অনুগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অনুগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ১৯ মে, ২০১৬

বুগেনভিলিয়া

|| বুগেনভিলিয়া ||


মোহন মাস্টার বিয়ে করে নি | চাপাচাপি করলেও কারণটা বলে না | বলে সময় হয় নি, বা পয়সা ছিল না, বা বয়স হয়ে গিয়েছিল প্রয়োজন বোধ করার আগে | আবার এও বলেছে, দরকারই পড়ে নি তেমন |

কিন্তু সেদিন আমাদের অন্য কথা বলল | অন্য প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল | মেয়েদের নিয়ে | এই বয়সে তো আর তেমন উত্তেজক কথা হয় না | তাও একজন কিছু বললে, অন্যজন তাতে অন্যমনস্ক হয়ে কিছু মনে পড়ায় হটাত করে জেগে উঠে বলছিল, “জানেন, আমার একবার এমন হয়েছিল ... |”

শুনতে শুনতে কেমন উসখুস করে উঠে মোহন মাস্টার বলে বসল, “জানেন কি, মেয়েদের একটা মর্মস্থল হয় – kernel যাকে বলে ?”
“তাই ?” নিরুৎসাহে আমরা জানতে চাইলাম |
“হ্যাঁ !” বলল মোহন মাস্টার, “ফুলের মধ্যে ফুল | বুগেনভিলিয়ার ফুলে যেমন হয়, চারিদিকে বড় বড় পাপড়ি, আর তার মাঝে ছোট্ট একটা ফুল, অনেক সময় সাদা – একেবারে বিমল সাদা মাটা সাদা |”

একটু থেমে মোহন মাস্টার বলল, “আমি একবারই দেখেছিলাম ... অনুভব করেছিলাম একটা ফুলের মধ্যে অন্য আরেক ফুল ফুটছে | সেটাই মেয়েদের মর্মস্থল |”

আমাদের চেপে ধরা লম্বা নিঃশ্বাস মোহন মাস্টার কেড়ে নিয়ে বলল, “মেয়েরা যে প্রকৃতি নিয়ে জন্মায়, যা রূপ, গুণ আর পরিচয় নিয়ে, সেটা হল ওই বাইরের রঙিন পাপড়ি | সেটা নিয়েই বড় হয়, কারো মেয়ে থেকে কারো জীবনসঙ্গিনী হয়, পরে মা হয়, ঠাকুমা-দিদিমা | কুমারী থেকে যুবতী, একসময়ে পূর্ণযৌবনা, তারপর ভাঁটা পড়তে শুরু করে | কারো জন্মের রূপ, গুণ শেষদিন অব্দি থেকে যায় | কারো অল্পেই তার শেষ হয়, অনেক আগেই | এরই মধ্যে একসময় ওই ভিতরের ফুলটা ফোটে | সেটাই মেয়েদের মর্ম | তার নির্দোষ রূপ, গুণ, মায়া, মমতা, ভালবাসা দেখতে এক অন্য চোখ লাগে | আমি একসময় সেই চোখ পেয়েছিলাম, আর দেখেছিলাম ভিতরের ফুলটা একজনের মধ্যে |”

মোহন মাস্টার চুপ করে গেলেন | আমারও চুপ করে রইলাম | ‘কে সে ?’ সবাই ভাবছি, কিন্তু মুখে প্রশ্নটা আসছে না, যে যদি মোহন মাস্টারের ঘোরটা কেটে যায় |

কাটল না | মোহন মাস্টার আবার বলতে শুরু করল |

“দাদুর বাড়ির দোতলা থেকে পাশের একতলার বাড়িতে মেয়েটাকে দেখতাম | শুধু সকালে | সে স্নান করে এসে কাচা শাড়িটা পিছনের উঠোনে মেলত | আমি দেখতাম | আর তার চোখে ধরা পড়লে, সে মেলা শাড়িটার আড়ালে চলে যেত | চুপ করে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত | আমিও থাকতাম | শেষে আমাকে হার মানতে হত | দাদু ছিল খুব অবস্থাপন্ন | ওরা ছিল ভীষণ গরিব | তাই আমি ভাবতাম আমার জোর খাটানো উচিত নয়, সরে যাওয়াই ভালো | একদিন কী যে হল, মেয়েটা সরল না | শাড়ি মেলার ভঙ্গিতে তারের উপর হাত ধরে আমার দিকে তাকাল | আমি ওর ভিজে চুলে ঘেরা মুখটা দেখলাম | আর দেখলাম ওর চোখ, ওর চিবুক, গলা ... বাইরের ফুলটা পুরো দেখলাম সেদিন | আর দেখলাম একটা বিষণ্ণ দৃষ্টি, কিছুটা আমাকে দোষারোপ করার আঁচ ছিল তাতে |

“তখন আমি সাইকেল চালান শিখছি | একদিন ওদের বাড়ির সামনে পড়ে গেলাম, বোকার মত চিতপটাং হয়ে | সেই সাথে শুনলাম কেউ খিলখিল করে হেসে উঠল | তাকিয়ে দেখি মেয়েটা জানালা দিয়ে আমার দুরবস্থা দেখে হাসছে, ভাবটা এই যে, এখন তো তুমি আমার চেয়েও অসহায়, দুর্বল | আর সেই মূহুর্তে ওর হাসির মধ্যে আমি ওর পরিমল মর্মস্থল দেখলাম | ক্ষণিকের জন্য ফোটা একটা ফুলের ভিতরের ছোট সাদা ফুল, কোন রেণু নেই, কুমারীর সিঁথির মত পরিষ্কার, নিষ্পাপ |

আমার যে কী মনে হল | মনে হল এই মর্ম একদিন মিটে যাবে, শেষ হয়ে যাবে, আর আমি কিছু করতে পারব না, একে ধরে রাখতে পারব না | বাইরের ফুল দেখে ভোমরা আসবে, আর মর্মের ফুলটা শেষ করে দিয়ে যাবে | আমি কিছু করতে পারব না |

“এরপর আমি চলে আসি | মনে কথাটা থেকে যায় | আর মন থেকে অন্য কোন ফুল দেখার, বা গ্রহণ করার বাসনাটা চলে যায় চিরকালের মত |”


-------------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ১৯ মে ২০১৬

সোমবার, ৪ মে, ২০১৫

চারু বাক্ সুখ

|| চারু বাক্ সুখ ||


দরিদ্র পণ্ডিত মশাইয়ের সংসার ছোট – পণ্ডিত, তাঁর স্ত্রী ও এক ছোট ভাই | তবুও চাল আনতে ডাল ফুরয়, ডাল আনতে নুন – পণ্ডিত বাড়ি বলে পান্তা খাওয়ার চল নেই | ভাই এত ছোট যে সে এখনও উপার্জন যোগ্য নয় | তাই
পণ্ডিতের স্ত্রী বড়ই অসুখী | এমন নয় যে পণ্ডিত স্ত্রীয়ের কষ্ট বোঝেন না | কিন্তু অর্থাভাবের মধ্যে যা সম্ভব, মাঝে মাঝে স্বল্পশিক্ষিতা স্ত্রীকে দর্শন বুঝিয়ে গ্লানিমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন | ফল হয় না |

