বলল যে জন্ডিস হতে পারে | ট্রেনে রিজার্ভেশন থাকলেও জ্বর আর গা ব্যথায় অনেক কষ্টে ফিরেছি | বাড়ি ফিরেই বাপি আমাকে হাসপাতালের এমার্জেন্সিতে দেখাল | ওরা বলল তখনই ভর্তি করতে | ঘরে গিয়ে দরকারি জিনিস নিয়ে ফিরে এসে ভর্তি হলাম | প্রথমে ওরা আমাকে ওয়ার্ডে দিল | অনেক রাত অব্দি বাপি থেকে শেষে মামণিকে রেখে গেল আমার কাছে | খুব চিন্তা হল মামণি কি করে রাত কাটাবে, বসার জন্য তো খালি একটা স্টুল | ডাক্তার দেখে গেল, বেশি ওষুধ দিল না | শুধু নার্স রক্ত নিলো পরীক্ষা করার জন্য | ডাক্তার বলল পরদিন কেবিন দেবার চেষ্টা করবে |

বাড়ি থেকে আসার সময় মামণি বাপিকে জিজ্ঞাসা করেছিল জিত কে খবরটা দেবে কিনা | বাপি বলেছিল বাড়ি ফিরে জিত কে ফোন করবে | আমি ভাবলাম, ‘জিত কি করবে ? আমার সাথে হাসপাতালে তো কথা বলতে পারবে না | শুধু রাত জেগে ছটফট করবে হয়ত |’

পরশু জানলাম আমার বিলিরুবিন ১৬’র ওপরে | খুব বেশী | কেন হল এরকম ? বাপি আবার গেল কেবিনের কথা বলতে |

আজ সকালে আমি কেবিন পেয়েছি | আমি বলায় বাপি কিছু আই আই টির বই খাতা দিয়ে গেছে | সেগুলো রেখেছি মাথার কাছে ওষুধের ছোট টেবিলটা টেনে | তবে বেশি কিছু পড়তে পারছি না | ভারী ভারী বইগুলো পড়েই থাকছে | তার উপর বাতি আসছে আর যাচ্ছে | বাপি বলছিল ঋতু বদল হলেই লোড শেডিং হয় | যেমন এখন ঠাণ্ডা পড়ছে | কিন্তু কেন ? জিত থাকলে নিশ্চয় এই নিয়ে কথা বলা যেত | আমি কিছু প্রশ্ন করলে ও খুব খুশি হয় নিজের মতামত জানানোর সুযোগ পেয়ে |

৬ই রাত্রিতে কালীপূজো | পরদিন মামণি প্রদীপ জ্বালবে | বলছিল, “তুই নেই | কি করব ভেবে পাচ্ছিনা |” আমি তো দেয়ালি দেখতে পাব না বলেই মনে হচ্ছে |

০৪ নভেম্বর
কাল জিত এসেছে | রাত সাড়ে দশটায় স্টেশনে নেমে বাপিকে ফোন করে জেনে নিয়ে আমি কোথায় আছি, প্রথমে সোজা হাসপাতালে এসেছে | রিসেপশনে ওকে আটকে রেখে খবর পাঠাল কেবিনে | মামণি গিয়ে ওকে নিয়ে এলো | কেবিনে ঢুকে আমায় দেখে ওর হাসি নিভে গেল | ও এইরকম চুপ করলেই আমি বুঝি ওর মনে কোনও আলোড়ন হচ্ছে যা মুখে প্রকাশ করতে পারছে না | মামণিকে বললাম গিয়ে নার্সদের কাছ থেকে জেনে আসতে শোয়ার আগে কোনও ওষুধ খেতে হবে কি না | মামণি চলে গেল জিজ্ঞাসা করলাম, “জিত কি হয়েছে ? তুমি এমন চুপ করে আছ কেন ? ক্লান্ত ?”
জিত আমার কাছে এসে আটকানো গলায় বলল, “খুব কষ্ট পেয়েছ, না ? ... ভাবিনি তুমি এত রোগা হয়ে গিয়ে থাকবে |”
আমি – “না, না | আসলে আমি হাসপাতালের ঢিলে গাউনে রোগা লাগছি হয়ত | আর, কতদিন পরে দেখছ | ”
জিত – “না | তোমার হাত, গলা সব কত রোগা হয়ে গেছে | শরীর দেখে মনে হচ্ছে বয়েস বার – তেরো যেন | কি খাচ্ছ ?”
আমি – “ডাক্তার ঝা, যে আমায় দেখছে, বেশ বয়স্ক, খুব হেসে কথা বলে | আমার ভারী বইগুলো দেখে বলে, এখন এগুলো তুলো না, দুর্বল শরীরে ক্লান্ত হতে নেই | আজ ও বলেছে এখন আমি বাড়ির খাবার খেতে পারি | সেই কথা শুনেই বাপি লাফিয়ে অফিস থেকে ফিরে আমার জন্য কুমড়ো, বেগুন, ঢেঁড়স দিয়ে সাম্বার আর ভাত রান্না করে এনেছিল | খুব খেয়েছি |”