একদিন স্ত্রী পণ্ডিতকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হ্যাঁগা, ঠাকুরপোর বিয়ে কবে দেবে ?” পণ্ডিত পান চর্বণ করতে করতে চার্বাক দর্শন পাঠ করছিলেন | কিছু বললেন না, শুধু ভ্রুকুটি করে একবার দৃষ্টি ক্ষেপণ করলেন, যার অর্থ, “এখন জ্বালিও না |”

কিছুদিন পরে স্ত্রী আবার সেই প্রশ্ন করলেন | পণ্ডিত তেমন ব্যস্ত না থাকলেও আগামী দিনগুলির আয় ব্যয়ের চিন্তা করছিলেন | অন্যমনস্ক ভাবে উত্তর দিলেন, “এখনও ওর বয়েস হয় নি | হলে দেখব খন |”

ক’দিন গেলে আবার সেই প্রশ্ন | রাত্রে শুয়ে কথা হচ্ছিল | এড়ানোর উপায় না পেয়ে, পণ্ডিত বিরক্ত হয়ে বললেন, “ওর বিয়ে নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছ কেন ? আরেকটা বউ আনলে খাওয়াবে কে শুনি ? আর তোমার তাতে কী লাভ হবে ?”
স্ত্রী গা ঘেঁষে বললেন, “তাহলে একটু সুখে থাকব |”
পণ্ডিত অবাক হলেন, “সুখে ... বলি ব্যাপারটা কী ?”
স্ত্রী বললেন, “কেন, তুমিই তো বলো, ‘ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ, জা বৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ’ | তা ধার করে ঘি নাই বা খাওয়ালে, জা হয়ে দুই বৌয়ে সুখে তো থাকব |”







------------------------------------
© ইন্দ্রনীর ০৪ মে ২০১৫

রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৫

কার্পেট-ব্যাগার

|| কার্পেট-ব্যাগার ||


শৈবাল ঘটনাটা বলেছিল, খানিকটা এই বয়ানে –

বুঝলি, আমার তখন প্রথম চাকরির প্রথম পদোন্নতি হয়েছে | একটু সচ্ছল অবস্থা – একনাগাড়ে ছ’মাস কেনাকাটা করে সংসারের খুঁটিনাটি মোটামুটি কুক্ষিগত করে একটু হাঁফ ছেড়েছি, কি, সীমা বলল ও জন্মদিনে একটা গালিচা নেবে | নতুন সোফার সামনে মেঝে নাকি ন্যাড়া ন্যাড়া লাগছে | অনেক বুঝিয়েও বোঝাতে পারলাম না যে জায়গাটা তত বড় নয়, গালিচা পাতলে আর খালি জায়গা থাকবে না | সব সময় গালিচায় মাড়িয়ে হাঁটতে হবে; আর আমদের দেশে জুতো চটিতে সবসময় ধুলো বালি থাকে | কিন্তু সীমা কিছুতেই শুনল না | তখন বললাম, 'আচ্ছা এই মাসটা যাক |' সীমা জিজ্ঞাসা করল, ‘ক্রেডিট কার্ডে কেনা যায় কিনা ?’ সত্যিই, সদ্য সদ্য ক্রেডিট কার্ড নিয়েছি, বেশির ভাগ ভারী দামের জিনিস তাতেই কেনা হয়েছে |

অগত্যা, একদিন ওকে দোকানে, দোকানে নিয়ে গিয়ে, অনেক দেখে রেখে একটা গালিচা কিনে দিলাম | সাগর-সবুজ রঙের জমিতে পার্সি কারুকাজ করা সুন্দর গালিচাটা বেলজিয়াম এ তৈরি | সাইজ চার ফুট বাই ছ’ ফুট – কিন্তু দাম প্রচণ্ড | তারপর বিভ্রাট – কার্ড মেশিনের কী গণ্ডগোলে দোকানদার দামটা দু’বার চার্জ করে ফেললো | তাই নিয়ে কথা কাটাকাটি, ক্ষমা প্রার্থনা | শেষে. দোকানদার আবার আমাকে টাকা ফেরত দেয়ার জন্য একটা চেক লিখে দিল | দোকান থেকে যখন বেরলাম রাত সাড়ে ন’টা | অতি কষ্টে একটা রিক্সা ধরে গালিচা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম |

প্রথমে ক’দিন ওই সুন্দর গালিচা পেতে ঘর আলো | সোফা দেয়ালের সাথে ঠেসে গালিচার চারপাশে একটু খোলা মেঝেয় পায়ে হাঁটার জায়গাও হল | সীমা গালিচায় বসে স্কুলের খাতা দেখে, বাতাবি ওতেই বসে খেলে, নয় পড়ে | আমিও মাঝে মাঝে অফিস থেকে ফিরে ওতে বসে চা খাই | কিন্তু সে ক’দিন ? সীমা নিজেই একদিন বলে, পুঁটি মাসি নাকি ওর উপরেও ঝাড় দিচ্ছে | সর্বনাশ ! তাহলে তো গালিচা ধুলোয় ভরে যাবে | তখন ঠিক হল, অফিস যাওয়ার আগে আমি গালিচাটা ভাঁজ করে একপাশে করে যাব | পুঁটি মাসি দুপুরে এসে ঘর ঝাড় দিয়ে, মুছে দেবে | বিকেলে অফিস থেকে ফিরে আমি আবার গালিচাটা পেতে দেব | এই ভাবে চলল ক’মাস | তারপর সীমা বলল, ভাঁজ করে করে গালিচাটা নাকি খারাপ হয়ে যাচ্ছে, ‘তার চেয়ে বরঞ্চ যদি গালিচাটা রোল করে রাখা যায়, তাহলে কেমন হয় ?’ আমি বললাম, ‘তোমার পাঁঠা, তুমি যেদিকে কাটবে ... থুড়ি, ওটাকে যে ভাবে রাখবে ...’

আরও ক’মাস এই ভাবে কেটে গেল | এখন প্রায়ই গালিচাটা রোল করে ফেলে রাখা হয় | পড়ে থাকতে থাকতে ওটা একটু একটু করে খুলে যায়, তখন আবার রোল করতে হয় | সীমা বলল, ‘এতসব ঝামেলায় কাজ নেই, ওটাকে রোল করে দাঁড় করিয়ে রেখে দাও |’ বেশ, ওটাকে গুটিয়ে বসার ঘরের কোনে দাঁড় করিয়ে রেখে দিলাম | এর পর বাড়িতে কাউকে চা-জলখাবারে ডাকলেই ওটা পাতা হত | নইলে, ওটা দাঁড়িয়ে থাকত | শুধু শীত পড়লে ওটাকে খুলে, ভ্যাকুয়াম করে রোদে দিয়ে, সীমার স্কুলের ছুটির দিন ক’টা পেতে রাখতাম | সে’ ক’দিন পুঁটি মাসি বসার ঘরের ঝাড়া-মোছা বাদ দিত | আবার, সীমার স্কুল খুললে গালিচাটা কে গুটিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখে দেয়া হত |

একবার গরম পড়ছে কি টিকটিকির খুব উৎপাত | সীমা আবার টিকটিকি একদম সহ্য করতে পারে না | আমাকে বলল, গোল করে দাঁড় করানো গালিচার ভিতর নাকি টিকটিকি বাসা বেঁধেছে | টিকটিকি যে বাসা বাঁধে জানতাম না | কিন্তু, সীমা বলল, ‘ওরাও নিশ্চয় বাসা বাঁধে | নইলে ডিম পাড়বে কোথায় ?’ অগত্যা, জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আমাকে কী করতে হবে ?’ সীমা বলল, ‘একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট দিচ্ছি, ওটা কার্পেটের রোলের মাথায় টুপির মত পরিয়ে বেঁধে দাও, তাহলে ওর ভিতরে আর টিকটিকি ঢুকতে পারবে না | আর ওর ভিতরে ধুলোও ঢুকবে না |’

তাই করলাম | এই করতে গিয়ে গালিচাটা পড়ে গেলে ভিতর থেকে কিছু ভাঙ্গা টিকটিকির ডিমের খোলা বেরল | সীমা বলল, ‘দেখলে, টিকটিকি বাসা বাঁধে কিনা ?’ তাই তো, ডিম পাড়তে নিশ্চয় বাসা বাঁধতে হয় !

কিছু দিন পরে দু’জনের স্কুলে গরমের ছুটি হলে আমরা দার্জিলিং চলে গেলাম বেড়াতে | ফিরে এসে বাড়ি খুলে দেখি বদ্ধ ঘরে সে কি চিমসে দুর্গন্ধ | বুঝলাম, নির্ঘাত টিকটিকি মরেছে কোথাও | কিন্তু বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজে কোথাও মরা টিকটিকি পাওয়া গেল না | পুঁটি মাসিও পরদিন এসে কোথাও কিছু তেমন পেল না | তখন ও বলল, ‘তাহলে নির্ঘাত ওই কার্পেটের ভিতরে কোনও টিকটিকি আটকা পড়ে মরেছে |’ ‘ও মা’, সীমা শিউরে উঠে বলল, ‘মাসি তুমি তাহলে ওটা বাইরে নিয়ে গিয়ে পরিষ্কার করে নিয়ে এস না |’ পুঁটি মাসি বলল, ‘আমি কি করে অত ভারীটা তুলব ? আর ওই মরা টিকটিকির রসে হয়ত ওটা মাখামাখি হয়ে আছে, সেটা কী করে পরিষ্কার হবে ? ও তো ফিনাইল দিয়ে ধুতে হবে |’ সীমা গা ঘিন ঘিন করে বলল, ‘তাহলে মাসি কাউকে ডেকে নিয়ে এসো, কার্পেটটা নিয়ে যাক |’ আমি বললাম, ‘নিয়ে যাক মানে ?’ সীমা বলল, ‘নিয়ে যাক মানে নিয়ে যাক ! আমি আর ওই কার্পেটে হাঁটতে বসতে পারব না |’ আমি সীমাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম | সীমা বলল, ‘কার্পেটটা কার, তোমার না আমার ?’ আমি বললাম, ‘তাহলে কাউকে দিয়ে দাও |’ সীমা বলল ‘কে নেবে মরা টিকটিকির রস মাখা কার্পেট ?’ পুঁটি মাসি সায় দিয়ে বলল, ‘যে নেবে সে কি আর গন্ধে টিকতে পারবে ? দিদি ঠিকই বলছে, ওটা ফেলে দেয়াই ভালো |’ শেষে রাজি হতেই হল | পুঁটি মাসি পাড়ার জমাদার বিশুকে ডেকে নিয়ে এলে | বিশু পনের টাকায় রাজি হল গালিচাটা নিয়ে ফেলে দিয়ে আসতে |

ক’দিন পরে বিশু বাথরুম, পায়খানা পরিষ্কার করতে এলে সীমা জিজ্ঞাসা করল, ‘হ্যাঁ রে বিশু, সেদিন কার্পেটটা কত দূরে নিয়ে গিয়ে ফেললি ?’

বিশু বলল, ‘ফেলব কেন, দিদি ? একটু দূর যেতেই দেখলাম পুঁটির ছেলে দাঁড়িয়ে | ওকে দেখতেই  পুঁটি বলল, ‘দে, কার্পেটটা এখানেই নামিয়ে দে |’