মামণি নার্সদের ওখান থেকে ফিরে এলে জিত বলল, “মাসিমা, আজ রাত্রে আমি থাকি ? আপনার নিশ্চয় অনেক দিন রাত্রে বাড়িতে শোয়া হয়নি |” মামণি বলল, “না টুকু | তুমি আজ কতক্ষণ ট্রেনে কাটিয়েছ | তুমি যাও | মেসোমশাই নিশ্চয় বসে আছে খাবার নিয়ে | ওকে বলে দিও আমি খেয়ে নিয়েছি |”

জিত চলে গেল সকালে আসবে বলে |

০৫ নভেম্বর
জিত আসার পর আমি মনে মনে অনেক ভাল বোধ করছি | জ্বরটা কমেছে, তবে ডাক্তার ঝা বলছে বিলিরুবিন কমতে দেরী হবে | রোজ সকালে এসে আমায় দেখে যায় | গলায় কণ্ঠীর মালা, কপালে চন্দন আর সিঁদুরের টিপ | ইংরেজি একদম বলতে পারে না | একদিন জিত কে না দেখতে পেয়ে মন্তব্য করল, “ও যখন থাকে তখন তো তুমি খুব হাসিখুশি থাক দেখছি !”
ভেবেছিল আমি উত্তর দেব না | হেসে বললাম, “আপনাকে দেখেও তো আমি খুশি হই |” | “ভাল কথা”, বলে চলে গেল |

মুশকিল নার্সগুলো কে নিয়ে | জিতকে নিয়ে নানা পরোক্ষ প্রশ্ন | একদিন জিত আমার খাটে বসে আমার হাতে কিরুকিবু কাটছিল | এটা ওর একটা খেলা | হাতের ভিতরের দিকের চামড়া তিন আঙ্গুলের ডগা দিয়ে চিমটি কেটে কেটে আঙ্গুল তিনটে হাঁটিয়ে নিয়ে যাবে কব্জি থেকে কাঁধ অব্দি, মনে হবে যেন কোন ডেঁয়ো পিঁপড়ে কামড় দিতে দিতে হেঁটে যাচ্ছে | হালকা চিমটির সাথে অদ্ভুত একটা সুড়সুড়ি লাগে, যেটা হাতের শিরা বেয়ে বেয়ে গলা হয়ে মাথায় ওঠে | আমার তো কিছুক্ষণের মধ্যেই শরীরের টানটান ভাব ছাড়তে শুরু করে | একবার মার হাতে করাতে মা তো হাসতে হাসতে হাত ছাড়িয়ে বলল, “ও সব তুমি ঋহার হাতেই করো, বাবা |” তাই, সেদিন একটা নার্স ইনজেকশন দিতে এসে এই সব দেখে খুব গম্ভীর হয়ে জিত কে বলল খাটে না বসতে | পরে আমাকে জিজ্ঞাসা করল, “ও কি তোমার ভাই, যে খাটে বসেছিল ?”

০৬ নভেম্বর
আজ রাত্রে কালীপূজো | বাপি আজ একটা অভাবনীয় কাজ করেছে | আমার বিলিরুবিন কমছে না এই নিয়ে খুব চিন্তিত দেখে কাল, অফিসে নয় ক্লাবে, বাপিকে কেউ বলেছে, পীরডিহিতে এক মুসলমান বাবা আছে যে নাকি জন্ডিসের ওষুধ দেয় | মাকে নিয়ে গিয়েছিল | একটা সাদা কাঠের পুঁতির মালা এনে আমায় দিয়েছে | এটা পরে থাকলে ওই পুঁতিগুলো শরীর থেকে বিলিরুবিন টেনে নেবে | পুঁতিগুলো হলুদ হয়ে গিয়ে কমলা রং ধরলে বুঝতে হবে অসুখ শেষ হয়েছে | মামণি তো এত রেগে গিয়েছে | বাপিকে জানি নাস্তিক বলে | ভগবান, সাধু, সন্ত কিছুতেই বিশ্বাস নেই | কিন্তু খুব কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “ঋহা, একবার পরেই দেখ না |” শেষে মামণি ও আমাকে বলল, “বাপির যখন এতে এত আস্থা, তখন কদিন পরেই দেখ |” তাই মালাটা পরেছি, কিন্তু খুব অস্বস্তি করছে কেন না ঘাড়ে, গলায় খরখরে পুঁতিগুলো ফুটছে |
মা আজ রাত্রে কালীপূজো দেবে | জিত থাকবে আমার সাথে কেবিনে |