----------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ১৮ এপ্রিল ২০১৫

শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০১৫

চায়ের এঁটো

|| চায়ের এঁটো ||

-“হ্যালো ... তনিমা !”
-“কে ? শিপ্রা ? আরে, কী খবর তোর ... এ’ ক’দিন ফোন করিস নি কেন ?”
-“বলছি, বলছি | সেই কথাই তোকে বলার জন্য তো ফোন করলাম | তোর সময় আছে ?”
-“হ্যাঁ, বল না ... যা বলতে চাস |”
-“তোর টম কে মনে আছে ?”
-“কে টম ?”
-“আরে টমেটো – টম-এঁটো ... কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের |”
-“ও ... তম এঁটো, মম এঁটো, যার-তার এঁটো, তুই যাকে ...”
-“থাক, আর বলিস না ...
  “আচ্ছা, তনিমা, একটা কথা বল ... মানুষ আত্মহত্যা করতে পারে, অথচ, পাগল কেন হতে পারে না রে, স্বেচ্ছায় ?”
-“ও মা, তুই পাগল হয়ে কী করবি ? কী হয়েছে তোর ?”
-“জানি না | কিন্তু কিছুদিন আগে হটাত ওর কথা মনে হল, ফোন করলাম ওকে |”
-“নম্বর পেলি কোথায়, এতদিন পরে ? তোর বিয়ে হয়েই তো তের বছর হয়ে গেল, তার তিন বছর আগে ছাড়াছাড়ি | কী, ঠিক বললাম তো ?”
-“ঠিকই বলেছিস, প্রায় ষোল বছর হয়ে গেল | এতদিনে নিশ্চয় ওর টাক, ভুঁড়ি, চশমা, সিরিয়্যাল দেখা বউ, বাচ্চা-কাচ্চা সব হয়ে গেছে | হ্যাঁ, ইয়ে ... যা বলছিলাম ... ও তো আমার মাসতুত দাদা সমীরের বন্ধু ছিল | সমীরদা’ই দিল নম্বরটা |”
-“কিছু জিজ্ঞাসা করল না ?”
-“না রে, সমীরদা খুব ভিন্ন রকমের মানুষ | শুধু বলল, ‘বাহ, এখনও প্রেম করছিস !? করে যা, মানসিক স্বাস্থ্যের পক্ষে খুব ভালো’ ... আর কিছু না |”
-“তুই কী বললি ?”
-“ধুর, সব কথার জবাব দিতে নেই | যাকগে, টমকে ফোন করলাম | বেশ ভারিক্কি, চিন্তা করা গলায় ফোন তুলল | মনে হল যেন টাক মাথায় হাত রেখে, বাই-ফোকাল চোখে উদাস হয়ে চেয়ে, ফোলা পেটের নাভির কাছ থেকে আওয়াজটা বের করল | তারপরই, আমার নাম শুনেই, টাক থেকে হাত নামিয়ে, বাই-ফোকাল খুলে রেখে, ভুঁড়ি টেনে ধরে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘আরে, এতদিন কোথায় ছিলে ?’”
-“উফ, এমন ভাবে বলছিস যেন মুখোমুখি কথা বলেছিস | তারপর ?”
-“তারপর অনেকক্ষণ নিছক কথা বার্তা – কে কোথায় আছে, কী করছে, বউ, বা বর - যার যেমন কেস - কী করে, ছেলে মেয়েরা সায়েন্স নিয়েছে না আর্টস | শেষে, বিশেষ বলার কিছু যখন থাকল না, তখন দুজনেই চুপ |”
-“ব্যাস ?”
-“না, ব্যাস ওখানেই নয় | আমি শেষে বললাম, ‘শোনো টম, যে কথাটা জিজ্ঞাসা করতে, তোমাকে ফোন করেছিলাম |’ ও বলল, ‘হ্যাঁ, বলো |’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আচ্ছা, আমাদের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতাটা হয়েছিল, তাতে কী একটুও ভালবাসা ছিল না ?’ ও জিজ্ঞাসা করল, ‘ঘনিষ্ঠতা ? সেকালের কম বাজেটের পকেট খরচে এঁটো চা শেয়ার করে দুজনের ঠোঁট এঁটো করা ছাড়া আর তো কিছু হয় নি |’ আমি বললাম, ‘যাই হোক, তার মধ্যে কি একটুও ভালবাসা ছিল না ?’ জানিস, তনিমা, ও না কিচ্ছু উত্তর না দিয়ে ফোনটা নামিয়ে রাখল |”
-“এই ব্যাপার ? এইটুকু ব্যাপার, আর তুই জানতে চাস মানুষ আত্মহত্যা করতে পারে, অথচ, পাগল কেন হতে পারে না স্বেচ্ছায় ?”
-“তুইই বল |”
-“কী বলব ? তুই এইরকম পাগলামি করলি, এর পরে তোর মুখে আর ওই প্রশ্ন সাজে ?”
-“তুই বুঝলি না | আমি অন্যের জন্য পাগল হওয়ার কথা বলছি না | সে অভিজ্ঞতা আমার আছে ... আমি জানতে চাই, মানুষ কেন নিজের জন্য পাগল কেন হতে পারে না স্বেচ্ছায় ?”
-“জেনে কী করবি ?”
-“কেন ? দিব্যি নিজের মনের মধ্যে লুকিয়ে বেঁচে থাকব, শাশুড়ি, বর, মেয়ে দুটো, কেউই ডিস্টার্ব করতে পারবে না  ... এই তোর ফোন বাজছে বোধ হয় |”
-“হ্যাঁ, ল্যান্ড লাইনে কেউ ফোন করছে | দাঁড়া দেখি ...
 “... শিপ্রা, আন্দাজ কর দেখি কার ফোন ছিল |”
-“কার তা আমি কি করে জানব ... ওহ! লেট মি গেস ...”
-“থাক, থাক | জিজ্ঞাসা করল, তুই কেমন আছিস |”
-“কী বললি ?”
-“বললাম যে তোর সাথেই ফোনে কথা বলছি | শুনে, ‘যাও, তাহলে পরে কথা হবে’ বলে ফোন রেখে দিল |”
-“ওহ ! আমি তো জানতাম না যে তোর সাথে ওর কথা আছে, তাহলে ওর নম্বরটা ...”
-“কেন ? তুই কি ভেবেছিলি ও শুধু তোর সাথেই চা শেয়ার করে খেয়েছিল ?”


----------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ১৮ এপ্রিল ২০১৫

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

মলিনা থাকলে ...

|| মলিনা থাকলে ... ||

এক মোহিনী বিষাদ ভরা অনুভূতি নিয়ে পরিমল বাবুর ঘুম ভাঙ্গল | পর্দা টানা আধোছায়া ঘরে আঁধার-আলো সুপ্তি-জাগরণের সন্ধিক্ষণটা দীর্ঘায়ত করে ফ্যাকাসে ঘুমটা আস্তে আস্তে কাটল | ঘড়িতে দেখলেন আড়াইটা বাজে | দুপুরের খাওয়া শেষ করে কাগজ নিয়ে শুয়েছিলেন | হয়ত বড় জোর এক ঘণ্টা ঘুমিয়েছেন | তারই মধ্যে বহুদিন পরে সেই স্বপ্ন দেখে বিচলিত হয়ে জেগে উঠলেন |

অনেকক্ষণ টনটন করা মন নিয়ে তারই আলসে রেশে শুয়ে রইলেন পরিমল |

এই মোহিনী বিষাদ তাঁর অনেক দিনের অনুভূতি | তাঁর চিরকালের অভ্যাস বাম দিকে পাশ ফিরে হাতের পাতা গালের তলে রেখে ঘুমনো | বিয়ের পর মলিনা তার বাম পাশে শুতে শুরু করেন | প্রথম আড়ষ্টতা  কাটলে, একদিন তিনি অজান্তে ঘুমের ঘোরে পরিমলের কাছে গুটিয়ে তাঁর বাম হাতে মাথা রাখলেন | ভোরে ঘুম ভেঙ্গে ব্যাপারটা গোচর করে লজ্জা পেলেন | পর পর কদিন পরিমল দেখলেন সকালে বাম হাতটা অসাড় হয়ে আছে | তারপর একদিন ধরে ফেললেন কারণটা | বহু বছর সংসার করার পরও, সত্যি বলতে কি মৃত্যু শয্যা ধরার আগে অব্দি, মলিনা ওই ভাবে ঘুমের ঘোরে পরিমলের ভাঁজ করা বাম হাতে মাথা রেখে শুয়েছেন | আর, কখনও মাঝ রাতে, কখনও ভোর বেলায়, ঘুম ভেঙ্গে পরিমল বিছানায় মলিনা কে না পেলে বাম হাতের সেই জড়তার অভাবের মধ্যে এক অদ্ভুত মোহিনী বিষাদ অনুভব করেছেন |

আজ আবার স্বপ্নটা দেখে ঘুম ভেঙ্গে সেই অনুভূতিটাই ফিরে অনুভব করলেন | একটা সময় ছিল যখন এই স্বপ্নটা তিনি মাঝে মধ্যেই নানান ভাবে দেখতেন | তারপর কয়েক বছর হয়ত স্বপ্নটা দেখেন নি | আজ আবার কেন ?