আমার কেবিনটা বেশ বড় | বাইরে একটা এক মুঠো চৌক ঘাসের উঠোন ঘিরে চারি পাশে করিডোর | তিন পাশের তিন করিডোরে মুখ করে কেবিন পর পর, চতুর্থ করিডোরটা হাসপাতালের যাতায়াতের মেরুদণ্ড | আমার কেবিনে ঢুকে বাঁ দিকের দেয়ালে লাগান আমার খাট | তার এই পাশে ঢোকার দরজার পর একটা বড় সোফা, যাতে শোয়াও যায় | এই দরজার মুখোমুখি উল্টো দেয়ালে আর একটা দরজা | ওটা দিয়ে বেরলে একটা ছোট ব্যালকনি | ওই দরজার পাশে একটা বড় জানলা, যেটা দিয়ে হাসপাতালের রিসেপশন দেখা যায় | দেখা যায় এদিক ওদিক কত ঢাকা করিডোর গেছে, পাশ দিয়ে দিয়ে সবুজ বেড়া আর ছায়া ছায়া গাছ | কেউ না থাকলে আমি বাইরে বসি, বা খাটে শুয়ে শুয়ে জানালা দিয়ে দেখি | জিত এলে বাইরেই বসি | অনেক সময় কোনও কথা হয়না | কি ভাবছে জিজ্ঞাসা করলে বলে, “কারো সাথে কথা বলার একটা সুযোগ পেয়েছি | মনে মনে দুটো কথা বলে নিই |” মাঝে মাঝেই আমায় হাতে কিরুকিবু করে দেয় | কে যে শিখিয়েছে ওকে | আগে একবার বলেছিল অর্জুন নাকি | অত ছোটবেলায় ?

আর, ওদের কি হল, অর্জুন আর এর্মের, কে জানে ? জিত কে জিজ্ঞাসা করলে বলে জানে না |

০৭ নভেম্বর
কাল রাত্রে জিত ছিল | অনেক রাত অব্দি গল্প করে শুয়েছি | সকালে উঠে দেখি আমায় না বলে চলে গেছে | এই খাতার একটা পাতা ছিঁড়ে লিখে রেখে গেছে -

তুমি ঘুমচ্ছিলে, ভোরের নার্স ওষুধ রাখতে এসে আমায় দেখে চমকে গেল | আসলে, আমি তোমার খাটের পাশে দাঁড়িয়ে তোমায় দেখছিলাম | ঘুমের মধ্যে তোমার বুক একটুও উঠছে পড়ছে না দেখে হটাত খুব ভয় পেলাম ! তারপর যখন তুমি নড়ে পাশ ফিরলে, তখন আশ্বস্ত হলাম | তখন দেখি তোমার গালে ঘামে আর লালায় অনেক চুল জড়িয়ে গেছে | গালটা মুছে চুলগুলো ছাড়াচ্ছিলাম, এমন সময় নার্সটা ঢুকল, আর থমকে দাঁড়াল |
আমি বাড়ি যাচ্ছি | স্নান করে জলখাবার নিয়ে আসব | তুমি ঘুমাও ততক্ষণ |

ঘুমবো কি, ফ্যান চলছে না, বাতি নেই সকাল থেকে | বাইরে শীত শীত আবহাওয়া হলেও সারা রাত বন্ধ ঘর সকালে গরম | জিত এলে ব্যালকনিতে বসে দুজনে মামণির বানিয়ে দেয়া স্যান্ডউয়িচ খেলাম চায়ের সাথে | তারপর জিত আমায় অনেক পার্ম্যুটেশনের অঙ্ক দেখিয়ে দিল | ও শুধু মুখে বলে দেয় | খাতায় কিছুতেই লিখবে না | একদিন ঠাট্টা করে বলল (সাধারণত এরকম কথা বলে না), “কে জানে একদিন যদি কেউ তোমার খাতায় আমার হাতের লেখা দেখে | কি বলবে তুমি তাকে ?”

আমার খাতায় আর কেউ লিখবে ? জিত, তুমি আমার যে খাতায় লেখ, সেটা কেউ কোনোদিন দেখবে না | আমি নিজেই দেখতে পাইনা | খালি লেখ যখন, যেমন এখন এই কথাগুলো বলে লিখলে, তখন মনের ভিতরে আঁচর টেনে কিরুকিবু করে তোমার লেখা পড়ে | কি লেখা তা বুঝি না | শুধু এটুকু বুঝি যে যা বলছ তা নয়, কি বলতে চাইছ তাই লেখা হচ্ছে | হয়ত অনেক দিন পরে একদিন আমি মনটা খুলে দেখাব তোমাকে, আর তুমি পড়ে শোনাবে কি বলতে চেয়েছিলে |

দুপুর অব্দি থেকে জিত চলে গেল | খেয়ে ঘুমিয়ে সন্ধ্যা বেলায় আসবে | ততক্ষণ মামণি থাকবে | ভাইফোঁটা পার হলে জিতের ছুটি শেষ, মায়ের স্কুল খুলবে, আমার ও | সামনে পরীক্ষা | কি লিখব ? ওদিকে আমার বিলিরুবিন কমতে লেগেছে, এখন দশের কাছাকাছি | বাপি একটু আশ্বস্ত হয়ে আমার গলার কাঠের পুঁতির মালাটা দেখল | মামণি কে বলল, “বুনু দেখ পুঁতিগুলো কেমন হলুদ হয়েছে |” মা জিতের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল | জিত বাপিকে বলল, “হ্যাঁ মেসোমশাই | আমি আগেই বলেছি ঝিলিক কে, যে এবার ও ঠিক হয়ে যাবে, আর আমি তাড়াতাড়ি বাড়ি পালাতে পারব |”

আমি এটা বুঝি না, বাপি জিত কে জিত বলে ডাকে, কিন্তু মামণি ওকে এখনো মাঝে মাঝে টুকু বলে ডাকে | আর বাপির সাথে কথা বললে জিত আমাকে ঝিলিক বলে ডাকে | মনে হয় যেন মামণি জিতকে এখনো সেই ছোট মনে করে, আর বাপি ভাবে ও বড় হয়ে গেছে | আর বাপির মনে আমি এখনো ছোট, তাই বাপির কাছে জিত আমাকে ঝিলিক বলে ডাকে | আমি বাপির ঝিলিক, না টুকুর ? জিত আমার, না বাপির ? টুকু আর ঝিলিক কি ভাই বোন ? আর, জিত আর ইতি ...