পরিমল বাবু অবসর নেয়ার পর কাজ থেকে ছুটি পান নি | তাঁর উপরওয়ালা সিনিয়র ম্যানেজার গোবর্ধন সাহেব তাঁকে ধরে রেখেছিলেন | কাজে কর্মে কী ভাবে তিনটে বছরও কেটে গিয়েছিল | কাজের তেমন চাপ ছিল না, এদিকে  দিব্যি মাস গেলে মন্দ-নয় মাইনে | সারাদিন কেবল সেলস এর নতুন ছেলে গুলো মাঝে মাঝে আসত, এ কথা সে কথা নিয়ে | তাদের সবার সমস্যা একই – লক্ষ্য অনুযায়ী সেলস হচ্ছে না, কী করা উচিত ? ছেলে গুলোকে বুঝিয়ে সমঝিয়ে বিদায় করতেন | মাঝে মাঝে গোবর্ধন সাহেব ডেকে পাঠাতেন, সেলস নিয়ে কিছু পরিসংখ্যা চাইতেন, কিছু আলোচনা করতেন | তারপর সকাল গড়িয়ে দুপুর হলে, দেড়টা নাগাদ পরিমল ব্যাগ খুলে টিফিন বাক্স বের করে নিয়ে হাত ধুয়ে এসে খেতে বসতেন | রোজ প্রায় একই খাবার – মাঝারি ওভ্যল টিফিন বাটিতে মলিনার নিপুণ হাতে গুছানো – দুটো রুটি, একটা শুকনো তরকারী, একটু কাটা শসা-টমেটো, এক চিলতে আঁচার মাঝে মধ্যে, কিছু কাটা ফল, আধখানা তাঁর প্রিয় সন্দেশ, কয়েকটা কাজু-কিসমিস, আর এক টুকরো চীস | এই শেষ জিনিসটা তিনি খুব তারিয়ে তারিয়ে খেতেন | যেদিন খাওয়ার সময় কেউ ঢুকে পড়ত, তাকে কাটিয়ে দরজা বন্ধ করে শেষটুকু খেতেন | আঙ্গুরের সময় কালো আঙ্গুর দিয়ে, নইলে কিসমিসের সাথে, একটু একটু করে চীসটা – একটু নোনতা, একটু টক-মিষ্টি | অফিস ছাড়া অব্দি তার স্বাদ লেগে থাকত মুখে |

হটাত এক ডিসেম্বরে গোবর্ধন সাহেব ভাইস-প্রেসিডেন্ট হয়ে হেড অফিসে বদলি হয়ে গেলেন | তাঁর জায়গায় বসলেন তাঁর অপ্রিয় অধস্তন কাপাডিয়া সাহেব | তিনি আর কোনদিন পরিমলকে ডেকে পাঠালেন না | মাস কয়েক কেটে গেলে একদিন পার্সোনেল থেকে ফোন এলো – আগামী এপ্রিলে আর তাঁর চুক্তির নবীকরণ হবে না | এক দু’ দিন ভেবে ভেবে শেষে তিনি গোবর্ধন সাহেব কে ফোন করলেন | সব কথা শুনে গোবর্ধন সাহেব বললেন, “ঠিক আছে | আমি এখন একটু ব্যস্ত আছি ... আপনি অফিসে যেমন আসছেন আসুন | কিছু একটা ব্যবস্থা করে আপনাকে জানাব | তবে আপনি অফিস আসা বন্ধ করবেন না |”

পরিমল অফিসে যাওয়া বন্ধ করেন নি | কিন্তু এপ্রিল এলো, প্রায় দু’ সপ্তাহ কেটে গেল, গোবর্ধন সাহেব আর ফোন করলেন না | এক দিন থাকতে না পেরে পার্সোনেল কে জিজ্ঞাসা করে জানলেন তাদের কাছেও কোনও আশাপ্রদ খবর নেই | শেষে ষোলই এপ্রিল থেকে পরিমল অফিস যাওয়া বন্ধ করলেন | তখন দুপুরের অফিসে একান্তে বসে আঙ্গুর আর চীস খাওয়া বন্ধ হয়ে বাড়ির ভাত খেয়ে বিশ্রাম নেয়া শুরু হল | আর অবশ্যম্ভাবী দিবানিদ্রায় দেখা দিয়ে হানা দিল বারবার সেই স্বপ্নটা |

স্বপ্নটা খুব সাধারণ | উনি অফিস যাওয়া বন্ধ করেন নি | রোজ অফিস যান | ছেলেরা আসে, শলা পরামর্শ করে | কাপাডিয়া সাহেব অবশ্য কখনই কোনও কাজ দেন না | তবু যেন পরিমল বাবু অফিসের একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছেন | কাজের চুক্তি নেই, তাই মাইনে বিনেই মাসের পর মাস কাজ করছেন | তবে তাঁর পুরানো গাড়িতেই পুরানো সহকর্মীদের সাথে অফিস যান, পুরানো কামরাটা থেকেও তাঁকে সরানো হয় নি | এই ভাবেই তাঁর দিন কেটে যাচ্ছে কাজের ব্যস্ততায়, অন্তত মলিনা তাই মনে করেন | আর ওই দুপুরে দরজা বন্ধ করে টিফিন খাওয়া, সব শেষে আঙ্গুর আর চীস, তাও বজায় আছে | শুধু, একটাই অস্বস্তিকর অবমাননা বোধ, কতদিন তিনি বিনে মাইনেতে কাজ করবেন | কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে, “এখন কত পাচ্ছেন ?” কী জবাব দেবেন ? কিন্তু এও সত্যি যে এই নিয়ে কথা বলতে গেলে যদি শোনেন যে তাঁর তো আর কাজ করার কথা নয় | যদি ... এক করতে আর এক হয়, অফিসে আসা বন্ধ হয়ে যায় | তার চেয়ে থাক না, যেমন চলছে |

যেদিনই এই স্বপ্ন দেখেছেন, স্বপ্ন দেখতে দেখতে ঘুম ভেঙ্গে গেছে, অনেকক্ষণ বিশ্বাস হয় নি যে তাঁর আর কাজটা নেই | তখন সেই নিভৃত অফিসের স্বপ্নের রেশ আর কাজ না থাকার প্রকৃত বিষাদের মাঝে পিষে মনটা ছটফট করেছে |

এর পর, হটাত করে মলিনা মারা গেলে তাঁর জীবনে কী একটা আমূল পরিবর্তন এলো | যিনি কিছুদিন আগেও রাত্রে ঘুমের ঘোরে পরিমলের বাম হাতে মাথা রাখতেন, তাঁর শেষ রাত কাটল এক হাসপাতালের বিছানায় | তারপর কত দিন পরিমল ঘুম থেকে উঠে বাম হাতে সেই জড়তার অবসন্নতা অনুভব করেছেন, আর অন্যমনস্ক ভাবে হাতড়েছেন বিছানার চাদর - মলিনার উপস্থিতি, অন্তত উত্তাপ, খুঁজে | অনেকদিন লেগেছে সেই ছোঁয়া কাটতে | এর মধ্যেই পরিমল একদিন লক্ষ্য করে আশ্চর্য হয়েছেন যে তাঁর অফিস যাওয়ার সেই স্বপ্ন আর তিনি দেখেন না | আজ আবার দেখলেন হয়তো বছর দুয়েক পরে |

পরিমল বাবু ঘোরটা কাটিয়ে উঠলেন | খাবার টেবিলে গিয়ে জলের বোতলটা তুলে জল খেতে গিয়ে দেখলেন সকালে আনা কালো আঙ্গুর আর চীসের বাক্সটা তিনি খেয়ে উঠে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখতে ভুলে গেছেন | তার পাশে খোলা টিফিন বাটিটা পিঁপড়েয় ভরে গেছে |

মলিনা থাকলে ...


-----------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০১৫

ইঁদুর


|| ইঁদুর ||


ভোর ভোর ঘুম ভেঙ্গে গেলেও, শৈলজার তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা একটু একটু করে কাটছে | হটাত মনটা তির তির করে সজাগ হয়ে উঠলো | আলতো গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, “উঠে পড়েছ ?” পাশ থেকে শিবনাথ উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ | ঘুমটা ভেঙ্গে গেল ... দেখি জানালায় একটা ইঁদুর এদিক ওদিক করছে |”
শৈলজা চমকে উঠলেন, “ইঁদুর ?”