০৮ নভেম্বর
কাল দেয়ালি ছিল | বিকেলেই পুরো পাওয়ার চলে গিয়েছিল | নেমে আসা অন্ধকারে আমি ব্যালকনিতে বসেছিলাম | সূর্য ডুবলে ওরা জেনারেটর চালিয়ে চেষ্টা করল অনেকক্ষণ ধরে | কিন্তু তাতে কখনো এখানে, কখনো ওখানে, এক দুটো বাতি শুধু জ্বলে উঠবার চেষ্টা করেই নিভে যাচ্ছিল | মনে হচ্ছিল যেন করিডোরে করিডোরে আলেয়ার আলো পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে | ভাবছিলাম করিডোরে অন্ধকার ঘনালে জিত আসবে কি করে | তখন বাইরের দরজায় দুটো টোকার শব্দ হল, শুনলাম জিত ডাকছে, “ইতি, তুমি কোথায় ?” আমি ব্যালকনির দরজা ফাঁক করে সাড়া দিলাম, “ব্যালকনিতে | চলে এস |”

দুজনে বসে থাকতে থাকতে দেখলাম, হাসপাতালের বাইরে নার্সদের হোস্টেলে বাতি এলো | ওরা অনেক ছোট চুমকি বাতি লাগিয়েছে - সাদা, হলুদ, লাল, নীল, সবুজ আর বেগুনী বিজলীর বাতি ঝালরের মত ঝুলছে চারতলা বাড়িটাতে | কি মায়াবী লাগছে বিশেষ করে ওই সবুজ, নীল আর বেগুনী আলো | তারপরে দেখলাম নার্সরা ব্যালকনির রেলিঙে প্রদীপ দিচ্ছে | জিত বলল মামণিকে প্রদীপের সলতে, তেল সব ঠিক করে দিয়ে এসেছে | মামণি বাপির অপেক্ষায় বসে আছে |

কিন্তু হাসপাতালে বাতি আর এলো না | জেনারেটর অনেক চেষ্টা করে শেষে কিছু কিছু জায়গায়, যেমন নার্সদের স্টেশনে স্টেশনে বাতি দিল | একটা নার্স এসে আমার ঘরে একটা ইমার্জেন্সি বাতি দিয়ে গেল | জিত গিয়ে সেটা নিভিয়ে এসে বলল, “চলো আজ অন্ধকারে বসি, দিনটা মনে রাখার জন্য |” দেখলাম একটু একটু করে ঠাণ্ডা নামছে | জিত আমার হাত দুটো নিয়ে নিজের হাতের তালুর মধ্যে ধরে রাখল | পরে ভিতর থেকে একটা চাদর এনে আমার হাঁটুর উপর ফেলে দিল |

একটু পরে আবার দরজায় টোকা | একটা নার্স ঢুকল, বলল রক্ত নেবে | নার্সটা নতুন মনে হল | কিছুতেই আমার নাড়ি খুঁজে পায় না আর থেকে থেকে জিতের মুখের দিকে তাকায় | জিত ওর চোখ এড়িয়ে ওকে একবার বলল অন্য নার্স ডাকতে | সে কথা না শুনে ও হটাত খুব জোরে ছুঁচ ফুটিয়ে রক্ত নিতে শুরু করল | তারপর ছুঁচটা বের করতেই ফোয়ারার মত রক্ত বেরোতে লাগল ফোটানো জায়গাটা থেকে | আমি দেখি জিত অদ্ভুত ভাবে সেদিকে তাকিয়ে, মুখে কথা নেই | আমি চিৎকার করে উঠতে নার্সটা ছুটে বেরিয়ে গিয়ে ফিরে এলো অন্য নার্স নিয়ে | জিত সেইভাবেই থ হয়ে দাঁড়িয়ে | যেন স্থাণু হয়ে গিয়েছে | কিছুক্ষণ পরে নার্সরা রক্ত বন্ধ করে চলে গেলে আমি বিছানা থেকে উঠলাম | ততক্ষণে ও সোফায় গিয়ে বসে পড়েছে | আমি ওর হাতে হাত রেখে বললাম, “জিত, কি হয়েছে ? এরকম রক্ত দেখনি কোনও দিন ?” জিত সম্বিত ফিরে পেয়ে বলল, “না, আমি তোমার রক্ত তো আগে দেখিনি | কোথায় থেকে এলো এত কালচে রক্ত ? তোমার আর আমার রক্তের রং আলাদা কেন ? “
আমি – “জিত, ইমার্জেন্সি আলোয় রক্তটা হয়ত কালচে লাগছিল | তুমি তাই দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিলে ?”
জিত = “না, আমি ঘাবড়ে যাইনি | কিন্তু কি সব এলোমেলো চিন্তার ঝোঁকে পড়ে গিয়েছিলাম, যেন ওই রক্ত আমাকে সম্মোহিত করেছিল |”

আমি জিত কে জড়িয়ে অনেকক্ষণ সোফায় ওর পাশে বসে থাকলাম | ওর পিঠে আমার বুক হেলিয়ে ওকে শোনালাম যে আমার বুকের ভিতরটা শান্ত হয়েই আছে; যাতে ও আর চিন্তা না করে | জিত কাঠের গুঁড়ির মত শক্ত হয়ে বসে থাকল |

রিসেপশনটা সন্ধ্যা থেকে অন্ধকার ছিল | অনেক দেরীতে ওখানে ওরা প্রথমে একটা ইমার্জেন্সি বাতি দিল | তারপর কেউ এসে অনেকগুলো মোমবাতি জ্বেলে দিয়ে গেলে | জানলা দিয়ে আসা সেই আলোয় জিত হুঁশ ফিরে পেয়ে বলল, “চল, ঝিলিক, ওখানে গিয়ে দেখি ওরা কি করছে |” জিত আমাকে ঝিলিক বলে ডাকার মানেই হচ্ছে একটা কিছু খেলার কথা মনে হয়েছে ওর | উঠে বললাম, “আচ্ছা তুমি বস, আমি এই গাউনের নিচে একটা আমার শেমিজ পরে নিই |” তার ওপর চাদর গায়ে জড়িয়ে আমি বেরলাম | অন্ধকার করিডোরে ইমার্জেন্সি বাতিটা ধরে আস্তে আস্তে হেঁটে রিসেপশন পৌঁছলাম | ওখানে একটা সোফায় আমায় বসিয়ে জিত গেল ক্যান্টিন থেকে চা আনতে | চা বলে দিয়ে ফিরে এলো কয়েকটা কাপ-কেক নিয়ে | একটু পরে একটা ছেলে চা দিয়ে গেল | খেতে খেতে দেখলাম কিছু স্টাফ অনেক রঙিন মশাল আর তুবড়ি নিয়ে এসে জ্বালাতে লাগলো পোর্টিকতে | তার ধুঁয়ায় ভরে গেল রিসেপশন | তখন একটা সিনিয়র ডাক্তার এসে খুব বকাবকি করল | তারপর সবাই এক এক করে চলে গেল | জায়গাটা শান্ত হয়ে গেল | শুধু মোমবাতিগুলো জ্বলল ঠাণ্ডা হওয়ায় শিখা হেলিয়ে দুলিয়ে | ওগুলো বোধ হয় সেন্ট দেয়া ছিল | পোড়া মশালের গন্ধ কাটিয়ে খুব সুন্দর হালকা একটা গন্ধ ছড়িয়ে গেল | আমি আর জিত বসেই থাকলাম | নটা বাজলে রিসেপশনিস্ট ও চলে গেল | তারপরে দেখলাম নার্স হোস্টেলে ওরা চুমকি বাতিগুলো নিভিয়ে দিল | দেখতে, দেখতে ওদের প্রদীপও প্রায় সব নিভে গেল | পটকা ফাটার শব্দ দূর হতে দূরে মিলিয়ে যেতে লাগল | বাইরের অন্ধকার নিঃশব্দে বাড়তে থাকল | এক সময় ঠাণ্ডা হাওয়াটায় গাটা শির শির করে উঠলো | তখন আমি মনের মধ্যে ভেসে আসা একটা কথা শুনে অস্পষ্ট স্বরে তার প্রতিধ্বনি করলাম, “টুকু, এবার আমায় ঘরে নিয়ে চল |”

ঘরে ফিরে এসে প্রথমে খাটে শুলাম, ক্লান্ত লাগছিল এত | তারপর উঠে বসলাম জানালার দিকে মুখ করে | জিত জানালার কাছে গিয়ে বাইরে দেখল | তারপর আমার কাছে এসে, অন্ধকারে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল | আমি বললাম, “কি দেখছ ?”
জিত – “তোমার চোখ |”
আমি – “কি আছে ওতে ?”
জিত – “ওর কালো অন্ধকার মনিতে বাইরের আলোর প্রতিফলন দেখছি | স্পষ্ট |”
আমি – “তাই ?”
জিত – “ভাবছি, যদি ওই ভাবে চোখে আলো ভরে নিতে পারতাম |”
আমি – “কেন ?”
জিত – “পথ দেখার জন্য |”
আমি – “কোন পথ ?”
জিত – “জানিনা | পথটাই তো খুঁজছি |“
আমি এই হেঁয়ালি না বুঝে চুপ করে থাকলে জিত বলল, “খিদে পায়নি ? ... রাত হয়েছে | চলো তোমাকে খেতে দিই |”
আমি – “দাঁড়াও, আগে এতগুলো জামা ছাড়ি | তুমি এখানেই থাক, শুধু ইমার্জেন্সি বাতিটা নিভিয়ে দাও |”