বিস্মৃতিতে লুকিয়ে থাকা বর্জিত একটা শব্দ ...

তাঁদের বিয়ের পর দু’বছর কেটেছিল ২২/২ বনবিহারী মিস্ত্রী লেনে | পাড়াটা প্রায় বস্তি | বেশির ভাগ টালির কি টিনের ছাতের কুঁড়ে | তার মাঝে এক দু’টো পাকা বাড়ি | যেমন তাদের ভাড়া বাড়িটা | দোতলায় টালির ছাতের দু’খানা ঘর | সামনের উঠোন পেরিয়ে সিঁড়ি উঠে ঝুল বারান্দা হয়ে বসার ঘর, শোয়ার ঘর তারপর | তার নিচু জানালা দিয়ে পিছনের কুমোর বাড়ি দেখা যায় | নিধু কুমোর ভোরে উঠেই কাজে লেগে যায় | একটু বেলা হলে তার বউ মিনতি এসে ঘরের কাজ করে যায় | তার উপচানো সোমত্ত শরীর দেখে শৈলজার ভীষণ অস্বস্তি করে | তাই রবিবারে ডাকেন না | শিবনাথ এক দু’বার বলেছেন, “রোববারেও তো ডাকলে পারো | কেন মিছে ছুটির দিন খেটে মরো ?” তবুও, ওই অস্বস্তিটুকু বাদ দিলে নিটোল জীবন |

সেই জীবনে ইঁদুরের উৎপাত শুরু হয়েছিল | তার আগেই শৈলজার নিজস্ব অভিধানে ইঁদুর কথাটা জুড়ে বসেছে – কখনও নেংটি, কখনও ধেড়ে | তাই নিয়ে কৌতুক, অভিমান কি বিরক্তি - আবার বেশি উৎপাত হলে রাগ | কিন্তু, একদিন সত্যি ইঁদুর দেখা দিল | ভোরের আলো ফুটেছে কি গায়ে চাপায় হালকা টান পড়ায় শৈলজার ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল | দেখলেন, শিবনাথ ঘাড় তুলে আধশোয়া হয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রয়েছেন | শৈলজা জিজ্ঞাসা করলেন, “কী  দেখছ ?” শিবনাথ ধপ করে শুয়ে পড়ে বলেছিলেন, “ইঁদুর | জানালার চৌকাঠে এদিক ওদিকে দৌড়ে বেড়াচ্ছে |” “ও,” বলে শৈলজা পাশ ফিরে শুয়ে পড়েছিলেন | তারপর মাঝে মধ্যেই ভোরে গায়ে চাপায় টান পড়ত | শৈলজা বুঝতেন ইঁদুর এসেছে | শেষে ইঁদুরের ভয়ে শৈলজা মশারি খাটিয়ে শোয়া শুরু করলেন, যদিও পাড়াটায় মশা নেই বললেই হয় |

সেদিনের কথা আজও মনে দেগে আছে | ভোরে - বোধ হয় হাল্কা হাওয়ার চাপে - খুট করে জানালার পাল্লার ঠোকাঠুকির শব্দ শুনে ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল | উঠেই শুনলেন নিধু কুমোরের উঠোনে চাপা কলের শব্দ | তারপর বালতি থেকে জল ঢালার ক্রমাগত ছপছপ | একটু পরেই মিনতির গলায় আদুরে ডাক, “হ্যাঁ গা, গামছাটা একটু দেবে |” চুপিসারে শৈলজা উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে ঝুল বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন | তার দূর প্রান্ত থেকে নিধুর উঠোন একটু দেখা যায় | মিনতি এত ভোরে স্নান সেরে ভিজে শাড়ির প্রায় সবটাই তারে মেলে দাঁড়িয়ে | তার সিক্ত টানটান আবলুস শরীরে সূর্যের প্রথম রশ্মির আভা চিকচিক করে উঠে এক অদ্ভুত নম্রতার মায়াজাল বিছিয়েছে | শৈলজার শরীরটা ঝিমঝিম করে উঠল | পা টিপে ঘরে ফিরে শোয়ার ঘরের দরজার চিলতে ফাঁক দিয়ে দেখলেন শিবনাথ আধশোয়া ভঙ্গিতে জানালা দিয়ে বাইরে দেখছেন | 

তারপর কী ভাবে বিরামহীন চল্লিশটা বছর কেটে গেছে | নিরলস, নিরুপদ্রুত, কিন্তু বৈচিত্র্যহীন নিঃসন্তান সংসার | তবে গায়ে চাপা আলাদা হয়েছে | আস্তে আস্তে সব রকমের ইঁদুরের সাথে আপোষ হয়েছে | ইঁদুর শব্দটাও দূর হয়ে আর কারো মুখে ফিরে আসে নি | শিবনাথ একটু একটু করে জীবনে উন্নতি করেছেন | শৈলজাকে আদরে রেখেছেন | ক’বছর আগে অবসর নিয়ে এই সাত তলার ফ্ল্যাটে উঠে এসেছেন | এখন উপর থেকে অনেক উঠোন দেখা গেলেও তাদের এত দূর থেকে দেখা ক্ষুদ্র ছবি সব তুচ্ছ, অর্থহীন | জীবন তাই এখন নিশ্চিন্ত |

এক লহমার স্মৃতিচারণ থেকে বেরিয়ে এসে শৈলজা ধরে রাখা দীর্ঘশ্বাসটা ছেড়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “ধেড়ে না নেংটি ?”
শিবনাথ বললেন, “বুঝলাম না | শুধু ওর পিঠটা একটু দেখতে পেলাম |”
শৈলজা নিজের গায়ে চাপা থেকে একটা হাত বের করে শিবনাথের গায়ে চাপার ভিতর ঢুকিয়ে তাঁর গায়ের উপর রাখলেন | বললেন, “না, না, এই সাত তলার স্বর্গে ইঁদুর আসবে কোথা থেকে ? অন্য কিছু হয়তো | তুমি ঘুমাও |”

--------------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ২৩ জানুয়ারি ২০১৫

রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০১৫

গুড়-বাদাম ও দাঁতপরী

|| গুড়-বাদাম ও দাঁতপরী ||


নাতি নাতনি আসছে, বিদেশ থেকে | সুদাম বাবু লুকিয়ে লুকিয়ে গুড়-বাদাম কিনে আনলেন | ছেলে ছোটবেলায় খেতে ভালবাসত | কিন্তু বিদেশ গিয়ে তার রুচি বদলে গেছে | জানলে বাচ্চাদের খেতে দেবে না, বলবে, “বাবা, ওদের ওই সব ফেরিওয়ালাদের অস্বাস্থ্যকর খাবার দিও না | পেটে সইবে না |”

সুদাম বাবু ভালোই জানেন, টিনটিন আর তুলতুল খুব পছন্দ করবে | তবুও ওদের হাতে তুলে দিয়ে সাবধান করে দিলেন, “বাবা কে বলবি না |” দু’জনে সন্দিগ্ধ হয়ে তাকাল | হেসে বললেন, “যা, চিলেকোঠায় গিয়ে বসে খা | ভালো লাগলে বলিস, বিকেলে আবার দেব |” দু’জনে মাথা নেড়ে চলে গেল | একটু পরে সিঁড়ির অর্ধেক উঠে উঁকি মেরে দেখলেন, দুজনে ঘুপটি মেরে বসে চুষে চুষে খাচ্ছে | ‘তাহলে কি  ...?’ অমূলক সন্দেহ দৃঢ় হাতে সরিয়ে বললেন, “চুষে না রে বোকা, কামড়ে কামড়ে খেতে হয় |” দু’জনেই চারিদিকে গুড় আর লালঝোল মাখা মুখ থেকে গুড়-বাদাম বের করে হাসল | তারপর খেতে মন দিল |

দু’জনেই বিকেলে এসে হাত পাতলে সুদাম বাবু নিশ্চিন্ত হলেন | বললেন, “চিবিয়ে চিবিয়ে খাবি, বুঝলি ?”