আমি নিচে পরা বাড়ির শেমিজটা ছাড়তে ওপরের হাসপাতালের গাউনটা খুলতে চাইলাম | মাথার উপর কাপড়ে কাপড় জড়িয়ে গেল | জানালার আবছা আলোয় দেখলাম জিত এগিয়ে এলো আমায় সাহায্য করতে | আমার কাছে এসে ইতস্তত করছে কি, বাতি জ্বলে উঠল | জিত বিব্রত মুখে, “চলো, বাতি এসে গেছে | আমি বাইরে বসছি | তুমি কাপড় বদলে নাও”, বলে দরজা খুলে ব্যালকনিতে চলে গেল |

কিছুক্ষণ পরে আবার বাতি চলে গেল | জিত অন্ধকার ঘরে ফিরে এসে ইমার্জেন্সি বাতিটা না জ্বেলেই আমার খাবারটা বের করে বেড-টেবিলে দিয়ে বলল, “ইতি, প্রায় দশটা বাজে | আমি এবার গিয়ে মাসিমা কে পাঠিয়ে দিচ্ছি | তুমি খাবার সময় বাতিটা জ্বেলে নিও |”
আমি – “মা তো এখনো এলো না | তুমি এত তাড়াতাড়ি কেন যাবে ?”
জিত – “জানিনা | দেরী হয়ে গেছে | হয়ত কোনও বাস বা অটো পাব না | হেঁটে যেতে হবে | ভয় হচ্ছে যদি অন্ধকারে আমি পথ গুলিয়ে ফেলি | তাই আর দেরী করব না |”

জিত চলে গেলে অন্ধকারে আমি এক সম্পূর্ণ শূন্যতা নিয়ে বসে থাকলাম | জিত যখনই এইরকম অদ্ভুত কথা বলে আমি বুঝি ও কোনও অন্তর্দ্বন্দ্ব জয় করার চেষ্টা করছে | কিন্তু আমায় বলতে পারছে না, কেননা সেটা খেলা, না খেলার দ্বন্দ্ব নয় | কি নিয়ে দ্বন্দ্ব তাও হয়ত ও নিজে জানে না |

বাপি মামণিকে যখন দিয়ে গেল, তখন প্রায় এগারোটা বাজে | জিত তখনও বাড়ি পৌঁছায়নি |

০৯ নভেম্বর
জিত কাল সকালে চলে গেছে | যাওয়ার আগে আমার সাথে দেখা করেনি | মামণি বলল ওকে বলেছিল ভাইফোঁটা কাটিয়ে যেতে | তাও থাকল না |

মামণি আরও বলল, “টুকু আসছে না দেখে বাপি ফেরার পর ওকে খুঁজতে গেল | কোথাও পেল না | টুকু অনেক রাতে এসে শুধু বলল ও পথ হারিয়ে গিয়েছিল | তারপর কিছু না খেয়ে শুয়ে পড়ল | বাপি বলছিল, ছেলেটা খুব ইমোশনাল | কখন কি কথা নিয়ে ভাবে, কিছু বোঝার উপায় নেই | তোর কি মনে হয় ?” আমি মাকে কাল রাত্রের নার্সের রক্ত নেয়া, ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরনোর কথা সব বললাম | বললাম, ওই রক্ত দেখে জিত কিভাবে স্থাণু হয়ে গিয়েছিল | মা বলল, “এতো আমারই ভুল | টুকু কি তাই পারে এই সব হাসপাতালের ঝক্কি সামলাতে ?”

ডাক্তার ঝা বাপিকে সন্ধ্যায় দেখা করতে বলেছে | আমার বিলিরুবিন অনেক কম | মনে হয় কাল ছেড়ে দেবে | বাড়ি গিয়ে আগেই জিতকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করব, সেদিন ও কেন বাতি জ্বললে অত বিব্রত হয়েছিল, যেন কোনও অচেনা মেয়ের কাছে এসে পড়েছে | হটাত আসা আলোয় আমি কি অচেনা হয়ে গিয়েছিলাম সেই এক মুহূর্তের জন্য ?
 





দেয়ালি, ২০০৭
ইতি,
         তখনকার অনেক কিছু কথাই আমার মনে নেই, এখন তোমার ডায়েরির লেখা পড়ে তার কিছু কিছু মনে পড়ছে | তবে, জানি না কোন অলিখিত কথার তুমি উল্লেখ করেছ |

         আমার একটা কথা তুমি লিখনি, কেননা তোমার জানার কথা নয় |

         প্রথম দিন তোমার রুগ্ন চেহারা হাসপাতালে দেখে আমি ভেঙ্গে পড়েছিলাম | আমার মনে তুমি সব সময় ছোটবেলার ঝিলিক – টুকটুকে চেহারার | আর হাসপাতালের গাউনে তোমায় দেখলাম যেন একটা ডুবন্ত জাহাজের ভেঙ্গে পড়া মাস্তুলে একটা প্রাণহীন পাল ঝুলছে | কি ভাবে কাটল পরের দিনগুলো | খালি মনে হত বিধ্বস্ত তোমাকে জড়িয়ে ধরে কোথাও নিয়ে যাই, কোনও এমন জায়গায় যেখানে গেলে সব অসুখ সেরে যাবে, তোমার হাসি ফিরে আসবে, আবার আমরা ছোটবেলার খেলায় ফিরে যাব | কত অছিলা করলাম তোমাকে ধরার, কিরুকিবু করে, গাল থেকে তোমার চুল সরিয়ে, তোমার হাত আমার হাতে নিয়ে গরম করে | তোমার হাঁটুতে গরম চাদর রাখতে গিয়ে মনে হল ওটাতে তোমাকে জড়িয়ে বুকের মধ্যে টেনে নিই |

         কিন্তু কি ছিল এই ভাবে চাওয়ার মধ্যে, সাথে সাথে মনের মধ্যে একটা সন্দেহ জাগল – এভাবে তোমাকে পাওয়া কি ঠিক ? কে বলে দেবে, আমি কোন পথে চলেছি ? নাকি পথে চলতে চলতে পথ হারাচ্ছি ?