রাত্রে শুয়ে ঘুম এসেছে এসেছে, কি সৌদামিনী দেবী ঘরে ঢুকে বললেন, “জানো তুমি কী কাণ্ড করেছ ? ... ও ঘুমিয়ে পড়েছ বুঝি ?”  সুদাম বাবু ঘুম জড়ানো গলায় বললেন, “না, কী বলছ, বলো |” “দাঁড়াও” বলে সৌদামিনী দেবী বাতি নিবিয়ে পাশে শুয়ে পড়ে বললেন, “একটা জিনিস দেখাতে চাইছিলাম, আচ্ছা ঘুম থেকে উঠে দেখো |”
-    “না, ঘুম আসতে দেরী আছে | কী দেখাবে, দেখাও |”
-    “আসলে ... বলছিলাম কী, বাচ্চাদের ওই গুড়-বাদাম না দিলেও পারতে |”
-    “কেন ? কী হয়েছে ?”
-    “যত সব আজে বাজে জিনিস | গুড় আর বাদামের নামে কী না কী দেয় |”
-    “কী হয়েছে বলবে ?”
-    “কী আবার | বিকেলে তুলতুল কাঁদতে কাঁদতে এলো | গুড়-বাদাম খেতে গিয়ে মুখে পাথর পড়েছে | লালঝোল শুদ্ধু মুখ থেকে বার করে আমার হাতে দিল | বাব্বা কী রঙ দেয়া সব |”
-    “তুমি ঠিক দেখেছ পাথর ছিল ?”
-    “দেখেছি বই কি ! তোমায় দেখাবো বলে ধুয়ে রেখে দিয়েছি | দাঁড়াও |”
সৌদামিনী দেবী মাথা তুলে উবু হয়ে বালিশের তলায় হাতড়ে কিছু বের করে বললেন, “নাও, হাত পাতো |” সুদাম বাবু হাতে নিয়ে উঠে বসলেন | অন্ধকারে দেখা না গেলেও পাথরই মনে হচ্ছে | মাথার পাশ থেকে মোবাইলটা নিয়ে বোতাম টিপলেন | তার ক্ষীণ আলোয় পাথরটা ভালো করে দেখে মোবাইলটার আলো ফেললেন সৌদামিনীর মুখে | সৌদামিনী বিরক্ত হয়ে বললেন, “আরে, কী করছ ? আমার মুখে আলো ফেলছে কেন ?”
সুদাম বাবু বললেন, “তোমাকে দেখছি |”
-    “আ মরণ ! আমাকে আবার দেখার কী হলো |”
-    “দেখছি ... আগে তো কখনও দাঁতপরী দেখিনি, তাই | বড় সুন্দর লাগছ !”


------------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ১১ জান্যুয়ারী ২০১৫

বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০১৫

প্রসূনের জন্মদিন

|| প্রসূনের জন্মদিন ||


আজ প্রসূনের জন্মদিন | এগারয় পা দিয়েছে | খুব ভয় পাচ্ছি | একটু পরেই সান্ধ্য অনুষ্ঠানটা শেষ হয়ে সবাই চলে গেলে, খেয়ে, অন্য সব ঘরের বাতি নিভিয়ে টিভি চালিয়ে বসব, শোয়ার আগে একটু খবর শুনতে | ঠিক তখন ও এসে রিমোট কেড়ে নিয়ে টিভি ম্যুট করে বলবে, “বাবু, এবার বলো |”

কী বলতে হবে জানি | তবু, জিজ্ঞাসা করব, “কিসের কথা বলছ ?” প্রসূন বলবে, “ওই যে, আমি কোথা থেকে এসেছিলাম ?” আমি বলব, “ঠিক আছে | বলেছি তো, একদিন বলব | আর একটু বড় হও |” ও বলবে, “আর কত বড় হব ? সেই কবে থেকে তুমি একই কথা বলে আসছে | না, না, আমি এখন বড় হয়ে গিয়েছি | এবার তোমাকে বলতেই হবে |”

প্রসূন আমার দত্তক নেয়া ছেলে | সুপ্রভার বাচ্চা হচ্ছিল না | কারণ জানা যায় নি, কেননা সুপ্রভা অজ্ঞাত অন্ধ বিশ্বাসে কোনও পরীক্ষা করাতে রাজী হয় নি | অনেক বুঝিয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম | তাই আমিও নিজের কোনও পরীক্ষার ধারে কাছে যাই নি | কয়েক বছর অনেক দোনোমনা করে দু’বছরের কচি প্রসূন কে শিশু সদন থেকে নিয়ে এসেছিলাম | যেদিন ওকে নিয়ে আসি, একবছর পরে সেইদিন ওর জন্মদিন হিসাবে পালন করতে শুরু করেছিলাম | তারপর স্কুলে যখন গেল, জন্মদিনে ওর সাথে অনেক লজেন্স, টফি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম, বন্ধুদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে | সেদিন ফিরে এসে প্রথম জানতে চেয়েছিল, “বাবু, আমি কোথা থেকে এসেছিলাম ?” পাঁচ বছর এড়িয়ে গিয়েছি |

সুপ্রভা থাকলে হয়ত বুঝিয়ে বলতে পারত | কিন্তু সুপ্রভা তো প্রসূন কে আনার বছর দুয়েক পরে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল একদিন, হটাত | একটা সংক্ষিপ্ত চিঠি রেখে গেল, “আমি নিজের ধনে সুখী হতে চাই | আশা করি তুমিও এই ভাবে সুখী হবে | প্রসূন কে বোলো, ও বড় হলে বুঝবে |” আমি অতি কষ্টে প্রসূনকে আগলে ছিলাম | হয়ত ছোট বলে সম্ভব হয়েছিল |

আজ আমি বিশেষ করে ভয় পাচ্ছি | স্কুল থেকে প্রসূনকে আনার সময় সুপ্রভাকে দেখেছি | একটা বছর তিন চারের ছোট ছেলের হাত ধরে দাঁড়িয়ে প্রসূনকে খুব কাছ থেকে দেখছিল | খুব ভয় হল, হয়ত চিনতে পেরেছে | হয়ত আলাপ করেছে, হয়ত কিছু বলেছে |

গাড়িতে উঠেই প্রসূন বলেছিল, “বাবু, তুমি মা কে দেখেছ ? দাঁড়িয়েছিল |”
আমি বললাম, “মা ! কার মা ?”
প্রসূন বলল, “আমার ! এসে যে আমায় বলল, আমি তোমার মা | তুমি তাকে দেখেছ ?”