         তখন শুধু তোমার চোখ দেখে মনে হয়েছে ওই আমার কম্পাস, আমায় এই অন্তর্দ্বন্দ্ব অন্ধকারে পথ দেখাবে |

         দেয়ালির দিন সন্ধ্যায় যখন তোমার কাছে যাব বলে বেরচ্ছি, মাসিমা জানতে চাইল, “টুকু, তুমি ভাইফোঁটা অব্দি থাকবে ?” মেসোমশাই বলল, “কিন্তু, ঋহা তো হাসপাতালে, কি ভাবে ফোঁটা দেবে ?” আমি বললাম, “দেখি |”

         আমার মনে কথাটা ঘুরতে থাকল | হাসপাতালে এসে তোমাকে জিজ্ঞাসা করতে চাইলাম, কিন্তু কি ভাবে প্রশ্নটা সাজাব, কি শব্দে, কি কথায় ? একদিকে মন ছুটে যাচ্ছে তোমাকে ছুঁতে, অন্যদিকে তোমাকে হারানোর বিভ্রান্তি | রোজকার অন্ধকারে মনে হত পথ হারাচ্ছি তোমার কাছে যেতে যেতে | চাইতাম, যদি তোমার চোখের আলোয় একটু কোনও পথের ইঙ্গিত দেখতে পাই |

         আমার মনে হয় আমার সেদিনের দৃষ্টিতে কিছু ছিল যা ওই নার্সটাকে বিচলিত করেছিল | না হলে তোমার রক্ত নিতে গিয়ে ওর হাত এত কাঁপল কেন ? যখন ফিনকি দিয়ে তোমার রক্ত বেরল, আমি মরমে মরমে মরলাম | মনে হল আমার জন্য তোমার সব রক্ত কালো হয়ে গেছে | তাও তোমাকে ধরা-ছোঁয়ার ইচ্ছায় আমি লাগাম লাগাতে পারলাম না | তুমি যখন রিসেপশন থেকে কেবিনে ফিরে জামা খুলতে গিয়ে পারলে না আমি এগিয়ে গেলাম তোমাকে সেই সুযোগে ছুঁতে | তখনই বাতি এলো, আর দেখলাম তোমার শুকিয়ে যাওয়া শরীর, যার স্নেহ দরকার, স্পর্শ নয় |

         আমি হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ভাবলাম কোথায় যাব ? কাকে শোনাব আমার পাগল করা সব প্রশ্নের কলরোল ? মনে পড়ল একবার ঠাকুমা বাবাকে বলছিল, আমি শুনেছিলাম, যে পাপবোধ হল কামনাকে গ্রাহ্য করার স্পর্ধার অভাব | এই সবই ভাবতে ভাবতে অনেক, অনেক সময় ধরে অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে, আকাশের তারা দেখে পথ খুঁজে পেতে পেতে, বাড়ি ফিরলাম, তোমার মনের কাছে যাওয়ার পথ হারিয়ে |

         জানো, সেই রাত্রে আমি শপথ নিয়েছিলাম আমি আর তোমাকে ছোঁব না, আর তোমার স্পর্শও আমার অকাম্য হবে |

         এখন ভাবি কত শিশুসুলভ কথা ভেবেছিলাম তখনকার অপরিণত বুদ্ধিতে | কিন্তু, তাই পরদিন আমি সকালে উঠে রওনা দিলাম বাড়ি ফিরতে | এই ভেবে নয় যে থাকলে তুমি আমায় ফোঁটা দেবে | এই ভয়ে যে ফোঁটা দিতে গিয়ে তুমি আমায় ছোঁবে | আর আবার তোমাকে ছোঁয়ার লোভ আমাকে পেয়ে বসবে |

         এতদিন পরে তোমাকে এইসব কথা বলে জানিনা আমার মন হালকা হবে কিনা, আর তোমারই বা কি মনে হবে | কিন্তু, যত দিন গিয়েছে, জেনেছি আর বুঝেছি, সেই কদিন তোমাকে যতই ছোঁয়ার কামনা করে থাকি, কোথাও তারই মধ্যে সেই ছোটবেলার নির্দোষ খেলার সম্পর্কের একটা আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে ছিল – তোমার সংস্পর্শ পাওয়ার, তোমার শরীরটা ছোঁয়ার নয় |

         অনেক ভেবেছি, তোমাকে কি তোমার শরীর থেকে আলাদা করে চাওয়া যায় ? আর সেভাবে পেলে, কিভাবে তোমাকে ছোঁব ? আসলে আমরা ভালবাসার একটাই ভাষা জানি বোধহয়, যার সব কথা শারীরিক |

         তাও সেদিনের মনোভাব তোমাকে জানাচ্ছি এই নিচের লাইন গুলোয়, সেদিন বাড়ি ফিরে সারা রাত জেগে লেখা,


                         আদিগন্ত, অফুরন্ত এই আঁধার, কি করাল ধাঁধা
                         তৃষার্ত চাতক আমি, আলোর মরীচিকায় বাঁধা
                         হাতড়ে তোমায় খুঁজি, না পেয়ে আমার সমীপ
                         আঁধারে দৃষ্টিহীন হয়ে করি তোমার দূরত্ব জরিপ

                         জ্বালাও না কেন তুমি হাজার দীপের দিয়াড়ি ?
                         যোগাও আমায় সামর্থ্য, দিতে এই ব্যবধান পাড়ি
                         আলোর বলয়ে তোমার কালো দু’আঁখির প্রভা
                         আমার হৃদয়ে ভরাবে তার নম্র কবোষ্ণ আভা
                         চোখের তারার আলো তার কটাক্ষে, ইঙ্গিতে
                         দেখাবে পথ যা হারিয়েছে আকাশের তারাতে

                         কোথায় সেই পথ, যা খুঁজেছি আমি এতকাল ?
                         আঁধার বিছিয়ে ছিল সে তার অলীক মায়াজাল
                         উপরে মহাকাশে দেখে তা তারার নীহারিকায়
                         হয়েছি পথভ্রান্ত আমি পৃথিবীতে, অন্ধ, একাই

                         এখন জ্বললে প্রদীপে প্রদীপে আলোর আলেয়া
                         লেলিহান শিখায় লুকিয়ে শ্যামার আমরণ-মায়া
                         আসবো আমি ছুটে, তখন তুমি দেখিও আমায়
                         পথ বিছিয়ে আছ বসে, তোমার চোখের তারায়

                         এই পথ কি সেই পথ যা ফেলে এসেছি পিছে ?
                         এই পথ কেন তবে ভুলে ঘুরেছি মিছে মিছে ?
                         এখন দেখি যে দুই কালো চোখের দৃষ্টি ধরে
                         পথ চলে যেতে গেছে হারিয়ে শরীরে গভীরে
                         তার যে ধমনীতে বহে যায় শোণিতাক্ত ধারা
                         আমার পথ সেই নাড়িতে শুরু, তাতেই সারা

                         দুয়ার-কপাট অকপট চোখের মনিতে খোলা
                         আলেয়া আলোর শিখারা তাতে করে খেলা
                         আলোর চাতক আমি, নিয়ে পিপাসা শিখার
                         করি আকণ্ঠ পান সব আগুন, বুকে দীপিকার

                         আমি ভেবেছিলাম আলেয়া শিখায় নেই উত্তাপ
                         শুধু লাগে পোড়াতে প্রেমে সুপ্ত কামনার পাপ
                         তা যদি হবে তবে কি ভাবে এই আকণ্ঠ পিপাসা
                         কামনার বুকে লুকানো এক ভীরু ভাবুক আশা
                         খুঁজে পাবে পথ দেয়ালির আলোর আলেয়ায় ?
                         শরীরে না খুঁজে, আমি পাব কোথায় তোমায় ?

         আশা করি এতে তোমার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর পাবে |
         ভালো থেক |
- জিত






দেয়ালি, ২০০৭ 
জিত,
         যে কথা তোমায় লিখিনি, আমার ডায়েরিতেও লেখা নেই |

         কালীপূজোর আগের দিন শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম আমার অসুখটার একটা ভালো দিক আছে | যতদিন অসুখ থাকবে তুমি আমার কাছে থাকবে, ছুটি ফুরিয়ে গেলেও হয়ত | মামণি জিজ্ঞাসা করেছিল, “জিত কে কি ভাইফোঁটা অব্দি থাকতে বলব ? ও অবশ্য কবে বাড়ি ফিরবে তা কিছু বলছেনা | কিন্তু আমি ভাবছি আগে জানা থাকলে সময়ে ব্যবস্থা করতাম | তুই কি বলিস ?”

         আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, “মামণি, আমি জানিনা |”

         মামণি তখন একটা কথা বলেছিল, যা আমার এখন মনে পড়লে মনে হয় তখন কেন বুঝিনি | বলেছিল, “দেখ, যাত্রা যবেই কর না কেন, যাত্রার প্রস্তুতি অনেক আগেই করতে হয় | নাহলে যাত্রার সময় এসে চলে যায়, মানুষ পা ফেলে এগোতে পারে না |”

         তুমি কি যাত্রায় প্রস্তুতি সেই সময়েই করেছিলে ? তা না হলে পথ কেন খুঁজছিলে আমার মধ্যে ?

- তোমার ইতি



                                                                                                                    দেয়ালি, ২০০৭

 
ইতি,


        হয়ত, আমি খুঁজছিলাম পথ – গন্তব্য ঠিক না করে, আর তুমি খুঁজছিলে গন্তব্য – পৌঁছানোর পথ আছে কি নেই না জেনে |        জীবনযাত্রাটা বোধহয় একটা গন্তব্য হীন, পথ হীন আলেয়া |

- জিত 





--->X<---