-----------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ০৮ জানুয়ারি ২০১৫

শনিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৪

লুপ লাইন

৷৷ লুপ লাইন ৷৷


ট্রেনটা লিপিং স্টেশন ছেড়ে ধীরে ধীরে বাঁক নিয়ে গতি বাড়াল ৷ প্রায় সবাই নেমে গেছে ৷ এখন এটা লুপ লাইনে চলবে, এক একটা স্টেশন ধরে ধরে ৷ মেন লাইনে একটাই স্টেশন – টুরিস্টদের গন্তব্য – ওখান থেকে পাহাড়ের নিচে বিম্বল লেক দেখা যায় ৷ ছুটির দিন ছাড়া শুধু প্রেমিক প্রেমিকাদের ভিড় – রঁদেভুর জায়গা ৷ দুই লাইনই শেষ হয়েছে হাফলং এ ৷

আমার একমাত্র সঙ্গী যাত্রী, বয়স্ক ভদ্রমহিলা উৎসুক হয়ে বাইরে দেখছেন ৷ মনে হল হয়ত বহুদিন পরে ফিরছেন ৷ চেহারা উদগ্রীব, তার সাথে একটু চিন্তার ছায়া ৷

ট্রেনটা লাপুস্কাতে ঢুকতেই উনি উঠে দাঁড়ালেন ৷ দ্রুত পায়ে দরজায় গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে অস্ফুট স্বরে বললেন, শান্ত স্টেশনের নিস্তব্ধতায় শুনলাম, “এ কী, লাপুস্কা !” তারপর আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে ইংরেজিতে জিজ্ঞাসা করলেন, “বিম্বল লেক হল্ট কি পড়ে না এই লাইনে ?”

আমি মাথা নাড়লাম, বললাম, “এটা লুপ লাইন দিয়ে যাচ্ছে ৷ ওখানে নামতে হলে মেন লাইন হয়ে যেতে হয় ৷”
উনি – “কিন্তু ওরা যে বলল হাফলং এর ট্রেন ধরতে !”
আমি – “ঠিকই বলেছে ৷ কিছু ট্রেন মেন লাইন দিয়েও যায় ৷”
ভদ্রমহিলা অসম্ভব হতাশ হয়ে স্বগতোক্তি করলেন, বাংলায়, “আবার সেই ভুল করলাম !”

এবার আমি ওনার মুখের দিকে তাকালাম ৷ বয়েসের সাথে নিঃসঙ্গতার ছাপ ৷ আবরণ ও আভরণে মনে হল অবিবাহিতা ৷ হাতের এখনো পেলব আঙ্গুল দেখে মনে হয় সংসারের ধকল বইতে হয় নি ৷ আমি বাংলায় বললাম, “কিছু যদি মনে না করেন, এর আগেও কি কখনো এই ভাবে লুপ লাইনে ভুলে চলে এসেছিলেন ?”

ভদ্রমহিলা আমার দৃষ্টি দেখে, মাথায় কাপড় তুলে সাদা সিঁথি ঢেকে বললেন, “হ্যাঁ ... অনেক দিন আগে ৷ ভুলেই গেছিলাম, সেই ভুলের কথা ৷”


------------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ২০ ডিসেম্বর ২০১৪

বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৩

অপেক্ষা

|| অপেক্ষা ||


ট্যাক্সি ধরলাম অফিসের সামনে থেকে | ক্লান্ত, তাই উঠেই সিটে শরীরটা এলিয়ে দিলাম | অনেক রাত হয়ে গেল আজ | হটাত ড্রাইভারের সিটের পিছনে লেখা ট্যাক্সির নম্বরটা চোখে পড়তেই চমকে উঠলাম | এই নম্বরটাই কি  ট্যাক্সির পিছনে লেখা ? ড্রাইভারটা নিশ্চয় আমার প্রতিক্রিয়াটা দেখেছিল আয়নায় ; বলল, “চিন্তা করবেন না |”
আমি – “চিন্তা ? আপনি কী করে বুঝলেন আমি চিন্তা করছি ?”
ড্রাইভার – “বলুন তো, গাড়ির নম্বরটা আজ কেন লক্ষ্য করলেন ? কিছু মনে পড়েছে কি ?”
আমি – “কেন কিছু মনে পড়বে ?”
– “৭৯১৩ – সাতই সেপ্টেম্বর দু হাজার তের ? এটা আপনার বিবাহ বার্ষিকীর দিন না ?”
– “আপনি কী করে জানলেন ?”
– “আজকের তারিখ ! আজ আপনি এত দেরী অব্দি অফিস করলেন কেন ?”
– “শুনুন, আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে আপনি নাক গলাচ্ছেন ! দরকার নেই ... আপনি ট্যাক্সি থামান !”
– “এত দেরীতে কোনও ট্যাক্সি পাবেন না | বললাম যে, চিন্তা করবেন না ... জানেন, কতবার আপনি এই ট্যাক্সি ধরেছেন ?”
– “এই ট্যাক্সি ?”
– “হ্যাঁ | প্রথম, যেদিন আপনি ম্যারেজ রেজিস্ট্রি অফিসে যাওয়ার জন্য দাঁড়িয়েছিলেন ; যেদিন প্রথম অফিসে যোগ দিলেন ; যেদিন বসের গাড়ি থেকে হটাত মাঝ পথে ছিটকে নেমে পড়ে আপনার স্বামী কে মোবাইলে ডাকলেন, ট্যাক্সি পাচ্ছেন না বলে ; যেদিন তিন বছরের ছেলের হাত ধরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেন | মনে আছে সেই সব দিন আপনি কোন ট্যাক্সিতে উঠেছিলেন ... ভেবে দেখুন তো |”
– “আপনি কি আমাকে ফলো করেন নাকি ?”
– “বলতে পারেন | আমাকে দেখতে হয় যাতে আপনি নিরাপদে যাওয়া আসা করেন | বিশেষ করে যেদিন থেকে আপনি বসের গাড়িতে বাড়ি ফেরা বন্ধ করলেন |”
– “এরকম ভয়ঙ্কর কাজ করেন আপনি ? একজন ভদ্রমহিলাকে ফলো করা, দিনের পর দিন | কেন ?
– “এই আশায় যে একদিন গাড়িতে উঠে বলবেন, আপনাকে আগের ঠিকানায় নিয়ে যেতে |”
– “আগের ঠিকানায় ?”
– “আপনার স্বামীর, যাকে আপনি ছেড়ে দিয়েছেন, যে ভদ্রলোকের ট্যাক্সির ব্যবসা করা থেকে বেকার হওয়া ভালো |”
– “আপনি কে ? আপনি তাকে চিনলেন কেমন করে ?”
– “আমি ... আমি তারই গাড়ি চালাই | তিনি আমাকে রোজ পাঠান, আপনার নিরাপত্তা দেখতে ... আর অপেক্ষা করেন ... আজও !”
– “তুমি !”

------------------------------------------
© ইন্দ্রনীর / ১৪ নভেম্বর ২০১৩